Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে বিদ্যাসাগর — একটি কল্পিত সাক্ষাৎকার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ খোলা খামের পরে খোলা চিঠি : দিলীপ মজুমদার সুরাবর্দী অ্যাভিনিউ ও তিনি — ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-৮৬) : প্রলয় চক্রবর্তী ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘মেরিলিন মনরোর চশমা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কবি ধনঞ্জয় সাহার মুক্তছন্দে লেখা কাব্যগ্রন্থ বহুমাত্রিক স্বর : সসীমকুমার বাড়ৈ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৩৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায়

ড. দয়াময় রায় / ৫৪ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

প্রদীপ জ্বালানোর আগের যেমন সলতে পাকানোর প্রস্তুতি থাকে তেমনভাবে দু’একটি সাময়িক পত্র-পত্রিকার জন্ম হয়তো হয়েছে মানভূমের মাটিতে তার সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়েছে এইচ, কুপল্যান্ডের মানভূম গেজেটিয়ারের পাতায় —

“Two News Papers, the Manbhum and the Purulia Darpan dealing with topics of local interest are published at Purulia. The Santhal Mission Press at Pokhuria publishes a quarterly magazine dealing with the progress of Medical Mission in India.” (১)

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত জি. ই. এল, চার্চ পুরুলিয়া থেকে ‘জ্যোতিরিঙ্গন’ পত্রিকার প্রথম প্রকাশ ঘটে ১৮৬৮ সালে। এমনকি ১৮৭২ সালের ২৪ শে ফেব্রুয়ারি মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের আগমন ঘটে পুরুলিয়ায় আদালতে ওকালতির কাজে। এবং ২৫শে ফেব্রুয়ারি জি. ই. এল চার্চে কবি শ্রীমান খ্রিস্টদাসকে খ্রিস্টধর্ম দীক্ষাকালে ধর্মপিতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে ‘কবির ধর্মপুত্র’ নামে সনেটটি লেখেন যা ১৮৭২ সালে ‘জ্যোতিরিঙ্গন’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, অন্যদিকে পুরুলিয়া শহরে

কবিকে সম্মাননা প্রদান এবং কবি পুরুলিয়া নিয়ে কবিতাটি রচনা করেন যা পুরুলিয়া নাম রূপে বাংলা সাহিত্যে শব্দটি প্রথম আদৃত হয়। এই সনেটকল্প কবিতাটিও ‘জ্যোতিরিঙ্গন’ পত্রিকার মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। অথচ সেকথা ব্রিটিশ কথিত গেজেটিয়ারে জায়গা পায়নি। যাইহোক মুক্তি পত্রিকাটি মানভূমের সাধারণ সাহিত্য সংস্কৃতির ক্ষেত্রে, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের ক্ষেত্রে, এবং ভাষা আন্দোলনের বিশেষ ভাবে লোক সেবক সংঘের বিহার থেকে বঙ্গভুক্তির আন্দোলনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার রূপে চিহ্নিত হয়ে এসেছে। সেই পত্রিকার সুদীর্ঘ ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের, গর্বের, গরিমার অহংকারের, সমৃদ্ধির এক উজ্জ্বল অধ্যায়। ১৯২৫-২০২৫; অর্থাৎ শতবর্ষ অতিক্রান্ত একটি পত্রিকা। যার প্রথম সম্পাদক — শ্রী নিবারণ চন্দ্র দাসগুপ্ত। পত্রিকাটির প্রকাশ ঘটে — ২১ শে ডিসেম্বর, ১৯২৫।

১৯২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বিহার প্রাদেশিক কংগ্রেসের সম্মেলন পুরুলিয়া শহরে অনুষ্ঠিত হয়। এরপরেই স্বাধীনতার আন্দোলনকে বিকশিত করা, মানুষের কাছে সঠিক খবর পৌঁছে দেবার উদ্দেশ্যে দেশবন্ধু প্রেস থেকেই মুক্তি পত্রিকা ১৯২৫ সালের ২১ শে ডিসেম্বর সাপ্তাহিক পত্রিকা রূপে আত্মপ্রকাশ লাভ করে। এর প্রথম সম্পাদক নিবারণ চন্দ্র দাসগুপ্ত, প্রথম প্রকাশক সুরেন্দ্রনাথ নিয়োগী। ১৯৩৯ সালে মুক্তি প্রেসের নামকরণ করা হয় মুক্তি প্রেস।

মুক্তির প্রথম সংখ্যায় সম্পাদকীয়তে লেখেন — “বন্ধন দশার মুক্তির কথা ছাড়া আর কি কথা বলিবার আছে?”

মুক্তি পত্রিকা প্রকাশের নেপথ্যে মূল ভাবনা —

১) স্বাধীনতা সংগ্রামের ভাবনাকে আরও প্রসারিত করা।

২) স্বাধীনতা আন্দোলনের সংবাদগুলিকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

৩) পরাধীন মানুষকে মুক্তির স্বপ্নে বিভোর করে স্বাধীনতার আস্বাদে উদ্বুদ্ধ করা।

৪) বিশেষভাবে মানভূমের মানুষের বিপ্লবী চেতনাকে ঐক্যবদ্ধ করে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে আরও শানিত করা।

৫) সংগ্রামের বার্তা বাহক রূপে মুক্তি পত্রিকা জনগণের জনমনের স্বাধীন স্পৃহাকে ভাবনাকে প্রসারিত করে নির্ভীক মনোভাব পোষণের ধারণাকে প্রসারিত করা।

৬) অপরদিকে মুক্তির পাতায় বিপ্লবী ভাবনার গান কবিতা প্রবন্ধ নাটক প্রকাশ করে সাংস্কৃতিক উপাদান বৃদ্ধি করা।

৭) মুক্তির মূল শ্লোগান হয়ে উঠে — “জাগ্রত হও, উঠিয়া দাঁড়াও, মুক্তির পথে অগ্রসর হও…।” অর্থাৎ জনগণকে বিপ্লবের কথা বলে সেই বিপ্লবে জাতিধর্মনির্বিশেষে সকল মানুষকে আহ্বান জানানো হয়।

৮) কংগ্রেসের কর্মীদের কাছে দেশপ্রেমের মশাল জ্বালানোর অগ্নি শলাকা। এরূপ নানাভাবে মুক্তি পত্রিকা মানভূম তথা বাংলার মাটিকে আন্দোলিত করে, জাতীয় মুক্তি চেতনাকে প্রসারিত করে, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে পুষ্ট করে মুক্তি ভাবনাকে ত্বরান্বিত করে।

দক্ষিণ পশ্চিম সীমান্ত বাংলা ছাড়িয়ে সুদূর কোলকাতা থেকে প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয় মুক্তির পাতায়।

মুক্তির প্রথম দিকের (১৯২৫-২৮) এই সময়কালে সম্পাদকমন্ডলিতে ছিলেন সুরেন্দ্রনাথ নিয়োগী, ফণীন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত, দেবেন্দ্রনাথ বিশ্বাস। ১৯২৮ সালের ৩রা ডিসেম্বর সোমবারের মুক্তির পাতায় রাজদ্রোহ ‘বিপ্লব’ শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রকাশের জন্য ১৯২৯ সালের ৬ই মার্চ থেকে সম্পাদক নিবারণ চন্দ্র দাসগুপ্তকে এক বছরের জন্য এবং প্রকাশক সুরেন্দ্রনাথ নিয়োগীকে তিন মাসের কারাদণ্ড দেয় ব্রিটিশ সরকার। স্বভাবতই মুক্তি পত্রিকার দায়িত্বে আসেন ফণীন্দ্রনাথ দাসগুপ্ত ও বীররাঘব আচারিয়া। যদিও ১৯৩০ সালের ৫ই মে থেকে মুক্তির প্রকাশ বন্ধ করে দেয় সরকার।

১৯৩৯ সালের ২৬ শে জানুয়ারি থেকে অতুল চন্দ্র ঘোষের সম্পাদনায় মুক্তি প্রেস থেকে আবারও মুক্তি পায় মুক্তি। কিন্তু ১৯৪১ সালে ১৬ই জুন থেকে মুক্তির প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়, যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলা সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশ নেওয়া জেলা নেতৃত্বকে কারারুদ্ধ করে ব্রিটিশ। এমনকি ১৯৪২ সালের ব্রিটিশ বিরোধী প্রাণ সঞ্চারী আগস্ট আন্দোলনের আন্দোলনে শঙ্কিত ইংরেজ মুক্তি পত্রিকা প্রকাশনা সহ, প্রেস ও শিল্পাশ্রম বাজেয়াপ্ত করে। এর ফলে মুক্তি পত্রিকার প্রকাশ বন্ধ হয়ে যায়।

এরূপ আবহে মুক্তি পত্রিকা মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গঠন, সচেতনতা প্রসার, ভীত দিশাহীন মানুষের বুকেও আস্থা ও সাহস জাগানোর নিরন্তর চেষ্টার নামও মুক্তি। যার পাতায় পাতায় দ্রোহ চেতনার অগ্নি স্ফুলিঙ্গ প্রজ্জ্বলিত এবং সংবাদ সাহিত্য সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের মূলাধার এক চেতনা প্রবাহ।

মুক্তি পত্রিকার ধারাবাহিক ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যায় যে, মুক্তি পত্রিকা স্বাধীনতা আন্দোলনে অর্থাৎ ১৯২০ উত্তর গান্ধীজীর নেতৃত্বে যে মুক্তি আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে তার প্রচার প্রসারের দিকটি ১৯২১ সাল থেকে তীব্রতর হয়ে উঠে সারা দেশ জুড়ে। এই সময়কালে মানভূমের মুক্তি আন্দোলনের ধারায় ১৯২৫ সালের ২১ শে ডিসেম্বর মুক্তির প্রকাশ। স্বভাবতই মুক্তির জন্মই মানভূমের মানুষের কাছে বিপ্লবের বার্তা বাহক রূপে নিরন্তরভাবে এর পাতায় সংবাদ ফিচার কবিতা প্রবন্ধ সহ নানাবিধ খবর প্রকাশিত হতে থাকে।।

মুক্তি পত্রিকা ১৯২৫ থেকে ১৯৩৫ অর্থাৎ ঋষি নিবারণ চন্দ্র দাসগুপ্তের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ প্রভাবে জন মনে প্রভাব ফেলেছে তার ব্যাপ্তি প্রসারতা চূড়ান্ত।। এটিকে মুক্তির প্রথম পর্যায় বলা যায়। দ্বিতীয় পর্ব অর্থাৎ ১৯৩৫-১৯৪৭ ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তি স্বাধীনতার দিগ দর্শনের কাজ করে চলেছিল মুক্তি অর্থাৎ প্রথম ধাপের অহিংস অসহযোগ থেকে আইন অমান্য আন্দোলনের ধারাপাত বেয়ে ১৯৪২ সালের আগস্ট আগস্ট আন্দোলনে মুক্তির প্রচার জনমনে বিপুল সাড়া ফেলে। স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিমুখ প্রসারে, আন্দোলনের গভীরতা প্রচারে, আন্দোলনের খবর প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দিতে মুক্তির জুড়ি মেলা ভার।

আসলে মানভূম (১৮৩৩) বা পূর্বতন জংগল মহল জেলা (১৮০৫) ব্রিটিশ বিরোধিতার মূলসূত্রটি হলো জমিদার ভূস্বামীদের উপরে বাড়তি কর আদায়ের চাপ বাড়ায় ব্রিটিশ, ধীরে ধীরে এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষের উপরে স্থানীয় প্রশাসনের যে চাপ বাড়তে থাকে তার বিরুদ্ধে জমিদার শ্রেণি ও প্রজাসাধারণ বিদ্রোহী হয়ে উঠে। জল জমি আর জংগলের অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে থাকে, নিপীড়িত হতে থাকে অধিক রাজস্বের চাপে। এরই ফলশ্রুতিতে পুঞ্জীভূত দ্রোহ বাড়তে থাকে এসব অঞ্চলে — কোল বিদ্রোহ, ভূমিজ বিদ্রোহ, সিপাহি বিদ্রোহ, মুন্ডা বিদ্রোহ তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। সুকৌশলী ব্রিটিশ এসব বিদ্রোহের গুরুত্ব কমানোর জন্য, ছোট করে দেখবার অভিপ্রায়ে কখনো চুয়াড় বিদ্রোহ কখনো হাংগামা বলে অভিহিত করে আসলে এসমস্তই ছিল কৃষককুলের সংগ্রাম, জল জমি জংগলের অধিকার রক্ষার সংগ্রাম পক্ষান্তরে মুক্তির সংগ্রাম। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অপসাসনসহ অধিক কর আদায়ের পাশাপাশি এলাকার মানুষের সংগ্রামী চেতনাকে ভাঙার জন্য প্রশাসনিক শাসনতান্ত্রিক প্রতিবিধানের দোহাই। দিয়ে বারেবারে এতদ্ অঞ্চলের স্বাধীনচেতা এবং শান্তপ্রকৃতির মানুষের উপর বারেবারে অত্যাচার নিপীড়ন নামিয়ে নিয়ে এসেছে, কিন্তু সেই অত্যাচারের বিরুদ্ধে মানুষ সংগঠিত হয়েছে জোর জোর প্রতিবাদে।।

মুক্তির জন্মলগ্ন থেকে সাধারণ ভাবে পাঁচটি বিভাগ তার প্রকাশন উদ্যোগ উদ্যেশ্য বিধেয়।

কারণ,

১) ১৯২৫-১৯৩৫ ঋষি নিবারণ দাসগুপ্তের প্রত্যক্ষ প্রভাব নির্ভরতা কালীন।

২) ১৯৩৫ উত্তর ১৯৪৭ সাল অবধি মুক্তির সম্পাদনা ও প্রচারণা পর্ব।

৩) ১৯৪৭-৪৮ এই সময়ে স্বাধীন ভারতের যে স্বপ্ন ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠনের দাবি তার যৌক্তিকতায় এবং ১৯১১ সালের দরবার ডের ঘোষণায় মানভূম জেলা যেহেতু বিহার উড়িষ্যা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত হবার সিদ্ধান্ত হয় এবং ১৯১২ সালের ১লা এপ্রিল থেকে তা কার্যকর হয়। এরই প্রতিবাদে মানভূমের বাংলা ভাষা ভাষী মানুষ প্রতিবাদ আআন্দোলনে নামে ১৯১২ থেকেই। কিন্তু জাতীয় মুক্তি আন্দোলন তীব্রতর হবার কারণে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে। কিন্তু স্বাধীনতা প্রাপ্তির সাথে সাথেই সেই লড়াই দাবি মাথা চাড়া দিয়ে উঠে মুক্তি পত্রিকা হয়ে উঠে তার প্রধান হাতিয়ার।

৪) মুক্তিকে কেন্দ্র করেই ১৯৪৮ সাল থেকে গঠিত লোক সেবক সংঘের যাবতীয় কর্মকাণ্ড প্রচারিত হতে থাকে। এবং তা চলে ১৯৫৬ সালের ১লা নভেম্বর অব্ধি।

৫) ১৯৫০ সাল থেকেই মুক্তি লোক সেবক সংঘের মুখপত্র রূপে ভাষা আন্দোলনই নয় রাজনৈতিক আন্দোলনেরও হাতিয়ার হয়ে উঠে।

৬) ১৯৫৬ উত্তর কালেও রাজনীতি সমাজনীতি সাংস্কৃতিক নানান লেখা মুক্তির পাতায় প্রকাশিত হতে থাকে।

৭) মুক্তি পত্রিকা প্রকাশ পাবার সাথে সাথেই একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে শুধু মানভূমের মানুষের স্বাধীনতা স্পৃহার আশা আকাঙ্খার কথাই এর পাতায় মুদ্রিত হবে এটা নয় সারা দেশের মানুষের মনে স্বাধীনতার ভাবনা, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের প্রচার প্রসার এবং স্বাজাত্যবোধের জাগরণ ঘটানোর উৎসাহে এর প্রকাশ।

বিশেষ ভাবে মুক্তির প্রথম সংখ্যার প্রথম পাতায় কর্নেল উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের লেখা ‘দাসের গান’ নামে একটি কবিতা প্রকাশিত হয় ভারতের অধিবাসীদের মনে স্বদেশ প্রেমের জাগরণ ঘটাতে উদ্ধুদ্ধ করে —

“দেখিবে যাহারে, বলিবে তাহারে, কি কর অলসে বসিয়া ভাই!

কি সুখে মগন মুদিয়া নয়ন, আবেশে জীবন যাপিছ ভাই?

কর্ণ পাতিয়া করহ শ্রবণ, অনাথ অনাথা করিছে রোদন,

মুছাতে তাদের সজল নয়ন, মনে কি তোমার বাসনা নাই?

***

অলস জীবন সত্য বচন, সুকাজে অশক্ত স্বকর চরণ,

এই যদি হয় ধর্মের লক্ষণ, দূর করি এস পূজা পুঁথি ছাই।”

সেকালের শিল্পাশ্রম মানভূমবাসীর জেলার স্বাধীনতা আন্দোলনের আশ্রয় ভরসাস্থল হয়ে উঠেছিল। আর মানভূমবাসীর মনে স্বাজাত্যবোধের উদগীরণ ঘটিয়ে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষকে জাগানোর জন্য মুক্তি পত্রিকা মানভূম কংগ্রেসের মুখপত্র রূপে প্রকাশিত হয়।।

সম্পাদকীয়তে নিবারণ চন্দ্র দাসগুপ্ত লিখলেন —

“বন্ধন দশায় মুক্তির কথা ছাড়া আর কি বলিবার আছে? পরাধীন দেশে স্বাধীনতার চেষ্টা ব্যতীত আর কি করিবার আছে? পর নির্ভরশীল জাতির পক্ষে স্বরাজ লাভের উপায় চিন্তন ব্যতীত আর কি করিবার আছে? —

ত্রিশ কোটি মানবের জন্মভূমি, সর্ব প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি, এই বিশাল ভারতবর্ষ কিসে পুনরায় আত্মস্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হইবে, কেমন করিয়া এই শৃঙ্খলিত, নিষ্পেষিত, নির্যাতীত, দেশটি তাহার দৈন্য দুর্দশা হইতে বিমুক্ত হইয়া পূর্ণ গৌরবে অধিষ্ঠিত হইবে, কি উপায় অবলম্বন করিলে মোক্ষধর্মের প্রচার ক্ষেত্র এই মুক্তিক্ষেত্র দাসত্বের বন্ধন হইতে মুক্তিলাভ করিবে, তাহাই করিয়া দেখা, নির্ভীকভাবে তাহার প্রচার করা এবং সমস্ত শক্তি একই উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করা। শৃঙ্খলাবদ্ধ জননীর বন্ধন মুক্তির চিন্তা ব্যতীত সন্তানের হৃদয়ে আর কি ভাবনা স্থান লাভ করিবে? ইহাই আমাদের মুক্তির কল্পনা। সালোক্য, সাযুজ্য, প্রভৃতি শাস্ত্রোক্ত মুক্তির কথা ভাবিবার এখন সময় নাই।”

অর্থাৎ প্রতি সংখ্যায় প্রতি কলমে “শুধু মুক্তির বাণীই প্রচারিত হউক।” এজাতীয় স্বাধীনতার প্রেরণা জোগাতে মুক্তির জুড়ি মেলা ভার।

সুমহান দেশ সেবার সুমহান ব্রত সাধনার লক্ষ্যে মুক্তি পত্রিকার ৫ম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় ছেপেছিল অনবদ্য প্রতিবেদন — “লাহোর কংগ্রেসে গৃহীত পূর্ণ স্বাধীনতা সম্পর্কীয় প্রস্তাবের তাৎপর্য দেশের সর্বত্র প্রচার করিবার উদ্দেশ্যে ১২ই মাঘ (১৩৩৬) ২৬শে জানুয়ারি (১৯৩০) রবিবার ‘স্বাধীনতা দিবস’ পালিত হইবে নিখিল ভারত কংগ্রেস কার্যকরী সমিতি কর্তৃক স্থির হইয়াছে।”

আসলে মুক্তির পাতায় পাতায় বিষয় বিন্যাস ছিল বৈচিত্র‍্যের বৈভবে পূর্ণ। যার মধ্যে প্রধান দিক ছিল জাতীয় মুক্তি আন্দোলন সংক্রান্ত চেতনার প্রচারণা। দ্বিতীয়ত সারা দেশের বুকে কংগ্রেসের মুক্তি চেতনার প্রসারকল্পে যাবতীয় কর্মকাণ্ড তাকে তুলে ধরা। তৃতীয়ত মহাত্মা গান্ধীসহ জাতীয় নেতৃত্বের বক্তব্য কেন্দ্রিক খবর প্রকাশ করা।

চতুর্থত মানভূমের মানুষের মুক্তি চেতনার প্রতিটি খবর, স্থানীয় যাকিছু দেশপ্রেমের সংবাদ পরিবেশন করা।

পঞ্চমত দেশ বিদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতি জন জাতির সংস্কার সংস্কৃতির কথা ছাড়াও অন্যান্য নানান সংবাদ যেমন সাহিত্য, ক্রীড়ার খবর সহ কবিতা গান নাটক হাস্যরসাত্মক লেকা প্রতিবেদিত হতো পাতায় পাতায়।

মুক্তির পাতায় প্রকাশিত হয় বিপ্লব নামে এক প্রতিবেদন, এর জন্য ব্রিটিশ সম্পাদক ঋষি নিবারণচন্দ্র দাসগুপ্ত এবং প্রকাশক মুদ্রাকর সুরেন্দ্রনাথ নিয়োগীর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহ মূলক মামলায় যথাক্রমে উনাদের একবছর ও তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ডাদেশ দেয়। পরবর্তীতে আবারও বেশ কয়েকবার মুক্তি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয় এবং প্রেস বাজেয়াপ্ত করে ব্রিটিশ সরকার।

পরবর্তী ক্ষেত্রে মুক্তির সাথে তরুণশক্তি পত্রিকাও বন্ধ করে দেওয়া হয়।

আসলে মুক্তি পত্রিকা তার জন্মলগ্ন থেকেই ভারতের মুক্তিসাধনার ক্ষেত্রে সমগ্র জাতিকে উদ্বুদ্ধ করেছে মুক্তি সংগ্রামের বিজয়গাঁথায় একটি করে মালা গাঁথতে, যাতে তা আরও বিকশিত হতে পারে পরাধীন দেশের মানুষের কাছে, তাঁরা প্রবল বিক্রমে ব্রিটিশ শক্তিকে পর্যূদস্ত করে জাতীয় মুক্তিকে ত্বরান্বিত করে তুলবে, এই স্বপ্ন, এই বাস্তবতার অচ্ছেদ্যবন্ধনেই মুক্তির প্রকাশ বিকাশ উত্তরণ ঐতিহ্য উত্তরাধিকার।

সহায়ক ঋন স্বীকার

১) আমার জীবন – স্বামী অসীমানন্দ সরস্বতীর আত্মজীবনী, প্রথম হইতে ষষ্ঠ খন্ড একত্রে , শ্রীভারতীদেবী, দ্বিতীয় অখন্ড সংস্করণ, সদ গ্রন্থ প্রকাশনী, শিবরাত্রি, ১৪২৬।

২) মুক্তি পত্রিকা, মানভূমে স্বদেশ চেতনার অগ্রদূত, প্রথম পর্ব, (১৯২৫-১৯৩০ ), ক্ষীরোদ চন্দ্র মাহাতো, প্রাচ্য পাশ্চাত্য, ডিসেম্বর, ২০২৫।

৩) স্বাধীনতা সংগ্রামী নিবারণ চন্দ্র দাসগুপ্ত, জীবন ও চিন্তাধারা, ড. প্রদীপ কুমার মন্ডল, টরিয়েন পাবলিকেশনস, প্রথম প্রকাশ, ১৪ই ডিসেম্বর, ২০২৫।

৪) পুরুলিয়া, তরুণদেব ভট্টাচার্য , ফার্মা কে, এল, এম, প্রা: লিমিটেড, কোলকাতা, ১৯৮৬।

৫) মুক্তি পত্রিকা, সুবর্ণ জয়ন্তী সংখ্যা, ১৯৯২।


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন