Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৩৮ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা

[আমরা দ্য ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় পর্ব, জোড়া পাতা বাংলা প্রদেশ পরিশিষ্ট অনুবাদে প্রবেশ করেছি। মূল অনুবাদে প্রবেশের আগে অনুবাদক, সহৃদয় পাঠককে ধরিয়ে দিতে চান, ১৮১২-য় ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দ্য ফিফথ রিপোর্ট বা পঞ্চম প্রতিবেদন জমা পড়ার প্রেক্ষিত, এবং কেন আজ, এই এক্সটেনডেড কলোনিয়াল পিরিয়োড দক্ষিণ এশিয়ায় বসে এই দ্বিতীয় অংশটার অনুবাদ এবং বিস্তৃত আলোচনা জরুরি।]

এই প্রেক্ষাপটে নিজের অধিকার বাঁচাতে দ্য সিটির জবাব — একচেটিয়া রক্ষার কৌশল

লন্ডন শহরের কর্পোরেশন, কোম্পানির একচেটিয়া অধিকার আর আমদানি করা পণ্য, লন্ডনে সীমাবদ্ধ রাখার পক্ষে আবেদন করে। তাদের যুক্তি ছিল — “আউটপোর্টে আমদানি সুবিধা প্রদান শুধু লন্ডনের ব্যবসায়ীদের ক্ষতিই করবে না, বরং দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। এই ব্যবস্থা লন্ডনের জাহাজ, গুদাম আর রাস্তাঘাটে বিনিয়োগ হওয়া মূলধনের ওপর আঘাত হানবে।” তারা আরও বলেন কোম্পানির বার্ষিক নিলাম ব্যবস্থা বিদেশি বণিকদের এক জায়গায় সমবেত করে দ্রুত বাণিজ্য করতে সাহায্য করে। আউটপোর্ট খুলে দিলে এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে । এছাড়া, তাদের দাবি আউটপোর্টে আমদানি করলে শুল্ক ফাঁকি ও চোরাচালান বাড়বে।

কোম্পানিও এই আক্রমণের বিরুদ্ধে নিজেদের বাঁচাতে উদগ্রীব। ১৮১৩-র ফেব্রুয়ারিতে কোম্পানি পার্লামেন্টে আবেদন পেশ করে। এই আবেদনে তারা বলে, ভারতবর্ষীয় সমাজে ব্রিটিশ পণ্যের খুব কমই চাহিদা; তাই বাণিজ্য উন্মুক্ত করলে বিশেষ লাভ হবে না । তাছাড়া তারা আরও বলেন ১৭৯৩-এ সনদ নবায়নের সময় ব্যক্তিগত বণিকদের জন্য কোম্পানির জাহাজে ৩০০০ টন বরাদ্দ করা হয়েছিল, যে সুযোগ তারা তারা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারে নি। তবে কোম্পানি বলে নি, ব্যক্তিগত ব্যবসায়ীদের জাহাজে বরাদ্দ স্থানে কম মাল পাঠানোর মূল কারন ছিল কোম্পানির অতিরিক্ত মালের ভাড়া, ফ্রেট।

১৮১৩-এর সনদ আইন — সংগ্রামের ফল — এই উত্তপ্ত বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত মুক্ত বাণিজ্য সমর্থকদের জয় হয়। ১৮১৩-র সনদ আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতবর্ষীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার বাতিল করে। তবে উচ্চলাভের চীন আর চা বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার কোম্পানির হাতেই থাকে। এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল —

১। যেকোনো ব্রিটিশ প্রজা এখন ভারতবর্ষের সাথে বাণিজ্য করতে পারবে ।

২। বাণিজ্য নির্দিষ্ট কিছু বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে, যেখানে শুল্ক ও পণ্য তদারকি সম্ভব।

৩। কিছু পণ্য — যেমন সিল্ক, চুল, সুতির উল — আউটপোর্টে নামানোর পর গুদামে রাখতে হবে এবং শুল্ক নির্ধারণের জন্য লন্ডনে নিয়ে যেতে হবে।

৪। কোম্পানির রাজস্ব ও প্রশাসনিক কাজকর্মের ওপর বোর্ড অফ কন্ট্রোলের কর্তৃত্ব বাড়ানো হয়। ভারতবর্ষীয় পণ্যে শুল্ক আরোপের জন্য ডিরেক্টর আর বোর্ড অফ কন্ট্রোলের অনুমোদন প্রয়োজন রইল।

৫। ভারতবর্ষে একজন বিশপ আর তিনজন আর্চডিকন নিয়োগের ব্যবস্থা করা হল।

ভারতবর্ষের বাজার দখল আর পুঁজিবাদের বিকাশ — এই দ্বন্দ্বের তাৎপর্য

এই দ্বন্দ্বের ফল ছিল ঐতিহাসিক। ‘আউটপোর্ট’ ব্লকের জয়ের মাধ্যমে যেটা ব্রিটিশ পুঁজিবাদীরা লাভ করল —

১। ভারতবর্ষে বাজার ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের জন্য খুলে গেল — ম্যানচেস্টারের সুতিবস্ত্র, বার্মিংহামের লোহার সামগ্রী — সবই এখন আইনত কোনও বাধা ছাড়াই ভারতবর্ষে প্রবেশ করতে থাকে। এর ফলে ভারতবর্ষীয় তাঁতি, কারিগর ও হস্তশিল্পীরা চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়েন। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮১৩-র পর ভারতবর্ষীয় বস্ত্রশিল্পের পতন শুরু হয় এবং ভারত ব্রিটিশ পণ্যের বাজার ও কাঁচামালের উৎস-এ পরিণত হয়। ভারতবর্ষে উৎপাদিত কাঁচামাল — তুলো, পাট, আফিম ইত্যাদি – ইংল্যান্ডে রপ্তানি করা হতো, আর সেখান থেকে তৈরি পণ্য ভারতবর্ষের বাজারে ডাম্প করা হতো।

২। ভারতবর্ষীয় অর্থনীতি বিশ্ব পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হল — ১৮১৩-এ আইন ভারতবর্ষে ‘মুক্ত বাণিজ্য’ যুগের সূচনা করল। ভারতবর্ষীয় অর্থনীতি এখন ব্রিটিশ আর বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত হল ভারতবর্ষের স্বার্থ ধ্বংস করে, এবং ব্রিটেনের শিল্পপুঁজির প্রসারের স্বার্থে কাজ করে ।

৩। কোম্পানির ‘স্ব-শাসন’-এর ওপর আঘাত- এই আইন প্রমাণ করল কোম্পানি আর স্বায়ত্তশাসিত কর্পোরেশন নয়; এই বিশাল কর্পোরেট এন্টিটি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের প্রশাসনিক শাখায় পরিণত হল। কোম্পানির রাজস্ব আর বাণিজ্যিক নীতির ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

৪। ‘শিল্প-পুঁজি’র জয়- দ্য সিটি বনাম আউটপোর্টের এই লড়াই ছিল বাণিজ্য-পুঁজি Merchant Capital বনাম শিল্প-পুঁজি Industrial Capital-এর মধ্যেকার লড়াই। আউটপোর্টের জয় শিল্প-পুঁজির জয় এবং ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের চূড়ান্ত পরিণতি। ভারতবর্ষ সেই শিল্পবিপ্লবের ভিত্তি আর বাজার হয়ে উঠল।

ফিফথ রিপোর্টের সাথে এই দ্বন্দ্বের সম্পর্ক

এই প্রেক্ষাপটে ফিফথ রিপোর্টের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮১২-র ফিফথ রিপোর্ট কোম্পানির রাজস্ব ও বিচার ব্যবস্থাকে ‘সফল’ দেখানোর চেষ্টা করেছিল, যাতে ১৮১৩-তে কোম্পানির সনদ নবায়ন হয় এবং তার প্রশাসনিক ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে। কিন্তু এই রিপোর্ট কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকার রক্ষা করতে পারেনি। কারণ আউটপোর্টগুলোর রাজনৈতিক চাপ এবং ব্রিটিশ শিল্প-পুঁজির প্রয়োজনীয়তা এতটাই প্রবল ছিল, কোম্পানির ২০০ বছর ধরে ভোগ করা একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকারকে ক্ষুণ্ণ করতে বাধ্য হয় রাষ্টড়কাঠামো। ফিফথ রিপোর্ট কোম্পানির প্রশাসনিক স্বার্থ রক্ষা করলেও তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়। কারণ, শিল্প-পুঁজির চাহিদা ছিল ভারতবর্ষীয় বাজারের উন্মুক্ততা, আর ফিফথ রিপোর্ট সেটা দিতে পারেনি।

ভারতবর্ষের পরিণতি — ‘দ্য সিটি বনাম আউটপোর্ট’-এর এই লড়াই তাই ভারতবর্ষের জন্য ছিল একটি চরমতম অভিশাপ। একদিকে যেমন কোম্পানির আমলাতন্ত্র আর জমিদারি ব্যবস্থা কৃষক ও কারিগরদের রক্ত শোষণ করছিল (যা ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের মূল আলোচনা দ্রষ্টব্য), অন্যদিকে ১৮১৩-র আইন ভারতবর্ষীয় বাজারকে ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের জন্য খুলে দেয় — পলাশীর পরের ৬ দশক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অত্যাচার সত্ত্বেও দেশীয় শিল্প কাঠামো যতটুকু টিকেছিল, তার ওপর ব্রিটিশ উপনিবেশিক বুলডোজার চালিয়ে ধ্বংস করা হয় এবং ভারবর্ষকে কাঁচামালের উৎস ও পণ্যের বাজারে পরিণত করা হল। এই দ্বৈত লুঠ—রাজস্ব লুঠ আর বাজার লুঠই তৈরি করে উপনিবেশিক ভারতবর্ষের ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ভিত্তি। আর এই শোষণ থেকে লাভ পেল ব্রিটিশ শিল্পপুঁজিপতিরা, যাদের মধ্যে ‘আউটপোর্ট’ ব্লক প্রধান ছিল।

ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ তাই এই দ্বৈত শোষণ-কাঠামোকে উন্মোচনের খুবই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র।

কোম্পানির যুক্তি- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বনাম বাণিজ্যিক স্বাধীনতা

এই পর্ব আমরা আরও বিস্তৃতভাবে উপস্থাপন করছি। এই বিতর্ক শুধু ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় ছিল না, বরং ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি ও শাসনকাঠামো নির্ধারণকারী এক যুদ্ধ ছিল।

কোম্পানির কেন্দ্রীয় যুক্তি — ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ বা ‘ভেস্টেড রাইটস’ (Vested Rights) — ১৮১৩-য় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ নবায়নের প্রশ্ন উঠলে কোম্পানি ও তার সমর্থকরা তাদের একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকারের সুরক্ষার জন্য প্রধান যে অস্ত্র ব্যবহার করে, তা হল ভেস্টেড রাইটস বা অর্জিত অধিকার আর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার যুক্তি। কোম্পানি আর লন্ডন বণিকদের প্রাথমিক যুক্তি ছিল, কোম্পানির সনদ একটি পবিত্র চুক্তি যা লঙ্ঘন করা যায় না। আর এই যুক্তি শুধু আইনি ছিল না, এটা ছিল ঔপনিবেশিক ক্ষমতার ভিত্তি রক্ষার চরম রাজনৈতিক অস্ত্র। পার্লামেন্টে কোম্পানির পক্ষে বক্তারা স্পষ্ট করেই বলেছিলেন যে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া কেড়ে নেওয়া মানে ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে চ্যালেঞ্জ করা।

তাদের কাছে ভারতবর্ষ ছিল বিশাল রাজস্বের উৎস আর প্রশাসনিক অঞ্চল। তারা বলেন ভারতবর্ষীয়রা ব্রিটিশ পণ্যের ভোক্তা নয়, তাদের নিজস্ব উৎপাদন ও জীবনধারা আছে। তাই বাণিজ্য অধিকার কেড়ে নিলে লাভের বদলে অস্থিরতা বাড়বে । এই যুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল স্ট্যাটাস কো বজায় রাখা, যাতে লন্ডনের বণিক ও কোম্পানির আমলারা তাদের স্বার্থ হারাতে না বসে। এটি ছিল “বাণিজ্যের স্বাধীনতা নেই, আছে কেবল কোম্পানির শাসনের স্বাধীনতা” — এই মানসিকতারই বহিঃপ্রকাশ ।

‘ভেস্টেড রাইটস’ যুক্তির প্রতি আউটপোর্টের প্রত্যুত্তর — ‘ব্রিটিশ অধিকার’ বনাম ‘কর্পোরেট স্বার্থ’ — এই যুক্তির বিরুদ্ধে ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, ব্রিস্টল আর লিভারপুলের আউটপোর্ট বণিকদের উত্তর ছিল অত্যন্ত প্রখর আর মৌলিক। তারা বলেন, বাণিজ্যের স্বাধীনতা ব্রিটিশদের জন্মগত অধিকার, যা কোনো কর্পোরেশনের স্বার্থে বলি দেওয়া যায় না এবং কোম্পানির সনদের ‘অর্জিত অধিকার’ অস্থায়ী ও কৃত্রিম; সনদের মেয়াদ শেষ হলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় । প্রশ্ন হলো, পার্লামেন্ট কি তার সর্বোচ্চ কর্তব্য পালন করে আরও একচেটিয়া স্বত্বকে বৈধতা দিতে পারে, যা অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত অনুপযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে?

এই বক্তব্যে তারা কোম্পানির ‘ভেস্টেড রাইটস’ যুক্তিকে মৌলিকভাবে চ্যালেঞ্জ জানায়। তারা স্মরণ করিয়ে দেয় যে ইংল্যান্ডের সংসদীয় ব্যবস্থা তথাকথিত ‘অর্জিত অধিকার’-এর ঊর্ধ্বে; জনগণের কল্যাণ ও রাষ্ট্রের প্রয়োজনই আইনের মূল ভিত্তি। শিল্প-পুঁজির এই প্রত্যুত্তর ছিল কোম্পানির বাণিজ্য-পুঁজির বিরুদ্ধে এক আক্রমণ, যা প্রমাণ করে যে বাজার উন্মুক্তকরণ শুধু ন্যায়সঙ্গত নয়, বরং জাতীয় স্বার্থের জন্যও জরুরি ।

‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ বনাম ‘বাণিজ্যিক স্বাধীনতা’ — প্রকৃত দ্বন্দ্ব — এই দ্বন্দ্ব আসলে ছিল বাণিজ্য-পুঁজি Merchant Capital আর শিল্প-পুঁজি Industrial Capital-এর মধ্যেকার প্রবল সংঘাত, যা ‘দ্য সিটি’ ও ‘আউটপোর্ট’-এর লড়াইয়ে প্রকাশ পেয়েছে খোলামেলাভাবে। কোম্পানির বক্তব্য “স্থিতিশীল শাসন”-এর জন্য একচেটিয়া অধিকার সুরক্ষার প্রয়োজন, আর আউটপোর্টের যুক্তি ছিল “জাতীয় সমৃদ্ধি”-র জন্য উন্মুক্ত বাজার প্রয়োজন।

কোম্পানির পক্ষে বক্তারা (যাদের মধ্যে লর্ড মেলভিলের নাম উল্লেখযোগ্য) বলেন ভারতবর্ষীয় জনগণ, জলবায়ু আর তার উৎপাদনের প্রকৃতি বাণিজ্য উন্মুক্তকরণের পক্ষে নয়। তারা বলেন, ভারতবর্ষীয়রা ধর্মীয় কুসংস্কারের কারণে ব্রিটিশ পণ্য ব্যবহার করবে না, আর ব্রিটিশ পণ্য ও পরিবহন খরচের জন্য অকোম্পানি কর্পোরেটরা ভারতবর্ষের বাজারে খোলামেলা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। এদের মূল সুর ছিল ভারতবর্ষকে লুঠের বাজার হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে না আসা।

অন্যদিকে, আউটপোর্টের বণিক ও শিল্পপতিদের প্রতিবাদী বক্তব্য ছিল ব্রিটেনের শিল্পশক্তি আর প্রযুক্তি ভারতবর্ষীয় বাজারে জয়লাভ করবেই; বাজার উন্মুক্ত হলে ব্রিটেনের অর্থনীতি আর জাহাজশিল্পের উন্নতি ঘটবে, এবং বিদেশি প্রতিযোগিতার হাত থেকে বাজার রক্ষা পাবে। তারা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা ও অন্যের ওপর নির্ভরশীলতার কথাও তুলে ধরেন।

নেপোলিয়নিক যুদ্ধ — ‘স্থিতিশীলতা’ যুক্তির পতন — এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা ছিল নেপোলিয়নিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপট। ব্রিটেন যখন ইউরোপের বাজার হারাচ্ছিল এবং উত্তর আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্য বাধা পাচ্ছিল, সে সময় আউটপোর্ট বণিকরা ভারতবর্ষীয় বাজার খুলে দেওয়াকে জাতীয় স্বার্থে জরুরি কাজ হিসেবে দাবি করে। এই সংকটময় সময়ে কোম্পানির ‘স্থিতিশীলতা’ যুক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে, কারণ যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের জন্য নতুন বাজারের প্রয়োজন ছিল। কোম্পানির পুরনো কাঠামো আর যথেষ্ট ছিল না; ব্রিটেনের উদীয়মান শিল্পশক্তির জন্য ভারতবর্ষীয় বাজার অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

এই সংকট আউটপোর্টগুলোর যুক্তিকে আরও জোরালো করে। তারা বলেন, ব্রিটেন যখন তার শত্রুদের থেকে বাজার ফিরে পেতে চায়, তখন নিজেদের উপনিবেশে ব্রিটিশদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা বুদ্ধিমানের কাজ নয় । এই যুক্তি প্রমাণ করে যে কোম্পানির ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’ আসলে কোম্পানির নিজস্ব স্বার্থ ছিল, জাতীয় স্বার্থ নয়।

১৮১৩-এর সনদ আইন — দ্বন্দ্বের ফলাফল ও ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের জন্য পরিণতি — এই দীর্ঘ বিতর্কের পর শেষ পর্যন্ত আউটপোর্ট আর উদীয়মান কর্পোরেট-পুঁজির জয় হয়। ১৮১৩-র সনদ আইন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতবর্ষীয় বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার বাতিল করে — তবে চীন ও চা বাণিজ্যের একচেটিয়া কিছুকাল বজায় থাকে। এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো ছিল —

১। বাণিজ্য উন্মুক্তকরণ- যে কোনো ব্রিটিশ প্রজা এখন ভারতবর্ষের সঙ্গে বাণিজ্য করতে পারবে ।

২। নির্দিষ্ট বন্দর- বাণিজ্য নির্দিষ্ট বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে ।

৩। রাজস্ব ও প্রশাসনে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ — কোম্পানির রাজস্ব ও প্রশাসনের ওপর বোর্ড অফ কন্ট্রোল-এর কর্তৃত্ব বাড়ানো হয়।

৪। শিক্ষা ও ধর্মীয় বিধান- ভারতবর্ষে শিক্ষা ও ধর্মপ্রচারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হয় ।

ভারতবর্ষের জন্য এর পরিণতি ছিল সুদূরপ্রসারী —

১। বাজার খুলেগেল ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের জন্য — ম্যানচেস্টারের সুতিবস্ত্র, বার্মিংহামের লোহার সামগ্রী — সবই এখন ভারতবর্ষের বাজারে প্রবেশের পথ পায়।

২। ১৭৫৭-র পর বিশিল্পায়নের কোম্পানি উদ্যোগকে ফাঁকি দিয়ে ভারতবর্ষীয় কারিগর ও তাঁতিরা যতটুকু টিকেছিল, তাদের সেই উৎপাদন কাঠামোর বাজার চরম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে-এর ফলে ভারতবর্ষীয় বস্ত্রশিল্পের পতন শুরু হয় এবং ভারত ব্রিটিশ পণ্যের বাজার ও কাঁচামালের উৎসে পরিণত হয় ।

৩। কোম্পানির ‘স্ব-শাসন’-এর ওপর আঘাত — এই আইন প্রমাণ করে যে কোম্পানি আর স্বায়ত্তশাসিত নয়; এটি ব্রিটিশ রাষ্ট্রের একটি প্রশাসনিক শাখায় পরিণত হয় ।

৪। শিল্প-পুঁজির জয়- ‘দ্য সিটি’ বনাম ‘আউটপোর্ট’-এর এই লড়াইয়ে শিল্প-পুঁজি Industrial Capital-এর জয় জয়কার ঘটে, যা ব্রিটেনের শিল্পবিপ্লবের চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে গণ্য হয় আজও।

ফিফথ রিপোর্ট- দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে একটি দলিল

এই প্রেক্ষাপটে ফিফথ রিপোর্টের ভূমিকা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮১২-এর এই রিপোর্টটি কোম্পানির প্রশাসনিক সাফল্যের কাহিনি তৈরি করেছিল, যা ১৮১৩ সালে কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু এটি কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া রক্ষা করতে পারেনি। কারণ, আউটপোর্টগুলোর রাজনৈতিক চাপ ও ব্রিটিশ শিল্প-পুঁজির প্রয়োজনীয়তা এতটাই প্রবল ছিল যে কোম্পানির বাণিজ্যিক একচেটিয়া অধিকারের যে বেড়াজাল ছিল, সব চুরচুর হয়ে ভেঙে পড়ে। ফিফথ রিপোর্টের সাফল্য আর ব্যর্থতা উভয়ই এই দ্বন্দ্বের ফসল। এই রিপোর্ট কোম্পানির প্রশাসনিক স্বার্থ রক্ষা করলেও তার বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় ব্যর্থ হয়, কারণ শিল্প-পুঁজির চাহিদা ছিল ভারতবর্ষীয় বাজারের উন্মুক্ততা, আর ফিফথ রিপোর্ট তা দিতে পারেনি।

‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বনাম বাণিজ্যিক স্বাধীনতা’ এই দ্বন্দ্ব ছিল ব্রিটিশ পুঁজিবাদ ও উপনিবেশবাদের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটা প্রমাণ করে কোম্পানির ‘রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা’র যুক্তি আসলে তার নিজস্ব বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার কৌশল, আর জাতীয় স্বার্থে বাণিজ্য উন্মুক্তকরণের যুক্তি ছিল উদীয়মান শিল্প-পুঁজির মুক্তির সংগ্রাম। এই সংগ্রামের ফলেই ভারতবর্ষীয় উপমহাদেশের অর্থনীতির প্রকৃতি নির্ধারিত হয়, যা ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের শোষণ-কাঠামোর পটভূমি তৈরি করেছে।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন