Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বিদ্যাসাগর — একটি কল্পিত সাক্ষাৎকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ খোলা খামের পরে খোলা চিঠি : দিলীপ মজুমদার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ ও তিনি — ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-৮৬) : প্রলয় চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘মেরিলিন মনরোর চশমা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তারাশঙ্করের উপন্যাসে সমাজগতির ধারা : ড. অলোক রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নিউরাল কারেন্সি’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কালীঘাট পটচিত্রের ইতিকথা : মনোজিৎকুমার দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’

বিশ্বজিৎ মণ্ডল / ৫৫ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬

বৃষ্টিহীন আষাঢ়ের তপ্ত দুপুর।

আকাশে মেঘের একটুকরো ছায়াও নেই। সূর্যের আগুনে ঝলসে উঠেছে একসময়ের বিস্তীর্ণ চাঁদ বিল। কোথাও কোথাও মাটি ফেটে চৌচির। যে বিল একদিন জল, মাছ, পাখি আর ধানের প্রাচুর্যে ভরে থাকত, আজ সেখানে বড় বড় বাঁধ তুলে মাছের ঘের বানানো হয়েছে। দূরে কয়েকজন পাহারাদার বসে আছে। বাতাসে আর ধানের গন্ধ নেই, শুধু এক অচেনা নীরবতা।

লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন আটাত্তর বছরের নিবারণ মণ্ডল। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে বিলের দিকে। কিন্তু তিনি বর্তমান দেখছেন না; তাঁর দৃষ্টি ফিরে গেছে বহু বছরের পুরোনো এক পৃথিবীতে।

একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল।

— “বিশ্বাস হয় না… এই বিলেই একদিন সোনা ফলত।”

তখন বর্ষা মানেই ছিল উৎসব। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামত। চাঁদ বিল কানায় কানায় জলে ভরে উঠত। বর্ষা কেটে গেলে সেই জল ধীরে ধীরে নেমে যেত, আর উর্বর পলিমাটিতে বেড়ে উঠত, ভাসামানিক ধান।

নিবারণের মনে পড়ে যায়, জ্যৈষ্ঠের তপ্ত দুপুরে বাবার সাথে বিলের জমিতে আসত চাষের কাজে। জল মরে আসা বিলের মাটিতে চাষ করে ধান ছড়িয়ে দিত বাবা। সঙ্গে সংগ্রামপুর, কয়া, শ্রীপুরডাঙ্গার অন্যান্য চাষীরাও। একমাত্র ধান ছিল, ভাসা মানিক। এই ধানের বৈশিষ্ট্য হল, যত জল বাড়বে, ধানের শরীরও ততই বাড়বে।

দিন পনেরোর মধ্যে যতদূর চোখ যেত, শুধু সবুজ আর সবুজ। বাতাস এলেই ধানের ঢেউ ছুটে যেত এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

ভাসামানিক ধানের শীষ ছিল ভারী, দানা ছিল মোটা। গ্রামের প্রবীণরা বলতেন, এই ধানের ভাতের গন্ধেই নাকি ক্ষুধা বেড়ে যায়।

তখন নিবারণ যুবক। শরীরে অফুরন্ত শক্তি। বাবা হরিপদ মণ্ডলের সঙ্গে ভোরবেলা মাঠে যেত। সদ্য বিবাহিত স্ত্রী সরলা সংসারের কাজ সেরে দুপুরে খাবার নিয়ে মাঠে পৌঁছে যেত।

একদিন ধানক্ষেতে কাজ করতে করতে বাবা বললেন,

— “নিবারণ, জমিকে কখনও অবহেলা করিস ন্যা । মানুষ মাটি ছাড়া বাঁচতে পারে না।”

নিবারণ হেসে বলল,

— “তুমি আছো তো বাবা, সব শিখ্যে  লিবো ।”

দূর থেকে সরলা ডাক দিল,

— “ওগো, আর কত কাজ করবা ? ভাত ঠান্ডা হয়ে যেছ্যে ।”

হরিপদ হেসে বললেন,

— “যা, আগে খেয়্যে আয়। প্যাট ভরা না থাকলে ধান কাটা আগাবে না ।”

ধানে শীষ এলেই আরেক বিপদ দেখা দিত। ঝাঁকে ঝাঁকে বালিহাঁস নেমে এসে ঠোঁট দিয়ে ধানের শীষ কেটে বাসা বানাত। এক রাতেই অনেকখানি ধান নষ্ট হয়ে যেত।

ভোরে বিলের ধারে এসে নিবারণ হতাশ হয়ে বলত,

— “বাবা, দ্যাখো না, কত ধান কেটে ফেলেছ্যে ।”

হরিপদ মৃদু হেসে বলতেন,

— “উয়াদেরও সংসার আছে রে। তবু চল, আজ একটু তাড়িয়ে দিই।”

ডিঙি-নৌকা নিয়ে দুজনে বিলে নামতেন। লাঠি দিয়ে জল পিটিয়ে চিৎকার করতেন —

— “হেই… হেই…  যা, পালা !”

শত শত বালিহাঁস ডানা ঝাপটিয়ে আকাশে উড়ে যেত। তাদের ডানার শব্দে যেন পুরো বিল কেঁপে উঠত।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে নিবারণ বলত,

— “উয়ারা কাল আবার আসবে।”

হরিপদ হেসে উত্তর দিতেন,

— “আসুক। বিল যদি বেঁচে থাকে, ধানও হবে, পাখিও থাকবে। প্রকৃতিকে একা ভোগ করতে নাই।”

সেই সময় কথাটার গভীরতা বোঝেনি নিবারণ। আজ বুঝতে পারে, বাবা শুধু কৃষিকাজ নয়, জীবনের দর্শনও শিখিয়েছিলেন।

ধান কাটার মরসুম এলেই গোটা গ্রাম উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাস্তের ঝনঝন শব্দ, মানুষের ডাকাডাকি, হাসি আর লোকগানের সুরে মুখর থাকত বিল।

সন্ধ্যায় উঠোনে গরুর পায়ে ধান মাড়াই হত। নতুন ধানের গন্ধে ভরে যেত চারদিক।

মা গরম ফ্যানভাত বাড়িয়ে দিতেন।

— “খা বাবা, সারাদিন খেট্যেছিস।”

নিবারণ বলত,

— “মা, আর একটু ফ্যান দাও।”

মা হেসে বলতেন,

— “তোর খিদ্যা দেখলে মনে হয় , তুই একাই সারা বিলের ধান কেট্যেছিস।”

শীতের সকালে সেই ভাসামানিক ধানের মোটা চিড়ে দুধ, গুড় আর কলা দিয়ে খাওয়ার আনন্দ আজও নিবারণের জিভে লেগে আছে।

এই ধান শুধু খাদ্য ছিল না; ছিল গ্রামের উৎসব, আত্মীয়তা, শ্রম, ভালবাসা আর অস্তিত্বের প্রতীক।

কিন্তু সময় কখনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।

প্রথমে বৃষ্টি একটু কমল। তারপর আরও কমল।

একসময় বর্ষা যেন পথ ভুলে গেল। চাঁদ বিলে আগের মত জল জমত না। জমির বুক শুকিয়ে উঠতে লাগল। ভাসামানিক ধানের ফলন বছর বছর কমতে শুরু করল।

এক সন্ধ্যায় উঠোনে বসে নিবারণ উদ্বিগ্ন গলায় বলেছিল,

— “বাবা, এভাবে চলল্যে কী হবে?”

হরিপদ আকাশের দিকে তাকিয়ে ধীরে বলেছিলেন,

— “প্রকৃতি বদলালে মানুষকে লড়ত্যে হয়। কিন্তু তার থেকেও বড় বিপদ তখুনি আসে, যখুন মানুষ নিজের মাটির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়…”

নিবারণ তখনও বুঝতে পারেনি কথাটা। সেই কথাই খুব শিগগির সত্যি হতে চলেছে।

দুই.

হরিপদ মণ্ডলের কথাগুলো যে এত তাড়াতাড়ি সত্যি হয়ে উঠবে, তা নিবারণ কল্পনাও করতে পারেনি।

পরের কয়েক বছরে বর্ষার চেহারাই বদলে গেল।

আষাঢ় এলেও মেঘ আসত না। বৃষ্টি হলেও দু-এক পশলা। চাঁদ বিল আর কানায় কানায় ভরে উঠত না। জমির বুক থেকে উর্বরতার হাসি যেন ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল। ভাসামানিক ধানের ফলন কমতে কমতে এমন জায়গায় পৌঁছাল যে অনেক কৃষক হতাশ হয়ে পড়লেন।

ঠিক সেই সময় গ্রামে এল কিছু নতুন মুখ। দামি গাড়ি, চকচকে পোশাক, মাপা কথা। তারা কৃষকদের বোঝাতে লাগল—

— “ধান চাষে লাভ নেই। মাছের ঘের করলে বছরে অনেক বেশি আয় হবে। জমি বিক্রি করুন, ভবিষ্যৎ গড়ুন।”

অভাবের সংসারে টাকার লোভ বড় কঠিন পরীক্ষা। কারও মেয়ের বিয়ে, কারও ছেলের পড়াশোনা, কারও চিকিৎসার খরচ—প্রলোভনের কাছে অনেকেই মাথা নত করলেন। একে একে জমির দলিল বদলাতে লাগল।

নিবারণ আপত্তি করেছিলেন।

— “এই বিল শুধু জমি লয়। এট্যা আমাদের ইতিহাস। তুমরা ইতিহাস বিক্রি করে দিছো ।”

একজন তরুণ হেসে বলেছিল,

— “কাকু, ইতিহাসে ভাত হয় না। এখন টাকার যুগ।”

কথাটা শুনে নিবারণের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠেছিল। তিনি বুঝেছিলেন, যে সমাজ তার মাটির মূল্য ভুলে যায়, সে সমাজ একদিন নিজের শিকড়ও ভুলে যায়।

অল্পদিনের মধ্যেই বিলের বুক চিরে উঁচু উঁচু বাঁধ উঠল।

বিশাল জলাধার তৈরি হল। পাম্প বসিয়ে জল আটকে রাখা হল। যেখানে একদিন ধানের ঢেউ খেলত, সেখানে মাছের খাদ্য ছড়ানোর শব্দ ভেসে আসতে লাগল।

সেই বছর নিবারণ শেষবারের মত ভাসামানিক ধানের বীজ বুনেছিলেন। ফলন হল না। পরের বছর আর বীজই পাওয়া গেল না। গ্রামের কেউ আর সেই ধানের কথা বলল না।

একটি ধানের জাত নীরবে হারিয়ে গেল। তার সঙ্গে হারিয়ে গেল একটি কৃষিসভ্যতার স্মৃতি।

বাড়ি ফিরে নিবারণ অনেকক্ষণ নিশ্চুপ বসে ছিলেন। সরলা জিজ্ঞেস করল—

— “এত চুপ করে আছ ক্যানে ?”

নিবারণ ধীরে বললেন—

— “আজ শুধু ধান হারাল না, আমাদের ঘরের একটা ভাষা হারিয়ে গেল।”

সরলা তাঁর হাত চেপে ধরে রইল। সান্ত্বনা দেওয়ার মত কোন ভাষা তারও ছিল না।

সময় তার নিজের নিয়মে বয়ে চলল। বাবা চলে গেলেন, মা চলে গেলেন। একদিন সরলাও নিবারণকে একা রেখে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল।

ছেলেরা শহরে চাকরি পেল। তাদের কাছে জমি মানে সম্পত্তি, বিল মানে ব্যবসার সম্ভাবনা।

একদিন বড় ছেলে বলল—

— “বাবা, বাকি জমিটাও বিক্রি করে দাও। এত কষ্ট করে আর কী হবে?”

নিবারণ শান্ত স্বরে উত্তর দিলেন—

— “জমি বিক্রি করা যায়, কিন্তু শিকড় বিক্রি করা যায় না। মানুষ শিকড় হারালে আর কুথাও দাঁড়াতে পারে না।”

ছেলে আর কিছু বলল না।

রাতে ঘুম এল না নিবারণের। বারবার মনে হতে লাগল, মানুষ বয়স বাড়লে আসলে স্মৃতির ভেতরেই বাস করে। বর্তমানের কোলাহল তার কাছে ম্লান হয়ে যায়, আর অতীতের ছোট ছোট ঘটনাগুলোই যেন সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি ভাবলেন, ভাসামানিক ধান কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? নাকি মানুষের স্মৃতি থেকেই তাকে মুছে ফেলা হয়েছে?

এই প্রশ্নের উত্তর তিনি খুঁজে পান না। বরং নিজের ভেতরেই এক অদ্ভুত অপরাধবোধ জন্ম নেয়। যদি সেদিন আরও জোর দিয়ে প্রতিবাদ করতেন? যদি গ্রামের মানুষকে আরও একবার বোঝানোর চেষ্টা করতেন? হয়ত কিছুই বদলাত না। তবু এই ‘হয়ত’ শব্দটাই তাকে আজও তাড়া করে বেড়ায়।

তিনি উপলব্ধি করেন, মানুষের লোভ শুধু জমি দখল করে না; লোভ ধীরে ধীরে মানুষের স্বাদ, সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং বিবেককেও গ্রাস করে।

বিলের জল শুকিয়ে যাওয়ার অনেক আগে মানুষের মন শুকিয়ে গিয়েছিল। তাই ভাসামানিক ধান হারানোর আগে হারিয়ে গিয়েছিল তাকে ভালোবাসার মন।

হঠাৎ তাঁর বাবার কথা মনে পড়ে—

— “জমি কখনও মানুষকে ঠকায় না; মানুষই একদিন জমিকে ঠকায়।”

আজ তিনি বুঝতে পারেন, কথাটা শুধু কৃষকের নয়, সমগ্র সভ্যতার সত্য।

পরদিন সকালে নিবারণ আবার চাঁদ বিলের ধারে এলেন। চারদিকে শুধু বাঁধ দেওয়া জলাভূমি। পাহারাদাররা মাছের ঘের দেখছে। কোথাও ধানের সবুজ নেই, কোথাও বালিহাঁসের ডানা ঝাপটার শব্দ নেই।

ঠিক তখনই তাঁর নাতি এসে পাশে দাঁড়াল।

— “দাদু, তুমি এখানে রোজ আসো কেন?”

নিবারণ মৃদু হেসে বললেন—

— “আমি যা খুঁজি, তা আর এখানে নাই।”

— “কী খোঁজো?” নাতির কৌতূহল ।

তিনি দূরে তাকিয়ে বললেন—

— “তোর ঠাম্মার হাতে খাওয়া ভাসামানিক ধানের ফ্যানভাত। শীতের সকালে মোটা চিড়ে। বাবার সঙ্গে নৌকা বেয়ে বালিহাঁস তাড়ানো। নতুন ধানের গন্ধে ভরে থাকা বাতাস। চাষাদের মুখের হাসি। এগুলো আর কোথাও নাই।”

নাতি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। সে এমন এক পৃথিবীর গল্প শুনছে, যা তার জন্মের বহু আগেই হারিয়ে গেছে।

নিবারণ নিচু হয়ে একমুঠো শুকনো মাটি তুলে নিলেন। ধীরে ধীরে মাটিটা হাতের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়তে লাগল।

তিনি ফিসফিস করে বললেন—

— “ভাসামানিক, তুই শুধু একটি ধানের নাম ছিলি না। তুই ছিলি আমাদের মাটির গন্ধ, আমাদের শ্রমের গর্ব, আমাদের মায়ের রান্নাঘরের উনুন, আমাদের শৈশব, আমাদের উৎসব। তোকে হারিয়ে আমরা শুধু একটি ফসল হারাইনি, হারিয়েছি আমাদের নিজেদেরই এক টুকরো পরিচয়।”

পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবতে শুরু করেছে। বাঁধে আটকে থাকা জলের ওপর লাল আলো পড়েছে। নিবারণ ধীরে ধীরে ফিরে চললেন। তাঁর লাঠির টুকটুক শব্দ নিস্তব্ধ বিকেলের বুক চিরে এগিয়ে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, সেই শব্দ যেন একটি হারিয়ে যাওয়া কৃষিসভ্যতার শেষ সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।

আর চাঁদ বিলের নীরব বাতাসে যেন অদৃশ্য কোনো কণ্ঠস্বর ভেসে এল —

“যে জাতি তার বীজকে রক্ষা করতে পারে না, সে একদিন তার স্মৃতিকেও রক্ষা করতে পারে না।”


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন