১৭৭৬-এর ২৯শে নভেম্বরের কার্যবিবরণীতে, হেস্টিংস মুঘল আমলের ভূমি-রাজস্বের স্বল্পতা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। তিনি বলেছিলেন, গত বছরগুলোয় আদায় করা মোট রাজস্বের পরিমাণের সাথে বর্তমান সময়ের আদায় করা রাজস্বের পরিমাণের কেবল তুলনা করাই যথেষ্ট নয়; তিনি লিখেছেন, “মোটা চালের দাম — যা জনসাধারণের খাদ্যের প্রধান উপাদান — সুজা খানের শাসনামলে বর্তমান সময়ের তুলনায় সাড়ে পাঁচ গুণ কম ছিল।” (গত কিস্তির শেষের সারণী দেখুন) অর্থের মূল্যমান নির্ধারণের ক্ষেত্রে যদি একে উপযুক্ত মাপকাঠি হিসেবে গণ্য করা হয় — যেহেতু অর্থের মান, সম্পত্তির মূল্য বণ্টনের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এবং বিনিময়ে সম্পত্তির মূল্য থেকেই নিজের মান নির্ধারণ করে — তবে সুজা খানের আমলে বাংলা থেকে আদায় করা ১,৪২,৫০,০০০ টাকার রাজস্ব বর্তমান মূল্যের হিসেবে ৭,৮৩,৭৫,০০০ টাকার সমতুল্য ছিল। তবে বিভিন্ন সময়ে বাংলার আয়তন ও তার শাসনব্যবস্থার অবস্থার তুলনা করলে এই অসামঞ্জস্য আরও প্রকট হয়ে ওঠে; কারণ পরবর্তীকালে এই সীমানার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে সীমান্তবর্তী অনেক অঞ্চল এবং সুজা খানের প্রতি বিভিন্ন মাত্রায় আনুগত্য প্রদর্শনকারী জমিদাররা বর্তমানে কোম্পানির সরকারের অধীনে সমানভাবে বশ্যতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন।”
এই যুক্তি খণ্ডন করে ফিলিপ ফ্রান্সিস বললেন যে, অর্থের মূল্য — যা “হস্তান্তরযোগ্য সকল বস্তুর সাধারণ ও সর্বজনীন সমতুল্য” — দুটি উপায়ে বৃদ্ধি বা হ্রাস করা যেতে পারে — (১) সোনা বা রুপার বিপুল আগমন, যা নামমাত্র মূল্য পরিবর্তন করলেও প্রকৃত মূল্যকে প্রভাবিত করবে না; (২) অত্যধিক ও অসহনীয় করের বোঝা, যা উৎপাদনকারীকে তার পাওনা পরিশোধের লক্ষ্যে পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য করে। হেস্টিংস আর বারওয়েল স্বীকার করেছিলেন, পণ্যের উচ্চমূল্যের ওপর রাজস্বের প্রভাব ছিল; কারণ ১৭৭৫-এর এপ্রিলে তাঁরা লিখেছিলেন: “ক্রমাগত রাজস্ব বৃদ্ধি কৃষকদের ওপর তাৎক্ষণিক দুর্দশা চাপিয়ে দিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তা উৎপাদক আর সব ধরণের মানুষের ওপরও প্রভাব ফেলেছে, কারণ কৃষকদের শ্রমে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের দাম এর ফলে বেড়েছে।” সুতরাং, এ কথা জোর দিয়ে বলা যায়, “জীবনধারণের অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি মানেই যে অর্থের মান কমে যাওয়া কিংবা অর্থের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া — তা কিন্তু নয়।”
সীমান্তবর্তী নতুন জেলাসমূহের [উপনিবেশে] অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ফ্রান্সিস বলেন: “আমার ধারণা, এগুলোর মধ্যে থাকবে ত্রিপুরা, রামগড়, পাচেত, নাগপুর, পালামৌ এবং কোচবিহার। এই অঞ্চলগুলো যোগ দেওয়ার ফলে রাজস্বের যে সরাসরি বৃদ্ধি ঘটেছে, তার কোনো প্রমাণ না দেখা পর্যন্ত আমি স্বীকার করতে পারি না যে, এর কারণে সংশ্লিষ্ট প্রদেশগুলোর ‘জমা’ বা রাজস্বের পরিমাণ বাড়ানো যৌক্তিক। বিষয় যদি আদৌ গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়, তবে সহজেই প্রমাণ করা সম্ভব — বর্তমানে এই অঞ্চলগুলো থেকে আয়, তাদের প্রশাসনিক এবং অন্য ব্যবস্থাগুলোর ব্যয়ভার মেটাতে অসক্ষম।”
হেস্টিংস বলেছিলেন ‘আসল-তুমারি-জমা’ — যাকে ফ্রান্সিস আকবরের আমলের রাজস্ব-নির্ধারণের সাথে অভিন্ন বলে চিহ্নিত করেছেন — তা এক ‘কৌতূহলী বস্তুতে’ পরিণত হয়। জবাবে ফ্রান্সিস বলেন, “আমার কাছে থাকা তথ্যের ভিত্তিতে গভর্নর-জেনারেলের দাবি করা প্রতিটি বিষয়কেই আমি অস্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি।” তিনি যুক্তি দেন যে, আলি বর্দী খানের সময় পর্যন্ত ‘আউসিল তুমারি জামা’-তে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছিল, তা জমিদারদের মৃত্যুর কারণে প্রয়োজনীয় নাম পরিবর্তনের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না, এবং কাসিম খানের সময় পর্যন্ত হুস্তাবুদ তৈরি করার বা জমির প্রকৃত মূল্যায়নের ধারণাটি ছিল অচিন্তনীয়। (ফ্রান্সিস হলওয়েলের উদ্ধৃতি তুলে ধরে বলেন : “জমির ওপর বার্ষিক বিঘা-প্রতি ৩ সিক্কা রুপির অতিরিক্ত যেকোনো রাজস্ব সাম্রাজ্যের চলতি আইনের বিরুদ্ধ; যে আইন আলীবর্দীর ক্ষমতা দখলের পূর্ব সময় পর্যন্ত অলঙ্ঘনীয় ও পবিত্র রূপে গণ্য করা হতো।”) যথাযোগ্য উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, “১৭৩২-এ যখন গভর্নর আর কাউন্সিল কলকাতার নিজস্ব জমিদারির খাজনা বৃদ্ধির বিষয় বিবেচনা করছিলেন এবং এ নিয়ে বাইরে উত্তেজনাময় গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল, তখন তাঁরা সুবাদারের থেকে কঠোর নির্দেশনামা পরওয়ানা পান। এই পরওয়ানায় সুবাদার তাঁদের জানান, তাঁরা এমন একটা কাজ করার দুঃসাহস দেখাচ্ছেন যা করার ক্ষমতা খোদ তাঁর নিজেরও নেই; এবং তাঁরা যদি এ ব্যাপারে অনড় থাকেন, তবে সাম্রাজ্যের আইন অনুযায়ী তাঁদের জমি বাজেয়াপ্ত করা হবে।” এই ঘটনাটি যদি সত্য হয়, (ক্ষমতায় ছিলেন জে জেড হলওয়েল) তবে এর অর্থ দাঁড়ায় যে মুঘল আইন অনুযায়ী কোনো জমিদারের পক্ষে প্রজাদের প্রদেয় কর বা খাজনা বৃদ্ধি করার অধিকার ছিল না; আর এটা ফ্রান্সিসের সেই তত্ত্বের বিরোধী — যেখানে তিনি বলেছিলেন যে প্রজাদের ওপর জমিদারের দাবির বিষয় প্রতিযোগিতানির্ভর আইনের ওপর ছেড়ে দেওয়া যেতে পারে। ‘আসল-তুমারি-জমা’ (ausil tumari jama) নিয়ে ফ্রান্সিসের তত্ত্বই ঐতিহাসিক তথ্যের সাথে খাপ খায় না।
হেস্টিংসের দাবি ছিল মুঘল শাসনব্যবস্থা স্রেফ “কশাঘাত আর অত্যাচারের” (stripes and tortures) ওপরে দাঁড়িয়ে থাকত; ফ্রান্সিস এই তথ্য সম্পূর্ণ অবিশ্বাস করেন। তিনি প্রশ্ন তুলে জিজ্ঞাসা করিলেন, মুর্শিদকুলি খানের অত্যাচারের একটিমাত্র ঘটনা ছাড়া, মুসলিম সরকারের পক্ষ থেকে কঠোরতা পালনের আর কী কী সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে? সুজা খানের পরের সময় কিন্তু এবাবদে বিবেচ্য নয়, কারণ ততদিনে মুঘল সরকারের পতনরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। লুক স্ক্রাফটনের উদ্ধৃতি সূত্রে বলা যেতে পারে, নাদির শাহের আক্রমণের আগে পর্যন্ত মহান মুঘল সাম্রাজ্যের চেয়ে “উত্তমরূপে পরিচালিত সরকার বিশ্বে খুব কমই ছিল”(স্ক্রাফটন: রিফ্লেকশনস অন দ্য গভর্নমেন্ট অফ হিন্দুস্তান (Reflections on the Government of Indostan)। পুনর্মুদ্রণ, ১৭৭০, পৃষ্ঠা ২৫। হলওয়েলের দাবি, এই ছোট বই ছিল তাঁরই পাণ্ডুলিপির মুদ্রিত রূপ; এটা কলকাতার অবরোধে হারিয়ে গিয়েছিল; কিন্তু এ ধরনের বক্তব্যের সত্যতা জাচাই হয় নি, এবং এ সব ক্ষেত্রে হলওয়েলকে চট করে বিশ্বাস করা মুশকিল)। “আমাদের প্রভাব বিস্তারের আগে এই দেশের সমৃদ্ধ অবস্থা ছিল জনগণের প্রতি প্রদর্শিত নমনীয়তা ও সংযমের সবচেয়ে জোরালো পরোক্ষ প্রমাণ — যদিও জাফর খাঁ-র (মুর্শিদ কুলি খান) শাসনামলে বিশেষ কঠোরতা এবং তাঁর উত্তরসূরির মৃত্যুর পর বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছিল। সম্পদ দখলদারির নানা উপায় আর পথের মাধ্যমে পরবর্তীকালে যে বিপুল অর্থ ইউরোপে পাঠানো হয়েছে, তা এমন কোনো জনগোষ্ঠীর কাছে থাকা সম্ভব ছিল না যাদের সরকার কশাঘাত, অপমান এবং এমনকি মৃত্যুর মতো নির্যাতন চালিয়ে রাজস্ব আদায় করত।”
ফ্রান্সিসের এই জবাব মূলত ইংল্যান্ডের কর্তাদের (Directors) জন্য লেখা, কারণ কমিশনার নিয়োগের বিষয় ততক্ষণে গভর্নর-জেনারেলের ‘কাস্টিং ভোট’ বা নির্ণায়ক ভোটেই চূড়ান্ত হয়েছিল। পরে ‘কোর্ট অফ ডিরেক্টরস’ গভর্নর-জেনারেলের এই পদক্ষেপে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন; কিন্তু ১৭৭৭-এর ৪ জুলাই লেখা তাঁদের সেই চিঠি বাংলায় এসে পৌঁছায় অনেক পরে — যখন কমিশন তাদের তদন্তকাজ শেষ করে প্রতিবেদনও জমা দিয়ে দিয়েছিল। তবে পরিচালকদের চিঠিতে যেসব বিষয় নিয়ে সমালোচনা করা হয়েছিল, সেগুলো বেশ কৌতূহলোদ্দীপকও বটে। তাঁরা বলেন, নতুন বন্দোবস্ত বা ‘সেটেলমেন্ট’ গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে তাঁরা এমন পদ্ধতি চেয়েছিলেন যা স্থানীয় বাসিন্দাদের আতঙ্ক সৃষ্টি না করে। এরপর তাঁরা গত সাত বছরে তথ্য সংগ্রহের লক্ষ্যে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ — যেমন ‘সুপারভাইজার’ নিয়োগ, ১৭৭০ সালের দুটি ‘রেভিনিউ কাউন্সিল’ এবং ১৭৭২ সালের ‘কমিটি অফ সার্কিট’-এর কার্যক্রম — পর্যালোচনা করেন এবং এগুলোর প্রতি তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তাছাড়া “উপকরণ সংগ্রহ আর বিন্যাসে” দুজন কনিষ্ঠ কর্মচারীকে নিয়োগের বিষয় — যেসব উপকরণ ইতিপূর্বেই বিভিন্ন স্তরের কর্মচারীরা সংগ্রহ আর পরীক্ষা করেছিল — তা হয়তো মেনে নেওয়া যেত যদি অতিরিক্ত তথ্যের সত্যিই প্রয়োজন থাকত; কিন্তু “আমরা অত্যন্ত দুঃখিত যে, এ বিষয়ে কাউন্সিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আচরণ এমন ছিল যা আমাদের তীব্র অসন্তুষ্ট করেছে।” কাউন্সিলের বাইরে নিজের নামে ও নিয়ন্ত্রণে কাজ করার জন্য কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে গভর্নর-জেনারেল যে তাঁর ‘কাস্টিং ভোট’ বা নির্ণায়ক ভোটের সুযোগ নিয়েছিলেন, তা ছিল কোর্টের পূর্বের অবস্থানের পরিপন্থী — কারণ কোর্ট পূর্বেই তৎকালীন প্রশাসনে সভাপতিকে পৃথক ক্ষমতা দানের বিষয়কে অনুমোদন করেননি। তথ্য-উপাত্ত প্রস্তুত করা এবং আদেশ জারি করার মধ্যে তিনি যে পার্থক্যটি দেখিয়েছিলেন, তা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। ভবিষ্যতে গভর্নরের পৃথক নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে কঠোরভাবে কেবল ফোর্ট উইলিয়াম গ্যারিসনের সামরিক আদেশ দানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। পরিকল্পনা আর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যে অভিন্নতা আর কর্তৃত্বের প্রয়োজন ছিল, সেই অজুহাতে এই দায়িত্ব প্রাদেশিক কাউন্সিলগুলোয় ন্যস্ত না করার যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়; কারণ প্রাদেশিক কাউন্সিলগুলোর কার্যক্রমে অভিন্নতা আনার ক্ষমতা গভর্নর-জেনারেল আর কাউন্সিলের হাতেই ছিল এবং তাদের ওপর প্রয়োজনীয় কর্তৃত্ব অর্পণ করাও নিরাপদ হতো। যদি ‘খালসা’র দেশীয় কর্মকর্তারা এই কাজের জন্য উপযুক্ত না-ই হতেন, তবে তা ছিল তাঁদের বরখাস্ত করার কারণ — নতুন কোনো পদ সৃষ্টির নয়। দেশীয় বিশেষজ্ঞের মধ্যস্থতা প্রয়োজন এমন যোগাযোগের ক্ষেত্রে ‘রায় রায়ান’ই ছিলেন উপযুক্ত মাধ্যম; অথচ কলকাতা কমিটির হাতে চাকরি যাওয়া গঙ্গা গোবিন্দ সিংহকে নিয়োগ দেওয়াটা ছিল আপত্তিকর। স্থানীয় তদন্ত পরিচালনার জন্য দেশীয় ব্যক্তিদের নিযুক্ত করা এবং এর মাধ্যমে প্রাদেশিক কাউন্সিলের সদস্যদের তাঁদের এখতিয়ার থেকে সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি ছিল বিস্ময়ের। চিঠির শেষে বলা হয়েছে, “এই অপ্রীতিকর বিষয়ে জেনারেল ক্লেভারিং এবং মিস্টার ফ্রান্সিসের মত বা বিবরণের পর আমাদের আর বিশেষ কিছু বলার নেই। গভর্নরকে পৃথক নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেওয়ার বিপক্ষে তাঁদের যুক্তিগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুবিবেচনাপ্রসূত; এবং আমরা আনন্দের সাথে জানাচ্ছি যে, এ বিষয়ে তাঁদের কার্যকলাপ আমাদের পূর্ণ অনুমোদন লাভ করেছে।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ