কমিশনাররা আশা প্রকাশ করলেন, তাঁদের উদ্যমে তৈরি বিপুল নথিপত্র আর তথ্য-উপাত্ত নতুন বন্দোবস্ত settlement চালু করার জন্য প্রয়োজনীয় ভিত্তি জোগাতে সাহায্য করবে; আর যদি কোনো জমিদার চুক্তিবদ্ধ হতে অস্বীকৃতি জানান, তবে বর্তমান তথ্য ভিত্তি করে সরকার সংশ্লিষ্ট জমিদারি ভাগ করতে এবং অবাধ্য জমিদারদের কোনও রকম সাহায্য ছাড়াই সরাসরি রাজস্ব আদায় করতে পারবে। বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া শুরুর লক্ষ্যে কমিশনাররা এমন কিছু উপায় আর পদ্ধতি বিষয়ে মত দিয়েছিলেন, যা দিয়ে যাচাই করা সম্ভব হবে — জমিগুলো প্রকৃতপক্ষে রাজস্ব বৃদ্ধির ফলে উৎপাদকতার কমার শিকার কি না এবং বর্তমান সময়ের রাজস্বের বোঝা বহন করতে আদৌ পারবে কি না। কোনো জেলার রাজস্ব বাড়া বা কমার কারণগুলোকে (১) সাময়িক, (২) স্থির এবং (৩) বাড়তে থাকা (প্রোগ্রেসিভ) — এই তিন শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। রাজস্ব কমানোর পরিকল্পনা নেওয়ার সময় রাজস্ব পাওয়ার পরিবর্তনের কারনের এই পার্থক্য বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন; অথচ দেখা যায়, ফ্রান্সিস ধরে নিয়েছিলেন বাংলার প্রতিটি জেলা একই সাথে বাড়তে থাকা অবক্ষয়ের শিকার। দেশের পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনায় (যা নিয়ে ফ্রান্সিসের আপত্তি ছিল) যদি দেখা যায় যে ‘নিরিখ’ (nirik) বা ভূমি-রাজস্বের হার বাড়ার সাথে সাথে চাষাবাদের পরিমাণও বেড়েছে, তবে সেই জেলাকে সমৃদ্ধ অবস্থায় আছে বলে গণ্য করা যেতে পারে। অন্যদিকে, যেখানে ‘নিরিখ’ বাড়ানো সত্ত্বেও জনসংখ্যা হ্রাস পেয়েছে — এবং সেই জনশূন্যতার পেছনে অন্য কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি — সেখানে ধরে নেওয়া যেতে পারে যে, অত্যধিক রাজস্বের বোঝা বা চাপের কারণে জেলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। যেসব ক্ষেত্রে কৃষকরা ফসল দিয়ে (পণ্য হিসেবে) রাজস্ব শোধ করতেন, সেখানে নির্দিষ্ট বছরে শস্যের মূল্য কমে যাওয়া কিংবা তীব্র খরার কারণে রাজস্ব শোধ বাধা পেলে — সেই তারতম্যের কারণ স্পষ্টতই ছিল সাময়িক প্রকৃতির। অন্যদিকে, নতুন গ্রাম বা বাজার পত্তন কিংবা রাজস্ব/শুল্ক রদ করার মতো বিষয়ের প্রভাব ছিল স্থায়ী বা সুনির্দিষ্ট; ঠিক যেমন নদীর ভাঙন বা আগ্রাসনের প্রভাবও ছিল দীর্ঘস্থায়ী। কমিশনারদের মতে, রাজস্বের এই ক্রমিক হ্রাস-বৃদ্ধির কারণগুলো ব্যাখ্যা করা কঠিন হলেও, “স্থানীয় প্রত্যেক ‘মুতাশদ্দি’ (কর্মচারী) তা সহজেই বুঝতেন।” রাজস্ব ও জনসংখ্যা — দুটোরই বার্ষিক বৃদ্ধি, অথবা জনসংখ্যা হ্রাসের পাশাপাশি রাজস্বের হার কমিয়ে আনা (যা সুনির্দিষ্টভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হয়ে থাকে) — এসবের সমন্বয় এমন সব প্রগতিশীল বা পরিবর্তনশীল কারণের অস্তিত্ব নির্দেশ করে, যেমন মুদ্রার (বা নগদ অর্থের) অভাব বা প্রাচুর্য কিংবা করের বোঝা বৃদ্ধি বা হ্রাস।
ফ্রান্সিসের যুক্তিতে কার্যত ধরেই নেওয়া হয়েছিল যে জমিদাররাই ছিলেন প্রকৃত চাষি এবং তাঁদের অনুকূলে ভূমি-রাজস্ব হ্রাস করলে তা সরাসরি কৃষিকাজের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে — বা তাঁর ভাষায়, এর ফলে “দেশের অবস্থার উন্নতি” হবে। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে কীভাবে ‘সার্বভৌম আধিপত্য’ (over-lordship) ক্রমশ ‘ভূমি-মালিকানা’র (landlordship) রূপ ধারণ করতে পারে — তা অনুধাবন করা আমাদের পক্ষে খুব একটা কঠিন নয়। একইভাবে এই বিষটাও বোঝা কঠিন নয়, যে কৃষক — প্রাথমিকভাবে জঙ্গল পরিষ্কার করে জমি আবাদ করার মাধ্যমে এবং পরবর্তীতে নিরবচ্ছিন্ন চাষাবাদের সুবাদে — জমির ওপর এক ধরণের সামাজিক মর্যাদা আর অধিকার অর্জন করেছিলেন; তিনি কীভাবে কোনো আধিপতির নিপীড়ন কিংবা দুর্ভিক্ষের কারণে সৃষ্ট চরম দুর্দশার মুখে পড়ে — জমির ওপর নিজের স্থায়ী অধিকার দাবি করা তো দূরের কথা — বরং কোনো প্রকার শাস্তি বা বাধা ছাড়াই জমি ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেলে সেই অপশনটি সাদরে গ্রহণ করতেন। যারা বিশ্বাস করতেন, জমিদার কেবল কৃষকদের থেকে রাজস্ব আদায়ের জন্য রাষ্ট্র-নিযুক্ত একজন সংগ্রাহকই নন, বরং জমির প্রকৃত মালিকও বটে — তারা স্বভাবতই মনে করতেন, রাজস্ব-দায়ী জমির কৃষিকাজের উন্নতি সাধনে জমিদারদের স্বাভাবিক আর সহজাত আগ্রহ থাকবে। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা সবসময় এই ধারণার সম্পূর্ণ উল্টো সাক্ষ্যই দিয়েছে। জমিদার হয়তো তার নিজের ‘নানকর’ (nankar) বা খাস জমিতে কৃষিকাজের উন্নত পদ্ধতি প্রয়োগ করতেও পারেন, আবার নাও করতে পারেন; কিন্তু ‘খুদকস্ত’ (নিজস্ব চাষি) রায়তদের জমি থেকে তিনি ঠিক সেটাই প্রত্যাশা করতেন, যা রাষ্ট্র তার নিজের কাছ থেকে প্রত্যাশা করত — অর্থাৎ, রাজস্বের পরিমাণ ক্রমাগত বৃদ্ধি। কমিশনাররা হয়তো ঠিক এতটা আমূল বা মৌলিক ব্যাখ্যায় উপনীত হননি; তবে তারা যখন বললেন — “যেসব ক্ষেত্রে রাজস্ব মওকুফ করা বা ছাড় দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে, সেখানে এমন বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে — যদি একই সময়ে রায়তদের ওপর ধার্য করা ‘আবওয়াব’ (abwabs) বা অতিরিক্ত করের একটি নির্দিষ্ট অংশও মওকুফ করা না হয় — তবে সরকারের দেওয়া সেই ছাড় বা সুবিধা, বিশেষ করে বড় বড় জমিদারীগুলোতে, সাধারণ নিম্নবিত্ত মানুষের কাছে খুব কমই পৌঁছাবে, আর তাদের উপকারে আসবে না” — তখন তারা কার্যত সেই মৌলিক ব্যাখ্যারই অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছে গিছিলেন। (উদাহরণস্বরূপ ১৭৭০-এ রংপুরের সুপারভাইজারের এক চিঠি উদ্ধৃত করা যেতে পারে: “দরিদ্র রায়তরা, (লোয়ার ক্লাস পিপল) যাদের সব ধরনের উৎসাহ পাওয়া উচিত, বিশেষ করে এমন দুর্দিনে, খরার জন্য তাদের দেওয়া ভাতায় কোনো লাভ পাউ নি; বরং এটা তাদের জন্য ক্ষতিকর ছিল, কারণ জমিদার আর কৃষকরা, যাদের প্রথমে ১,৪৯,০০০ টাকা ছাড় দেওয়া হয়েছিল, তারা সেই ছাড়ের কারণে তাদের কাছ থেকে সেই পরিমাণ অর্থ এবং সেই সাথে মাহতুতের ৯২,০০০ টাকা আদায় করেছিল। আমার বিশ্বাস, তিনি, অর্থাৎ আমিল, এর কোনো অংশ পেয়েছিলেন বলে মনে হয় না; কেবল জমিদার এবং আদায়ের কাজে নিযুক্ত সরকারি কর্মচারীরাই এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে আমি ধারণা করতে পারি।”)
সরকারের পক্ষে অতি-সূক্ষ্ম আর্থিক গবেষণায় লিপ্ত হওয়ার বিষয়ে ফ্রান্সিসের যে আপত্তি ছিল, তা দশশালা বন্দোবস্তের জন্য ‘পরিচালক সভা’ (Court of Directors)-এর নির্দেশাবলীতে ফলপ্রসূ হয়েছিল; ওই নির্দেশাবলীতে বলা হয়েছিল, “জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের লক্ষ্যে অতি-সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষা বা নতুন করে স্থানীয় তদন্ত চালানো নিরুৎসাহিত করা হলো।” তবে লর্ড কর্নওয়ালিস ‘রাজস্ব বোর্ড’-এর (Board of Revenue) কাছে এই ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন মনে করেছিলেন (৫ই ফেব্রুয়ারি, ১৭৮৭) যে, এই নির্দেশনার উদ্দেশ্য এমন ছিল না যে — “কোনো জেলার প্রকৃত সম্পদ বা সামর্থ্য সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে স্থানীয় তদন্ত চালানো থেকে বিরত থাকা দরকার; বিশেষত যেখানে নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাব কিংবা অন্য বিশেষ পরিস্থিতিতে এমন তদন্ত অত্যন্ত মূল্যবান বা অপরিহার্য হয়ে উঠা দরকার আছে।” (২রা এপ্রিল, ১৮১৫ তারিখে লেখা এক মন্তব্যে সর্বশ্রী টি. সিসন উল্লেখ করেন: “রংপুর জেলাটি ঠিক এই ব্যতিক্রমী শর্তের আওতাভুক্ত হওয়ার যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও, দুর্ভাগ্যবশত এটিকে সেই সাধারণ নীতি বা বিধির আওতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়নি। ফলে দেখা গেল — দিনাজপুর জেলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি যা নিঃসন্দেহে রংপুর জেলার পরিস্থিতির মতোই ছিল — সেখানে শ্রী হ্যাচ-এর অদম্য উৎসাহ, অধ্যবসায় আর দক্ষতার সুবাদে প্রতি পরগণার অভ্যন্তরীণ সম্পদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে অতি-সূক্ষ্ম তদন্তের ফলের ওপর ভিত্তি করে বন্দোবস্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলো; অথচ রংপুর জেলার বন্দোবস্ত প্রতিষ্ঠিত হলো পূর্ববর্তী বন্দোবস্তগুলোর সেই অনিশ্চিত মানদণ্ডের ওপর, যার ভিত্তি ছিল কেবলই অনুমান ও ধারণা।” “সর্বশ্রী হ্যাচ তাঁর সমগ্র জেলা স্বয়ং পরিদর্শন করেন এবং এর মাধ্যমে দেশের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান লাভ করেন; অতঃপর তিনি সেই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে সুশৃঙ্খল করার কঠিন দায়িত্ব অবিচল অধ্যবসায়ের সাথে পালন করতে শুরু করেন এবং শেষমেশ এমন এক বন্দোবস্ত ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ দেন, যা পরের প্রজন্মের কাছে তাঁর নাম সম্মানের সাথে স্মরণীয় করে রাখতে বাধ্য করবে। পক্ষান্তরে, সর্বশ্রী পার্লিং রংপুর জেলার মফস্বল অর্থনীতির সেই জটিল বিশৃঙ্খলায় নতি স্বীকার করেন এবং এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এমন সব সমস্যার বোঝা রেখে যান, যার প্রতিকার করা বর্তমানে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।” ১৭৮৭-তে লএখা এক চিঠিতে ডি. এইচ. ম্যাকডাওয়াল “রংপুর জেলার প্রকৃত সম্পদ বা সামর্থ্য সম্পর্কে একটি বিশেষ ও বিস্তারিত তদন্ত চালানোর” জন্য জোরালো আবেদন জানিয়েছিলেন; কিন্তু দৃশ্যত তাঁর সেই আবেদনে কেউ বিশেষ উৎসাহ প্রদর্শন করেননি। (গ্লেজিয়ার: রংপুর নথিপত্র বিষয়ক আরও কিছু টীকা — Further Notes on the Rungpore Records, ১৮৭৬)।)
কোর্ট অব ডিরেকটরস (Court of Directors) রাজস্ব সংগ্রহের সাধারণ পরিকল্পনার বিষয়ে মতামত দিতে যতটা দেরি করতেন, তাদের নিযুক্ত গভর্নরের কাজে ত্রুটি খুঁজে বের করতে ঠিক ততটাই তাড়াহুড়ো করা তাদের স্বভাব ছিল। ৩রা ফেব্রুয়ারি তারা লেখেন: …
“অনুচ্ছেদ ৮। আমরা আশঙ্কা করছি, বাংলায় আমাদের রাজস্ব অনুসন্ধান আর আদায়ের ক্ষেত্রে একটা পদ্ধতি থেকে অন্য পদ্ধতিতে আকস্মিক পরিবর্তন হয়তো এখানকার অধিবাসীদের — বিশেষ করে স্থানীয় জমিদার আর ভূস্বামীদের — মনে ভীতির তৈরি করেছে, আমাদের স্থিতিশীলতার প্রতি তাদের আস্থা কমিয়েছে এবং এর ফলে অন্য অনিষ্ট কর্মেরও উদ্ভব হয়েছে; তা সত্ত্বেও, যেহেতু সব কটা মহলেই স্বীকৃত যে, এই পরিবর্তনের ফলে সুফল অর্জিত হয়েছে — আর তা হলো, কোনো প্রকার নিপীড়ন ছাড়াই এ দেশ থেকে ঠিক কী পরিমাণ রাজস্ব আদায় করা সম্ভব, তা যথেষ্ট নির্ভুলভাবে নিরূপণ করা সম্ভব হয়েছে — তাই আমরা এই প্রাপ্ত তথ্য সদ্ব্যবহার করব। অধিকন্তু, এই বিষয়ে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি, কোম্পানির বিন্দুমাত্র অসুবিধা সৃষ্টি না করেই স্থানীয় অধিবাসীদের যথাযথ প্রতিকার বা স্বস্তি দেওয়া আমাদের সাধ্যের মধ্যেই রয়েছে।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ