[ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গারের সম্পাদিত ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদন অনুবাদের ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব শেষ হল। পত্রিকা সম্পাদককে ধন্যবাদ আমাকে এই অনুবাদ ধারাবাহিকভাবে তাঁর সাইটে প্রকাশ করতে দেওয়ার জন্য। তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালাম। আমি আরও বেশি কৃতজ্ঞ প্রত্যেক পাঠকের কাছে, তাঁরা আমায় জাগিয়ে রেখেছেন। কয়েক দিন পর ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় পর্বের ধারাবাহিক শুরু হবে। অলমিতি — অনুবাদক]
১৭৮১-তে পাস হওয়া পার্লামেন্টের আইন (২১ জিও. ৩য়, অধ্যায় ৭০) মূলত ১৭৭৩-এর ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’-এর ‘সর্বনাশা ভুল’ সংশোধনের জন্য প্রণয়ন করা হয়। বিচারকদের অবস্থানের বিপরীতে গিয়ে আইন লঙ্ঘনের দায়ে গভর্নর-জেনারেল-ইন-কাউন্সিল এবং অ্যাডভোকেট-জেনারেলকে দায়মুক্তি দিয়ে, ১৭৮১-র এই আইন কার্যত নির্বাহী বিভাগের সাথে দ্বন্দ্বে, আইনের আক্ষরিক আর তাত্ত্বিক বিচারে বিচারকদের অবস্থানকে উপযুক্ত স্বীকৃতি দেয় নি; তবে আইনের প্রস্তাবনায় ‘বিচারক এবং গভর্নর-জেনারেল ও কাউন্সিলের মধ্যকার মতবিরোধ’-এর ফলে তৈরি হওয়া ‘ভুল বোঝাবুঝি আর অসন্তোষ’ এবং ‘ভয় আর আশঙ্কার’ কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। পাশাপাশি এও সতর্ক করে বলা হয়েছিল যে, ‘যৌক্তিক আর উপযুক্ত প্রতিকারের ব্যবস্থা না করা হলে’ আরও ‘অনিষ্টকর পরিস্থিতি’ সৃষ্টি হতে পারে।
আইনটির বিধানসমূহ সংক্ষেপে নিচে উপস্থিত করা গেল —
১. গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিলকে — যৌথ বা পৃথকভাবে — সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারভুক্ত নয় বলে ঘোষণা করা হয়েছিল; এই অব্যাহতি প্রযোজ্য ছিল “তাদের সরকারি পদমর্যাদায় এবং কেবল গভর্নর-জেনারেল ও কাউন্সিল হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাদের দ্বারা পরামর্শকৃত, আদিষ্ট বা সম্পাদিত কোনো কাজ বা আদেশ, কিংবা অন্য যেকোনো বিষয় বা কার্যের” ক্ষেত্রে (Cowell : The History and Constitution of the Courts and Legislative Authorities in India. Tagore Law Lectures, ৮ম সংস্করণ, কলকাতা ১৯০৫, পৃ. ৫৩)
২. একই সাথে ঘোষণা করা হয়েছিল যে, রাজস্ব সংক্রান্ত বিষয়াবলি কিংবা দেশের প্রচলিত প্রথা এবং গভর্নর-জেনারেল ও তাঁর পরিষদের প্রবিধান অনুযায়ী রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে প্রদত্ত আদেশ বা সম্পাদিত কাজের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের কোনো এখতিয়ার থাকবে না। এছাড়া বিধান রাখা হয়েছিল যে, কেবল সরকার, কোম্পানি বা গ্রেট ব্রিটেনের কোনো নাগরিকের অধীনে কর্মরত থাকার কারণেই কোনো ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুপ্রিম কোর্টের এখতিয়ারের অধীন হবেন না — বিশেষত জমি বা সম্পত্তির উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিষয়ে কিংবা বিভিন্ন পক্ষের মধ্যকার চুক্তি ও লেনদেন সংক্রান্ত বিষয়ে; তবে কোনো অন্যায় বা অনধিকার প্রবেশের (trespass) দায়ে দায়েরকৃত মামলার ক্ষেত্রে এবং আদালতের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বিষয়ে পক্ষসমূহের লিখিত সম্মতিসাপেক্ষে দায়ের করা যে কোনো দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হবে না (ঐ, পৃ. ৫৪)। ভারতীয় আদালতসমূহে বিচারের দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তি এবং তাঁদের অধীনে কর্মরত ব্যক্তির কোনো অন্যায় কাজ বা ক্ষতির জন্য সুপ্রিম কোর্টে দায়ের করা মামলার আওতাভুক্ত করা যাবে না।
৩. এই আইনের ১৭তম ধারা কলকাতা শহরের অধিবাসীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা যাবতীয় মামলা আর মোকদ্দমা নিষ্পত্তির ক্ষমতা আদালতকে দেয়; তবে এতে এই বিধান রাখা হয় যে, “ভূমি, খাজনা ও অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকার ও স্বত্বনির্ণয় সংক্রান্ত বিষয় এবং দুই পক্ষের মধ্যকার যাবতীয় চুক্তি ও লেনদেন সংক্রান্ত বিষয় — মুসলমানদের ক্ষেত্রে মুসলমানদের আইন ও প্রথা অনুযায়ী এবং হিন্দুদের (Gentoos) ক্ষেত্রে হিন্দুদের আইন ও প্রথা অনুযায়ী নির্ধারিত হবে; আর যেখানে দুই পক্ষের মধ্যে যদি একজন মুসলমান আর অন্যজন হিন্দু হবেন, সেখানে বিবাদী পক্ষের আইন আর প্রথা অনুযায়ী বিষয়টি নির্ধারিত হবে।” (ঐ, পৃ. ৫৬) প্রেসিডেন্সির স্থানীয় অধিবাসীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি আর দেওয়ানি মামলার ক্ষেত্রে, জনগণের ধর্মীয় আর সামাজিক রীতিনীতি এবং জীবনযাত্রার ধরণ বিবেচনা করে উপযুক্ত কার্যপ্রণালী প্রণয়নের ক্ষমতাও দেওয়া হল।
৪. দেশের প্রচলিত শাসনব্যবস্থার অধীনস্থ আদালতগুলোকে স্বীকৃতি প্রদান করা হল এবং ওই আদালতের জন্য বিধিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে গভর্নর-জেনারেল আর তাঁর পরিষদের কর্তৃত্বকেও স্বীকৃতি দেওয়া হল।
অধ্যাপক কাউয়েল উল্লেখ করেছেন, ১৭৮১ -এর আইনে — ঠিক যেমনটি ১৭৭৩ -এর আইনেও দেখা গিয়েছিল — ‘ব্রিটিশ প্রজা’ (British subjects) পরিভাষা এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যার অর্থ থেকে হিন্দু ও মুসলমান অধিবাসীরা অনিবার্যভাবেই বাদ পড়ে যান। কোম্পানির কুঠিগুলোর অধিবাসী এবং মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনস্থ লক্ষ লক্ষ প্রজার মধ্যকার এই বিভাজন — বা প্রেসিডেন্সি শহরসমূহ ও মফস্বল এলাকার মধ্যকার এই পার্থক্য — অন্তত আরও আশি বছর ধরে বিদ্যমান ছিল।
শেষ।
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ