শিবশঙ্কর পাল মূলত প্রাবন্ধিক। কবিতা বিশ্লেষক। লোকসংস্কৃতির লেখক। তাঁর ‘জীবনানন্দ : জীবন ও সাহিত্যদর্শন’ বইটি নতুন করে জীবনানন্দকে ফিরে দেখার অনন্য প্রয়াস। বইটির ব্লার্বে বলা হয়েছে — ‘অতলান্ত জীবনানন্দ। শব্দশিল্পী জীবনানন্দ। আহত ক্লান্ত পথচারী জীবনানন্দ। পাঠক ও কবির কাছে তিনি আজও উজ্জীবনী প্রদীপ। টিমটিমে আলোর মতো ঝাপসা কখনও। কখনও নীলিমায় বিলীন।’ ড. শিবশঙ্কর পাল এই বইটিকে কেন্দ্র করে কবিকে ফিরে দেখেছেন। দেখেছেন নতুন ভঙ্গিমায়। নতুন দিকে। নতুন নতুন বিষয়বস্তুকে তুলে ধরে। জীবনানন্দ পাঠের অনুভূতি সম্পর্কে লেখক ভূমিকায় বলছেন — ‘স্নায়ুতন্দ্রে কোমল আঘাত করে যায় শব্দের তার। বাক্যের প্রথাহীন চলনে ঘন্টার পর ঘন্টা যায় কেটে। এই হলো আমার জীবনানন্দ পাঠের অনুভূতি।’ বইটির সূচিপত্রে চোখ রাখলে দেখা যায় ব্লার্ব ও ভূমিকা-কথন যথার্থ হয়ে উঠেছে। বেশ কিছু নতুন বিষয় উত্থাপন করেছেন লেখক। যেখানে আছে চিহ্ন ব্যবহার। জীবজন্তু-কীটপতঙ্গ। প্রেত-স্বরূপ। ভৌগোলিক পরিসর প্রভৃতি। এছাড়াও আছে নীলিমা, শিকার, সেদিন এ-ধরণীর, ফুটপাথে, ১৯৪৬-৪৭ প্রভৃতি কবিতার পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা, বিশ্লেষণ। সেখানে আছে জীবন প্রণালী উপন্যাসে স্বয়ং জীবনানন্দকে অন্বেষণ।
লেখক এসব করতে গিয়ে জীবনানন্দকে সম্পূর্ণ নতুন আঙ্গিকে এঁকেছেন। দেখতে চেয়েছেন এই বিরল কবির নানা অদেখা অঞ্চল। জীবনানন্দের চিহ্ন চেতনা নিয়ে আমরা কতজন এতদিন কিছু ভেবেছি? কিন্তু ভেবেছেন, লিখেছেন লেখক। দেখেছেন কবিতায় ড্যাশ চিহ্ন, বিস্ময় চিহ্ন, সেমিকোলন, উদ্ধৃতি চিহ্নের আমদানি কেন? তারা কি কাজ করছে? ভাবের ভারা কিভাবে বাঁধছে! তার এক টুকরো উদাহরণ — ‘বলতে গেলে ড্যাশ চিহ্নের মতো জীবনানন্দের কবিতায় সেমিকোলন চিহ্নের ব্যবহার অনেক বেশি। সেখানে সেমিকোলন শুধু কবির ভাব প্রকাশে সাহায্য করেনি, উপরন্তু কবিতার গঠনে, খণ্ড বাক্যগুলিকে একগুচ্ছ করে তুলতে সুতোর কাজ করেছে। সেমিকোলনের ফাঁসে গেঁথে দেওয়া হয়েছে বাক্যের পর বাক্য। সেখানে কবিতার গতি আরও সম্পৃক্ত হয়েছে লাইনে লাইনে।’ জীবনানন্দের কবিতায় অগণিত জীব, কীটের অবস্থানকে লেখক দেখতে চেয়েছেন। কেন তারা কবিতায় আসছে, কি কাজে, কোন উদ্দেশ্যে ওসব কীট-পোকা এসেছে তা তুলে ধরেছেন লেখক। বলেছেন — ‘জীববিজ্ঞানে জীবজন্তু-কীটপতঙ্গের নাম, তাদের পর্ব, গণ প্রভৃতি আলোচিত হয়ে থাকে। তাদের আচরণ অভ্যাস বসবাস প্রজনন প্রভৃতি নানাদিক আলোচনা জীববিজ্ঞানের একটি মূল উদ্দেশ্য।
সেই জীববিজ্ঞানের কিছুটা উদ্দেশ্য যদি কোনও কবি পূরণ করেন, তাঁকে আমরা কি বলব? কীটবিজ্ঞানী-কবি? জীববিজ্ঞান-কবি?… জীবজগতকে গভীর অনুধ্যানে তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন। তাদের বর্ণনা বা তাদের অনুভূতি-আচরণ-অভ্যাসের সঙ্গে নিজের অনুভূতিকে যুক্ত করে দেওয়া একজন জীবপ্রেমীর পক্ষেই সম্ভব। জীবনানন্দ সেই জীবপ্রেমী।’ আসলে মানুষের অনুভূতিকে কীটের অনুভূতি কাজকর্মের সঙ্গে এক করে দেখেছেন কবি৷ আর লেখক এই দিকটির সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করেছেন। ভৌগোলিক পরিসরে এসেছে প্রাচীন স্থান৷ গ্রামবাংলা, আন্তর্জাতিক সীমানা, প্রকৃতিক পরিসর। ত্রিভুজের সূত্রে মাটি-ঘাস-মাঠ, নদী-সমুদ্র-দ্বীপ, নক্ষত্র-সূর্য-আকাশ-নীলিমা’কে ত্রিবন্ধনে বেঁধেছেন লেখক। শিবশঙ্কর পাল বইটিতে জীবনানন্দের কবিসত্বা, কবিতা আঙ্গিকের যে নতুন অঙ্ক কষেছেন তা বাংলা সাহিত্যে নতুন চিন্তা বলা যেতে পারে। জীবনানন্দের প্রেত-স্বরূপ নিয়ে যে গহীন আলোচনা আছে সেখানে প্রেত নরক কঙ্কাল চিতার সঙ্গে মৃত্যু অন্ধকার, হতাশা, ক্লান্তির সুতো খুঁজতে চেয়েছেন লেখক।
পাশাপাশি প্রতিটি কবিতার আলোচনায় এসেছে নতুন সব দিক। নতুন চিন্তার অবতারণা! ‘শিকার’ কবিতায় প্রশ্ন রেখেছেন শিকার কার? কেন শিকার? করেছেন শিকারের প্রতীকি পর্যালোচনা। এখানে নীল সবুজের যে রঙের খেলা তা বদলে গিয়েছে লালে। মরণখেলায়। শিকারির কৌশলে। শিকারের বাঁচার তাগিদে। হরিণের বা গৃহবধুর সঙ্গে কবিকে মিলিয়ে দেখেছেন লেখক। বলছেন — ‘বাইরের পরিবেশের মতো তার মনেও জ্বলে ওঠে লাল আগুন, অন্তর্দাহ, মচকাফুলের পাঁপড়ির মতো। এই হরিণ কি কবি নিজেও? যিনি জীবনের নানা ব্যথাবেদনাকে আত্মসাৎ করেও লিখে গেছেন ‘ঝরা পালক’-এর কথা?… এই শিকারের রূপকে কি কবির জীবনসংগ্রামের চুপকথা নিহিত নেই? হয়তো আছে কিন্তু তাকে ঢেকে দিয়েছে বাদামি হরিণের ছোপ ছোপ দাগ।’
সেদিন এ-ধরনীর কবিতায় দেখিয়েছেন প্রস্তুতি, গতি, স্থিতিসূত্র। সীমা-অসীমের বৈপরীত্য। সমাপতন৷ জীবন প্রণালী উপন্যাসে জীবনানন্দ নিজেই যেন নায়ক। যা উপন্যাস হয়েও কবিতার গদ্য চরিত্র যেন। এছাড়াও কবিতার কাঠামো, কবিতায় অনুষঙ্গ অন্বেষণ, মানবতাবাদ, দেশভাবনা, গল্প-সংলাপ-নাট্যধর্মীতা প্রভৃতি প্রবন্ধগুলিতে আছে বহুকৌণিক চিন্তাচেতনা, আলোচনা। কবিতায় নাটকের ছাপ দেখতে গিয়ে লেখক খুঁজে পেয়েছেন —
‘কবিতার কথাচলন নাটক হয়ে ওঠে যেন। এখানে তার কিছুটা আভাস আছে। অদ্ভূত হয়েও জীবনকে ছুঁয়ে যায় সেসব কবিতার কথা। জীবননাট্যের ধারাভাষ্য হয়ে সেসব কথা ঘোরাফেরা করে আমাদের মনের ভিতর। কখনও হয়ে ওঠে শ্রুতিনাটক —
“ঘুম নাকি সবচেয়ে ভালো?
তবুও ঘুমের থেকে ভালো এই জেগে থাকা, — এই জেগে থাকা!
আমরা বাঁচিয়া থাকি আমাদের হৃদয়ের দোষে, —
অবসাদ ধরে গেলে অবসন্ন হতে চাই আরও!”
যদি কোনও চরিত্র কবিতার এই চরণগুলি মঞ্চে দাঁড়িয়ে উচ্চারণ করে তাহলে কি নাটকীয় একটা মুহুর্ত তৈরী হবে না? হয়তো হবে। হয়তো ওই হওয়াটাও জীবনানন্দের মনে নাটক লেখার সুপ্ত বাসনার বহিঃপ্রকাশ। যার কোনও প্রতিউত্তর আমরা জীবনানন্দ থেকে পাই না। শুধু তার কবিতা বলে দেয় সেখানে চিরাচরিত নাটকের একটা শ্রতিবিশোধন করার প্রয়াস থাকতে পারে —
‘গর্ভাঙ্কে ও অঙ্কে কান কেটে-কেটে নাটকের হয় তবু শ্রুতি বিশোধন।’ (পরিচায়ক) আবার ‘সবারই হাতের কাজ’ কবিতায় জীবনানন্দ বলছেন —
‘নাট্যের লিখন তারা— তবু তারা পড়েছিল মৃগশিরা নক্ষত্রের নিচে,
কথোপকথন গান স্বগতোক্তি নেপথ্যের রব
শিশিরবিন্দুর মতো শব্দ করে দর্শকের কানে;’
সব মিলিয়ে বইটিতে জীবনানন্দকে নতুন আঙ্গিকে এঁকেছেন লেখক। জীবনান্দের যে বিষয়গুলি নিয়ে এতো দিন এতো এতো আলোচনা হয়েছে সেদিকে মুক ফেরাননি লেখক। বরং আপন চোখে, মনের চিন্তায়, খোঁজার নেশায় ডুবেছেন কবির কাব্যাঙ্গনে। বালুচর থেকে ঝিনুক সংগ্রহের মতো প্রবন্ধবন্দী করেছেন জীবনানন্দের কাব্যরত্ন। পুঁতির মালা গাঁথার মতো সেসব কাব্যরত্নকে সাজিয়েছেন বিশ্লেষণী যুক্তিগ্রাহ্য সুতোর বাঁধনে। বইটিতে চোখ রাখলে পাঠক সেখান থেকে খুঁজে নিতে পারেন জীবনানন্দের বহু অদেখা অঞ্চল। অনালোচিত বহু বিষয়।