মাঝিপাড়ার মাঠে রোদটা আজ যেন একটু বেশিই ঝাঁঝালো।
আকাশে একটুকরো মেঘ নেই। লাঠিতে ভর দিয়ে ধীরে ধীরে আলপথে নামল ফুলমনি। হাঁটতে হাঁটতে বারবার থামছে। বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। হাঁটুতে ব্যথা, চোখেও ঝাপসা দেখে। তবু আজ মন টিকল না ঘরে। কতদিন পরে সে এসেছে এই মাঠে — একবার শুধু দেখবে বলে।
আলপথে দাঁড়িয়েই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
এ কেমন মাঠ?
যেদিকে তাকায়, সেদিকে আগাছা। কোথাও ধানের সবুজ নেই, কোথাও চাষের দাগ নেই। জমির বুক চিরে সাদা কংক্রিটের পিলার দাঁড়িয়ে আছে। লাল রঙে টানা সীমানার দাগ যেন মাটির গায়ে ক্ষতের মত।
ফুলমনি বিড়বিড় করে বলল,
“এ কুন মাঠ রে? হামার মাঝিপাড়ার মাঠডা কুথাক গেলো ?”
কথাটা শেষ হতেই যেন সময় উল্টো দিকে হাঁটতে শুরু করল।
তখন সে নতুন বউ। ভোরের আলো ফুটতেই মরদ শামপদের সঙ্গে মাঠে চলে আসত। শামপদ ছিল কালো কুচকুচে, চওড়া বুকের মানুষ। হাসলে চোখ দুটো চিকচিক করত।
একদিন ভোরে বলদ জোত দিতে দিতে শামপদ বলেছিল,”ও ফুলা, তুই এত ডেরি করলিক কেনে ? সূরুজ তো মাথায় উঠবেক।” ফুলমনি হেসে উত্তর দিয়েছিল,
“তর লিগা ভাত রাঁধমু কেনে? খালি লাঙল ধরলেই সংসার চলবেক?”
“সংসার তুই চালাস, হামি শুধু মাটিডা চষি।”
“তা-ই নাকি? মাসের শ্যাষে চাল ফুরাইকলে কেঁদে কে বেড়্যায়?”
শামপদ হো-হো করে হেসে উঠেছিল।
দুজনের হাসি ভোরের মাঠে ছড়িয়ে পড়েছিল।
ধান রোপণের সময় দুজন পাশাপাশি কাজ করত। ফুলমনি চারা মেরে দিত, শামপদ সারি মিলিয়ে বসাত। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করেই শামপদ কাদা ছুড়ে দিত ফুলমনির গায়ে।
“এই! কী করলি?”
“মাছ ধইরলাম।”
“মাছ কই?”
“এই যে, কাদার ভেতর।”
ফুলমনি রাগ দেখিয়ে তাড়া করলে শামপদ হেসে দৌড় দিত। পাশের জমির মুনিষেরা হাসাহাসি করত।
দুপুরে আলের ওপর বসে দুজনে ভাত খেত। হাঁড়িতে মোটা চালের ভাত, কাঁচা পেঁয়াজ, শুকনো লঙ্কা আর নুন।
শামপদ এক গ্রাস ভাত মুখে দিয়েই বলত,
“আহা! তোর হাতের ভাত খেইলেই খাটনির জোর ডাবল হইয়্যা যায়।”
ফুলমনি ঠোঁট উল্টে বলত,”জোর যদি এতই বাড়ে, তাইলে আরেক বিঘা জমি পুঁতে দে দেখি।”
“হ। এই বচ্ছর ফলন ভালো হল্যে একজড়া রুপার নূপুর কিনমু তোর লিগে।”
“আগের বচ্ছরও বুলেছিলি।”
“ইবারে সাচ কুথা বুললাম।”
“তর সাচ কথা শুনতে শুনতে হামার চুল পিকা গেল রে।”
শামপদ মুচকি হেসে বলত,”চুল পাকুক, তবু তুই হামার ফুলাই থাকবিক।”
ফুলমনি লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিত।
বর্ষা পেরিয়ে যখন ধান পেকে উঠত, মাঠ যেন সোনার চাদর পরে থাকত। ধান কাটার সময় সারা মাঠে গান উঠত। টুসুর দিন, বাহা পরব, করমের নাচ — সব উৎসবের প্রাণ ছিল এই মাঠ। কাজের ফাঁকে শামপদ বাঁশি বাজাত। দূরের জমি থেকেও মানুষ শুনে বলত,
“শামপদ আবার বাঁশি বাজাইছে।”
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরতে ফিরতে ফুলমনি বলত, “এত বাজাইস না, কাজের জোর কমে যাইবেক।”
“বাঁশি না বাজাইলে মাটিও অভিমান করে রে ফুলা।”
ফুলমনি বিশ্বাস করত, সত্যিই তাই। এই মাঠ শুধু জমি নয়; এ যেন তাদের সংসারের আর-একজন মানুষ।
বছর ঘুরে রাখহরির জন্ম হল। ছেলেকে গামছার উপর আলের পাশে শুইয়ে রেখে দুজনে ধান কাটত। মাঝে মাঝে বাচ্চা কেঁদে উঠলে শামপদ কাস্তে রেখে ছুটে যেত।
“ওরে, হামার বাপধন আবার খিদা পাইছেক নাকি?”
ফুলমনি হেসে বলত,”বাপের মুতোই খাইখাই।”
সুখ বলতে যদি কিছু থাকে, তবে সে ছিল ওইসব দিনেই।
কিন্তু সুখ কখনও চিরকাল থাকে না।
এক বর্ষার শেষে শামপদের জ্বর এল। প্রথমে কেউ গুরুত্ব দিল না। সবাই বলল, দু-চার দিনের জ্বর। কিন্তু জ্বর আর নামল না। দিন গড়াল, মাস গড়াল। একসময়ের তাগড়াই মানুষটা খাটিয়ায় শুয়ে কাঠির মতো শুকিয়ে গেল।
এক সন্ধ্যায় ফুলমনির হাত চেপে ধরে শামপদ শুধু বলেছিল,”ফুলা… মাটিটারে ছাড়িস নাই রে…।”
তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুজে এল।
সেই দিন থেকে ফুলমনির পৃথিবীটা যেন এক লহমায় বুড়িয়ে গেল।
দুই.
শামপদের মৃত্যুর পর মাঠে আর আগের মত নামতে পারত না ফুলমনি। তবু পেট তো মানে না। অন্যের জমিতে নিড়ানি দিয়েছে, ধান কেটেছে, ধান মাড়াই করেছে। ছোট্ট রাখহরিকে মানুষ করার জন্য কতদিন আধপেটা থেকেছে, সে হিসেব আর কেউ রাখেনি।
ছেলেটা বড় হল, বিয়েও করল। ফুলমনি ভেবেছিল, এবার হয়তো ঘরে আবার মানুষের হাসির শব্দ ফিরবে। কিন্তু কয়েক মাস না যেতেই রাখহরি একদিন মাথা নিচু করে বলল,”মা, শ্বশুরমশাই বুলেছে, ওদিকেই থাকলেক কামকাজের সুবিধা হোবে।”
ফুলমনির বুকটা ধক করে উঠেছিল।
“তাইলে হামি?”
“তুই তো লিজের ঘরেই আছিস। হামি মাঝে মাঝে এসে দ্যাখা করে যাবোক রে।” রাখহরি নির্বিকারে উত্তর দিয়েছিল।
ফুলমনি আর কিছু বলেনি। শুধু ছেলের মাথায় হাত রেখে বলেছিল,”যা বাপ, তুই সুখে থাকিস কেনে। মায়ের চিন্তা কইরে হইবেক লাই।”
সেই “মাঝে মাঝে” আর কোনদিন এল না।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের চেহারাও বদলে গেল। বলদ হারিয়ে গেল, লাঙলের জায়গায় ট্রাক্টর এল। ঢেঁকির শব্দ থেমে গেল। ধান ভানার গান আর শোনা যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই শহরে চলে গেল। মাঠে মানুষের ভিড় কমতে কমতে একদিন প্রায় ফুরিয়েই গেল।
ফুলমনি মাঝিপাড়ার একফালি পাট্টার জমিতে একাই রয়ে গেল। ভাঙা মাটির দেওয়াল, খড়ের চাল, উঠোনে একখানা নিমগাছ — এই ছিল তার সংসার।
কদিন ধরে তার মন কেমন অস্থির হচ্ছিল। বারবার মনে হচ্ছিল, একবার মাঠটা দেখে আসে। কতদিন যাওয়া হয়নি!
সেই টানেই আজ সে এসেছে।
ঠিক তখনই আলপথ ধরে ভাদু মোড়লকে আসতে দেখল।
“ও ভাদু!” ভাদু চমকে তাকাল।
“আরে ফুলমনি কাকি! তুই এই রোদে?”
“হাঁগো , এ কী দশা হইছেক মাঠের? ধান নাই, মানুষ নাই, এই পিলারগুলান কেনো গো ?
ভাদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,” শুনছি বড় কারখানা হোবে গো। শহর থিক্যা কোম্পানির লোক ইসেছিল। জমি মাপঝোক কইরেক গিছে। মালিকেরা কাগজে টিপ দিছে। বুলেছে, চাকরি হইবেক, উন্নতি হইবেক।”
ফুলমনি মাটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“আর চাষ?”
“চাষ আর কেডা করব খুড়ি? ছেলেপুলেরা শহরে যায়। জমির দাম পাইছে, তাই বেইচা দিছে।
ভাদু একটু থেমে আবার বলল,
“সুমায় বদলাই গেলছে রে।”
ফুলমনি ধীরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
“সুমায় বদলায়, ঠিক কথা ফোটে। কিন্তুক মাটির বুকও কি বদলাইয়া যায় রে?”
ভাদুর কোন উত্তর ছিল না।
ফুলমনি ধীরে ধীরে মাঠের ভেতরে নেমে গেল। আগাছায় তার পা জড়িয়ে যাচ্ছে। মনে হল, এই ঘাসগুলোই যেন তাকে চিনে রেখেছে। একটা পিলারের সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। হাত রাখল ঠান্ডা কংক্রিটের গায়ে।
এইখানেই একদিন শামপদ লাঙল ধরেছিল।
এইখানেই রাখহরিকে গামছার দোলনায় শুইয়ে ধান কেটেছিল সে।
এইখানেই কত হাসি, কত কান্না, কত স্বপ্ন বোনা ছিল।
আজ সেই মাটির বুক দাগ কেটে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
তার বুকের ভেতর যেন জমে থাকা সব কষ্ট একসঙ্গে জেগে উঠল।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল,
“শুনছিস মাটি? হামি এসিছি। তুই হামারে চিনলিক লাই তো?”
তার কণ্ঠস্বর মাঠের ওপর ঘুরে ফিরে এল।
আবার সে বলল,”এই মাটিতে হামার মরদের ঘাম আছে। হামার যৈবন আছে। হামার পোলার পেরথম পায়ের ছাপ আছে। কাগজে নাম লিখলি বুলেই মাটি কারও হইয়া যায় নে রে !”
চারদিকে নিস্তব্ধতা।
হঠাৎ পশ্চিম কোণের শুকনো ঘাসের ভেতর দপ করে একটা আগুন জ্বলে উঠল।
ভাদু চমকে উঠল।
“কাকি ! আগুন!”
একটা থেকে দুটো, দুটো থেকে আরও কয়েকটা শিখা। বাতাসের ঝাপটায় আগুন সরু রেখার মত ছড়িয়ে পড়তে লাগল মাঠের বুক জুড়ে। শুকনো ঘাস কটকট শব্দ করে জ্বলছে।
গ্রাম থেকে লোক ছুটে এল।
“জল আন!”
“আগুন নিভা!”
কেউ বলল, রোদের তাপে লেগেছে।
কেউ বলল, কে জানে বিড়ির আগুন।
কেউই নিশ্চিত হতে পারল না।
ফুলমনি শুধু জ্বলতে থাকা মাঠটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।
তার চোখে জল ছিল না।
ছিল বহু বছরের জমে থাকা আগুন।
মনে হল, জ্বলছে শুধু আগাছা নয় — জ্বলছে মানুষের লোভ, জ্বলছে স্মৃতিহীনতার অহংকার, জ্বলছে সেইসব কাগজ, যেগুলো মাটির গন্ধ বোঝে না।
ধীরে ধীরে লাঠিটা তুলে নিল ফুলমনি।
একবার শেষবারের মতো মাঠটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,”শামপদ, হামি আসেছিলম। তুর মাঠডা আর নাই রে…”
তারপর আলপথ ধরে ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
পেছনে আগুনের লাল আভায় মাঝিপাড়ার মাঠটা যেন অদ্ভুতভাবে জেগে উঠেছিল। যেন মাটি নিজেই তার বুকের জমে থাকা ক্ষোভ আগুনের ভাষায় বলে উঠেছে।
লোকজন সেই আগুন নেভানোর চেষ্টা করছিল।
আর ফুলমনি বুঝতে পারছিল — ফসল পোড়ার আগেই মানুষ তার মাটির সঙ্গে সম্পর্ক পুড়িয়ে ফেলেছে। সেই আগুনই সবচেয়ে ভয়ংকর।