| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’ আশ্বিনের শারদপ্রাতে : যশোবন্ত রায় আমার ছেলেবেলার মহালয়ার সকাল : পীযূষ কান্তি দাস পর্দার দাপুটে নায়ক, বাস্তব জীবনে মানবতাবাদী — নানা পাটেকরের জীবন ও অবিনশ্বর কীর্তি : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সসীমকুমার বাড়ৈ-এর ছোটগল্প ‘প্রকৃতি বিভাজন খেলা’ মিরকাশিমের বীরকুল, হেস্টিংসের ব্রাইটন, জন ফ্র্যাঙ্ক স্নেইথ-এর দীঘা : সুব্রত গুহ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (শেষ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে পাঁচ দফা কৌশল বাস্তবায়নের রোডম্যাপ : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন কলকাতার নব্য কাজিয়ার দুর্গা : অসিত দাস SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (সপ্তম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার আমাদের নিখোঁজ শিশুরা: সংখ্যার বাইরে যে প্রশ্নগুলো জরুরি : নিকোলাস বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৮০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মানুষকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে নয়া পুঁজিবাদ : সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (ষষ্ঠ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (পঞ্চম কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার হাসানের ইতিহাস ও বর্তমান ছুঁয়ে : নন্দিনী অধিকারী গান্ধীজী : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কবরের ইতিহাস : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (চতুর্থ কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার ছেলে বেলার পুজো : সুব্রত দত্ত SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (তৃতীয় কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার শাশ্বত বোস-এর গল্প ‘সর্বভূক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৭৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ SIR-এর ফাঁসে জ্ঞানেশ কুমার, কমিশনের অন্দরে অশান্তি (দ্বিতীয় কিস্তি) : দিলীপ মজুমদার শত সুরের সারস্বত সাধক — নলিনীকান্ত সরকার : রিঙ্কি সামন্ত
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com, আমাদের পোর্টালের কিছু ছবি বাদে প্রায় সব ছবিই অন্তর্জাল থেকে সংগ্রহ করা হয়। কারুর যদি কপিরাইট থাকে জানাবেন। আমরা সেই ছবি পোর্টাল থেকে ডিলিট করে দেব।

বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘এক টুকরো ভোর’

Reporter
বিশ্বজিৎ মণ্ডল / ৮৭ Views জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

অন্ধকারের ভিতর মানুষ

কথা ছিল, আলোটুকু ফুটে উঠলে গরু দুটোকে হাঁকিয়ে দেবে দুখনা দাস।

আলো তখনও ফুটেনি।

দুধশরের মাঠের ওপর রাতের শেষ অন্ধকারটা ঝুলে আছে। শিশিরে ভিজে আছে আলের ঘাস। দূরে কোনো এক বাড়ির মোরগ ভুল সময়ে ডেকে আবার চুপ করে গেছে।

দুখনা চটের বিছানা থেকে উঠে বসল।

ঘরের এক কোণে মাটির হাঁড়ি। পাশে একটা অ্যালুমিনিয়ামের থালা। দেয়ালে পুরনো ক্যালেন্ডার।  তার নিজের ছায়া। ছায়াটার দুটো হাত আছে। দুখনার নেই।

জন্ম থেকেই ডান হাতটা প্রায় অকেজো। শরীরের সঙ্গে আছে, কিন্তু জীবনের কাজে নেই।

দুখনা মাঝে মাঝে আয়নায় নিজেকে দেখে ভাবে, মানুষ কি তার শরীরের হিসেব দিয়েই মানুষ?

ভাবনাটা উঠলেই সে আয়না থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

“সকাল হইছে কি না দেখি!” নিজেকেই বলা।

তারপর গরু দুটির দড়ি খুলতে যায়।

দুখনার জীবন খুব সাধারণ। অন্যের জমিতে কাজ করে। লাঙল ধরে, আল কাটে, ধান কাটে, আলু তোলে। যে কাজের জন্য দুটো হাত দরকার, সেটাও সে কোনভাবে করে ফেলে।

কিন্তু কাজের চেয়েও কঠিন একটা জিনিস সে প্রতিদিন করে — নিজেকে বোঝায় যে সে কারও বোঝা নয়।

ছোটবেলায় মা তাকে একবার বলেছিল, “তুই মন খারাপ করিস না রে। তোরও একদিন ঘর হবে।”

ঘর হয়েছিল। সংসার হয়নি।

বাবা চলে গেল। তারপর মা। বিয়ের কথা উঠেছিল দু-একবার। কিন্তু কথাগুলো উঠেই নেমে গিয়েছিল।

কারও মুখে সরাসরি না শুনলেও দুখনা বুঝেছিল।

একটা অকেজো হাত শুধু কাজের অক্ষমতা নয় — সমাজের চোখে সেটা একজন পুরুষের অসম্পূর্ণতার চিহ্ন।

সে কাউকে দোষ দেয়নি। দোষ দেওয়ার মতো কাউকে পাওয়া যায়নি।

শুধু নিজের ভেতরে একটা প্রশ্ন রেখে দিয়েছে —

“আমি কি সত্যিই কম?”

এই প্রশ্নের উত্তর সে আজও জানে না।

গরু দুটোকে নিয়ে মাঠের দিকে হাঁটতে হাঁটতে দুখনা আকাশের দিকে তাকাল।

অন্ধকারের মধ্যে খুব ক্ষীণ একটা আলো দেখা যাচ্ছে।

তার মনে হল, ভোরও বোধহয় একদিনে আসে না।

অন্ধকারকে একটু একটু করে সরিয়ে আনতে হয়।

মানুষের জীবনও কি তাই?

দয়ার চোখ

দুখনা কাজ করে ভাল। এই কথাটা আমতলার মধুপুর  গ্রামের সবাই জানে। কিন্তু কাজের আগে মানুষ তার হাতটা দেখে।

“এই কাজটা পারবি? একটু কষ্ট হবে না? তোকে দিয়ে এই কাজ করানো ঠিক হবে?”

এই কথাগুলো শুনতে শুনতে দুখনার মধ্যে একটা অদ্ভুত অভ্যাস তৈরি হয়েছে।

সে মানুষের চোখ পড়তে শিখেছে। কেউ তাকে দেখে সহানুভূতি দেখালে সে বুঝতে পারে। কেউ তাকে কম মজুরি দিতে চাইলে বুঝতে পারে। কেউ কাজ দেওয়ার আগে একটু থেমে গেলে সেটাও বুঝতে পারে।

মানুষের মুখের ভাষার চেয়ে চোখের ভাষা অনেক বেশি নিষ্ঠুর — এটা দুখনা খুব তাড়াতাড়ি শিখেছিল।

একদিন হরিপদ ঘোষের জমিতে কাজ করছিল সে।

দুপুরে হরিপদ এসে বলল, “দুখনা, তুই একটু বিশ্রাম নে।”

দুখনা মাটি থেকে মুখ তুলল।

“ক্যানে?”

“তোর কষ্ট দেখে।”

“কষ্ট তো সবারই হয়।”

“তোর একটু বেশি।”

দুখনা হাসল। “তাইলে মজুরিটাও একটু বেশি দিয়েন।”

হরিপদ হেসে উঠল। কিন্তু দুখনা হাসল না।

সে জানে, কথাটা মজা করে বলা হলেও তার ভিতরে একটা সত্যি ছিল।

সে করুণা চায় না। কিন্তু করুণা ছাড়া সমাজ তাকে কী দিয়েছে?

প্রশ্নটা তাকে মাঝে মাঝে ভিতর থেকে কুরে কুরে খায়।

রাতে ঘরে ফিরে সে চুপ করে বসে থাকে।

তার মনে হয়, মানুষ তাকে দুটো বাক্সের একটায় রাখতে চায় — অক্ষম মানুষ অথবা অসাধারণ প্রতিবন্ধী মানুষ।

সাধারণ মানুষ হিসেবে কেউ তাকে দেখতে চায় না।

অথচ দুখনা অসাধারণ হতে চায় না।

সে শুধু কাজ করে খেতে চায়। কখনও ক্লান্ত হলে শুয়ে থাকতে চায়। কখনও রাগ করতে চায়। কখনও ভালোবাসতে চায়। কখনও চায় কেউ তাকে প্রশ্ন না করে পাশে বসুক।

এই চাওয়াটুকু কি খুব বেশি? দুখনা উত্তর খুঁজে পায় না।

তাই পরদিন আবার মাঠে যায়।

কারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছে অনেক সময় কাজ শুধু জীবিকা নয় — নিজেকে ভুলে থাকার একটা উপায়ও।

যে ঘরে ফেরার কেউ নেই

শীতের এক রাতে দুখনার জ্বর এল। খুব বেশি নয়।

কিন্তু শরীর কাঁপছিল।

সে হাঁড়িতে জল বসিয়ে নিজেই ভাত করল। তারপর ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়ল।

রাত বাড়ল। জ্বর একটু কমল। কিন্তু ঘুম এল না।

দুখনা ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।

হঠাৎ তার মনে হল — আজ যদি সে খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে, কেউ কি জানবে?

পরদিন যদি সে মাঠে না যায়, কেউ কি খোঁজ নেবে?

এক সপ্তাহ যদি তার দরজা বন্ধ থাকে?

এই প্রশ্নগুলো প্রথমে কৌতূহলের মতো এসেছিল।

তারপর ভয়ের মতো। একসময় অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াল।

“আমি না থাকলে আমার অনুপস্থিতিটা কে টের পাবে?”

দুখনা উঠে বাইরে এল। আকাশে চাঁদ নেই। সে উঠোনে বসে নিজের সঙ্গে কথা বলল।

“তুই কিসের জন্য বাঁচিস রে?”

কোন উত্তর নেই।

“প্যাটের জন্য?” বলে চুপ থাকল।

“কাজের জন্য?”

“নাকি মানুষরে দেখানোর জন্য যে তুই অক্ষম না?”

এইবার প্রশ্নটা বুকের মধ্যে এসে লাগল।

দুখনা বুঝতে পারল, এতদিন সে নিজের সঙ্গে একটা যুদ্ধ করে এসেছে। অন্যদের সঙ্গে নয়।

নিজের ভিতরের সেই মানুষটার সঙ্গে, যে বারবার বিশ্বাস করতে চেয়েছে — সে অসম্পূর্ণ।

সামাজিক অবহেলা কখনও কখনও মানুষের শরীরে নয়, আত্মপরিচয়ে বাসা বাঁধে। দুখনার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

লোকেরা হয়তো ভুলে গেছে তার একটা হাত অকেজো।

কিন্তু দুখনা ভুলতে পারেনি। সে নিজের শরীরকে প্রতিদিন প্রমাণ করতে চেয়েছে। সেই প্রমাণ করতে গিয়েই কখনও কখনও সে নিজেকে ভালবাসতে ভুলে গেছে।

সেই রাতে প্রথমবার তার মনে হল — অক্ষমতার সঙ্গে লড়াই করতে করতে যদি সারাজীবন নিজেকেই শত্রু বানিয়ে ফেলি, তবে জয়টা কার?

সে কোন উত্তর পেল না। শুধু অনেকক্ষণ বসে রইল।

তারপর খুব আস্তে বলল, “দুখনা, তুই মানুষ। আগে এইটে মনে রাখ।”

অন্যের জীবনে নিজের আলো

বর্ষার এক সন্ধ্যায় নদীর জল হঠাৎ বেড়ে গেল।

ফেরার পথে দুখনা দেখল, রাস্তার ধারে একটা কিশোরী দাঁড়িয়ে কাঁদছে।

“কী হইছে রে?”

মেয়েটি বলল, “বাড়ি যেতে পারছি ন্যা।”

দুখনা চারপাশে তাকাল। জল হাঁটু ছুঁয়েছে। সে বলল, “চল, আমি দিয়্যা আসি।”

মেয়েটি দুখনার দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনি পারবেন?” প্রশ্নটা শুনে দুখনার বুকের ভেতর পুরনো একটা দরজা খুলে গেল।

এই প্রশ্ন সে কতবার শুনেছে!

সে একটু হেসে বলল,

“পারবু। তুই চল।”

মেয়েটিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার পর তার মা দৌড়ে এসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। দুখনার দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনি না থাকলে আজ কী করত্যাম!”

দুখনা মাথা নিচু করল।

“কিছু না। মানুষ মানুষরে দেখবে না তো কে দেখবে?”

মেয়েটির মা বললেন,”একটু বসেন।”

দুখনা মাথা নাড়ল। “না, যাই।”

“আপনার বাড়িতে কেউ অপেক্ষা করছে?”

দুখনা থেমে গেল।

তারপর বলল, “না গো।”

“তাহলে এত তাড়া কিসের?” দুখনা এবারও হাসল।

“তাড়া নাই বলেই তো যাই।” বলে সে বেরিয়ে এল।

বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ তার মনে হল —

যে মানুষটির জন্য কেউ অপেক্ষা করে না, সে কি অন্যের অপেক্ষার মূল্য বেশি বোঝে?

হয়তো বোঝে।

সেই রাতেই দুখনা একটা জিনিস বুঝল — মানুষের জীবনে সম্পর্ক শুধু রক্তের সূত্রে তৈরি হয় না।

কখনও একটি দরজা খুলে দেওয়া, কারও হাত ধরে রাস্তা পার করা, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো — এসবও সম্পর্কের বীজ।

সে কারও স্বামী হতে পারেনি। কারও বাবা হতে পারেনি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে সে কারও জীবনে প্রয়োজনীয় হতে পারে না।

এই উপলব্ধিটা দুখনার ভিতরের দীর্ঘ অন্ধকারে প্রথম সত্যিকারের আলো ফেলল।

এক টুকরো ভোর

পরের বছর গ্রামের স্কুলের পাশের পতিত জমিতে সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হল।

কয়েকজন শ্রমিকের সঙ্গে দুখনাও কাজ পেল।

প্রথম দিন কর্মচারী তার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই কাজটা পারবা?”

দুখনা এবার কোন রাগ দেখাল না।

শুধু বলল, “আগে কাজটা দেখান। না পারলে কইয়েন।”

সে কাজ করল,ধীরে। কষ্ট করে। কখনও ভুল করে।

আবার শিখে।

কয়েক মাস পর পতিত জমিটা সবুজ হয়ে উঠল।

এক সকালে দুখনা জমির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল।

শিশিরে ভেজা পাতার ওপর সূর্যের আলো পড়েছে।

একটি ছোট মেয়ে পাশে এসে দাঁড়াল।

“কাকা, এই জমি কার?”

দুখনা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তার জীবনে এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়।

জমি তার নয়। ঘর তার।কিন্তু ঘর মানেই তো মালিকানা নয়।

মানুষের জীবনে কত কিছুই বা নিজের?

শেষ পর্যন্ত শরীরটাও তো একদিন মাটির কাছে ফেরত দিতে হয়।

দুখনা মাটিতে হাত রাখল। “জানি ন্যা।”

মেয়েটি অবাক, “জানো না?” দুখনা হাসল।

“হয়তো সবার।”

“তোমারও?”

দুখনা এবার দীর্ঘক্ষণ মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর বলল, “হ্যাঁ, আমারও।”

এই “আমারও” কথাটার মধ্যে তার চল্লিশ বছরের জীবন এসে দাঁড়াল।

যে মানুষটির নিজের জমি ছিল না, সে মাটির সঙ্গে সম্পর্ক খুঁজে পেল।

যে মানুষটির সংসার ছিল না, সে মানুষের জীবনে নিজের প্রয়োজন খুঁজে পেল।

যে মানুষটি নিজের শরীরকে অসম্পূর্ণ মনে করত, সে বুঝল — মানুষের মূল্য তার অঙ্গসংখ্যায় মাপা যায় না।

দুখনা আকাশের দিকে তাকাল।

পুব আকাশে তখন সূর্য ওঠার ঠিক আগের আলো।

না পুরো দিন। না পুরো রাত। একটা সীমান্তরেখা।

দুখনা ভাবল, তার জীবনও তো এমনই।

সব পাওয়া নয়। সব হারানোও নয়। অন্ধকারের মধ্যেও আলো থাকে।

শুধু আলোকে নিজের বলে চিনে নেওয়ার সাহস লাগে।

গরু দুটোকে নিয়ে সে মাঠের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

তার অকেজো হাতটা শরীরের পাশে নিশ্চুপ।

অন্য হাতটা লাঙলের দড়ি শক্ত করে ধরে আছে।

হাঁটতে হাঁটতে সে আর নিজের কাছে প্রশ্ন করল না —

“আমার কী নাই?”

বরং প্রথমবার তার মনে হল, “আমি যা পেয়েছি, তা দিয়ে আজ কার জীবনটাকে একটু সহজ করতে পারি?”

এই প্রশ্নের কোন শেষ উত্তর নেই। হয়তো এটাই জীবনের সত্যিকারের অর্থ।

কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য যতটা বাঁচে, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে সে অন্যের অন্ধকারে যতটুকু আলো রেখে যেতে পারে।

দুখনা মাঠে ঢুকে গেল।

পেছনে তার একাকী ঘর। সামনে বিস্তীর্ণ মাটি। মাথার ওপরে — ধীরে ধীরে জন্ম নিচ্ছে এক টুকরো ভোর।

আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev