Logo
এই মুহূর্তে ::
ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বিদ্যাসাগর — একটি কল্পিত সাক্ষাৎকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ খোলা খামের পরে খোলা চিঠি : দিলীপ মজুমদার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ ও তিনি — ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-৮৬) : প্রলয় চক্রবর্তী
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ

ড. ললিতা ঘোষ / ৯৬ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

বাংলার শ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য কবিকঙ্কণ মুকুন্দের [সুকুমার সেন তার আদি নামে রাম যোগ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন] চণ্ডীমঙ্গলে লোহায় তৈরি বহু তৈজস এবং কারিগরি পণ্যের উল্লেখ আছে তার একটা ঝঁকি আমি এই প্রবন্ধে উল্লেখ করব। আমি এখানে সুকুমার সেন সম্পাদিত মুকন্দরা কবিকঙ্কণের, সাহিত্য অকাদেমি প্রকাশিত চণ্ডীমঙ্গল ব্যবহার করেছি।

যে কথা বলছিলাম মুকুন্দরামের কাব্যে টাঙ্গি, কোদাল, কুড়ুল-কুঠার, কাঠারি-কাঠদা, খন্তা, লোহার শিকলি, লোহার শাবল ইত্যাদি উল্লেখ করেছেন। কোদাল চালানো পেশাদারদের নাম কোদালিয়া, কুঠার ব্যবহার করা পেশাদারদের নাম কাঠুরে ইত্যাদি। লোহার তৈজস পণ্য উৎপাদন করা কারিগর কামারদের উল্লেখ আছে। আর আছে ডোকরা কামারদের উল্লেখ। এরা বাটি, ঘটি, থালা ইত্যাদি তৈরি করছেন। আজকে যেমন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘দয়ালু’ আধিকারিকেরা ডোকরা কামারেরা স্থায়ী বাসস্থান দিয়ে তাদের কারিগরি, পরম্পরার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছেন, সেদিন কিন্তু ডোকরা কামারেরা পরিযায়ী চরিত্রের ছিলেন, সেটি আমরা মঙ্গলকাব্যে পাচ্ছি। পিতল কাঁসা বা অন্যান্য ধাতুর কারিগরি পণ্যে পাচ্ছি বাটি, ঘটি এবং থালা। অলঙ্কার ছাড়া সোনার ব্যবহার হত বনেদি পরিবারের তৈজসপত্র তৈরিতে। কবিকঙ্কণে সোনার কলম আর সোনার গাড়ুর উল্লেখ আছে। গুজরাট নগরে চণ্ডীর মন্দিরের মাথায় সোনার কলসি বসিয়ে নেতের পতাকা লাগানো হয়েছে। বণিকখণ্ডে লহনা সোনার গাড়ুতে ঘি রাখছেন।

বহু অস্ত্রের উল্লেখ পাচ্ছি চণ্ডীমঙ্গলে – তির, টাঙ্গি, ধনুক, বাঁটুল, কামান, ত্রিশূল, পট্টিশ, মুদগর, বাণ, খড়গ (খাঁড়া) ইত্যাদি। আত্মরক্ষার জন্যে বর্ম পরার উল্লেখ আছে। বাঁটুল তৈরি হয় চামড়া আর কাঠে। ছোঁড়া হয় লোহার গুলি। নায়ক ব্যাধ কালকেতু বাঁটুল থেকে গুলি ছুঁড়ে শিকার করতেন। কামানের উল্লেখ পাচ্ছি, কারিগর সমাজের নাম কামানিয়া। বিভিন্ন অস্ত্র অলঙ্করণ করা হত, খোদন করে নানান রথের গা সাজানো হত।

টাঙ্গি বিষয়ে কবিকঙ্কণ লিখছেন ‘তবক বেলক টাঙ্গি/ভন্দিপাল সেন সাঙ্গি/ ভুশুণ্ডি ডাবুষ খরসান’। পশুদেরে বিরুদ্ধে যুদ্ধে টাঙ্গি ব্যবহার করছেন,’খর টাঙ্গি ধরি বীর কাড়ে করিমুণ্ড/ বালকে যেমন কাটে ইক্ষুর দণ্ড’। জঙ্গল কেটে নগর তৈরির জন্যে টাঙ্গি ব্যবহার করছেন দেশ দেশান্তর থেকে আসা হাজার হাজার শ্রমিক ‘মহাবীর কাটে বন/শুনি বেরুনিইয়া[মূলে ঞ আছে] জন/ আইসে তারা দেশে দেশে হইতে’[শায়েস্তা খান যখন মগ-ফিরিঙ্গি দমন করতে স্থলপথে সেনা পাঠিয়েছিলেন চট্টগ্রামে জঙ্গল কেটে এগোনোর জন্যে ২২০০০ কুঠার সেনার হাতে দেন]। মহাবীর কালকেতু টাঙ্গি দিয়ে বাঘের দাঁত ভাঙছেন ‘পেলিয়া মারিআ টাঙ্গি/বাঘের দশন ভাঙ্গি/ লেঞ্জে ধরি দিল পাকনাড়া’। হাতির দাঁতও কাটছেন তিনি টাঙ্গিতে ‘একবাণে করি অন্ত/টাঙ্গি দিয়া কাটে দন্ত/হাটে নিয়া [মূলে ঞ আছে] বেচে কালকেতু’। টাঙ্গ নামে টাঙ্গির কথাও উল্লেখ করেছেন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের মধ্যে অন্যতম কবিকঙ্কণ মুকুন্দ, ‘বন কাটে বেরুনিয়া[মূলে ঞ আছে] জন/ শর নল খাকরা ইকড়ি টাঙ্গ/ওকরা ধুথুরা কাটে অপাঙ্গ’। কামারের কুঠার আর কোদালতৈরির নথি পাচ্ছি ‘কামার পাতিয়া শাল/কুঠারি কোদাল ফাল/ গড়ে টাঙ্গি অঙ্গরখি সেল’। যুদ্ধেও টাঙ্গি ব্যবহার করছেন মহাবীর ‘টানাটানি করে চুলে ধরিআ কোটাল/ টঙ্গ টাঙ্গি কেহ হানে কেহ করবাল’। বণিকখণ্ডের যুদ্ধক্ষেত্রে টাঙ্গির ব্যবহার হয়েছে। কবিবর লিখছেন ‘গায় আরোপিল রাঙ্গি/কাছিল লাসান টাঙ্গি/নয় শত চলে যেন কাল।’ সিংহলের যুদ্ধে যাচ্ছে বাংলার টাঙ্গি ‘করে ধরি সামগী/ধায় রণরঙ্গী/তোমার টাঙ্গি শেল’।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করে যাই বাংলার কামারদের, বিশেষ করে রাঢ় অঞ্চলের কামারদের বেশ কিছু সংস্কার বিশ্বাস আছে। প্রথমটি হল রবিবার ধাতু অর্থে তামা গলানো নিষিদ্ধ। হাতি বিশ্বকর্মার বাহন। কর্মকারদের কুলদেবী লক্ষ্মী। জাতিদেবতা বিশ্বকর্মা। তাই কর্মকারেরা হাতির পিঠে চড়ে না। আমরা কামারদের তৈরি কিছু যন্ত্রপাতি আর হাতিয়ার নিয়ে আলোচনা করব।

কোদাল

কামারেরা কামারশালে লোহা দিয়ে কোদাল তৈরি করেন। কামারেরা শাল পাতেন অর্থাৎ কারখানা তৈরি করেন – কামারশাল তৈরি হল। সেই শালে তাঁরা কোদাল তৈরি করেন ‘কামার পাতিয়া শাল/ কুঠারি কোদাল ফাল’। এই জ্ঞান, দক্ষতা আর পরম্পরা নির্ভর করে বাংলার পেশাদারেরা গ্রাম জীবন, তার অর্থনীতি এবং প্রযুক্তির অংশ হয়ে ওঠেন।

চণ্ডীমঙ্গলে আখেটিক খণ্ডে দেবী চণ্ডী কালকেটুকে মাণিক আঙটি উপহার দেন। কিন্তু সরলা ফুল্লরা তাতে সন্তুষ্ট নন। তাঁর চাহিদা বুঝে দেবী তাকে কোদাল আর খন্তা দিলেন – ‘লহ খুড়ি কোদাল খন্তা ক্ষুরধার/কোদাল খন্তা মাতা না পাই নিয়ড়ে/ তুমি আজ্ঞা দিলে মাতা করিব চোয়াড়ে’।

কোদাল ব্যবহারের দক্ষ মানুষদের কোদালিয়া বলা হয়। দেবী চণ্ডী বিশ্বকর্মাকে পুরী তৈরির আদেশ দিয়েছেন। এই কাজে হনুমান কোদালিয়া হয়ে দীঘি আর প্রাকার নির্মাণ করছেন যখন কোদাল ধরে বীর হনুমান/বাসুকী নাগের শির হয় কম্ফমান।

কুড়ুল-কুঠার, কাটারি-কাঠদা, লাঙলের ফাল

কোদাল ছাড়াও কবিকঙ্কণে কাঠদা কুড়ুল কাটারির উল্লেখ আছে। বন কেটে বসতি তৈরির জন্যে কালকেতু কামারের থেকে কিনছেন কাঠদা (কুড়ুল) আর কুঠার – ‘কাঠদা কুঠারি বাসি/ টাঙ্গি কিনে রাশি রাশি/ কিনে বীর সভাকারে দিতে’। ধনপতির নৌকো দ্বীপে হদ জঞ্জালে আটকে আছে। কাটারি দিয়ে হদ কেটে ধনপতি নৌকো নিয়ে এগোন – ‘রসান কাটারি নৌকোর আগেতে বান্ধিয়া/বুদ্ধিবলে গেল সাধু হাদি কাটিয়া’।

কামারেরা তাদের কামারশালে লাঙলের ফালও তৈরি করেন। আখেটিক খণ্ডে হালের ফাল তৈরির উল্লেখ পাচ্ছি ‘কামার পাতিয়া শাল/ কুঠারি কোদাল ফাল’।… সেকালে চাষের জন্যে বাংলায় লাঙলের ব্যবহার আবশ্যিক ছিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য শিবায়ন কাব্যে চাষের প্রচুর হাতিয়ার আর প্রযুক্তির উদাহরণ পাচ্ছি।

আমরা খন্তার উদাহরণ আগেই উল্লেখ করেছি ‘লহ খুড়ি কোদাল খন্তা ক্ষুরধার/কোদাল খন্তা মাতা না পাই নিয়ড়ে…’। ছুরির তৈরির কথা পাচ্ছি গুজরাট নগরে মোসলমান বসতিতে। তারা নামাজ পড়েন আর ছুরি দিয়ে মুরগি জবাই করেন, ‘করে ধরি করা ছুরি/ মুরগী জবাই করি/দশ গণ্ডা দরে পায় কড়ি’।

লোহার শিকল

শিকলের কাজ ছিল বেঁধে রাখা। হারি ঘোড়ার পায়ে শিকল বাঁধা থাকত। চণ্ডীমঙ্গলে শিকল আর বেড়ির উল্লেখ আছে। ঘোড়ার মুখনালি ছাড়াও উল্লেখ পাচ্ছি লোহার শিকল, গজের শিকল আর লোহার বেড়ির। কলিঙ্গরাজ কালকেটুকে শেকল দিয়ে বাঁধছেন ‘গজের শিকল দিআ বান্ধি মহাবীরে/ বাঘহাতা হাতে দিল গলায় জিঞ্জিরে’।

শাবল

কামারেরা সে সময় শাবলও তৈরি করত। কাজ ছিউল মাটি খোঁড়ার। কবিকঙ্কণ শিশু কালকেতুর দুটো হাত লোহার শাবলের সঙ্গে তুলনা করেছেন – ‘নাক মুখ চক্ষু কান/কুন্দে যেন নিরমান/ দুইবাহু লোহার শাবল’। আবদুস সামাদ বাংলার জনজাতি বই সূত্রে পাচ্ছি[বইটা আর এই বক্তব্যটা আমে নেটে পেয়েছি, বইটা হাতে পাই নি] বাংলায় অমুসলমান কর্মকার ছাড়াও লোহার কাজ করা ধর্মান্তরিত মুসলমান জনগোষ্ঠীর পরিচয় পাচ্ছি। এরা এক সময় নেপাল থেকে আসা কামিয়া লোহার গোত্র শাখার অংশ ছিল। পরে অনেকেই ইসলামে দীক্ষিত হন।

পিতল কাঁসার শিল্প

হার্বার্ট হোপ রিজলে দ্য ট্রাইবস এন্ড কাস্টস অব বেঙ্গল বইতে বলছেন মেদিনীপুরে ৮ গোষ্ঠীর কামারের কথা। এরা ৮ ধরণের পণ্য তৈরি করত – এদের মধ্যে ছিল ডোকরা, তামারা, জঙ্গল মহলের দুগোত্রের জাতিচ্যুত কামার, যারা মোরগ খেত, এদের অপরিষ্কার ভাবা হত। এই জনগোষ্ঠী তাদের নানান আচার বিচার নিম্নশ্রেণীর ব্রাহ্মণ দিয়ে করাতেন।

ডোকরা কামারেরা বাংলার খুব পুরোনো গোষ্ঠী। মোম গলিয়ে ঢালাই পদ্ধতিতে ডোকরা কামারেরা বাটি, থালা, ঘটি, ঘুঙ্গুর, নূপুর, দেবদেবীর মূর্তি, খেলনা, ছোট বাক্স ইত্যাদি তৈরি করতেন। কবিকঙ্কণের কাব্যে ডোকরা কামারদের কারিগরি পণ্যের নজির ছড়িয়ে আছে। তবে অধিকাংশ বাটি, ঘটি আর থালা। তিনি বহুবার বাটির কথা উল্লেখ করেছেন। পুজো পার্বন বা মঙ্গল অনুষ্ঠানে ঘটি আর বাটির ব্যবহারের কথা আছে। ঘটি আর বাটিতে নানান মঙ্গল চিহ্ন, প্রতীক আর চিত্রকলা আঁকা হচ্ছে। আজকাল, বিংশ শতাব্দীর আশেপাশের সময়ে উপনিবেশের পরের সময়ে, সাধারণ অমুসলমান মধ্যবিত্ত পরিবারে ঘটি বা গাড়ুর ব্যবহার কম। আখেটিক খণ্ডে ভাঁটড়ু দত্ত কলিঙ্গরাজকে কালকেতুর ঐশ্বর্যের কথা বলছেন সোনার ঘটি উল্লেখ করে ‘পূর্বে পিট ভাণ্ডে বারি/ এবে তার হেমঝারি/ ঘটী বাটী সব হেমময়’। কাঁসারিরা [কামার] শাল পেতে নানান কারিগরি পণ্য উতপাদন করছে, ‘কাঁসারি পাতিয়া শাল/ ঝারি খুরি গড়ে থাল/ বাড়ী ঘটী বট-লই শিপ’। বণিক খণ্ডে সওদাগর আহারে বসে অম্বল খাওয়ার পরে ঘটি ঘটি জল খাচ্ছেন ‘অম্বল খাইআ পিলা জল ঘটী ঘটী/দধি খায় ফেলি তায় শুনি মটমটী’। ভুতলোকের পিশাচ-পিশাচিদের ব্যবহৃত ঘটি বাটির উল্লেখ করছেন ‘হাড়ে ঘটি হাড়ে ব্যাটিঙর-আঠুচাকী রুটি’।

কালকেতু দেবীর কৃপায় সম্পদ পেয়ে গোলহাট থেকে ঘটি কিনছেন, ‘তৈল কিনে উমানিঞা ঘটী’। বণিক খণ্ডে পাচ্ছি শোয়ার ঘরেও ঘটী রাখা হত। ধনপতি দত্তের শোয়ার ঘরে ঘটীর বর্ণনা ‘দুই দিকে আলাবাটী/ জলে পুর‍্যা গাড়ু ঘটী’। আগেই আমরা ঘটিতে জল খাওয়ার উল্লেখ করেছি ‘অম্বল খাইআ পিলা জল ঘটী ঘটী’।

ঘটির মত বাটিও কাঁসারিদের উৎপন্ন পণ্য। ডোকরা কামারেরা বাটিও তৈরি করতেন। আমরা কবিকঙ্কণে আগেই দেখেছি কীভাবে কাঁসারিরা শাল পেতে ঘটি বাড়ি ইত্যাদি তৈরি করছেন। বণিক খণ্ডে লহনা সোনার বাড়িতে সাধু ধনপতিকে খেতে দিচ্ছেন ‘সুবর্ণের বাটিতে দুবলা দেই ঘি’। খুলনার বিবাহে বাটি ভরে মঙ্গল দ্রব্যের উল্লেখ পাচ্ছি ‘তৈল সিন্দূর পান গুয়া/ বাটি ভর‍্যা গন্ধ চুয়া’। কাব্যে তেলের বাটি খুরির উল্লেখ আছে। খুলনা সাষ্টাঙ্গে[জানু পদ পাণি বক্ষ মস্তক দৃষ্টি বুদ্ধি বাক্য] প্রণাম করছেন সাধু ধনপতিকে ‘অবনী লোটাইআ তৈল-বাটি এরে খুরি’। সইফুদ্দিন চৌধুরীর এসপেক্টস অব মেটিরিয়াল এন্ড ফোক কালচার ইন বাংলাদেশ বইতে লিখছেন, — The utensils that are found to be relieved on terracotta panels not only throw a light on the different professonal craftsman such as potters, basket makers, blacksmiths, metal carvers, gold smiths and Jewellers but at the same time they also reveal the artistic excellence attained by some such crafts men as well. [এই উদ্ধৃতিটাও নেটে পেয়েছি, বই পাইনি]।

আজকের মতই সেই সুলতানি এবং পরের মুঘল আর শেষে নবাবি যুগে সমাজ থাকবন্দীর প্রত্যেকস্তরে পান সেবন খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ পালন করত। পান রাখার জন্যে ব্যবহার করা হত পান বাটা। তৈরি করতেন ডোকরা কামারেরা। কাঁসা-পিতলের তৈরি পান-বাটার গায়ে নানান ধরণের নকসা করা হত। বাটার গায়ে তোলা হত ময়ূর, মাছ লতাপাতা ইত্যাদি শিল্পকর্ম। চণ্ডীমঙ্গলে বাটার উল্লেখ পাচ্ছি গুজরাট নগরে শালপাতা কাঁসারিদের কাজে ‘সাপুড়া চুনাটি বাড়া/ উরমাল ঘাঘর ঘাঁটা/ সিংহাসন গড়ে পঞ্চদীপ’। বাটায় থরে থরে মঙ্গল আয়োজন সাজানো ‘পাট ভর‍্যা নিল খই/ ঘড়া ভরা ঘৃত দই/ সাজিআ সুরঙ্গ নিল বাটা’। বিবাহের মঙ্গল উৎসব বিষয়ে কবিকঙ্কণ লিখেছেন ‘চন্দন কুসুম কেহ বাটা ভরা কড়ি’ বা ‘চন্দন কুসুম চুর্বা বাটা ভর‍্যা কড়ি’। ধনপতির শোয়ার ঘরে বাটায় পান, চন্দন আর কর্পুর সাজানো থাকে ‘বাটা কর‍্যা পান গুয়া/ সুগন্ধি চন্দন চুয়া/ কর্পুর লবঙ্গ তোলা লেখা’। কবি আমাদের নিয়ে যান শ্রীমন্তের বিবাহ উৎসবে। দোলায় চেপে চলেছেন বর কনে, তাতে আছে ‘চন্দন কুসুম দুর্বা বাড়াভরা কড়ি’। প্রবালকান্তি হাজরা ‘গ্রামীণ সংস্কৃতির ঝাঁপি’তে ‘ঐতিহ্যের বিষণ্ণ স্মৃতি – পানবাটার সাজ’ প্রবন্ধে লিখছেন ‘এক সময় রাজা-বাদশার দরবার থেকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পানের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হওয়ায় গড়ে উঠেছিল পান সাজার জন্যে আনুষঙ্গিক সাজ’।[এই উদ্ধৃতিটাও নেটে পাওয়া]

থালা

থালা আজও বাঙালির জীবনে অপরিহার্য অংশ। মূলত ধাতু দিয়েই তৈরি হয়। লোহা, কাঁসা, পিতল, ইস্পাত ইত্যাদি উপাদানে থালা তৈরি হয় – এক সময় রূপো সোনার থালা তৈরি হত। মাথায় রাখতে হবে কামারদের মধ্যে ধাতুভেদে গোত্র পাল্টে যায়। সব কামার গোষ্ঠী এক ধাতুতে কাজ করেন না। এক এক রকম ধাতুর কারিগরি পণ্য উৎপাদনে এক এক গোত্রের কামার গোষ্ঠী দক্ষতা অর্জন করেন। কবিকঙ্কণে থালার নানান বৈচিত্র উল্লিখিত হয়েছে – থাল, থালা কনকথালা, হেমথালা। আখেটিক খণ্ডে ভিক্ষা করা শিবকে কোচ রমণী থালা থেকে ভিক্ষার চাল ভিক্ষা দিচ্ছেন ‘ভ্রমেন উজানি ভাটি/চৌদিকে কোচের বাটী/কোচ বধূ ভিক্ষা দেই থালে/ থাল হইতে চালগুলি/ পুরিআ এড়েন ঝুলি/ দ্বাদশ লম্বিত ঝুলি দোলে’। গুজরাত নগর পত্তনের সময়ে বহু পেশাদারের সঙ্গে এসেছেন কাঁসারিরা। কাঁসারিরা কাঁসা দিয়ে থালা তৈরি করছেন, ‘কাঁসারি পাতিআ শাল/ ঝারি খুরি গড়ে থাল/ বাটী ঘটী লই শিপ’। তবে বণিক খণ্ডে দেবপূজার জন্যে লহনা লোহার থালা ব্যবহার করছেন ‘নৈবিদ্য নানা বিধি/ খণ্ড মধু দধি/ শর্করা পুরি হেম থাল’। আখেটিক খণ্ডে ফুল্লরা যেখানে মাটির পাত্রে খাওয়াদাওয়া করছেন, সেখানে বণিক খণ্ডে মহিলারা পূজায় বা উৎসবে অনুষ্ঠানে সোনার থালা ব্যবহার করছেন।

সোনার কলসি, সোনার গাড়ু

স্বর্ণকারদের সোনার কলসি তৈরির কথা আখেটিক খণ্ডে পাচ্ছি। পত্তন করা গুজরাট নগরের বাড়ির ওপরে নেতের পতাকা উড়ছে সোনার কলসির চূড়ায় ‘কনককলস চূড়ে/ নেতের পতাকা উড়ে/ হৃহশিরে সভে সুদর্শন’। আর সোনার গাড়ুর কথা উল্লেখ আছে বণিকখণ্ডে। আমরা দেখি বণিকদের অন্তঃপুরে সোনার গাড়ু ব্যবহার হচ্ছে। তাতে ঘি রাখছেন বণিক নারী লহনা ‘সুবর্ণের গাড়ুতে লহনা দেই ঘি/ হাসিআ পরসে রামা বানিঞার ঝি’।

অস্ত্রশস্ত্র

শুরুতেই আমরা অস্ত্রশত্রের কথা বলেছি — তির, টাঙ্গি, ধনুক, বাঁটুল, কামান, ত্রিশূল, পট্টিশ, বাণ, খড়্গ/খাঁড়া, কবচ ইত্যাদি। আত্মরক্ষার বর্মেরও কথাও এসেছে কবিকঙ্কণে।

ধনুক

কবিকঙ্কণ আখেটিক খণ্ডে ধনুকের উল্লেখ করেছেন। বাল্যবয়সে ধনুক হাতে তুলে নেওয়ার সময় একটা নির্দিষ্ট সামাজিক রীতিনীতি পালন করা হত। সেই রীতি উল্লেখ করছেন বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ কবিদের অন্যতম মুকুন্দ কবিকঙ্কণ ‘গণক আসিঞা ঘরে/ শুভদিন শুভবারে/ ধনু দিল ব্যধসুত করে’। কালকেতু পশুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন তির ধনুক দিয়ে ‘একা মহাবীর/ লই তিন তির/ কুলিতা কাঠের ধনু’। শুধু তাই নয় ধনুক দিয়ে পশু পেটাচ্ছেন ‘পাছু মহাবীর মারে ধনুকের বাড়ি/ ধনুকের বাড়ি খাইয়া সিংহ নাঞি ফিরে’। ধনুকের হুলে সোনার গোসাপ বেঁধে নিয়ে চলেছেন ‘ধনুকের হুলে হেম-গোধিকা বান্ধিয়া/ ঘররে চলিল বীর বিষাদ ভাবিআ’।

বাঁটুল

বাঁটুল কাঠ আর চামড়া দিয়ে তৈরি অস্ত্র। বাঁটুল দিয়ে লোহার গুলি ছুঁড়ে লক্ষবস্তু আঘাত করা হয়। বাচ্চাবেলা থেকেই পারিবারিক পেশায় হাত পাকাতে কালকেতু বাঁটুল নিয়ে শিকার করতেন ‘বিহঙ্গ বাটুলে বধে/ লতায় সাজুরি বাঁধে/ কান্দে-ভারে কালু আইসে ঘরে’।

কামান

অনেকেরই ধারণা বাবরের সময় থেকেই দক্ষিণ এশিয়ায় কামানের প্রচলন। সেটা যে ভুল তার উদাহরণ বাংলায় চণ্ডীমঙ্গলে কামান আর কামান তৈরি পেশাদার কামারদের উল্লেখ। বাবরের হাত ধরে কামান দক্ষিণ এশিয়ায় এলে, কবিকঙ্কনে উল্লিখিত বাংলায় কামান তৈরি করা কারিগর সম্প্রদায় তৈরি হওয়া অসম্ভব ছিল। কবি কামান তৈরি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে কামান বসানোর পেশাদারদের কামানিঞা আখ্যা দিচ্ছেন। চণ্ডীমঙ্গলের আখেটিক খণ্ডে কামানের ব্যবহার আছে। কালকেতু কলিঙ্গ যুদ্ধে কামান ব্যবহার করেছেন। কবি লিখছেন ‘কামানিঞা কামান পাতিল থরেথরে/ তালফল সম গোলা পেলিল ভিতরে’। শ্রীমন্তের সঙ্গে সিংহল রাজার যুদ্ধে কামান ব্যবহারের উল্লেখ পাচ্ছি ‘চোঙর ভোঙর মাথে/কৃপান কামান হাথে/ কত কত সমতপণ্ডিত’। কামান সজ্জার বর্ণনা ‘বিষম তবলে ঘন আরোপিতর কাটি/ গ্নুরুজ কামান হাতে শেল পাটী পাটী’।

খড়্গ, খাঁড়া

উপনিবেশিক আমলের আগের অন্যতম প্রাচীন যুদ্ধাস্ত্র হল খড়্গ। এর উল্লেখ আমরা কবিকঙ্কণের কাব্যে পাচ্ছি। কালকেতুর হাতে খড়গ দেখে পশুরা ভয় পায় ‘খড়গের জ্বালায় মোর মিল দুই ভাই’ বা তিনি হুঙ্কার দেন ‘খড়গেতে কাটিয়া তোরে করিব দুই চির’। কালকেতু জঙ্গল কাটছেন। বাঘ নিজের বাসস্থান হারা হওয়ার যন্ত্রণায় কালকেতুকে মাঘ মাসের মূলার মত দাঁত নিয়ে খড়্গ সমান জিভ নিয়ে আক্রমণ করে ‘বিকট দশনগুলা/মাঘমাস্যা জেন মূলা/জুভাখান খাণদার সমান’। কালকেতু খড়্গ নিয়ে জঙ্গলে চামরীর লেজ কেটে নেন। ফুল্লরা সেই লেজ বাজারে বিক্রি করেন। কালকেতু খড়্গ ব্যবহার করে মহিষের শিং কেটে নেন আর ফুল্লরা সেটিকে শিঙ্গার রূপ দিয়ে বাজারে বিক্রি করেন। কালকেতু জঙ্গলে বাঘ হত্যা করেন, ফুল্লরা বাঘনখ আর বাঘছাল বাজারে বেচেন। গণ্ডারও (১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে একটি গন্ডার ধরা হয়। যেটি ছিল দুইশিঙ্গি গন্ডার – বাংলাদেশের শেষ জীবিত গন্ডার। নাম ‘বেগম’। ১৮৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রামের দক্ষিণের কোন একস্থানে এটি মানুষের হাতে বন্দি হয় জানিয়েছেন সূত্র http://surl.li/eeexh) তিনি মারেন। খড়্গ ব্যবহার করে এই সব জন্তু মেরে বা সে সবের অঙ্গ বাজারে বিক্রি করা ছাড়াও ফুল্লরা হাটে, কামারদের তৈরি খড়্গ বিক্রিও করেন। ব্রাহ্মণ তনয় তর্পণ করার জন্যে খড়্গ কেনেন — ‘গণ্ডক বাঁধিয়া কাণ্ডে খড়্গবলে ছিণ্ডে/ ফুল্লরা বেচয়ে খড়্গ দরে এক পণ/ ব্রাহ্মণ সজ্জন লয় করিতে তর্পণ’।

শেল

এটাও প্রাচীন যুদ্ধাস্ত্র। লোহার তৈরি। মুখ সূচালো। লক্ষ্মণের শক্তিশেল শব্দের ব্যবহার কবিকঙ্কণের পরের সময়ের অনুবাদ সাহিত্যে পাই। শ্রীমন্তের সঙ্গে সিংহল রাজার সঙ্গে যুদ্ধের বর্ণনায় শেল প্রহারের কথা এসেছে, ‘করে ধরি সাঙ্গী/ ধায় রণরঙ্গী/ তোমার টাঙ্গি শেল’ এবং ‘শেল সাঙ্গী কাঁড় খাণ্ডা/পাইকের যতেক ভাণ্ডা/ সকল করিলি বুড়ি নাশ’ কিংবা ‘কাঁড়া খাণ্ডা শেল ভাঙ্গে’।

ত্রিশূল

ত্রিশূল শৈবাস্ত্র। শিবের আয়ুধ। ত্রিশূল লোহার তৈরি। কামারদের হাতেই তৈরি হয়। বণিকখণ্ডে দেবী চণ্ডীকা রণরঙ্গী মূর্তিতে যুদ্ধ করছেন। মুকুন্দরামের ভাষায় ‘কাত্যায়নী তীক্ষ্ণ বাণ কাচেন সত্ত্বর/ ত্রিশূল পট্টিশ সাঙ্গি শূল যমধর’।

পট্টিশ

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে পট্টিশ সম্পর্কে লিখছেন ‘বক্ষঃস্থলসমান বা হস্ত প্রমাণ দ্বিমুখ অস্ত্রবিশেষ’। পশু যূথের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কালকেতু পট্টিশ ব্যবহার করছেন ‘ঘন তোলা দেই গোঁফে/ পোলিয়া পট্টিশ লোফে/ এগোলয়ে সিংহের সরণি’।

কাঁড়, কাঁড়া

কাঁড় বা কাঁড়া বাণ বা তিরের আকারের অস্ত্র। বণিকখণ্ডে শ্রীমন্তের বিরুদ্ধে কলিঙ্গ রাজের যুদ্ধে কাঁড় এবং কাঁড়া অস্ত্রের ব্যবহার দেখি ‘পুরিআ বেলকি/ ধাইল ধানকী/ বাছিআ মারিতে কাঁড়া’। ব্রাহ্মণী জরতী বুড়ি বেশধারী চণ্ডী শ্রীমন্তের ছোঁরা অস্ত্রকে মন্ত্রবলে প্রতিহত করেন, ‘শেল সাঙ্গী কাঁড় খাণ্ডা/ পাইকের জতেক ভাণ্ডা/ সকল করিলি বুড়ি নাশ’।

মুদ্গর

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় বঙ্গীয় শব্দকোষে মুদ্গর বিষয়ে বলছেন ‘লৌহময় আয়ুধ বিশেষ’। এই বর্ণনা থেকে অস্ত্রটির অধিকাংশ চরিত্রই নির্ধারণ করা যায় না। আখেটিক খণ্ডে কালকেতুর সঙ্গে যুদ্ধে অনেক সেনার মৃত্যু হলেও যুদ্ধ শেষে মন্ত্রপুত জলে সেনাপতি ইত্যাদিরা প্রাণ ফিরে পাচ্ছেন ‘পাইআ কুশজল/ উঠিল গজবল/ লোহার মুদগর শুণ্ডে’ বা ‘জলবিন্দু দিল চণ্ডী গজবল মুণ্ডে/ জিআ উঠে মৃত্যুহস্তি মুদগর লয়্যা শুণ্ডে’। আমরা যেন মাথায় রাখি সংসার সমরাঙ্গনপাশে মোহাবদ্ধ মানুষকে তাত্ত্বিক মুদগর নিক্ষেপ করেছিলেন শঙ্করাচার্য।

বাণ/শর

দেশিয় মন্ত্রে বাণের বিপুল ব্যবহার রয়েছে – বাণ মেরে মানুষকে বশ, অবশ করার কাজ করেন গুণিনেরা। তবে যুদ্ধে ধনুকের সঙ্গে একনিশ্বাসে উচ্চারিত হত বাণ। চণ্ডীমঙ্গলে আখেটিক খণ্ডে কালকেতু ছোটবেলা থেকেই অস্ত্রশিক্ষা করছে – ‘শরাসনে আকর্ণ পুরিত কৈল বাণ/ হাথে শরে রহে কালু চিত্রনির্মান’। দেবী চণ্ডীকা স্বয়ং বাণ ব্যবহার করছেন ‘চণ্ডনাদ চন্ডিকা ছাড়েন চণ্ডবাণে … কাত্যায়নী তীক্ষ্ণ বাণ কাছেন সত্ত্বর’। যুদ্ধে বাণ বৃষ্টির উল্লেখ ‘কার পৃষ্ঠদেশেতে পূর্ণিত শোভে বাণ’ অথবা ‘বাণ বৃষ্টি করে জেন জল-বরিষণ’।

কবচ

কবচ এক ধরণের অঙ্গরক্ষণ। লোহা এবং অন্যান্য ধাতুতে তৈরি হত। যোদ্ধারা যুদ্ধক্ষেত্রে বর্ম কবচ হিসেবে পরতেন। সিংহ যুদ্ধে কালকেতুর কবচ ছিঁড়ছেন ‘সিংহে চাহে কোপদৃষ্টে/ বীরের আঁচড়ে পিষ্টে/ কবচ করিল ছারখার’।

তোমর

অনেকটা বল্লমের মত। ছুঁচোল মুখ, হাতে ছুঁড়তে হয়। তৈরি করেন কামার সমাজ। সিংহলরাজের বিরুদ্ধে শ্রীমন্ত তোমর ব্যবহার করছেন ‘করে ধরি সাঙ্গী/ ধায় রণরঙ্গী/ তোমর টাঙ্গি শেল’।

ঢাল

যুদ্ধে, আঘাত রোধে ব্যবহার করা হয়। সিংহ সেনাপতিতে রাহুল সংকৃত্যায়ন বলছেন, গণ্ডারের চামড়ার তৈরি ঢালের বর্ণনা। লোহা দিয়েও ঢাল হত। বণিক খণ্ডের যুদ্ধে ভয়ে যাওয়া যোদ্ধারা ঢাল ফেলে পালিয়ে যাচ্ছেন ‘ঢাল খাণ্ডা পোলাইয়া পালায় পুরন্দর’। ঢাল ব্যবহার করেও যুদ্ধ করা পেসাদারদের ঢালী বলা হয় ‘মাথায় সুরঙ্গ ডালি/ তবকী ধানকী ঢালি/ পাইক আইসে কাহনে কাহনে’।

পেজফোরনিউজ ২০২৪ পুজা সংখ্যায় প্রকাশিত


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন