| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্বাধীনতা — অর্জন নয়, দায়িত্বও : যশোবন্ত রায় চোখের বালি যখন চোখের বালিশ : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বাগ্মী কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী হুমায়ুন কবিরকে কি বাঙালি ভুলে গেল : অসিত দাস পূর্বিতা পুরকায়স্থ-র ছোটগল্প ‘প্রান্তিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৩৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা

কোম্পানির ‘স্ব-শাসন’-এ রাষ্ট্রীয় আঘাত — রাষ্ট্র পরিচালনায় কর্পোরেশন

মনে রাখতে হবে, ১৭৫৭-এর পলাশির পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শুধু বণিক সংগঠন ছিল না; এর সঙ্গে কোম্পানি হয়ে ওঠে ডি ফ্যাক্টো সার্বভৌম শক্তিও। ১৭৬৫-তে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি (রাজস্ব আদায়ের অধিকার) লাভ করে বার্ষিক ২ থেকে ৪ মিলিয়ন পাউন্ড অতিরিক্ত আয়ের সুব্যবস্থা করল। ১৮১৫-য় সে শাসন করত ৪ কোটির বেশি জনসংখ্যাকে এবং ১৮৩৩-এর মধ্যে সে ৫ লক্ষ বর্গমাইল এলাকা আর ৯.৩ কোটি ‘ব্রিটিশ প্রজা-র প্রত্যক্ষ্য নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেয়। স্বাভাবিকভাবে মেট্রোপলিটনে প্রশ্ন উঠছিল — বাজারে শেয়ার ছেড়ে ব্যবসা করা একটা কর্পোরেট সওদাগরি প্রতিষ্ঠানের কি এত বড় যোগ্যতা যে সে এইবড় সাম্রাজ্য শাসন করে? এই প্রশ্নই কোম্পানির অভ্যন্তরে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ভিত্তি তৈরি করল।

প্রথম আঘাত — ১৭৭৩-এর রেগুলেটিং অ্যাক্ট

১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ ওপর প্রথম বড় রাষ্ট্রীয় আঘাত, যা ফিফথ রিপোর্টের মতো দলিলগুলোর ভিত্তি তৈরি করেছিল। ১৭৭২ সালে কোম্পানির আর্থিক সঙ্কট ও পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতির অভিযোগ ব্রিটিশ সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য করে। প্রধানমন্ত্রী লর্ড নর্থ স্পষ্ট ঘোষণা দেন যে কোম্পানির অঞ্চল “রাজমুকুট দ্বারা আরও ভালভাবে শাসিত হবে, যেহেতু পরিচালকরা ব্যবসা বোঝেন, কিন্তু বিশাল এই দেশ শাসন করতে যথেষ্ট যোগ্য নন”। এই মনোভাবের ফলস্বরূপ ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট পাস হয়, যা কোম্পানির প্রশাসনে সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আনে। এই আইনের মাধ্যমে বাংলায় একজন গভর্নর-জেনারেল ও চার সদস্যের কাউন্সিল নিয়োগ করা হয়, যাঁরা কোম্পানির অঞ্চলগুলোর ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব পাবেন। এছাড়াও, কোম্পানিকে সরকারি ঋণ দেওয়া হয় এবং বিনিময়ে ভারতীয় অঞ্চলের ওপর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব স্বীকৃত হয়, এবং কোম্পানি প্রতি দুই বছর অন্তর ৪০,০০০ পাউন্ড রাজস্ব দিতে বাধ্য হয়। এই আইন ছিল ফিফথ রিপোর্টের পূর্বসূরি, যা কোম্পানির শাসনের দুর্বলতা ও দুর্নীতির চিত্র ফুটিয়ে তোলে এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ‘বৈজ্ঞানিক’ অজুহাত তৈরি করে। ফিফথ রিপোর্ট ১৮১২ সালে এসে এই প্রক্রিয়াকে আরও সুসংহত করে, যেখানে কোম্পানির প্রশাসনিক সাফল্যের গল্প বললেও তার পরিশিষ্টে থাকা তথ্য রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে। ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট ছিল সেই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সূচনা, যা ১৭৮৪ সালের ইন্ডিয়া অ্যাক্ট, ১৮১৩ সালের সনদ আইন এবং শেষ পর্যন্ত ১৮৫৮ সালের গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্টের মাধ্যমে কোম্পানির সম্পূর্ণ বিলুপ্তিতে পরিণত হয়। এই আইনটি প্রমাণ করে যে উপনিবেশিক শাসন কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই নয়, বরং আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমেও পরিচালিত হয়, যা ফিফথ রিপোর্টের ‘মাস্টারপিস’-এর ভিত্তি তৈরি করে। ১৭৭৩ সালের রেগুলেটিং অ্যাক্ট তাই কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ অবসানের প্রথম পদক্ষেপ, যা ফিফথ রিপোর্টের মতো দলিলগুলোর মাধ্যমে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।

এই আইনের ফলে —

১। ভারত শাসনে গভর্নর-জেনারেল পদ সৃষ্টি হল- বাংলায় একজন গভর্নর-জেনারেল ও চার সদস্যের কাউন্সিল নিয়োগ করা হল, যাঁরা কোম্পানির অঞ্চলগুলোর ওপর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব করবেন।

২। রাষ্ট্রীয় ঋণ ও নিয়ন্ত্রণ- কোম্পানিকে সরকারি ঋণ দেওয়া হল। এর বিনিময়ে ভারতবর্ষীয়য অঞ্চলের ওপর ব্রিটিশ রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব স্বীকৃত হল।

৩। দু’বছর অন্তর রাজস্ব দেওয়া- কোম্পানি তার ভারতীয় অঞ্চলের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বিনিময়ে, রাজাকে প্রতি দু’বছর অন্তর ৪০,০০০ পাউন্ড রাজস্ব দিতে বাধ্য থাকল।

এই নীতি কোম্পানির ‘স্ব-শাসনে’ প্রথম বড় ফাটল ধরায় — রাষ্ট্র এখন কোম্পানির শাসনকে ‘লিজ’ দিচ্ছে, আর কোম্পানি রাষ্ট্রের কাছে ‘ভাড়াটিয়া’-তে পরিণত হচ্ছে।

আরও বড় নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা হল পিটের ইন্ডিয়া এক্ট ১৭৮৪ সূত্রে

১৭৮৪ সালের ইন্ডিয়া অ্যাক্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ ওপর এক চূড়ান্ত আঘাত ছিল, যা ওয়ারেন হেস্টিংসের দীর্ঘ মহাভিযোগ ও কোম্পানির শাসন নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল। এই আইনটি কোম্পানির নীতি প্রণয়নে সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করার জন্য প্রণীত হয়েছিল এবং এটি ছিল কোম্পানির উপর রাষ্ট্রীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। ১৭৮৪ সালের ইন্ডিয়া অ্যাক্টের পটভূমিতে ছিল কোম্পানির ক্রমবর্ধমান দুরবস্থা, প্রশাসনিক দুর্নীতি, এবং হেস্টিংসের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি, যা ব্রিটিশ জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। হেস্টিংসের মহাভিযোগ কোম্পানির শাসনের প্রতি জনগণের অসন্তোষকে আরও উসকে দেয় এবং সংসদে কোম্পানির কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায়। এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল বোর্ড অফ কন্ট্রোল গঠন, যা ছয়জন সংসদ সদস্য নিয়ে গঠিত এবং কোম্পানির সামরিক, রাজস্ব ও অন্যান্য বিষয় পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা পায়। এর ফলে কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে চলে আসে এবং কোম্পানি একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাষ্ট্রের অধীনস্থ একটি প্রশাসনিক সংস্থায় পরিণত হয়। এছাড়াও, গভর্নর-জেনারেলের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রেসিডেন্সিগুলো বাংলার অধীনস্থ হয়। এই আইন কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ অবসান ঘটায় এবং ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে, যা পরবর্তীতে ১৮১৩ সালের সনদ আইন ও ১৮৫৮ সালের গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্টের মাধ্যমে আরও সুসংহত হয়। ১৭৮৪ সালের ইন্ডিয়া অ্যাক্ট তাই কোম্পানির শাসনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যা উপনিবেশিক শাসনে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সূচনা এবং ফিফথ রিপোর্টের মতো দলিলগুলির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করে। এটি কেবল একটি আইন ছিল না, বরং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শাসন কাঠামোতে এক নতুন দর্শনের সূচনা ছিল।

তো এই আইনের মোদ্দা কথা হল —

১। দ্বৈত শাসন ব্যবস্থা (Dual System) — কোম্পানির বৃহত্তর নীতিমালা প্রণয়নে সরকারি নিয়ন্ত্রণে তৈরি হল সরকারের ছ’জন নিযুক্ত সদস্য নিয়ে বোর্ড অফ কন্ট্রোল। বোর্ড অফ কন্ট্রোলের হাতের থাকবে কোম্পানির কর্তাদের প্রণীত নীতিমালা পর্যবেক্ষণ আর নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষমতা। কোম্পানি তার একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার এবং দৈনন্দিনের প্রশাসন ধরে রাখলেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করত সরকার।

২। গভর্নর-জেনারেলের ক্ষমতা বৃদ্ধি — ১৭৮৬-র আইনে গভর্নর-জেনারেলের হাতে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হল এবং ভারতবর্ষে কোম্পানির অন্য কর্মকর্তাদের ওপর তার কর্তৃত্ব বাড়ানো হল।

এই আইনে কোম্পানির রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন কার্যত শেষ হয়ে যায়; বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা পেলেও সরাসরি ব্রিটিশ রাষ্ট্র এখন ভারতীয় শাসনের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।

তৃতীয় আর চূড়ান্ত আঘাত — ১৮১৩-এর সনদ আইন ও তার পর

১৮১৩-র চার্টার অ্যাক্ট কোম্পানির স্ব-শাসনের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা। এর আইনে —

১। কেড়ে নেওয়া হল কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার — কোম্পানির ভারতীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার বাতিল করা হল, রইল শুধু চীন আর চা বাণিজ্য।

২। সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট ঘোষণা — এই আইনে স্পষ্টভাবে ব্রিটিশ ভারতবর্ষে রাজার সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করা হল। কোম্পানি এখন রাষ্ট্রের অধীনস্থ একটা প্রশাসনিক সংস্থামাত্র যার কাজ হল মূলত ভারতবর্ষ শাসন।

৩। খ্রিস্টান মিশনারিদের প্রবেশাধিকার — ভারতবর্ষে খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হল। কোম্পানির আগের নিরপেক্ষ নীতি তুলে নেওয়া হল।

৪। শিক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ — ভারতবর্ষীয়য সাহিত্য আর বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনে অর্থ বরাদ্দ করা হল।

এর দু’দশক পর ১৮৩৩-র চার্টার অ্যাক্ট কোম্পানির শেষতম বাণিজ্য ক্রিয়া, চিন বাণিজ্য নিষিদ্ধ ঘোষনা করে তার সমস্ত বাণিজ্য উদ্যম সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হলে এই প্রথম কোম্পানি বিশুদ্ধ প্রশাসনিক সংস্থায় পরিণত হয়। ১৮৫৮-র গভর্নমেন্ট অফ ইন্ডিয়া অ্যাক্টে কোম্পানির সমস্ত প্রশাসনিক ক্ষমতা বিলুপ্ত করা হয় এবং ব্রিটিশ রাজের সূচনা ঘটে।

আঘাতের পেছনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কারণ

এই আঘাতগুলো শুধু রাজনৈতিক ছিল না; এর পেছনে গভীর অর্থনৈতিক ও আদর্শিক কারণও ছিল —

১। শিল্প-পুঁজির উত্থান — ‘দ্য সিটি’ (লন্ডন) ও ‘আউটপোর্ট’ (লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ইত্যাদি) গুলোর মধ্যে সংঘাতে আউটপোর্টের জয় হল ১৮১৩র সনদ আইনে। এর আগে কোম্পানি জাহাজে নতুন উঠে আসা আউটপোর্ট কর্পোরেট — যাদের আমরা শিল্পপুঁজি আখ্যা দিচ্ছি — আবির্ভাবে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার ক্রমশঃ কোণঠাসা হতে থাকে।

২। মুক্ত বাণিজ্য মতবাদের প্রভাব — অ্যাডাম স্মিথের ধারণা জনপ্রিয় হওয়ার সাথে সাথে একচেটিয়া বাণিজ্য অস্বাভাবিক ও অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে — শুরু হল লিজা ফেয়ার বা মুক্ত বাণিজ্যের যুগ। তবে মুক্ত বাণিজ্যের অধিকার রইল একমাত্র মেট্রোপলিটনের কর্পোরেটদের, উপনিবেশের বাণিজ্যের ওপর চরম নিষেধাজ্ঞা রইল।

৩। দুর্নীতি ও কুশাসনের অভিযোগ — সেই পলাশীর কিছু পরের সময় থেকেই কোম্পানির ভারতবর্ষ শাসন প্রশ্নের মুখে পড়েছিল আমলাদের ব্যপ্ত দুর্নীতি আর অদক্ষতায়। প্রথমে ভ্যান্সিটার্ট, পরে বোল্টস, তারপরে ভেরেলস্টের বই লিখে আমলাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা এবং ১৭৬৯-এর শেয়ার বাজার ধ্বস — তার নাম ইস্ট ইন্ডিয়া বাবল — রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের নৈতিক অজুহাত তৈরি করল।

৪। ঔপনিবেশিক ‘সভ্যতা মিশন’ — উইলিয়াম উইলবারফোর্সের মতো ব্যক্তিদের বক্তব্য ছিল ভারতবর্ষকে ব্রিটিশ আইন, প্রতিষ্ঠান, ধর্ম ও নৈতিকতার মাধ্যমে ‘উন্নত’ করতে হবে। সভ্যতা বিস্তারের জোর সওয়াল রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে বাধ্যতামূলক করে তোলে।

ফিফথ রিপোর্টের অবস্থান — আঘাতের প্রস্তুতি ও দলিলায়ন

এই প্রেক্ষাপটে ফিফথ রিপোর্টের ভূমিকা অত্যন্ত কৌশলী। এই রিপোর্টে বিস্তারতভাবে কোম্পানির রাজস্ব আর বিচার প্রশাসনের একটি তুল্যমূল্য বিবরণ উপস্থাপন করে। আপাতদৃষ্টিতে এই সমীক্ষায় কোম্পানির সাফল্য প্রমাণিত হলেও, খুঁটিয়ে পড়লে বোঝা যাবে এই সমীক্ষার মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির প্রশাসনিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। এই সমীক্ষা তাই কর্পোরেট বোর্ডরুমের  দখলদারির থেকেও বেশি, মেট্রোপলিটনের জন্য যুগান্তকারী রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের প্রথাগত দলিল, যার ভিত্তিতে ১৮১৩-র আইন আরও সহজে পাস করা গেল। এই রিপোর্ট সূত্রে কোম্পানি তার ভারতবর্ষ শাসনের ক্ষমতা ধরে রাখতে পারলেও, রিপোর্টের ধাক্কায় সে তার বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকার রক্ষা করতে পারল না; তার একচেটিয়া বাণিজ্য আর ভারতবর্ষে বাণিজ্য অধিকার কেড়ে নিয়ে তাকে প্রায় প্রশাসনিক সংগঠনে রূপান্তরিত করা হল। ‘কোম্পানির স্ব-শাসনের ওপর রাষ্ট্রীয় আঘাত’ ছিল সুপরিকল্পিত ধাপে ধাপে সম্পাদিত প্রক্রিয়া — যা ১৭৭৩ থেকে ১৮৫৮ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। এই আঘাতের প্রতিটি ধাপে ফিফথ রিপোর্টের মতো দলিল ছিল রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের অজুহাত আর প্রমাণ। ১৮১৩-র সনদ আইনে এই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত রূপ পেল, যখন রাষ্ট্র সরাসরি কোম্পানির ওপর তার সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে এবং তার বাণিজ্যিক একচেটিয়া বিলুপ্ত করে। এরপর ১৮৫৮-তে কোম্পানির সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটল, যা ফিফথ রিপোর্ট ও ১৮১৩-র আইনের পূর্বাভাসিত পরিণতি — বিশ্বের সব থেকে বড় এবং প্রভাবশালী বেসরকারি সওদাগরি সঙ্গঠনকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক শাখায় রূপান্তরিত করার লম্বা প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটল।

ফিফথ রিপোর্ট — কোম্পানির পক্ষে, অথচ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে

ফিফথ রিপোর্টকে আখ্যা দিচ্ছি ‘কোম্পানির পক্ষে, অথচ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে’। আমরা এই প্যারাডক্সিক্যাল সত্যিকে আরও গভীরভাবে উন্মোচন করব। এই দ্বন্দ্বই আসলে ফিফথ রিপোর্টের সবচেয়ে কৌশলী আর ঐতিহাসিক দিক। এই সমীক্ষাপরে একই সঙ্গে কোম্পানির টিকে থাকার গুরুত্বপূর্ণ ঢাল এবং সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের জন্য ধারালো বর্শামুখও বটে।

ফিফথ রিপোর্ট — ‘ব্যাকহ্যান্ডেড কমপ্লিমেন্ট’

ফিফথ রিপোর্টের মৌলিক প্যারাডক্স। এই সমীক্ষা কোম্পানির প্রশাসনিক সাফল্যের গল্প বললেও, মূল উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানিতে আরও বড় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করা। ১৮১২-র এই সমীক্ষা কোম্পানির রাজস্ব আর বিচার ব্যবস্থার ‘ইতিবাচক’ চিত্র তুলে ধরে বলেই, কোম্পানি ১৮১৩-র সনদ আইনে তার প্রশাসনিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পেরেছিল।

সমীক্ষায় কোম্পানির পক্ষাবলম্বনগুলো বুঝে নেওয়া যাক –

১। প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ — বিপুল বিশাল এই সমীক্ষাপত্র দেখানোর চেষ্টা করেছে, ১৭৫৭র পর থেকে কোম্পানি বাংলায় ‘সুশৃঙ্খল’ রাজস্ব আর বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে — এবং এই কাঠামো ছিল স্থানীয় ডেসপট শাসকদের চেয়ে অনেকটাই উন্নত। সমীক্ষায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ‘যুগান্তকারী সংস্কার’ হিসেবে উপস্থাপন করা হল, যে কাঠামোয় কোম্পানির রাজস্ব আদায় স্থিতিশীল হল এবং জমিদাররা ‘উন্নয়ন’প্রক্রিয়ায় উৎসাহিত হল।

২। আমলাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাফাই — সমীক্ষায় কোম্পানির আমলাদের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগকে হালকা করা হল। এর দাবি কোম্পানি ইতিমধ্যেই অনেক সংস্কার করেছে, যা শাসনকে আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ করে তুলেছে।

৩। ‘ভেস্টেড রাইটস’-এর যুক্তি — সমীক্ষা পরোক্ষভাবে কোম্পানির ‘অর্জিত অধিকার’-এর যুক্তি সমর্থন করল – এই তত্ত্ব মুক্ত বাণিজ্য সমর্থকদের দাবির বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছিল।

রাষ্ট্রের ‘নিয়ন্ত্রণ’ বলছি কেন?

ফিফথ রিপোর্টের কৌশলী দিকটা হলো, এর প্রতিটি ‘সাফল্যের গল্প’ রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ‘অজুহাত’ তৈরি করে —

১। সংস্কারের অজুহাত — সমীক্ষা কোম্পানি প্রশাসনকে ‘সফল’ দেখালেও, এর বিশদ বিশ্লেষণ ও জুড়ে দেওয়া পরিশিষ্টগুলো — যেমন জেমস গ্র্যান্টের মিনিটস চা শোর-কর্নওয়ালিস বিতর্ক দেখায় যে কোম্পানির ভারতবর্ষ শাসনে এখনও অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় সংস্কারের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন।

২। রাজস্বের দুর্বলতা — সমীক্ষায় দেখা গেল কোম্পানির রাজস্ব আদায় পদ্ধতি অদক্ষ আর অসম। এই দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র বলল কোম্পানি তার রাজস্ব ব্যবস্থা নিজে ঠিক করতে অক্ষম, তাই রাষ্ট্রকে হস্তক্ষেপ করতে হবে।

৩। বিচার ব্যবস্থার জটিলতা — সমীক্ষা ব্রিটিশ আইন আর স্থানীয় আইনের মধ্যে জটিল দ্বন্দ্ব তুলে ধরার ফলে কোম্পানির ‘স্ব-শাসন’-এর ওপর রাষ্ট্রীয় আইনি আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।

রিপোর্টের অন্তর্নিহিত দ্বন্দ্ব — কোম্পানির ‘পক্ষে’ অথচ ‘বিপক্ষে’

ফিফথ রিপোর্টের প্রধান কৌশল ছিল একটি ‘দ্বৈত বক্তব্য’ তৈরি করা, যা বিভিন্ন শ্রোতাদের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে —

পক্ষ                          রিপোর্টের বক্তব্য                                   উদ্দেশ্য

কোম্পানি                    কোম্পানি বাংলায় একটি সফল প্রশাসন        কোম্পানির প্রশাসনিক অস্তিত্ব রক্ষা করা।

গড়ে তুলেছে, তাই তার সনদ নবায়ন

করা উচিত।

রাষ্ট্র                কোম্পানির প্রশাসনে ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে,                 কোম্পানির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা।

তাই রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ ও সংস্কার প্রয়োজন।

মুক্ত বাণিজ্য       কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য ভারতবর্ষীয়               কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া ভেঙে দেওয়া।

সমর্থক             বাজারে অদক্ষতা তৈরি করেছে, তাই

বাণিজ্য উন্মুক্ত করা উচিত।

এই ‘দ্বৈত বক্তব্য’-এর মাধ্যমেই ফিফথ রিপোর্ট একইসঙ্গে কোম্পানির ‘ঢাল’ ও রাষ্ট্রের ‘বর্শা’ হয়ে ওঠে। রিপোর্টটির ভাষা ও তথ্য এমনভাবে সাজানো ছিল যে উভয় পক্ষই তাদের স্বার্থে তা ব্যবহার করতে পারে।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev