শুনুন নেতাজি সুভাষ। অনেক দিন ধরে আপনি বাঙালি তথা ভারতবাসীর নয়নের মণি হয়ে আছেন। মৃত্যুর এত বছর পরেও। হিন্দু-মুসলমান-শিখ–খ্রিস্টান সকলের প্রিয় আপনি। আপনার কিছু আত্মত্যাগ ছিল। বিলেত থেকে ফিরে চাকরি-বাকরি না করে আপনি নেমে পড়লেন স্বাধীনতার লড়াইতে। চিঠি লিখলেন চিত্তরঞ্জন দাশকে। তাঁর শিষ্য হয়ে গেলেন। এসবের জন্য আপনি দেশবাসীর কিছুটা প্রিয়। তবে দেশবাসীর ভীষণ প্রিয় হবার কারণটা আমরা এবার আবিষ্কার করেছি। নজরবন্দি হবার পরে আপনি সুকৌশলে একটা অ্যাডভেঞ্চারের প্ল্যান করেছিলেন। আপনার ভাইপো ‘মহানিষ্ক্রমণ’ বইতে সে সব লিখেছেন। রাতের অন্ধকারে পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বেরিয়ে পড়া, পুলিশের চোখে যাতে না পড়েন তার জন্য গাড়ির সিটের তলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকা, ফাঁকি দিয়ে দেশের সীমান্ত পেরিয়ে যাওয়া, সাবমেরিনে স্থানান্তরে গমন, সৈন্য বাহিনী গঠন, ‘দিল্লি চলো’ ডাক — এসব অ্যাডভেঞ্চারের উপকরণ। এসব খুব খেয়েছে মানুষ। এখনও খাচ্ছে। আপনার জন্মদিন পালন করছে, জন্মদিনে ছুটি দিয়েছে, ঘরে ঘরে টাঙিয়ে রেখেছে আপনার ছবি, শুধু বাংলায় আপনাকে নিয়ে শ’তিনেক বই লেখা হয়ে গেছে।
অনেকদিন তো হল, এবার একটু স্পেস দিন। অন্য কে জায়গা করে দিন। সরে দাঁড়ান একটু। দেখুন, আমাদের মহাপুরুষ খুব বেশি নেই। যাও বা আছে, ভিন প্রদেশের। বাংলায় তাঁদের তুলে ধরা বেশ কষ্টকর। ওই কি যে বলে, ‘বাঙালি অস্মিতা’ — সেটা বড় বাধা। বাঙলায় আমাদের ওই একজন আছেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। যাঁকে আপনারা ‘বাংলার বাঘ’ বলেন, সেই আশুতোষ মুখার্জির ছেলে। রাজ্যের ক্ষমতা লাভ করে আমরা সেই শ্যামাপ্রসাদকে তুলে ধরতে চাই। তাঁর জন্মদিনে এবার ছুটি ঘোষণা হয়েছে। তাঁর বিরাট একটা মূর্তি বসানোর উদ্যোগ নিয়েছি। তবে জন্মদিনে ছুটি আর বিরাট মুর্তি যে বিশেষ কাজের কিছু হবে না, তা আমরা জানি। আপনার ভাবমূর্তি দেশের মানুষের মনে যে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে আছে। তাই আপনাকে জনান্তিকে অনুরোধ : একটু সরে দাঁড়ান। শ্যামাপ্রসাদকে একটু স্পেস দিন।
আপনাকে কমিউনিস্টদের মতো নাস্তিক বলতে পারলে আমাদের কাজ সহজ হয়ে যেত। কিন্তু সনাতনী না হলেও আপনি যে রামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দের অনুরাগী। আপনি যে ধর্মপথে ছিলেন। কিন্তু নেতাজি সুভাষ, আমরা যে হিন্দুধর্ম নিয়ে চিল্লে চলেছি, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ তো সে হিন্দুধর্মের মানুষ নন। তা যদি হতেন, তা হলে তাঁরা গলা ফাটিয়ে বলতেন — ‘হিন্দু খতরমে হ্যায়।’ ‘যত মত তত পথ’–এ আবার কি উদ্ভট কথা! আরে এক মত এক পথ। এক দেশ, এক জাতি, এক ধর্ম, এক ভাষা। ‘বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য’ বিলকুল বাজে কথা। রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ কি ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করার কথা বলেছেন কোনদিন? না, বলেন নি। তাহলে বুঝুন, কেমন হিন্দু তাঁরা!
কি, শুনলেন না তো আমাদের অনুরোধ! বেশ। এবার তাহলে অফেন্স ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। আপনি তো মশাই, এক গুণ্ডা। প্রেসিডেন্সি কলেজে কি করেছিলেন মনে নেই? অধ্যাপক ওটেনের গালে চড় কষিয়েছিলেন আপনি। ছাত্র হয়ে শিক্ষকের গালে চড়! ভাবা যায়! তার মানে গুণ্ডামিটা আপনার জিনের মধ্যে আছে। তারপর কলেজ থেকে বহিষ্কার। তারপর কে আশ্রয় দিলেন আপনাকে! সেই শ্যামাপ্রসাদের বাবা স্যার আশুতোষ। নাঃ, উপকারীর উপকার স্বীকার করা আপনার ধাতে নেই।
কি বলছেন? চড় মারেন নি? অধ্যাপকের উদ্ধত ও বর্ণবিদ্বেষী আচরণের প্রতিবাদ করেছিলেন শুধু? বলছেন, অধ্যাপক ওটেন নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিলেন? তিনি ভারতপ্রেমিক হয়ে গিয়েছিলেন? ভারতকে নিয়ে একের পর এক বই লিখেছেন …. ‘অ্যাংলো ইণ্ডিয়ান হিস্ট্রি’, ‘গ্লিম্পসেস অব ইণ্ডিয়াজ হিস্ট্রি’, ‘ইউরোপিয়ান ট্রাভেলারস ইন ইণ্ডিয়া’? কি বললেন, আপনার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে ওটেন লিখেছিলেন এক মর্মস্পর্শী কবিতা :
‘Did I once suffer, Subhas, at your hands?
Your patriot heart is stilled, I would forget’?….
যাক গে যাক। এটা না হয়, মিসটেক হয়ে গেছে। কিন্তু মহম্মদ আলি পার্কের সভায় শ্যামাপ্রসাদকে আপনার ফরওয়ার্ড ব্লকের গুণ্ডারা ইট ছুঁড়ে যে আহত করেছিল, তার বেলা! কি বললেন? “১৯৪০ সালের ওই দিন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১০ হাজার কর্মী-সমর্থক নিয়ে হিন্দু মহাসভার সমাবেশ করেছিলেন, তাও মহম্মদ আলি পার্কে নয়, শ্রদ্ধানন্দ পার্কে। ইতিহাস বলছে, সে সময়ে কলকাতার কংগ্রেসের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা পাঁচুগোপাল বন্দ্যোপাধ্যায় জনা পঁচিশেক হাঙ্গামাকারীকে নিয়ে সভামঞ্চের দিকে ‘সুভাষবাবু কি জয়’ বলতে বলতে ছুটে যান। স্লোগান দিচ্ছিলেন পাঁচুগোপালের সমর্থকরা। চলতে থাকে পাথর ছোঁড়া। আহত হন শ্যামাপ্রসাদ।”( সংবাদ প্রতিদিন )
আচ্ছা এটা না হয় গেল। এবার এক মারাত্মক অভিযোগ করব। আপনি কি এই রাজ্যের আগের আগের সরকারের মতো মুসলিমতোষণ নীতি গ্রহণ করেন নি? ১৯২৩ সালের বেঙ্গল প্যাক্টের কথা মনে করুন। চিত্তরঞ্জন দাশের সাগরেদ হিসেবে আপনি কি মুসলমানদের বেশি সুযোগ-সুবিধা দিতে চান নি? ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত সারা ভারত হিন্দু মহাসভা কেন আপনাকে আকৃষ্ট করে নি? আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠন করেছিলেন। সামরিক ইউনিফর্মে টিপু সুলতানের ‘লাফানো বাঘের’ প্রতীক গ্রহণ করেছিলেন কেন? কেন আপনার ফৌজে এত মুসলমানরা? কেন আপনার ফৌজের ফার্স্ট ডিভিশনের কম্যাণ্ডার ও পরে চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল মোহাম্মদ জামান কিয়ানি? কেন সুভাষ ব্রিগেডের কম্যাণ্ডার মেজর জেনারেল শাহ নওয়াজ খান? কেন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন শাখার প্রধান কর্নেল হবিবুর রহমান? কেন ‘জয় হিন্দ’ স্লোগানস্রষ্টা আবিদ হাসান সাফরানি ও ক্যাপ্টেন আব্বাস আলি আপনার এত প্রিয়?
শুনুন নেতাজি সুভাষ, পথ ছাড়ুন। মনে আছে ‘কল্লোলে’র তরুণ লেখকরা রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কি বলেছিলেন? বলেছিলেন, ‘পথ রুধি বসি আছে রবীন্দ্র ঠাকুর।’ আপনিও আমাদের শ্যামাপ্রসাদের পথ রোধ করে বসে আছেন। পথ ছেড়ে দিন। দেখছেন না, চাদ্দিকে ডিম থেরাপি চলছে।
নেতাজী হিন্দু মহাসভার ভ্রুনেই মৃত্যু কামনা করেছিলেন সুতরাং তাঁকে তো গুণ্ডা বলতেই হয়!
লেখার স্টাইল ভাল।
ধৃষ্টতা মাফ করবেন। লেখাটি পড়ে মনে হল লেখার মধ্যে কোথাও কোথাও নির্মোহ ভাবকে অতিক্রম করে আবেগ উঁকি দিয়েছে।
লেখাটির শেষ লাইন-” আপনিও আমাদের শ্যামাপ্রসাদের পথ রোধ করে বসে আছেন” এটি যুতসই মনে হল না।