
— বিণ, তোর কি একটু কথা শোনার সময় হবে বাবা?
দ্রবিণ হেসে ফেলল। ডাইনিং টেবিলের চেয়ার টেনে সে মায়ের পাশে বসল-কী যে বলো মা, তোমার কথা শোনার সময় হয়নি এমন কখনও হয়েছে।
— না তা হয়নি কিন্তু নেদারল্যান্ডস-এর ওয়েগান ইউনিভার্সিটি…
লাবণ্যপ্রভার কথার মাঝে দ্রবিণ বলে উঠল — মা, ওটা ওয়েগনিগান ইউনিভার্সিটি।
— ওই হল, তুই ওখানে যাওয়ার আগে তো নামই শুনিনি। মানুষ কি সব এক জীবনে জানতে পারে।
দ্রবিণ মাথা নাড়াল-হুম্।
— ওখান থেকে ফিরে নাওয়া খাওয়া ভুলতে বসেছিস, খেয়াল আছে? ধক্কলের ছাপ পড়েছে চাহারায়। হঠাৎ মাথায় এত চাপ নিস না। লাবণ্যপ্রভা সস্নেহে ছেলেকে বলল।
— কোম্পানি আমাকে একটা বিশেষ কোর্স করতে ইউরোপ পাঠিয়েছিল। তোমাকে বলেছিলাম না, একটা প্রমোশন পেয়েছি। কোম্পানি নতুন একটা ইউনিট খুলেছে। ওই ইউনিটের দায়িত্ব দিয়েছে আমাকে। সবে যাত্রা শুরু, সামাল দিতে আমাদের একেবারে ল্যাজে গোবরে অবস্থা।
— ও সামলে নিতে পারবি, তুই যা সিরিয়াস। কিন্তু কাজটা কী?
দ্রবিণ একটু থমকে গেল। তখনই প্রিশা চা নিয়ে এল। কাপে চা ঢেলে দিয়ে স্বামীর পাশে বসল। সকালে বাড়ির তিন সদস্যর চায়ের টেবিলে এক সঙ্গে বসার যা ফুরসত মেলে। ছেলে, ছেলের বউ-র চাকরিতে বেরোনোর তাড়া থাকে। তারপর কলকাতা শহরের এই বিষণ্ন বাড়িটা অবসর প্রাপ্ত লাবণ্যপ্রভাকে অবদমিত করে জাবর কাটে। সে নিজেই যেন জাবরের খড়কুটো বনে যায়। লাবণ্যপ্রভার অবসর কাটতে চায় না। অথচ ছেলেকে ঘিরে তার এক সময় শ্বাস ফেলার সময় থাকত না। এখন ছেলের সময়ের বড়ো ভাগিদার বৌমা। তার কেবলই অসহায় লাগে, কিন্তু প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকা জানে কোথায় দাড়ি টানতে হয়। নিজের ভিতরে প্রতিনিয়ত বয়স ম্যানেজমেণ্টের প্রক্রিয়া চলে। মেনে নেয় ভবিতব্য।
লাবণ্যপ্রভা তাগাদা লাগাল-কী হল, বলবি তো কাজটা কী।
— বেশি করে বকনা বাছুর উৎপাদনে সেক্স সর্টেড টেকনোলজির ব্যবহারিক প্রয়োগ।
লাবণ্যপ্রভা ছেলের মুখের দিকে হা করে রইল-সেটা আবার কী।
— আমার এক্ষুণি রেডি হতে হবে, নইলে অফিসে দেরি হয়ে যাবে। তোমাকে পরে বলব মা। দ্রবিণ চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে বাথরুমে ঢুকে গেল। প্রিশাও উঠল। তাকেও রেডি হতে হবে। স্বামী স্ত্রী এক সময় কাজে বেরোয়। ফেরার সময় আলাদা আলাদা। দ্রবিণ ফেরে অনেকটা রাত করে।
প্রিশা হয়তো কখনও অভিমান করে-কী যে করো, রোজ রোজ এত দেরি করে ফেরো। বউ-এর জন্য বাবুর সময় কোথায়?
অমনি দ্রবিণ অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে — আরে বাবা, করলে না তো বেসরকারি চাকরি, তুমি কী বুঝবে। ত্রিশ টাকা ঘরে আনতে গেলে মালিককের হাতে তিনশো টাকা তুলে দিতে হবে। সাধে লোকে বলে, রক্ত জল করা পয়সা।
রোজকার মতো সেদিনও দ্রবিণ রাত করে ফিরেছে। মুখে এক রত্তি বিরক্তি নেই। টেবিলের উপর একটি মস্ত বড়ো ফুলের তোড়া রেখে তোয়ালে নিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গেল। ওটাই তার অভ্যাস। বাড়ি ফিরে দেহবর্জ্য ত্যাগে দেহমন হাল্কা হয়ে যায়, সারা দিনের ক্লান্তি ধুয়ে জল। তারপর এককাপ চা খেলেই ফুরফুরে মেজাজ। ‘আমার পরান যাহা চায়…’ গুণগুণ করতে করতে সে বাথরুম থেকে বেরোল।
প্রিশা বলে উঠল-বাবুর মনে আজ যে এত পুলক।
— মাসিকে বল চা দিতে। দাঁড়াও, কথা আছে।
ক্যাজুয়ালস পরে দ্রবিণ বেডরুম থেকে ফিরেও এল ঝটিকা বেগে। মুড একেবারে চনমনে। তার পেটে কথা জমে ঢোল, না বললে এক্ষুণি ফেটে বেরোবে। সে চায়ে চুমুক দিয়ে বলল-প্রিশা আমাদের ইউনিট ব্রেক থ্রু করেছে।
— কী।
— আরে তোমাকে একদিন বলেছিলাম না, আমরা গরুর শুক্রাণু থেকে পুরুষ ক্রমোজম এক্স আলাদা করতে চাই।
— হ্যাঁ, এমন কী যেন একটা বলেছিলে। আমি ইতিহাসের দিদিমণি, মাথায় সারাক্ষণ যুদ্ধ বিদ্রোহ পাক খায়। সব মৃত মানুষের কাহিনি। আমার কি ছাই তোমার এই সব ভজঘট কথা মাথায় ঢোকে। কিন্তু এখন ব্যাপারটা বেশ অন্যরকম লাগছে। খুলে বলো।
— আমরা পেরেছি। এই ক’মাসের চেষ্টায় ক্রমোজম আলাদা করতে পেরেছি। বুঝলে প্রিশা, ফ্লো সাইটোমিটারের নলের মধ্য দিয়ে স্পার্ম পাঠিয়ে লেজারে নির্ণয় করা হচ্ছিল তার উজ্জ্বলতা। তারপর একে একে ক্রমোজম আলাদা করার দৃশ্য ভেসে উঠল কমপিউটারে পর্দায়। সে এক অপার্থিব দৃশ্য। উঃ আমাদের কী যে উত্তেজনা হচ্ছিল, তুমি যদি দেখতে! শেষে মিলল সাফল্য, গরুর শুক্রাণু থেকে এক্স এবং ওয়াই আলাদা করতে পেরেছি। পূর্ব ভারতে সেক্স সর্টেড টেকনোলজির খুব একটা ব্যবহারিক প্রয়োগ হয়নি। দেখবে বাংলায় আমরা ডেয়ারি বিপ্লব ঘটাব।
— তাই নাকি!
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলে বলে গোল দেব। কৃত্তিম প্রজননে এক্স ক্রমোজমে নব্বই ভাগেরও বেশি বকনা বাছুর উৎপাদন করব। বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করলাম বলে। সরকার আমাদের ফার্মকে ইতিমধ্যে প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে, তারা সব আলাদা করা এক্স ক্রমোজম কিনে নেবে। শুধু আমাদের কি আনন্দ, মালিক তো ধেই ধেই করে নৃত্য করছিল। দেখছ না, অফিস সবাইকে ফুল-মিষ্টি দিয়ে সম্বার্ধনা জানিয়েছে। ইনসেন্টিভ দেবে, বেতন বাড়বে সবার।
— বেনিয়ারা জন্মের আগেই লাভের গন্ধ পায়। তোমাদের কোম্পানির মালিকদের নাকি কয়েক পুরুষের ব্যবসা বাণিজ্য। ও ব্যাটা তো লাফাবেই।
দ্রবিণ হাসল-ওরা তো খয়রাতি দিতে ব্যবসায় আসে না। আর খয়রাতি দিয়ে পৃথিবীর কোন মহৎ কর্ম হয়? আমার কিন্তু দারুণ লাগছে, বিভাজিত ওয়াই ক্রমোজমে উন্নত মানের সব গাভী, মানে দুধের ফোয়ারা। দুধের বন্যা বইবে এই বাংলায়। তুমি দেখে নিও প্রিশা।
প্রিশার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল-না, যা দেখছি বাবু মশাইয়ের কাজের একদিন বড়ো ধরনের স্বীকৃতি মিলবে। আমাদের সন্তানও থাকবে দুধে ভাতে। তোমার এবার দুধ দুধ বাতিক হবে।
দ্রবিণ হো হো করে হেসে উঠল — পারও বটে, গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল। আমাদের তো সন্তানই হল না এখনও।
— হবে বাবু, ঠিক সময়ে হবে। অত তাড়া কিসের। তোমার শ্রীবৃদ্ধি ঘটলে আমার আনন্দ হবে না?
ডাইনিং টেবিলে ছেলে বউয়ের খুশির আওয়াজে লাবণ্যপ্রভার ঘরে পৌঁছেছে। তাকে আসতে দেখে প্রিশা খুশি চেপে রাখতে পারল না — মা জানেন, আপনার ছেলে পেরেছে।
দ্রবিণ মৃদু প্রতিবাদ করল-আমি কী গো, বলো সবাই পেরেছে।
লাবণ্যপ্রভা উৎসাহ দেখাল না। সে নিস্পৃহ গলায় বলল — বিণ জানিস, নন্দি আর আমাদের পাড়ায় আসে না।
— ওর বয়স হয়েছিল। মারা গেছে, নয়তো পাচার হয়েছে। ছাড়া ষাড়ের আজকাল প্রয়োজনই বা কী।
— হুম, সেটাই তো তোরা চাস। কোনো এঁড়ে বাছুর জন্মাবে না। সব হবে বকনা বাছুর।
দ্রবিণ অবাক হল — তুমি জানলে কিভাবে!
— ভুলে যাস কেন তোর মা এককালে হেডমিস্ট্রেস ছিল। সমাজ-টমাজ নিয়েও ভাবত। বয়স হলেও মুঠোয় অ্যানড্রয়েড ফোন আছে। আমি জানি তোরা কী করতে চাস। গৃহপালিত পশু পুরুষ জন্মাবে না মেয়ে জন্মাবে তা তোরাই ঠিক করে দিবি। গরু হলে শুধু বকনা, আর ছাগল হলে হবে জবাইয়ের পাঁঠা। যেমন খুশি তেমন কাটো।
— মা বুঝতে পারছি তুমি সেক্স সর্টেড টেকনোলজি বিষয়ে পড়াশুনা করেছ। তবে প্রায় দশ শতাংশ মেল মাস্টার ব্রিডার তো থাকবে। একশো চল্লিশ কোটি মানুষের চাহিদা মিটাতে প্রযুক্তির সাহায্য ছাড়া চলবে? হাইব্রিড শস্য না ফললে এতগুলো লোকের খেয়ে পরে বাঁচার উপায় আছে। আর এঁড়ে বাছুর এখন শুধু লায়াব্লিটি। কে গাঁটের পয়সায় অনর্থক এঁড়ে বাছুর পুষবে। হালচাষেও তেমন একটা লাগে না। আর গোমাংস নিয়ে দেখছ তো কত রাজনীতি।
— ওসব তোদের রেডিমেড যুক্তি। তোরা প্রকৃতিকে তার মতো কিছুতেই চলতে দিবি না।
— তা হলে তুমি কী চাও?
থমথমে মুখে লাবণ্যপ্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। মাথা তুলে বলল — বিণ, তুই এই চাকরিটা ছেড়ে দে বাবা।
দ্রবিণ এমন অপ্রত্যাশিত ঝটকা মেনে নিতে পারল না। সে উত্তেজিত স্বরে বলল — এটা কী বলো মা। এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে এমন ভালো একটা চাকরি কেউ ছাড়ে। আর চাকরি গেলে পাব কোথায়?
প্রিশা এমন গুমোট পরিবেশ আগে দেখেনি। শ্বশুরকে সে দেখেনি, বিয়ের অনেক আগেই গত হয়েছে। শাশুড়ি সন্তানের সব দায় দায়িত্ব একার হাতে সামলেছে। দ্রবিণকে বাবার অভাব বুঝতে দেয়নি। ছেলেও তেমনি মায়ের ন্যাওটা। কিন্তু এমন একটা বিপরীতমুখী সংঘাতে প্রিশার ভূমিকা কী হওয়া উচিত বুঝে উঠতে পারছে না। একদিকে সহজাত মাতৃত্বের প্রকৃতি, অন্যদিকে স্বামীর ভবিষ্যৎ। তার ভিতরে সংকটছায়া ঘন হচ্ছে। নিজের শরীরের কোষগুলো কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠেছে। থমথমে মুখে সে চুপ করে রইল।
— যোগ্যদের কোনোদিনই চাকরির অভাব ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। এই বাজারেও তো অভিজ্ঞতা ছাড়া যাদবপুরের ছেলে এক কোটি পয়তাল্লিশ লক্ষ টাকার প্যাকেজ নিয়ে বেরোচ্ছে। তোর অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা দুটোই আছে। ভালো মন্দ যাহোক একটা চাকরি জোটানো তোর কোনো সমস্যা? তা ছাড়া তুই তো আর জলে পড়বি না, আমরা আছি তোর পিছনে।
— সে না হয় ভাবব, আমি ছেড়ে দিলে অন্য কেউ না কেউ এ কাজ করবে। কোম্পানিও বসে থাকবে না। কিন্তু মা তুমি বিষয়টি নিয়ে এমন কঠোর অবস্থান নিচ্ছ কেন?
— করুক। তোর বাবা কিভাবে মারা গেছে একবারও তলিয়ে দেখেছিস।
— না, সেভাবে কখনও ভাবিনি। বুঝে ওঠার আগেই তো বাবা মরে গেল। কী যেন একটা জটিল মানসিক ব্যধিতে ভুগছিল।
লাবণ্যপ্রভার দীর্ঘশ্বাস পড়ল। তার চোখ ছলছল করে উঠল। দ্রবিণ উঠে গিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রাখল — ও মা, কাঁদছ কেন? বলো, দুঃখ চেপে রেখনা।
আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে লাবণ্যপ্রভা বলল — তোর আগে আমার গর্ভে তোর একটা দিদি এসেছিল।
বিদ্যুৎপৃষ্ট হওয়ার মতো দ্রবিণ চমকে উঠল — বলো কী মা! আগে তো বলনি, তার কী হয়েছিল?
— রায় বাড়ির লোক জেনে গিয়েছিল কন্যা সন্তান আসছে।
প্রিশা আর চুপ থাকতে পারল না — কিভাবে।
— চৌদ্দ-পনেরো সপ্তাহের মাথায় কী কারণে যেন আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করা হয়েছিল, তখন ওরা জেনে যায় গর্ভে কন্যা ভ্রুণ আছে।
— ভ্রুণের লিঙ্গ নির্ধারণ কারা তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
— বৌমা, আইন আছে আইনের জায়গায়। দেশে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ শুধু কন্যা ভ্রুণ হত্যা হয়। কয়জনের শাস্তি হয়?
— হুম। দিদিটাকেও কি মেরে ফেলা হয়েছিল।
— হ্যাঁ, হত্যাই তো। বাড়ির মুরুব্বিরা সব বেঁকে বসল, প্রথম সন্তান কিছুতেই মেয়ে হতে পারে না। ওর বাবা মিনমিন করে একটু প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিল, ধোপে টিকল না। আর আমি যে একটা মানুষ তা ধর্তব্যের মধ্যে আনেনি কেউ। গর্ভ আমার, গর্ভপাতের সিদ্ধান্ত নিল যৌথ পরিবার।
দ্রবিণ মরিয়াভাবে বলে উঠল — বাবা আটকাতে পারল না!
— না-রে পারল না। না পারার যন্ত্রণাটাই তো তাকে শেষ করে দিল। ভিতরে ভিতরে অপরাধ বোধ কুড়ে কুড়ে খেত। আমার সঙ্গেও সম্পর্ক আর খুব একটা স্বাভাবিক করতে পারেনি। তীব্র হতাশা, গ্লানিবোধে ভোগা মানুষটার মধ্যে আর কোনো জীবনীশক্তি ছিল না। আত্মদহনে জ্বলে-পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছিল, তারপর একদিন তেল শূন্য প্রদীপের মতো নিভে গেল। তোর বাবা মরে বেঁচেছে। বুঝলি বিণ, এখনও সমাজের বড়ো অংশ চায় শুধু পুত্র সন্তান, আর তোরা চাস ক্রমোজম বিভাজন করে ভ্রুণ হওয়ার আগেই এঁড়ে বাছুর বিলোপ করে দিতে। খেলাটা তো একই। লাবণ্যপ্রভা চুপ করে গেল, তার গলা ধরে এসেছে।
প্রিশা ভারী স্বরে বলল — হয়তো এই প্রযুক্তি মানুষ নিজের উপরই প্রয়োগ করবে কোনোদিন।
তিনটি মানুষের ভাবনা সমবিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছে। তাদের চেপে ধরেছে ভীষণ এক নিঃশব্দ বোবা কান্না।
পেজফোরনিউজ ২০২৫ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত
শক্তিধর লেখা। খুব ভালো লাগলো।