
প্রথম : ধোঁয়ার আড়ালে
হিলহিলিয়ে উপরে না উঠে আশপাশে ছড়িয়ে পড়ছে সাঁজালের ধোঁয়াটা। সুখেন ধুঁদি কুলো দিয়ে জোরে জোরে বাতাস দিচ্ছে, যাতে আগুনটা নিভে না যায়। ধোঁয়ার কুণ্ডলী ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে বিহারিয়ার মণ্ডলপাড়ার আনাচেকানাচে। মুর্শিদাবাদ জেলার নওদা থানার প্রত্যন্ত গ্রাম এই বিহারিয়া। এখানে এলে চারদিকে দেহাতি মানুষের বাসস্থান চোখে পড়ে। সুখেন তাদেরই একজন।
সন্ধ্যার হালকা অন্ধকারে গোয়ালঘর আর উঠোন একাকার হয়ে যায় সাঁজালের ধোঁয়ায় ।
এটা অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই গরুগুলোকে গোয়ালে পুরে দিয়ে এমন করে সাঁজাল জ্বালে সুখেন।
তার ছটা গরু। গরুগুলোর জন্যই যেন তার সংসারের এত আয়োজন। গোয়ালের এক পাশে শুকনো নাড়া , পাটকাঠি আর গোবরের ঘুঁটে জমিয়ে রাখে সে। সন্ধ্যায় সেগুলোতে আগুন ধরিয়ে সারারাত ধিকিধিকি জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে। সুখেন জানে, সাঁজালের ধোঁয়ায় মশা-মাছি দূরে থাকে, গরুগুলোও ভালো থাকে। এই কাজটুকু করতে পারলে তার মনে একধরনের তৃপ্তি আসে।
পাড়ার লোক অবশ্য তার গরুগুলোকে ভালো চোখে দেখে না। তাদের মতে, সব কটা গরুই বেজাতের। দুধ দেয় কম, খরচ হয় বেশি। কোনও গরুই নাকি পাঁচ লিটারের ওপর দুধ দেয় না। এ নিয়ে চায়ের দোকানে কত ঠাট্টা-তামাশা হয়। সুখেন সেসব কানে তোলে না।
তবে বাড়িতে এই নিয়ে কম অশান্তি হয়নি। বউ শোভা প্রায়ই বলে, “গরুগুল্যার জাত পাল্টাও। এত খাটাখাটনি কইরে কী লাভ? দুধই যদি ঠিকমুতো না দেয়!”
সুখেন হেসে উত্তর দেয়, “সব কিছু কি দুধের হিস্যাব দিয়া হয় রে? উরাও তো জীব।”
শোভা মুখে বিরক্তি দেখালেও স্বামীর প্রতি তার টান কম নয়। অভাবের সংসারে দুজনের মধ্যে ছোটখাটো মনোমালিন্য লেগেই থাকে, আবার কিছুক্ষণের মধ্যেই সব মিটেও যায়।
সুখেন প্রতিটি গরুকে আলাদা নামে ডাকে। কামলি, রাঙি, বুধি, কালো, ফুলমণি আর ঝিলিক। কার কখন খাবার চাই, কার শরীর খারাপ, কার দুধ কমেছে — সব তার নখদর্পণে। মানুষের সঙ্গে তার যতটা কথা হয়, তার চেয়ে বেশি কথা হয় এই অবলা প্রাণীগুলোর সঙ্গে।
সন্ধ্যার ধোঁয়ায় গোয়ালঘর ঢেকে যায়। সুখেন কুলো হাতে বসে থাকে। তার কাছে এই ধোঁয়ার গন্ধও যেন সংসারের গন্ধ।
দ্বিতীয় : সুখেন ধুঁদির সংসার
সুখেনের আসল নাম সুখেন মণ্ডল। কিন্তু মোটা শরীরের জন্য গ্রামের লোকেরা খিঁয়াতি করে তার নাম দিয়েছে সুখেন ধুঁদি। প্রথম প্রথম নামটা শুনে একটু খারাপ লাগত। এখন আর গায়ে মাখে না। গ্রামের মানুষের মুখে যে নাম একবার বসে যায়, তা আর সহজে বদলায় না।
সুখেনের তিন মেয়ে। বড় দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে পার্বতী এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মেয়েটা বেশ বুদ্ধিমতী। পড়াশোনায় ভালো, কথাবার্তায়ও বেশ পাকা। বাবার গরু পোষার অভ্যাস তার একেবারেই পছন্দ নয়।
একদিন বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে পার্বতী দেখল, বাবা গোয়ালে বসে কামলির গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
সে বলল, “বাবা, তোমার এই গরু পোষার শখ আর কতদিন চলবে?”
সুখেন অবাক হয়ে তাকাল। “কী হল আবার?”
“কী হবে! গরুগুলো দুধ দেয় না বললেই চলে। অথচ খাবার জোগাতে কত টাকা খরচ হয়। ওই টাকা জমালে আমার পড়াশোনার খরচেও সুবিধা হত।”
শোভা রান্নাঘর থেকে কথাটা শুনে এগিয়ে এল। “তুমার মেয়ের কথাটা একেবারে ভুল লয় গো। আমিও কতদিন বুলেছি, দু-একটা ভালো জাতের গরু আনো।”
সুখেন একটু গম্ভীর হয়ে বলল, “তুরা শুধু টাকার হিস্যাব বুঝিস। ইয়েদ্যার লিয়ে কত বছর কাটাল্যাম, সে হিস্যাব কে রাখবে?”
পার্বতী তর্ক ছাড়ার মেয়ে নয়। সে বলল, “গরু পুষে যদি সংসার না চলে, তাহলে এত ভালোবাসার কী দরকার?”
সুখেন মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। “মানুষের সংসার শুধু টাকায় চলে না মা। মায়া বুলেও একটা জিনিস আছে।”
পার্বতী আর কথা বাড়াল না। তবে বাবার এই অদ্ভুত ভালোবাসার কোনও যুক্তি সে খুঁজে পেল না।
আসলে সুখেনের জীবন বলতে এই সংসার আর গরুগুলো। ভোর হলে গোয়ালের দরজা খোলে, গরুগুলোকে মাঠে নিয়ে যায়। দুপুরে গাছতলায় বসে একটু বিশ্রাম, তারপর বিকেলে বাড়ি ফেরা। এই নিয়মের বাইরে তার আর কোনও জগৎ নেই। গ্রামের মানুষের ঠাট্টা, অভাবের যন্ত্রণা কিংবা সংসারের টানাপোড়েন — সব ভুলে সে গরুগুলোর মধ্যেই নিজের সুখ খুঁজে নেয়।
তৃতীয় : এক হাজার এক টাকা
সেদিন দুপুরে মাঠে বেশ গরম পড়েছে। গরুগুলোকে ঘাসের জমিতে ছেড়ে দিয়ে বাবলা গাছের নিচে গামছা পেতে শুয়ে পড়েছিল সুখেন। সকাল থেকে পরিশ্রমের পর একটু বিশ্রাম দরকার। চোখে ঘুম নেমে আসতেই কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে, টের পায়নি।
ঘাসের জমির পাশেই ঝরু নাপিতের পাকা গমের খেত। গমের শিষগুলো বাতাসে দুলছে। মাঠের অন্য গরুগুলো ঘাস খেতে ব্যস্ত থাকলেও কামলি একটু একটু করে সরে যাচ্ছিল। একসময় সে ঢুকে পড়ল ঝরুর গমের জমিতে। মচমচ করে বেশ কিছু গমের শিষ চিবিয়ে খেল।
দূর থেকে ব্যাপারটা দেখতে পেয়েছিল ঝরুর ভাই রামা ক্ষ্যাপা। সে চিৎকার করতে করতে ছুটে এল।
“ওই সুখনা! তোর গরু আমার দাদার গম খাইয়ে শেষ করে দিছেরে!”
সুখেনের ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি উঠে ছুটে এসে কামলিকে সরিয়ে নিতে গেল। কিন্তু ততক্ষণে রামা গরুটার দড়ি ধরে ফেলেছে।
“ভাই, ভুল হয়ে গেছে। আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিল্যাম । যা ক্ষেতি হয়েছে, দেখ্যে দিব। গরুটাকে ছেড়ে দে।”
রামা রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল, “প্রতিদিন গরু চরাবি আর অন্যের জমি লষ্ট করবি? আজ এর একটা বিহিত করতেই হবে।”
সুখেন অনেক অনুনয় করল। কিন্তু রামা কোনও কথা শুনল না। কামলিকে টানতে টানতে সোজা নিয়ে গেল পাড়ার মন্দিরের বটগাছের কাছে। সেখানে গরুটাকে বেঁধে রেখে ঝরুকে খবর দিল। শুরু হল গ্রাম্য সালিশি ডাকার আয়োজন।
বিকেলের দিকে মন্দির চত্বরে লোক জমল। কেউ গমের ক্ষতির কথা বলল, কেউ আবার বলল, সামান্য কয়েকটা শিষের জন্য এত বাড়াবাড়ির কী আছে! কিন্তু ঝরু আর রামার মন গলল না। শেষ পর্যন্ত সালিশিতে সিদ্ধান্ত হল, সুখেনকে এক হাজার এক টাকা জরিমানা দিতে হবে।
সিদ্ধান্ত শুনে সুখেনের মুখ শুকিয়ে গেল। এত টাকা তার কাছে কোথায়? তবু গরুটাকে তো ছাড়াতে হবে। গ্রামের দু-একজনের কাছে হাত পেতে, ধার করে কোনওরকমে টাকা জোগাড় করল সে।
টাকা গুনে দেওয়ার সময় তার হাত কাঁপছিল। লোকজনের সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। টাকার অঙ্কটা যত বড়, অপমানটা যেন তার চেয়েও বড়।
কামলির দড়ি খুলে বাড়ির পথে হাঁটতে লাগল সে। গরুটাও মাঝে মাঝে পিছন ফিরে ডাকছিল। সুখেন তার মাথায় হাত বুলিয়ে শুধু বলল, “চল মা, বাড়ি চল।”
তার চোখের জল কেউ দেখতে পেল না। কিন্তু বুকের ভেতরের কষ্টটা সে নিজেও সামলাতে পারছিল না।
চতুর্থ : আগুনের অন্য নাম
গ্রামের জীবন একসময় কত সহজ ছিল! কারও গরু অন্যের জমিতে ঢুকলে প্রথমে কথা হত, বোঝাপড়া হত। বিপদে পড়লে প্রতিবেশীরা ছুটে আসত। এখন যেন সেই সহজ সম্পর্কগুলো কোথায় হারিয়ে গেছে। সামান্য ক্ষতিতেও মানুষ একে অপরকে ছাড় দিতে চায় না। মানুষের মনে জমছে হিংসা, অভিমান আর প্রতিহিংসা। পাশাপাশি থেকেও মানুষ ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছে।
সালিশির ঘটনার পর থেকে সুখেনের মনটা ভীষণ খারাপ। ধার করা টাকার চিন্তা, লোকের সামনে অপমান আর নিজের অসহায়ত্ব তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। রাগের মাথায় কামলিকে গোয়ালের বাইরে রোদে বেঁধে রেখেছে। সকাল থেকে খাবারও দেয়নি।
শোভা অনেকবার বলেছে, “গরুটার ওপর রাগ দেখিয়ে কী হবে? ও তো অবলা জীব।”
সুখেন কোনও উত্তর দেয়নি।
শেষ পর্যন্ত শোভা আর থাকতে না পেরে কামলির মুখের সামনে কয়েকটা শুকনো নাড়া ফেলে দিল। কামলি ক্ষুধার্ত মুখে সেগুলো চিবোতে লাগল। শোভা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, মানুষের রাগের বোঝা কেন অবলা প্রাণীগুলোকে বইতে হবে!
সন্ধ্যা নামল। একে একে গরুগুলোকে গোয়ালে ঢুকিয়ে দিল সুখেন। প্রতিদিনের মতো সাঁজাল জ্বালানোর সময় হল। গোয়ালের পাশে জড়ো করা শুকনো নাড়া , পাটকাঠি আর ঘুঁটেতে আগুন ধরিয়ে দিল সে। কুলো দিয়ে দু-একবার বাতাস করল। কিন্তু আজ তার মন নেই। প্রতিদিন আগুনটা অনেক রাত পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে সে। আজ আর সেদিকে মন দিল না।
বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিনের অপমান আর অশান্তি যেন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। এপাশ-ওপাশ করতে করতে একসময় ঘুমিয়ে পড়ল।
রাত কত হয়েছে, পাড়ার মানুষেরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। হঠাৎ পাড়ার মানুষের চিৎকারে ঘুম ভেঙে গেল।
“আগুন! আগুন! সুখেন ধুঁদির গুহালে আগুন লেগ্যেছে!”
চমকে উঠে বাইরে বেরিয়ে এল সুখেন। শোভাও ছুটে এল ঘর থেকে। দুজনে বালতি হাতে গোয়ালের দিকে ছুটল। পাড়ার লোকজনও জল নিয়ে হাজির। কেউ গরুগুলোকে বের করার চেষ্টা করছে, কেউ আগুন নেভাতে ব্যস্ত।
অনেক চেষ্টার পর আগুন নিভল। কিন্তু ততক্ষণে গোয়ালের বেশ কিছু অংশ পুড়ে গেছে। কয়েকটা গরুর গায়ে আগুনের আঁচ লেগেছে। আতঙ্কে তারা ছটফট করছে। কামলি এক কোণে দাঁড়িয়ে কাঁপছে।
সুখেন একবার গরুগুলোর দিকে তাকাল, একবার পোড়া গোয়ালের দিকে। তারপর কামলির কাছে গিয়ে তার গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। তার চোখের জল আর বাঁধ মানল না। হু হু করে কেঁদে উঠল সে।
কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, “শালার সাঁজালের আগুনট্যাও আমার সাথে বেমানি কল্লো?”
কথাটা শুনে চারপাশের মানুষগুলো চুপ করে গেল। শোভা স্বামীর পাশে এসে দাঁড়াল। কেউ আর কোনও কথা বলতে পারল না।
রাতের আকাশে তখনও পোড়া খড়ের গন্ধ ভাসছে। সাঁজালের আগুন নিভে গেছে, কিন্তু সুখেনের বুকের ভেতরে যে আগুন জ্বলছে, তা নেভানোর মতো জল কারও হাতে নেই।
একটা সামান্য গমের ক্ষতি নিয়ে গ্রামের মানুষ যে দূরত্ব তৈরি করেছিল, সেই দূরত্বেরই যেন আরেকটি নির্মম পরিণতি আজ সুখেনের গোয়ালে।
মানুষের হিংসার আগুন আর সাঁজালের আগুন — দুটোর তাপ যে কতখানি আলাদা, তা সুখেন আজ টের পেল।