Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৬৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা

ফিফথ রিপোর্ট আর ১৮১৩-র সনদ আইন- রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের চূড়ান্ত পরিণতি

ফিফথ রিপোর্টের কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ‘বৈজ্ঞানিকতা’র এই ‘দ্বৈত’ চরিত্রই ১৮১৩-র সনদ আইনের ভিত্তি তৈরি করল। আইনের মূল বৈশিষ্ট্য ফিফথ রিপোর্টের বিশ্লেষণকে সরাসরি প্রতিফলিত করে —

১। ফিফথ রিপোর্ট কার্যত ঘোষণা করল বাণিজ্যিক একচেটিয়ার যুগ শেষ, উত্থান হল মুক্তবাণিজ্য যুগের, যে বাণিজ্য মুক্ত হল মেট্রোপলিটনের আর সেটলার কলোনির কর্পোরেটদের জন্য আর উপনিবেশিক প্রজাদের জন্য হল চরমতমভাবে নিয়ন্ত্রিত- ফিফথ রিপোর্টের তথ্য আর বিশ্লেষণ সূত্রে প্রমাণ হল, কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য ভারতবর্ষীয় বাজারের উন্নতির পথে অন্যতম প্রধানতম বাধা, অর্থাৎ এই বাজারে নব্য কর্পোরেটদের প্রবেশে ২০০ বছরের বৃদ্ধ কোম্পানি প্রবল বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বাণিজ্য একচেটিয়া অধিকারের কুড়ুল হাতে। বাংলা-আমেরিকা লুঠ আর ব্রিটেনজুড়ে এনক্লোজার চাপিয়ে দিয়ে সম্পদ দখল করা আউটপোর্ট কর্পোরেটদের চাপ প্রাবল্যে সরকার বাধ্য হল আইন প্রণয়ন করে কোম্পানির ভারতবর্ষীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার ছিলিয়ে নিতে — শুরু হল তথাকথিত ‘মুক্ত’ বাণিজ্য যুগের, যেখানে মেট্রোপলিটনের কর্পোরেট এনটিটির বাণিজ্য প্রায় বাধাহীন আর উপনিবেশের প্রজাদের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা না করা হলেও কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যায় আর আভ্যন্তরীণ বাজারেও তার অংশগ্রহণে বেড়ি পরানো হয়।

আদতে ফিফথ রিপোর্ট আর ১৮১৩ সালের সনদ আইন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক কৌশলের এক চূড়ান্ত মোড় ঘোষণা করে। এই আইন কোম্পানির ভারতীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার বাতিল করে, যেন ‘মুক্তবাণিজ্যের’ যুগের সূচনা হয়। কিন্তু এই ‘মুক্তি’ ছিল এক পরম মিথ্যা — মেট্রোপলিটনের কর্পোরেট সংস্থাগুলির জন্য বাজার উন্মুক্ত হলেও উপনিবেশের প্রজাদের জন্য তা ছিল কারাবন্দির নতুন শৃঙ্খল। ফিফথ রিপোর্টের তথ্য-বিশ্লেষণ কোম্পানির একচেটিয়াকে বাজার-উন্নতির বাধা বলে প্রমাণিত করলেও, ১৮১৩ সালের আইন মূলত শিল্প-পুঁজি Industrial Capital স্বার্থে প্রণীত হয়েছিল — এবং মাথায় রাখতে হবে পুঁজিতন্ত্র ক্রমশঃ মার্কেন্টাইল পুঁজি থেকে পরিণত হতে চাইছে শিল্পপুঁজির চরিত্রে। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগোর উদীয়মান কর্পোরেট শিল্পপতিরা দাসবাণিজ্য আর দাস উৎপাদন কাঠামো চালিয়ে এবং এনক্লোজার-নির্ভর আদি পুঁজি সঞ্চয় করে ক্রমশঃ শক্তিশালী হয়ে ভারতবর্ষীয় বাজার দখলের জন্য এই আইন তৈরির চাপ তৈরি করল। অন্যদিকে, সনদ আইনের ৪৩ ধারা স্পষ্টভাবে ভারতীয় প্রজাদের বিদেশি জাহাজে বা ভারতের বাইরে বাণিজ্য করতে নিষেধ করে বলেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণ কার্যত অসম্ভব হয়ে ওঠে। আর অভ্যন্তরীণ বাজারেও ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের আগমনে দেশীয় তাঁতি ও কারিগররা ধ্বংসের মুখে পড়ে, যা স্বেন বেকার্টের ভাষায় ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর এক নৃশংস প্রক্রিয়া। এই আইন ভারতকে ব্রিটিশ শিল্পের কাঁচামালের উৎস ও পণ্যের বাজারে পরিণত করলেও, এটিকে ‘মুক্ত’ বা ‘ন্যায্য’ বাণিজ্য বলা যায় না; এটি ছিল শিল্প-পুঁজির স্বার্থে উপনিবেশিক শোষণের কাঠামোকে পুনরায় সংগঠিত করার এক চতুর কৌশল, যা ফিফথ রিপোর্টের ‘মাস্টারপিস’-এর পরিণতি।

২। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা- ফিফথ রিপোর্ট কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ ওপর রাষ্ট্রীয় আঘাতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট থেকে শুরু করে ১৭৮৪ সালের পিটস ইন্ডিয়া অ্যাক্ট — প্রত্যেকটি আইন কোম্পানির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছিল। কিন্তু ফিফথ রিপোর্ট সেই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পর্যায়কে দলিলায়িত করে, যা ১৮১৩ সালের সনদ আইনের মাধ্যমে কার্যকর হয়। রিপোর্টটি আপাতদৃষ্টিতে কোম্পানির প্রশাসনিক সাফল্যের গল্প বললেও, তার পরিশিষ্টে থাকা তথ্য ও বিশ্লেষণ কোম্পানির শাসনের দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্র ফুটিয়ে তোলে। এই তথ্যগুলোই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ‘বৈজ্ঞানিক’ অজুহাত তৈরি করে। ১৮১৩ সালের সনদ আইন কোম্পানির ভারতীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার বাতিল করে এবং বোর্ড অফ কন্ট্রোলের ক্ষমতা বাড়িয়ে কোম্পানির রাজস্ব ও প্রশাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে কোম্পানি আর স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন ছিল না — পরিণত হল ব্রিটিশ রাষ্ট্রের একটি প্রশাসনিক শাখায়, যার আর্থিক সংস্থান রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এই আইন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে ব্রিটিশ ভারতের ওপর রাজা (Crown) বা পার্লামেন্টের সার্বভৌম অধিকার রয়েছে, যে দাবি কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ অবসান ঘটায়। ফিফথ রিপোর্ট তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক দলিল ছিল না — ছিল রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ‘মাস্টারপিস’ কোম্পানির বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসনের অন্ত ঘটয়ে রাষ্ট্রীয় শাসনের পথ প্রশস্ত করল। এরই প্রতিক্রিয়ায় ১৮৫৮ সালে গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্টের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করা হল। এই আইন প্রমাণ করে যে উপনিবেশিক শাসন কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই নয়, বরং আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমেও পরিচালিত হয়, যা ফিফথ রিপোর্টের মত ‘মাস্টারপিস’-এর ভিত্তি তৈরি করে। ফিফথ রিপোর্ট তাই কোম্পানির ‘শেষ অধ্যায়’-এর সূচনা করে, যা রাষ্ট্রীয় শাসনের পথ প্রশস্ত করে এবং উপনিবেশিক শাসনের এক নতুন যুগের সূচনা করে, যেখানে কোম্পানি আর স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন ছিল না; এটি পরিণত হয় ব্রিটিশ রাষ্ট্রের একটি প্রশাসনিক শাখায়।

ফিফথ রিপোর্ট আলোচনা সূত্রে পুঁজির শৈশবকালের চরিত্র ছুঁয়ে যাওয়া

১৮১২-য় যখন ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ফিফথ রিপোর্ট পেশ হচ্ছে সে সময়টার পুঁজির চরিত্রটা বুঝে নিই। প্রথম যুগের মার্ক্স পড়ে আমরা মনে করেছি পুঁজি হল সামন্ততন্ত্র আর দাস ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা প্রগতিশীল সামাজিক কাঠামো। কিন্তু Simon Fairlie, A Short History of Enclosure in Britain-এ দেখাচ্ছেন ১৭৬৫তে বিপুল জমি দখল হয়ে প্রচুর মানুষ উচ্ছেদ হবেন, তাদের একটা অংশ শ্রমিক হবেন। আর স্বেন বেকার্ট এম্পায়ার অব কটনে বলছেন, ১৭৮০ থেকে পুঁজি নির্ভর যে কেন্দ্রিভূত শিল্প কাঠামো তৈরি হল, সেই পুঁজি আসছে এনক্লোজার তৈরি করে ফুলেফেঁপে ওঠা জমিদার আর স্বাধীন আমেরিকায় বাগিচা কৃষি অর্থাৎ দাস ব্যবসা আর বিনামূল্যে দাস খাটিয়ে সম্পদশালী হওয়া মালিকেরা। তারা কারখানায় যে শ্রমিক আর সম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে আসবেন, সেটা মূলত দাস ব্যবস্থার বাগিচা কৃষিতে শ্রমিক খাটানোর ব্যবস্থাপনা — যে জন্য কারখানায় অবশ্রমমূল্যে বিপুল মহিলা আর বিনামূল্যে শিশুরা খাটবে এবং আজও কর্পোরেট কাঠামোয় যে শ্রম ব্যবস্থাপনা দেখি — পিঙ্ক স্লিপ, কয়েক ঘন্টার নোটিশে চাকরি যাওয়া, গলায় দাস শ্রমিকের মত বাধ্যতামূলক ধারণ করা সঙ্গঠন পরিচিতি, বন্ধ কর্পোরেট আপিসে বাইরে না গিয়ে ১০-১২ ঘণ্টা বাধ্যতামূলকভাবে আটকে থাকা – ঢোকা-বেরোনোর সময় ইলেক্ট্রনিক চিহ্ন দিয়ে যাওয়া, কাজের সময় ছাড়াও অন্য সময়ে খাটিয়ে নেওয়া অতরিক্ত ভাতা না দিয়ে ইত্যাদি মূলত দাস ব্যবস্থার এক্সটেনশন। অর্থাৎ ১৮১২য় ফিফথ রিপোর্ট সূত্রে ইস্ট ইন্ডিয়ান কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার কেড়ে নেওয়ার ফলে যে সব কর্পোরেট তথাকথিত মুক্ত বাণিজ্যে প্রবেশ করবে – যে বাণিজ্য মুক্ত হল মেট্রোপলিটনের আর সেটলার কলোনির কর্পোরেটদের জন্য আর উপনিবেশিক প্রজাদের জন্য হল চরমতমভাবে নিয়ন্ত্রিত – সেটা মার্ক্সীয় নিদানে আদৌ বিকাশ না রাজনৈতিক পশ্চাদপদতা। পরের যুগে অর্থাৎ ল্যাটার মার্ক্স নিজের প্রথম জীবনের অবস্থান অনেকটাই নেগেট করেছেন। ফলে ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ড – বেঙ্গল পোরশন অনুবাদের বিপুল ডাটা আলোচনা সূত্রে আমাদের পুঁজিবাদের চরিত্রও বিশ্লেষণ করতে হবে যারা এই বিপুল ডাটা কুশনে বসে আগামী দিনে সারা বিশ্বের ডাটা উপনিবেশ বানাবে।

প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদ ও ডেটা উপনিবেশ : ফিফথ রিপোর্ট থেকে ডিজিটাল সাম্রাজ্য এবং তার উত্তর

ফিফথ রিপোর্টের ডেটা-নির্ভর কৌশল আজকের প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতিতে নতুন রূপ নিয়েছে, যা ডেটা উপনিবেশ নামে পরিচিত। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে পেশ হওয়া ফিফথ রিপোর্ট যেমন রাজস্ব আদায়, জমির পরিমাণ ও জনসংখ্যার পরিসংখ্যান ব্যবহার করে শাসন-কাঠামো তৈরি করেছিল, তেমনই আজকের গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে বাজার ও জনমত নিয়ন্ত্রণ করে। এই ডেটা-শাসন শুধু বাণিজ্যিক নয়, এটি রাজনৈতিকও — যেখানে ডেটা ব্যবহার করে জনমত তৈরি করা হয়, নির্বাচন প্রভাবিত করা হয়, এমনকি বিপ্লবও বানানো হয়।

রাজ প্যাটেল ও জেসন মুরের ‘সেভেন চিপ থিংস’ ধারণা দেখায়, পুঁজিবাদ কীভাবে প্রকৃতি, শ্রম, যত্ন ও জীবনকে ‘সস্তা’ করে শোষণ করে। এই শোষণের শিকড় ফিফথ রিপোর্টের সময়কালে, যখন এনক্লোজার, দাসপ্রথা ও উপনিবেশের মাধ্যমে আদি পুঁজি সঞ্চয় করা হয়েছিল। আজকের প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদ সেই শোষণেরই ডিজিটাল রূপ — যেখানে আমাদের ডেটা হয়ে যায় পুঁজির কাঁচামাল, আর আমরা হয়ে যাই ‘পণ্য’। ফেসবুকের ‘বিনামূল্যে’ পরিষেবার বিনিময়ে আমরা আমাদের ডেটা দিই, যা কর্পোরেটরা বিপণন, রাজনৈতিক প্রচারণা ও জনমত তৈরিতে ব্যবহার করে।

ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ তাই পুঁজিবাদ ও ডেটা উপনিবেশের এই ধারাবাহিকতা বোঝার জন্য অপরিহার্য। এটি দেখায় কীভাবে ডেটা-শাসনের কৌশল শতাব্দী ধরে বিবর্তিত হয়েছে — রাজস্ব ডেটা থেকে শুরু করে আজকের পার্সোনাল ডেটা পর্যন্ত। যারা এই বিপুল ডেটার কুশনে বসে আগামী দিনের ডেটা উপনিবেশ বানাবে, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের জন্য এই ডেটা-শাসনের ইতিহাস জানা জরুরি। ফিফথ রিপোর্টের ডেটা-নির্ভর কৌশল ছিল উপনিবেশিক শাসনকে সুসংহত করার একটি মাধ্যম; আজকের প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদ সেই কৌশলকে আরও পরিশীলিত ও বৈশ্বিক রূপ দিয়েছে। হকার, কারিগর ও চাষীদের জন্য এই ডেটা উপনিবেশের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অত্যন্ত জরুরি, কারণ তারা এখন শুধু শ্রমের মাধ্যমেই নয়, তাদের ডেটার মাধ্যমেও শোষিত হচ্ছে। ফিফথ রিপোর্টের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ সেই সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা — তথ্যের মাধ্যমে শোষণকে উন্মোচন করা, এবং ডেটা উপনিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

এর উত্তর মুলডুনের প্ল্যাটফর্ম সোসালিজম আর লাতিন আমেরিকায় প্রাক্টিশ করা ডিজিটাল কোওপারেটিজম

ফিফথ রিপোর্টের ডেটা-নির্ভর শাসন থেকে আজকের ডেটা উপনিবেশ — এই ধারাবাহিকতার বিপরীতে মুলডুনের ‘প্ল্যাটফর্ম সোশ্যালিজম’ এবং লাতিন আমেরিকার ডিজিটাল কোঅপারেটিভিজম প্রকৃতপক্ষে একটি কার্যকর প্রতিরোধের পথ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে। আমি মনে করি, হ্যাঁ, এটাই সেই বিকল্প যা আমরা খুঁজছি — এবং তা শুধু তাত্ত্বিক নয়, বাস্তবেও কাজ করছে।

‘প্ল্যাটফর্ম সোশ্যালিজম’ : বৃহৎ প্রযুক্তির বিরুদ্ধে একটি পদ্ধতিগত বিকল্প

জেমস মুলডুনের ‘প্ল্যাটফর্ম সোশ্যালিজম’-এর মূল বক্তব্য হলো, ডেটা উপনিবেশ ও প্ল্যাটফর্ম পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু নিয়ন্ত্রণের (regulation) মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং ডিজিটাল অর্থনীতির মালিকানা ও শাসন কাঠামোকে আমূল বদলে ফেলা প্রয়োজন। মুলডুন ‘প্ল্যাটফর্ম সোশ্যালিজম’-কে সংজ্ঞায়িত করেছেন ‘ডিজিটাল সম্পদের সামাজিক মালিকানা এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর ওপর গণতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ’ হিসেবে। এটি একটি ‘প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রণ-পুনঃসংহিতাকরণ’ (resisting, regulating, re-coding)-এর কৌশল। তিনি বিংশ শতাব্দীর গিল্ড সোশ্যালিস্ট (G.D.H. Cole) ও অটো নিউরাথের চিন্তা থেকে অনুপ্রাণিত, যা বৃহৎ রাষ্ট্রের পরিবর্তে স্থানীয়, সাম্প্রদায়িক ও নিকটবর্তী প্ল্যাটফর্মের (subsidiarity) পক্ষে সওয়াল করে। তিনি বর্তমানের সফল মডেলগুলির কথাও তুলে ধরেন — যেমন প্ল্যাটফর্ম কোঅপারেটিভ (Up&Go), নাগরিক প্ল্যাটফর্ম (বার্সেলোনা এন কোমু, ডেসিডিম), ডেটা কমন্স (উইকিপিডিয়া) এবং বিকেন্দ্রীভূত সামাজিক নেটওয়ার্ক (মাস্টোডন)।

লাতিন আমেরিকার ‘সলিডারিটি প্ল্যাটফর্ম কোঅপারেটিভিজম’: বাস্তবে বিকল্প

আমেরিকা ও ইউরোপের তাত্ত্বিক আলোচনা থেকে এগিয়ে, লাতিন আমেরিকায় ‘সলিডারিটি প্ল্যাটফর্ম কোঅপারেটিভিজম’ (SPC) নামে একটি বাস্তব আন্দোলন গড়ে উঠেছে, যা ফিফথ রিপোর্টের ডেটা-শাসনের বিকল্পের প্রত্যক্ষ চিত্র। ২০২৫ সালের একটি গবেষণায় লাতিন আমেরিকার ১১৩টি SPC চিহ্নিত করা হয়েছে, যাদের পাঁচটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে — উৎপত্তি, কর্মী পরিচয়, সংকর ব্যবসায়িক মডেল, প্রযুক্তি গ্রহণ এবং ন্যায্য শ্রমশর্ত।

প্রধান উদাহরণ ও প্রয়োগ:

১. কোপসাইকেল (CoopCycle) : একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। এটি একটি উন্মুক্ত-উৎস সফটওয়্যার-ভিত্তিক সাইকেল ডেলিভারি ফেডারেশন, যা ইউরোপে শুরু হয়ে লাতিন আমেরিকায় (আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, চিলি) ছড়িয়ে পড়েছে। এটি শ্রমিকদের সমবায়ের মালিকানায় পরিচালিত একটি বিকল্প ‘আলগোরিদম’ তৈরি করেছে।

২. ব্রাজিলের বিবি মোবিল (Bibi Mobil) : সাও পাওলোর আরাকুরা শহরের পৌরসভা কর্তৃক পরিচালিত একটি ট্যাক্সি প্ল্যাটফর্ম। এটি সরকার-পরিচালিত প্ল্যাটফর্মের একটি উদাহরণ।

৩. অ্যান্ডিয়ান কেয়ার কোঅপারেটিভস : ইকুয়েডরের অ্যাসকোলিম (Ascolim) ও কলম্বিয়ার ইমা লিম্পিয়া (Ima Limpia) গৃহস্থালি ও পরিচর্যা পরিষেবার প্ল্যাটফর্ম সমবায়।

সাফল্যের সূত্র ও চ্যালেঞ্জ:

এই সমবায়গুলির সাফল্য নির্ভর করে আন্তঃসমবায় সংযোগ (FACTTIC-এর মতো ফেডারেশন), উন্মুক্ত-উৎস প্রযুক্তি, এবং সামাজিক বিপণন ও পরিষেবার বৈচিত্র্যকরণের ওপর। তবে তাদের চ্যালেঞ্জও কম নয় — টেকসই অর্থায়ন, দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ধরে রাখা, এবং কর্পোরেট প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টেকা। মুলডুনের মডেল একটি কাঠামো দেয়, আর লাতিন আমেরিকার সমবায়গুলো সেটির বাস্তব প্রমাণ। তারা দেখাচ্ছে যে শ্রমিক ও সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করা সম্ভব। ফিফথ রিপোর্টের উপনিবেশিক ডেটা-শাসনের বিরুদ্ধে এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ও বাস্তবসম্মত প্রতিরোধ। লাতিন আমেরিকার এই অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা শিখতে পারি কীভাবে ‘ডেটা উপনিবেশ’-এর বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক ও সমবায়ভিত্তিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে হয়।

লড়াই দীর্ঘজীবী হোক। উপনিবেশের পতন হোক।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার এডিটেড দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন