| | |
এই মুহূর্তে ::
বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘রঙিন ছাতার রহস্য’ বর্ণ বিদ্বেষ, হেনস্থা, উত্তর-পূর্বে ক্ষোভ : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জয়ন্ত দে-র ছোটগল্প ‘সংসারযাত্রা’ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে কার্যকরী উদ্যোগ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ পাষাণকন্যার পুনরুত্থান — পৌরাণিক অহল্যা ও বর্তমান সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি : রিঙ্কি সামন্ত শিল্পী সোমনাথ হোর : যোগেন চৌধুরী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৭/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোলের সন্ধানে দুই বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিস্মৃতপ্রায় শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ফ্রানস বালথাজার সলভিনস ও উত্তর কলকাতার ঘোড়ার সহিস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার জনসংযোগের বিপণনে দুর্গোৎসব : পান্নালাল রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৫/১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আকাশ প্রদীপ — পুরাণ, ভক্তি ও বিশ্বাস : যশোবন্ত রায় ৮১ বছরে জাতিসংঘ: সবার প্রত্যাশা পূরণে কতটা সক্ষম? : নিকোলাস বিশ্বাস বোধিসত্ত্ব সঞ্জয়-এর ছোটগল্প ‘স্যার’ কুমারটুলির সহিসমহল্লা ও দেবী দুর্গার বাহন ঘোটকমুখী সিংহ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বিজয়াদশমীর ভাঙ-সিদ্ধি : অসিত দাস কলকাতায় এমন দুর্গাপুজো দেখিনি তো আগে : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ওঝা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৯৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই কোজাগরী লক্ষ্মী পূর্ণিমার আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

উল্লাস মল্লিক-এর ছোটগল্প ‘অনন্যার মা-বাবা’

Reporter
উল্লাস মল্লিক / ৭৪৬ Views জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ৪ জুলাই, ২০২৩

একটি ছেলে আর একটি মেয়ে। এভাবে গল্পটা শুরু করা যায়। গল্প শেষও করা যায় এইভাবে। ছেলেটি আর মেয়েটি। কিন্তু নাম না থাকা চরিত্রের গল্প বলব না এখানে। তাই ছেলেটির আর মেয়েটির একটা করে নাম দেব। খুব সাধারণ নাম। কারণ, ওরা দু’জনেই খুব সাধারণ।

ছেলেটির নাম ধরা যাক অমল। রোগাপাতলা চেহারা, লম্বাটে গড়ন, একমাথা ঢেউখেলানো কালো চুল, উজ্জ্বল দুটো চোখ। খুব মৃদু গলায় কথা বলে সে।

মেয়েটির নাম অঞ্জলি। অঞ্জলি বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা মেয়ে— ফরসা, টানাটানা চোখ, লাল ঠোঁট, চিবুকে একটা অব্যর্থ কালো তিল। তার গভীর কালো চোখ যেন অতল দিঘি। কী অমোঘ তার আহ্বান! মেয়েটি চোখ তুলে তাকালে ভালবাসার মানুষ তলিয়ে যায় সেখানে, থই পায় না কিছুতেই।

এক মায়াময় গোধূলিতে দেখা হয়েছিল দু’জনের। গ্রামের ছোট নদী।  নদীবাঁধের ওপর লাল মাটির রাস্তা। সেই রাস্তা ধরে সাইকেল চালিয়ে আসছিল অঞ্জলি। ক্লাস টেন। সাইকেলের প্যাডেলে টিউশনির তাড়া।

সূর্য ডুবেছে একটু আগে। নীল আকাশে কিছু আপনভোলা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে। অস্ত যাওয়ার আগে সূর্যদেব একটু আবির খেলে গেছে ওদের সঙ্গে। সেই আবির-মাখা মুখ নদীর জলে দেখে নিচ্ছে ওরা। মাঝি তার ডিঙি-নৌকাটি নিয়ে নদী পেরোচ্ছে। নদী থেকে উঠে আসছে শরীর জুড়নো ঠান্ডা বাতাস।

এমন এক মনোহারী গোধূলি সন্ধ্যায় ঘটনাটা ঘটল। একটু বুঝি অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিল অঞ্জলি। ছোট একটা গর্তে পড়ল সাইকেলের সামনের চাকা।  সাইকেল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল অঞ্জলি। পড়তে পড়তে কোনওরকমে সামলে নিল সে। কিন্তু সাইকেল পড়ল আছড়ে। ছিটকে পড়ল বইখাতা।  তখন ছেলেটি আসছিল উলটো দিক থেকে। প্রকৃতির এই মায়াময় রূপে বিভোর সে। সম্মুখে হঠাৎ ছন্দপতন। তাড়াতাড়ি সাইকেল স্ট্যান্ড করে মেয়েটির বইখাতাগুলো কুড়িয়ে নিল সে। মেয়েটির হাতে দিল। কাঁপা হাতে বইখাতা নিল মেয়েটি। বড় লজ্জা পেয়েছে সে। ছেলেটি সাইকেলটি তুলল এর পর। দেখে নিল। ঠিকই আছে। এগিয়ে গেল মেয়েটির দিকে। বলল, “ঠিক আছে, চালাতে অসুবিধা হবে না।”

মেয়েটি কী বলবে বুঝতে পারছে না। কিন্তু কিছু একটা তো বলা দরকার। ধন্যবাদের মতো উপযুক্ত শব্দ মাথায় আসছে না। অথচ বলা দরকার কিছু একটা। অবশেষে বলতে পারল, “টিউশন পড়তে যাচ্ছি। ইংরেজি।”

ছেলেটি বলল, “পরেশবাবুস্যার?”

মেয়েটি মাথা নাড়ল, “হ্যাঁ।”

“আমিও ওঁর কাছে পড়েছি। এখন ফার্স্ট ইয়ার, রঘুনাথপুর কলেজ।”

মেয়েটি বলল, “আসি?”

এমনভাবে বলল যেন ছেলেটির অনুমতির উপর নির্ভর করছে ওর যাওয়া, না-যাওয়া।

ছেলেটি ঘাড় নাড়ল।

মেয়েটি কিছু বলল না। সাইকেলে চড়ে বসল। ছেলেটিও।

কয়েক মুহূর্ত পর ছেলেটি পিছন ফিরে তাকাল একবার। আশ্চর্য ঠিক তখনই মেয়েটিও তাকিয়েছে।

পরদিন আবার দেখা হল দু’জনের। ঠিক সেই জায়গায়। ঠিক তেমনই গোধূলি সন্ধ্যায়। যেমন হয় আর-পাঁচটা গল্পে। নতুন কিছু নয়।

###

ওদের বিয়ে হল একদিন। ততদিনে স্নাতক হয়ে গেছে অঞ্জলি। ছেলেটি বেসরকারি ক্ষেত্রে ছোটখাটো চাকরি পেয়েছে একটা। যদিও বিয়েটা সহজ হল না ওদের। অঞ্জলি সম্পন্ন ঘরের মেয়ে যে! বাবার বড় ব্যবসা। তাঁরা মেয়ের বিয়ে দেবেন তেমনই এক সম্পন্ন পরিবারে। সেখানে অমল কোথায়! তাই খুব অনাড়ম্বর ভাবেই হল বিয়েটা।

তিনজনের ছোট সংসার— শাশুড়ি-মা অমল আর অঞ্জলি। দিন আসে, দিন যায়। বছর ঘোরে। অঞ্জলির বাড়ি থেকে যোগাযোগ করে না কেউ। অঞ্জলির খুব বাবার কথা, মায়ের কথা, ওর পরের দুটো বোনের কথা আর ছোট ভাইটার কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে বারান্দায় টাঙানো দোলনাটার কথা, ঘরের আলমারিতে সাজানো পুতুলগুলোর কথা। আচ্ছা, সাদা বেড়ালটা কি এখনও দুপুরে ভাত খাওয়ার সময় আসে, একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিউ মিউ করে? অমল যখন অফিসে যায়, একা ঘরে থাকে অঞ্জলি, তখন বেশি বেশি মনে পড়ে এসব কথা।

একদিন শাশুড়ি-মা বললেন, “এবার একটা বাচ্চাকাচ্চা নাও বউমা। শরীর থাকতে থাকতে আমি মানুষ করে দিয়ে যাই।”

অঞ্জলি লজ্জা পায়। মুখ লাল হয়ে যায় লজ্জায়। মা তো আর জানেন না, কাল রাতেও এ নিয়ে কথা হয়েছে তাদের মধ্যে।

কাল অঞ্জলির মুখ তখন অমলের বুকে গোঁজা। ফিসফিস করে অঞ্জলি বলল, “তুমি যখন বাড়ি থাক না, বড্ড একা লাগে আমার।”

অঞ্জলির মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে অমল বলল, “আসলে তোমার তো বাপের বাড়ি যাওয়া নেই, না হলে ক’দিন ঘুরে আসতে পারতে।”

অঞ্জলি চুপ করে থাকে।

অমল বলে, “তোমার একটা পুচকি হোক। দেখবে, সময় কোথা দিয়ে কেটে যাচ্ছে তখন।”

অঞ্জলি পলকা হাতে কিল মারে অমলের বুকে। বলে, “খুব বাবা হওয়ার শখ দেখছি।”

অমল বলে, “কেন, তোমার নেই? আচ্ছা, তুমি কী চাও, ছেলে না মেয়ে?”

অঞ্জলি বলে, “তুমি বলো।”

অমল বলে, “তুমি আগে বলো।”

অঞ্জলি বলে, “না, তুমিই তো তুলছ পুচকি পুচকুর কথা।”

“মেয়ে,” অমল বলে, “মেয়ের খুব শখ আমার।”

“সত্যি! আমারও,” বড় বেশি উচ্ছ্বাসে বলে ওঠে অঞ্জলি।

“তা হলে মেয়ে, তাই তো?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, মেয়ে। কত সাজাব তাকে, কত সুন্দর সুন্দর জামা পরাব।  কত রঙের জামা। লাল রং আমার ফেভারিট, লাল জামা বেশি পরাব।”

অমল বলে, “কপালে লাল টিপ।”

“ঠিক ঠিক। আর দু’হাতে রঙিন চুড়ি।”

“পায়ে নূপুর পরাবে না?”

অঞ্জলি বলল, “পায়ে নূপুর তো থাকবেই। নূপুর-পায়ে সারা বাড়ি ঘুরবে, আর ঝুমঝুম শব্দ হবে। কী সুন্দর শোনাবে বলো তো?”

অমল বলে ওঠে, “আচ্ছা, নাম কী হবে? নাম?”

অঞ্জলি বলে, “নাম তুমি দেবে।”

“কেন, তুমি দাও না।”

“না না, মেয়ের নাম বাবাকেই দিতে হয়।”

অমল বলে, “এই আশ্চর্য তত্ত্বটা তুমি কোথায় পেলে?”

“ও মা, এ তো সবাই জানে। তুমিই দেখছি জানো না। নামটা বরং ভাব। ভেবে বলো।”

একটু চুপ করে থাকে অমল। তারপর বলে, “আচ্ছা, অনন্যা নামটা কেমন? আমাদের দু’জনের নামই ‘অ’ দিয়ে শুরু, তাই ভাবছি অনন্যা।”

অঞ্জলি খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। বলে, “খুব সুন্দর। আমার মাথায় এত সুন্দর নাম আসত না। সেই জন্যেই তো তোমাকে বললাম।”

অমল বলে, “তা হলে অনন্যা ফাইনাল।”

“একদম,” বলে, অমলকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে অঞ্জলি।

অমল বলে, “কী হল অনন্যার মা, অমন করছ কেন!”

অঞ্জলি বলে, “আর-একবার ডাকো না ওই নামে! অনন্যার মা!”

তারপর এক খেলা শুরু হল দু’জনের। ভারী মজার খেলা। খেয়ে উঠে অমল মৃদুস্বরে অঞ্জলিকে বলে, “দুটো মৌরি দাও তো অনন্যার মা।”

অঞ্জলি বলে, “অনন্যার বাবা, অফিস থেকে ফেরার সময় মনে করে কাঁচালঙ্কা আর পাতিলেবু নিয়ে এসো তো।”

একদিন অফিস থেকে ফিরে অমল বলে, “জানো তো, আজ চাঁদুদার দোকানে কী সুন্দর একটা লাল রঙের জামা দেখলাম, আমাদের অনন্যাকে খুব মানাবে।”

অঞ্জলি বলে, “বুকে একটা হলুদ ফুল আঁকা, তাই তো!”

অমল বলে, “হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক তাই। হলুদ ফুল। কিনে আনব নাকি? তখন যদি আর না পাওয়া যায়।”

অঞ্জলি বলে, “তুমি কী গো! বাচ্চা হওয়ার আগে জামাপ্যান্ট, খেলনা এসব কিনতে নেই।”

অমল বলে, “ও বাবা, তাই নাকি!”

অঞ্জলি বলে, “হ্যাঁ, মেয়ের বাপ হতে যাচ্ছ, এটুকু জানো না!”

দিন যায়। বছর ঘোরে। কিন্তু সন্তান আসার কোনও লক্ষণ দেখা যায় না অঞ্জলির শরীরে। শাশুড়ি-মা বলেন, “আর দেরি কোরো না মা, এবার একটা নিয়ে নাও।”

চিন্তার আঁকিবুঁকি রেখা দেখা দেয় অমলের কপালে। তাই তো, এতদিন হয়ে গেল, এখনও…

মুখ বিষণ্ণ অঞ্জলিরও। অমলের বুকে মাথা রেখে বলে, “কী হচ্ছে বলো তো! মনে হচ্ছে, আমারই কিছু দোষ।”

অমল বলে, “কী যা তা বলছ, অনেকেরই দেরি হয়। চিন্তার কিছু নেই, বুঝলে অনন্যার মা!”

অঞ্জলির চোখে জল আসে। লুকোতে চেষ্টা করে সে। অমল বলে, “এ মা, এতবড় মেয়ে কাঁদে! দু’দিন পরে মেয়ের মা হবে!”

আরও দিন যায়। মাস যায়। দু’জনে যুক্তি করে। ডাক্তারের কাছে যায়। তারপর কত পরীক্ষা, কত ওষুধ, কত নিয়মপালা। এর মধ্যে অমলের মা গত হলেন, দরজার সামনে কলমের আমগাছটা লম্বা আর ঝাঁকড়া হয়ে যৌবনের গৌরব ঘোষণা করল সদম্ভে, খাঁচার টিয়াপাখিটাকে অঞ্জলি উড়িয়ে দিল একদিন। কোন অজানায় উড়ে গেল সে। শূন্য খাঁচাটা পড়েই ছিল, একদিন লোহার দরে বিক্রি করে দিল অঞ্জলি।

অঞ্জলির দু’বোনেরই বিয়ে হয়ে গেল। বাড়ি এসে নেমন্তন্ন করে গেলেন অঞ্জলির বাবা। বাবাকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদল অঞ্জলি। ছেঁড়া সম্পর্ক জোড়া লেগে গেল। যেমনটা হয় আর কী! অনন্যার বোনেদের বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেল। আরও পরে একদিন ওরা বুঝে গেল অনন্যা কোনওদিনই আর আসবে না।

সংসারে দু’জন মানুষ। মাঝে মাঝে মান-অভিমান। আবার ভাব-ভালবাসা। অঞ্জলি বলে, “তোমার খাওয়াটা দিন দিন কমছে। অফিসে এত খাটুনি, আর দুটো ভাত দিই?”

অমল বলে, “আহা রে, কে বলছে! তোমার নিজের চেহারাটা দ্যাখো একবার, ঘরে তো আয়না আছে।”

একদিন মেলায় গিয়েছিল অঞ্জলি। সেখানে এক কাণ্ড করে বসল। ছোটদের খেলনা কিনে ফেলল কতগুলো। অফিস থেকে ফিরে দেখল অমল। অবাক হয়ে বলল, “ও মা, এগুলো কী গো!”

অঞ্জলি মৃদুস্বরে বলল, “কিনে ফেললাম। মাথায় ভূত চাপল বোধ হয়। দেখি, পাড়ার কোনও বাচ্চা মেয়েকে দিয়ে দেব।”

সে খেলনা বাড়িতেই রয়ে গেল। দেওয়া হল না কাউকে। ক’দিন পরে অফিস থেকে ফেরার সময় একটা লাল জামা কিনে আনল অমল। বলল, “চাঁদুদার দোকানে ঝুলছিল, দেখে খুব লোভ হল, কিনেই ফেললাম। পরে পাড়ার কাউকে দিয়ে দিয়ো।”

অঞ্জলির চোখে জল এল। জামাটা নিয়ে আলমারিতে তুলে রাখল।

তারপর আবার জামা এল। আবার এল খেলনা। একদিন সোনারুপোর দোকানে গিয়ে ছোট মেয়ের একজোড়া নূপুর গড়িয়ে আনল দু’জনে।

এখন ওই যে, দুটো মানুষ বসে আছে বিছানায়। জানলা দিয়ে, চাঁদের আলো এসে পড়েছে ঘরে। রোজ রাতে ওরা এমনই বসে থাকে। একজন বলে, “অনন্যার মা, শুনতে পাচ্ছ ঝুমঝুম শব্দ?”

অন্যজন বলে, “ও মা, শুনতে পাব না কেন, অনন্যা নূপুর পরেছে যে। আর জানো, তোমার আনা সেই লাল জামাটা পরিয়ে দিয়েছি আজ।”

একজন বলে, “ও কি শোবে না এখন? রাত তো হল।”

অন্যজন বলে, “আচ্ছা, খেলছে, খেলুক না। ঘরের দরজা তো খোলাই রইল, ও ঠিক এসে শুয়ে পড়বে।”

অনন্যার বাবা-মা শুয়ে পড়ে। বিছানার মাঝখানটা ফাঁকা রেখে শোয়। ছোট একটা মাথার বালিশও থাকে মাঝখানে। ঘরের দরজা খোলা। ছোট্ট অনন্যা খেলা শেষ করে ঠিক শুয়ে পড়বে নিজের জায়গায়। জানলায় উঁকি দিয়ে চাঁদ দেখবে, মা-বাবার মাঝখানে ছোট্ট-অনন্যা কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

প্রথম প্রকাশ : ৭ জুন ২০২১

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev