সেবার হালদারবাড়িতে চোর পড়ল। কলতলায় রাখা এঁটো বাসনের স্তূপ ধুয়েমুছে সাফ। ঠাকুরঘর আর ভাঁড়ার ঘরের কর্তাদের আমলের ভারি তালা ভেঙে গোছ করা সব বাসন এমনকি তালাও লোপাট।
ঝি ছায়া মনে মনে কি খুশি! হালদার বাড়ি নাতো, যেন রাবণের গুষ্টি! ছাই আর সরষে খোল দিয়ে রগড়ে রগড়ে কাঁসার বাসন মাজতে মাজতে তার হাতে হাজা! তবুও সে গালে হাত দিয়ে নাটক করল, “ওমা গো! একটা রেকাবি, খুন্তি অবধি ছেড়ে যায়নি কো!”
হালদারদের বড় খোকার সকালে এক গ্লাস জল না খেলে বাহ্যে হয় না। কিন্তু জল খাবার একটা গ্লাসও চোরেদের হাত থেকে রক্ষা পায় নি। এজমালি বাসন চুরির চেয়েও এই সমস্যায় তার সকালটাই মাটি।
ছোটো বৌ মুখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছে, তার ছ’মাসের ছেলের দুধ খাওয়ার পদ্মবাটিটাও চোরে নিয়ে গেছে!
এ বাড়িতে বড়বউয়ের দাপটে স্টিলের বাসন এখনো ঢোকেনি, “ও তো লোহা, ম্যাগো! আমি বেঁচে থাকতে এ বাড়ির হেঁসেলে ইস্টিলের নাম করে চারটে লোহার বাসন আমি ঢুকতে দেব না, বলে দিচ্ছি!”
তাহলে কি আজ আপিস-কাছারি-ইস্কুল সব যাওয়া বন্ধ? এগারোটার আগে পাল বাসনালয় না খুললে তো এ বাড়িতে হাঁড়িই চড়বে না!
এই ঘটনার দিন পনেরো পর হালদার বাড়ির চুরির কথা সবাই ভুলতে বসেছে। থানায় ডাইরি করা হলেও পুলিশ তার কিনারা করতে পারেনি। চোর অধরা। সেদিন যখন দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে গোটা পাড়া, তখন সাধুচরণের মুদির দোকানে আবার বড়সড় চুরি। দু’মাসের তোলা মাল খুইয়ে সাধুচরণ মাথায় হাত চাপড়ে হাউহাউ করে কাঁদছে, “আমার সব গেল রে! সব গেল! আমি এখন কোথায় যাব, কি খাব!”
সত্তরের দশকের মধ্যবিত্ত বাঙালির বাড়িতে যা-ই চুরি যাক, সেটাই বড় লোকসান। পুলিশ তো কোনো গা’ই করছে না। পাড়ায় সবাই সন্ত্রস্ত। এবার কার বাড়ি? একটা হেস্তনেস্ত হওয়া দরকার!
পাড়ার মাথারা এক হল। দল বেঁধে মিটিং বসল ঘোষ মাস্টারের বৈঠকখানায়। ঘোষ মাস্টার এ পাড়ার মান্যগণ্য লোক। তিনি পরামর্শ দিলেন,
— রাত পাহারা শুরু হোক। পাড়ার প্রতিটি পুরুষ সপ্তাহে একদিন করে পাহারা দেওয়ার ডিউটি করবে।
— খালি হাতে?
হালদারদের মেজ ছেলে কানু জিজ্ঞেস করল। তাদের বাড়ি থেকেই চুরির সূত্রপাত। আগ্রহ দেখাতেই হবে!
— না। সবার হাতে একটা করে লাঠি আর একটা করে হুইশিল থাকবে। কেউ সন্দেহজনক কিছু দেখলেই সঙ্গে সঙ্গে বাঁশি বাজিয়ে অন্যদের সজাগ করে দেবে।
— লাঠি আর বাঁশি কেনার খরচ কি নিজের ট্যাঁক থেকে?
কিপটে বিকাশ পেট চুলকোতে চুলকোতে প্রশ্ন করল।
— তা কেন? পাড়ার সব বাড়ি থেকেই চাঁদা তোলা হবে।
ঘোষ মাস্টার বললেন।
অসীমের প্রস্তাব —
— রাতে একটু চায়ের ব্যবস্থা হবে না? ঘুম তাড়ানোর জন্য।
— হ্যাঁ, হ্যাঁ, সেটাতো করতেই হবে!
সমস্বরে সবাই বলে উঠল।
— তাহলে চা-দুধ-চিনির পয়সা চাঁদা তুলেই যোগাড় হবে।
অসীম আবার বলল।
মহা উৎসাহে লাঠির ঠকঠক আর হুইশিলের পিঁপ পিঁপ আওয়াজে রাত পাহারা শুরু হল। অনেকেই খুশি। এই উপলক্ষ্যে পাড়ায় বেশ একটা একতা ফিরে এসেছে।
এরমধ্যে ব্যাংক কর্মী অসীম একটু বেশি বয়সেই বিয়ের পিঁড়িতে বসল। তার রাত এখন দিনের চেয়েও মূল্যবান। রাতের পাহারায় তার ক’দিন ছুটি চাই।
রাত জেগে বিকাশের বদ হজম হচ্ছে সে সাফ জানিয়ে দিল, পাহারা দিতে আর পারবে না।
ঘোষ মাস্টার গরমের ছুটিতে বছরে একবার বৌ ছেলেপুলে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যান। সেই বিহারের মুঙ্গেরে গেলে তো আর চট করে ফেরত আসা যায় না। তাই মাস্টারের ও রাতের পাহারা থেকে একমাসের বিরতি।
সাধুচরণ আর কানুর বাড়ির চুরির ঘটনাতেই এ পাড়ায় রাত পাহারা শুরু হয়েছিল, তাই তারা চক্ষুলজ্জায় আর না বলতে পারে না। কিন্তু একে একে সবাই রণে ভঙ্গ দিতে শুরু করল। বয়স আর আরামের শরীর রাতজাগার ধকল নিতে পারছে না। যদিও এ পাড়া ও পাড়া থেকে চুরির খবর ও কিছু কম নেই। তাহলে উপায়!
আবার মিটিং বসল। তবে কি এবার বিল্লু, কাল্টু, বুড়ো, দেবু, চিতের ওপর এ দায়িত্ব দিতে হবে! এতদিন পাহারার কাজে ব্রাত্য ছিল পাড়ার এই উঠতি মস্তানরা। ধাপিতে বসে গুলতানি, তাস পেটানো, মেয়েদের টিটকিরি দেওয়া, তারস্বরে মাইক বাজিয়ে ফিস্টি করাই যাদের কাজ, তাদের কে ভরসা করবে! এই তো ক’দিন আগে ওরা মিত্তিরদের মেয়ের বিয়ের সময় নতুন বরের গাড়ি আটকে গ্রামভাঁটি চেয়ে পাড়ার মুখ কি কালোই না করল!
ঘোষ মাস্টার ওদের পারতপক্ষে এড়িয়ে চলেন। এবার কিন্তু উনি বললেন, — একবার দায়িত্ব দিয়ে দেখাই যাক না। ওদের বয়স কম। হাতে কোনো কাজ নেই। হয়তো উৎসাহ পাবে।
— ওরাই না দল পাকিয়ে আবার চুরি করে! এই তো আমার দোকানে কেতো আর চিতে ক’দিন আগেই বয়েম খুলে একমুঠো চানাচুর আর টফি তুলে পালাল। পরে পয়সা দেব বলে এখনো দেয়নি!
সাধুচরণের গলায় ঝাঁজ।
ঘোষ মাস্টার বললেন,
— দায়িত্ব দিলে, ভরসা করলে অনেক সময় এরা শুধরে যায়। ওরা ছাড়া আমাদের আর অন্য উপায়ও তো নেই!
এবার আবার রমরমিয়ে চলতে লাগল তরুণ তুর্কিদের রাত পাহারা। রাত এগারোটা থেকেই ঘনঘন হুইশিল আর লাঠির ঠকঠক আওয়াজের জোর এবার আরো বেশি। পারলে এরা সবাই মিলে রোজই পাহারা দেয়! চায়ের খরচ তাই অবশ্য একটু বাড়ল।
ঘোষ মাস্টার তার টিউশনের ঘরটা রাতে ওদের চায়ের মজলিশের জন্যে ছেড়ে দিলেন। সেখানে চায়ের সঙ্গে জমে ওঠে গানের আসর। বিল্লুর গানের গলাটি ভরাট, সুরেলা। রাতের অন্ধকারে তার তরুণ কণ্ঠে কিশোর কুমার ভর করে। “আমার পূজার ফুল ভালোবাসা হয়ে গেছে, তুমি যেন ভুল বুঝোনা।” তার অবুঝ মনের বেদনা রাতের নির্জনতায় গুঞ্জরিত হতে থাকে পুরনো পাড়ার ক্ষয়িষ্ণু, বিবর্ণ দেওয়ালে, “ওগো নিরূপমা, করিও ক্ষমা….”।
রাত পাহারা দিতে দিতে কখন যে পাড়ার নিষ্কর্মা ছেলেগুলোকে নতুন চোখে দেখতে শুরু করেছিল সবাই, তা কেউ টেরই পায় না। পাহারার ফাঁকে চা, গল্প আর গান যেন পাড়ার রাতগুলোর নতুন পরিচয় হয়ে ওঠে। বিল্লুর এই গান সবার অলক্ষ্যে চুরি করে নেয় একটি নবীন হৃদয়।
ঘোষ মাস্টারের কিশোরী মেয়ে রত্না গানপাগল। ট্রানজিস্টার কানে নিয়ে বিবিধ ভারতীর গান শুনতে শুনতেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। মা এসে ঘুমন্ত মেয়ের পাশ থেকে নিঃশব্দে রেডিওটা সরিয়ে নেন।
গভীর রাতে বিল্লুর কণ্ঠস্বর রত্নার আধো ঘুমে স্বপ্নের মতো ভেসে বেড়ায়। সে জানে না কার গলায় এমন দরদী সুর! কার বুকে এত গভীর ব্যথা! কার উদ্দেশেই বা রাতের অন্ধকারে ছড়িয়ে পড়ে এই স্বপ্নমাখা গান!
রত্নার তেরো বছরের কিশোরী মনের কপাট খুলে বিনা দ্বিধায় সেই সুর ঢুকে পড়ে হৃদয়ের গহিন কোণে কোণে। অজান্তেই তা চুরি করে নেয় তার প্রথম বিস্ময়, হৃদয়ের প্রথম আলোড়ন!