
সবার জীবনের গল্প যেমন একরকম হয় না, সবার সংসারও তেমন একই রকমভাবে গড়ে ওঠে না। আর ফিসফিস করে একটা কথা বলি, সবার স্ত্রী-ই নারী। কিন্তু সব নারী এক নয়। আমার নারী, মানে আমার বউ একদম ভিন্ন।
সে গড়পরতা মেয়েদের থেকে বেশ লম্বা। ডিম্বাকৃতি মুখ, ইতালিয়ানদের মতো গাল ভাঙা। গায়ের রং গ্রিক রমণীদের মতো। একটু তামাটে। নাকটি পাতলা, সামনের দিকে একটু বাঁকানো। টিয়েপাখির ঠোঁটের মতো। হাতের আঙুলগুলোও পুরোপুরি আদর্শ লেডিসফিঙ্গার! নধর ঢ্যাঁড়শ। খুব গভীর নাভি। খুব ছোটবেলায় অন্ধকূপের খেলা দেখেছিলাম আমি, বাইক নিয়ে গোঁ গোঁ আওয়াজ করে সাঁই সাঁই ঢুকে যাচ্ছে, ভেতরে গিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। দুর্বল হার্ট! পিসতুতো দাদা খ্যা খ্যা করে হাসতে হাসতে বলেছিল, বোকা ছেলে ওটা খেলা, সবাই উঠে আসবে, কেউ হারাবে না। আমি ঈশ্বরকে ডেকেছিলাম, এখনও ডাকি। বাচ্চা বাচ্চা ছেলে সব, ওরা অন্ধকূপ থেকে উঠে আসুক। শাড়ি পরে বিপজ্জনকভাবে। যার চোখ একবার ওদিকে পড়বে, তার নির্ঘাত মরণ। বুক মাপা নয়, বাঙালি মেয়েদের মতোই বড্ড ভারী! সে সামনে থেকে পিছনদিকে যাবে। কেন না ওদিকে আরও বেশি উন্মুক্ত প্রাঙ্গণ পাওয়া যাবে। আর যারা পিছন দিকে মোহিত হয়ে এতক্ষণ পড়েছিল, তারা নানা ফিকিরে সামনে আসবে। সামনে তাদের জন্য মাপা ঢেউ আর বিপুল খাদ অপেক্ষা করে আছে।
ঘোর! ঘোর! পুরো ঘোর! তবু আমি বলব, এ আর এমন কিছু না। ওর সবকিছুই টলি বলি হলি মেশানো। আকর্ষণীয়, মনমোহিনী! এবারই আসবে সেই গোপন কার্ড। টেক্কা! আমার বউয়ের রক্ত নীল। উনি ব্লু ব্লাড!
ওর কোন কাকা মিলিটারিতে ছিলেন, তাই ওর কথার মধ্যে সর্বদা ঢিসুম ঢিসুম! ফায়ারিং চলছে। আপনি কিছু করেননি, কিন্তু আপনার মনে হবে আপনি বুঝি ওর হাতের ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনতাই করে দৌড়চ্ছেন। আর উনি তাড়া করছেন। ধরলেই ক্যারাটে!
ওর নিজের কাকা ডাক্তার। তাই সব ওষুধ ওর মুখস্ত। ওর কাকা মেডিসিন, কিন্তু উনি পাক্কা সার্জেন। সব কেস উনি টেনে অপারেশন টেবলে নিয়ে গিয়ে ফেলবে। তারপর কেটে ছিঁড়ে এক্কেবারে একসা। পারলে পোস্টমর্টেমও করিয়ে দেবে।
ওর বাবা কলেজে পড়াতেন। ভদ্রলোক অত্যন্ত ভালো। বিনয়ী। নিজের শ্বশুরমশাই বলে বলছি না। কাউকে বাবা ছাড়া কথা বলেন না। কিন্তু তাঁরই মেয়ে, কড়া ধাঁচের মাস্টার, পারলেই বেত নিয়ে ঘোরে। পিটিয়ে সোজা করে দেয়। আর বাবা প্রফেসর ছিলেন বলে, মেয়েরও জন্মসূত্রে অগাধ জ্ঞান।
ওদিকে আমার এক মামাশ্বশুর পুলিশ, ফলে পুলিশের মতো সমস্ত দিকে ওর চোখ, নজর ঘুরছে। খুব সন্দেহ। চাবকে লাল করে দেবে।
আর এক মামাশ্বশুর উকিল। অর্থাৎ তাই ওর সঙ্গে আপনি কোনও কথায় পারবেন না। আপনার যে কোনও কথাকেই ও নিজের দিকে নিয়ে আসবে। নিজের মতো করে চালাবে। আইনকানুন সব ওঁর হাতের মুঠোয়।
এহেন স্ত্রীকে নিয়ে আমার সংসার। সংসারে উনি থাকেন না, উচ্চপদে বিচরণ করেন।
আমি একজন সামান্য লোক। ব্যাঙ্কের ক্যাশে বসি। জালে ঘেরা ঘরে, খুব সর্তক করে টাকা গুণি। টাকা গুনে দিই, গুনে নিই। আমার নামে বদনাম আমি খুব স্লো, বয়স্করা বলে নিটপিটে। তাতে আমার কিছু এসে যায় না। কারণ, টাকা পয়সার ব্যাপার ভুলচুক হলে কেউ আমাকে ছেড়ে কথা বলবে না। গুণাগার আমাকেই দিতে হবে।
মন শান্ত রাখার জন্য আমি প্রতিদিন সকালে মেডিটেশন করি। আমার আমার বউ প্রতিদিন বিকেলে জুম্বা করে। শরীর মন চনমনে রাখার জন্য। উদ্দাম গান চালিয়ে তালে তালে নাচ। সবাই আমাকে ঈর্ষা করে — কারণ আমার স্ত্রী।
অথচ আমি আমার এক জ্যেঠার কথা বার বার মনে পড়ে, জ্যেঠা বলত, সুন্দরী স্ত্রী অনেকের আছে নীলা। সবার ভাগ্যে সয় না, বিড়ম্বনা ডেকে আনে। আমার স্ত্রীর জন্য আমি অনেক এক্সট্রা নেমন্তন্ন পাই। সবার এক কথা বউদিকে এনো, মিসেসকে এনো। অনেকে আমার বউয়ের জন্য আমাকে এক্সট্রা খাতিরও করে।
আমি জালে ঘেরা একটা ঘরে বসে থাকি। বাইরে বেরুলে অনেকেই আমাকে চিনতে পারে না। আমি যে এত লম্বা, আমার গায়ের রং যে এমন ফর্সা, কারো চোখে পড়ে না। সবাই বলে ওই রোগা লোকটা, হ্যাংলামতো।
বিয়ের পর পরই শুনেছিলাম, আমার চেহারা হ্যাঙারের মতো। শর্ট বা পাঞ্জাবি যেন ঝুলছে। বিয়ের সময় সন্ধ্যামালতী কিন্তু এমন ছিল না। সেও ছিল বেশ রোগা। বিয়ের দিন আমাদের জোড়ে দেখে অনেকেই বলেছিল — মেড ফর ইচ আদার! আর ফুলশয্যার দিন আমার এক জামাইবাবু তো সবার সামনে বলে বসল — আজ শুধু ঠক ঠক আওয়াজ শুনবে। হাড়ে হাড়ে ঠোকাঠুকি লাগবে।
সত্যি কথা বলব, সন্ধ্যামালতী তখন এত সুন্দরী ছিল না। এত শুধু নয়, সুন্দরীই ছিল না। সুশ্রী বলা যায়। কোনওরকমে পাশমার্ক! আমার মায়ের পছন্দ হয়নি। দিদা তো বলেই বসেছিল, ওই মেয়ে একটা বাচ্চা বিয়লে বেঁকে ধুনক হয়ে যাবে। মা বলেছিল, বড্ড রোগা, আর এত লম্বা মেয়েছেলে বাপু ভালো লাগে না। কিন্তু বাবার পছন্দ ছিল, তাঁর মতে ছিল।
সন্ধ্যামালতীর সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেল।
বিয়ে হওয়ার পরেও বেশ লতানে ছিল। সবসময় আমার হ্যাঙারের মতো চেহারের পিছনেই চুপ করে থাকতো। শান্তশিষ্ট রোগাসোগা একটা মেয়ে, তখন জানতাম না, ও আসলে দেশলাই কাঠি, ওপর দিকে বারুদ আছে।
কিন্তু এক সময় বুঝলাম, ও দেশলাই কাঠি নয় রংমশাল। এবং তা ক্রমশ প্রকাশ্য! যত আলো তত ফুলকি!
এখন ওর রংঝরা আলোয় আমি আলোকিত।
আমার বাবা নেই, মা আছেন। বৃদ্ধাশ্রমে। ছেলে বোডিং-এ। ছুটির সময় আসে। তবে মায়ের এ বাড়িতে আসা হবে না। প্রথম প্রথম মা বলত, আসার কথা বলত না, বলত, ‘আমি মরলে, আমাকে একটু স্বামীর ভিটেতে নিয়ে যাস।’ আমি সাহস করে হ্যাঁ, না বলতে পারতাম না। শুধু মায়ের হাতটা ধরতাম। জ্যান্তো অবস্থা যেখানে থাকত পারল না, মরে সেখানে কী করতে ঢুকবে — আমি বুঝি না। সন্ধ্যামালতী কিন্তু মাকে তাড়ায়নি। মায়ের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেনি। কিন্তু মা চলে গেছেন। এমনি। মা এখানে নিঃসঙ্গ বোধ করত। একা একা। বুঝতে পারত, তাঁর জন্য আমাদের অসুবিধে হচ্ছে। মায়ের কোনও অভিযোগ ছিল না। বরং ওখানে গিয়ে মা ভালো আছেন। কিন্তু আমার ছেলের অনেক অভিযোগ। সে বোর্ডিংবাসী হতে চাইনি। তার মা তাকে জোর করে বোর্ডিংবাসী করেছে। আমারও আপত্তি ছিল ধোপে টেকেনি। কারণ, আমার এক মামাশ্বশুর উকিল। অর্থাৎ সন্ধ্যামালতীর সঙ্গে কথায় পারবেন না। আপনার যে কোনও কথাকেই ও নিজের পক্ষে নিয়ে আসবে। এলোই তাই। তবে, আমার ছেলে শাসিয়ে রেখেছে — সে দেখে নেবে।
আমার স্ত্রীও তাকে পালটা হুমকি দিয়েছে — আমি দারোগাবাড়ির মেয়ে।
আমার এক মামাশ্বশুর পুলিশ। এতে কী করে আমার স্ত্রী দারোগাবাড়ির মেয়ে হল বোঝা মুশকিল। এটা মা ছেলের সংঘাত আমি বেশি ঢুকিনি। ওদের মান অভিমানের বাইরেই আমি দাঁড়িয়ে আছি।
ইদানীং ছেলে ভেকেশনেও বাড়িমুখো হয় না। এই বন্ধুর বাড়ি ওই বন্ধুর বাড়ি চলে যায়। ওর মা শাসায় — কতদিন? ছোলা এখানে, দানা খেতে এখানেই ফিরতে হবে। এখন আমাদের টোনাটুনির সংসার। যাবতীয় দরকারে, কখনও কখনও অদরকারে ফোনাফুনি হয়, কিন্তু ছোবল মারার জন্য ফণাফণি নেই।
ফণা আমি কোনওদিন তুলি না। কারণ, সন্ধ্যামালতী ওর মাকে বলছিল — আমি ওর বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছি।
আমি জানতাম, মানে মায়ের কাছে শুনেছিলাম, আমার নাকি সব দুধেদাঁত পড়েনি। দু একটা রয়ে গেছে। অর্থাৎ মায়ের কথামত আমার দু-একটা দুধে দাঁত থাকলেও থাকতে পারে, বিষ দাঁত কাভি নেহি। আর সন্ধ্যামালতী তার মা বসন্তসেনাকে বলল, ‘আমার বিষদাঁত ভেঙে দিয়েছে!’
এব্যাপারে আমি একদিন সন্ধ্যামালতীর কাছে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিলাম, অবশ্যই মিহিস্বরে। কিন্তু আমার কথা শুনেই ও হুঙ্কার দিয়ে বলল, ‘বিষ নেই কুলোপানা চক্কর!’
আমি সেই থেকে নিজভূমে পেইড অতিথি। আসি যাই হ্যাঁ’তে হ্যাঁ, না’তে না বলি।
বাড়ির আসার আগে জানান দিয়ে একটা ফোন করে নিই। আমি আসছি। সময় দিই। আমি যন্ত্রণা চাই না। কেউ বিব্রত হোক এটাও চাই না।
সন্ধ্যামালতী আমাকে ভেড়া ভাবে। ছেলের কাছে ফালতু! ছেলে যখন হোস্টেল থেকে আসে। বাড়িতে তখন শান্তি পাই। কিন্তু সন্ধ্যামালতী অশান্ত হয়ে থাকে। তখন কানে ফোন।
দিন চলে যায়। সত্যি দিন চলে যায়। ছেলে বিদেশ পড়তে চলে গেছে। পড়তে পড়তে ঠিক করেছে আরও পড়বে। আমারও চাকরি জীবন হয়ে এল। সন্ধ্যামালতী তার যৌবন খুইয়ে বসেছে। থুতনির দুটো লোম ইদানীং হু হু করে বাড়ে। ওর ফোনে ফোনে দিন চলে যায়। কিন্তু রাত যে আর চলে না। মাঝে মাঝেই দুরন্ত দুরন্ত সব নাইটি পরে এসে আমার সামনে ঘোরাঘুরি করে। আমি চুপ করে বসে থাকি। প্রতিদিন ব্যাঙ্কের জালে ঘেরা ঘরে লক্ষ লক্ষ টাকা নিয়ে আমি বসি। যা একটুও আমার নয়। সব অন্যের। বান্ডিল হয়ে পড়ে আছে, ছুঁড়ে দিলে ফরফর করে উড়বে। ওকেও তেমন টাকার বান্ডিলের মতো লাগে। আমি রাম, দুই, তিন করে গুনি।
ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে মুখে সন্দেহ। — কী গোনো?
আমি উত্তর দিই না। সন্ধ্যামালতী তীব্র সন্দেহে ফোঁসে।
আমি নিরুত্তর। সন্ধ্যামালতী দুম দুম পায়ে ঘরের মধ্যে ঘোরে।
আমি গুনি — রাম, দুই, তিন…।
এক পা, দু পা, তিন পা…। আমি মায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি।
সন্ধ্যামালতী চুপ করে থাকে। আমার দিকে তাকায়, তীব্র সন্দেহ।
আমি গুণি — চার, পাঁচ, ছয়…।
যোজন, নাকি আলোকবর্ষ…। আমাদের সন্তান ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
সন্ধ্যামালতী হুঙ্কার দেয়। ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স বোঝো? আইনে ফেললে তুমি খাবি খাবে।
আমি গুণি — সাত, আট, নয়…।
— তুমি কি স্বর্গে যাওয়ার সিঁড়ি গুনছ?
আমার ঠোঁট কাঁপে — স্বর্গের ফুল পারিজাত! পাতালে কী ফুল ফোটে সন্ধ্যামালতী?
শারদোৎসব বিশেষ সংখ্যা ২০২১ প্রকাশিত