শৈলেন বাবুর বয়স এখন সত্তর ছুঁইছুঁই। স্মৃতিগুলো এখন ঝাপসা হতে হতে হঠাৎই কেন যেন কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠছে ইদানিং। কলকাতার ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে যখন তিনি নিচের ট্র্যাফিক দেখেন, তখন মাঝে মাঝেই তাঁর মনে হয় তিনি আসলে এখানে নেই, আছেন উত্তরবঙ্গের সেই পুরনো রেলওয়ে কোয়ার্টারে, যেখানে তাঁর বাবা ছিলেন স্টেশন মাস্টার।
গত পরশু রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখার পর থেকেই শৈলেনবাবুর মনটা ছটফট করছে। স্বপ্নে তিনি দেখলেন, তাঁদের সেই পুরনো বাড়ির পেছনের জঙ্গল থেকে নীলমণি ডাকছে। নীলমণি কোনো মানুষ নয়, একটা অতি প্রাচীন পিতলের মূর্তি, যা তাঁদের বংশে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছিল। কিন্তু দেশভাগের সময় বা তারও পরে, বাড়ি বদলের হাঙ্গামায় সেই মূর্তিটা কোথায় হারিয়ে গিয়ে ছিল, কেউ জানে না।
পরদিন সকালেই শৈলেন বাবু কাউকে কিছু না বলে একটা ছোট ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ছেলে অনির্বাণ অফিসে, বৌমা মালবিকা স্কুলে। ওদের বলে লাভ নেই, ওরা ভাববে বাবার মাথাটা বোধহয় এবার পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে।
শিমুলতলি স্টেশনে যখন শৈলেনবাবু নামলেন, তখন চারদিকে বিকেলের মরা রোদ। স্টেশনটা এখন অনেক আধুনিক হয়েছে, কিন্তু বাতাসটা আজও সেই এক — ভেজা মাটি আর বুনো ফুলের গন্ধ। গ্রামের পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি সেই পুরনো জমিদার বাড়ির ধ্বংস স্তূপের সামনে এসে দাঁড়ালেন। এখানেই তাঁদের কোয়ার্টার ছিল। এখন সেখানে শুধুই আগাছা আর ভাঙা ইটের স্তূপ।
শৈলেন বাবু বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন একটি অশ্বত্থ গাছের তলায়, এমন সময় অদ্ভুত ধরনের এক বৃদ্ধের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। লোকটির পরনে একটা জীর্ণ ধুতি, গায়ে চাদর, আর চোখে এক জোড়া চশমা যার একটি কাঁচ ভাঙা। লোকটা শৈলেনবাবুর দিকে তাকিয়ে ফোকলা দাঁতে হাসল।
“কি শৈলেন, নীলমণিকে খুঁজতে এলে বুঝি?”
শৈলেনবাবু চমকে উঠলেন। “আপনি আমাকে চেনেন? আর আমি যে নীলমণি কে খুঁজতে এসেছি সেটাই বা আপনি জানলেন কি করে?”
বৃদ্ধ খকখক করে কেশে বললেন, “চেনা-অচেনা তো সব মনের ভ্রম। তোমার বাবা যখন এই স্টেশনে ফ্ল্যাগ দেখাতেন, আমি তখন ওই রেল লাইনের ধারে ঘুঘুর বাসা খুঁজতাম। তা নীলমণি তো আর মূর্তিতে নেই হে, সে তো এখন অন্য কোথাও।”
শৈলেনবাবু কৌতূহলী হয়ে বললেন, “কোথায় আছে সে? বাবা বলতেন, নীলমণি হারানো মানে আমাদের বংশের সৌভাগ্য হারিয়ে যাওয়া।”
বৃদ্ধ হাসলেন। “সৌভাগ্য কি আর পিতলের মূর্তিতে থাকে? ওটা তো একটা উপলক্ষ মাত্র। তুমি বরং ওই মরা পুকুরটার ধারে যাও। যেখানে বড় ঝাউ গাছটা ছিল।”
শৈলেনবাবু স্মৃতির সরণি বেয়ে পুকুরধারে গেলেন। ঝাউ গাছটা এখন নেই, শুধু একটা গুঁড়ি পড়ে আছে। সেই গুড়ির তলায় মাটি খুঁড়তেই তাঁর আঙুলে শক্ত কিছু একটা ঠেকল। বুকটা ধক করে উঠল তাঁর। তবে কি সত্যিই…?
মাটি সরিয়ে যা বেরোল, তা কোনো মূর্তি নয়। একটা ছোট লোহার কৌটো। ভেতরে একটা জং ধরা চাবি আর একটা হলদে হয়ে যাওয়া চিঠি। চিঠিটা তাঁর বাবার হাতে লেখা।
“সোমু (শৈলেনবাবুর ডাকনাম), যদি কোনোদিন তুই এখানে ফিরে আসিস, তবে জানবি নীলমণি আমি নিজেই বিসর্জন দিয়েছিলাম। কারণ মানুষ যখন মূর্তির ওপর বেশি নির্ভর করতে শুরু করে, তখন সে নিজের ভেতরের শক্তিটা হারিয়ে ফেলে। আমাদের বংশের সৌভাগ্য মূর্তিতে ছিল না, ছিল আমাদের পরিশ্রমে। এই চাবিটা আমাদের সেই পুরনো সিন্দুকের, যা আমি তোর জন্য আগলে রেখেছি। কিন্তু মনে রাখিস, আসল সিন্দুকটা তোর বুকের ভেতরে।”
শৈলেনবাবু স্তব্ধ হয়ে বসে রইলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, পায়ের কাছে একটা নীল রঙের আলো খেলে গেল। মাথা তুলে দেখলেন, সেই ভাঙা চশমা পরা বৃদ্ধটি দূরে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছেন। তারপর কুয়াশার মতো মিলিয়ে গেলেন তিনি।
শৈলেনবাবু বুঝতে পারলেন না, ওটা কি সত্যিই মানুষ ছিল নাকি তাঁর অবচেতনের কোনো ছায়া। শীর্ষেন্দু বাবুর গল্পে যেমন ঘটে — বাস্তব আর পরাবাস্তবের সীমারেখাটা মুছে যায়।
কলকাতায় ফেরার পথে ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে শৈলেনবাবুর মনে হলো, তাঁর ব্যাগটা আগের চেয়ে অনেক হালকা লাগছে। নীলমণি কে তিনি পাননি ঠিকই, কিন্তু এক অদ্ভুত শান্তি পেয়েছেন। জীবনের সায়াহ্নে এসে তিনি বুঝতে পারলেন, হারানো জিনিস সবসময় ফিরে পাওয়ার জন্য নয়, কিছু জিনিস হারিয়ে যাওয়ার মধ্যেই পূর্ণতা থাকে।
বাড়ি ফিরে যখন অনির্বাণ জিজ্ঞেস করল, “বাবা, কোথায় ছিলে সারাদিন?”
শৈলেনবাবু মিটিমিটি হেসে বললেন, “একটু শিকড়ের টান খুঁজতে গিয়েছিলাম রে। নীলমণিকে একবার দেখে এলাম।”
অনির্বাণ অবাক হয়ে বলল, “নীলমণি? সে তো কবে হারিয়ে গেছে!”
শৈলেনবাবু নিজের বুকের ওপর হাত রেখে বললেন, “না রে, সে হারায়নি। সে ঠিক জায়গাতেই আছে।”
বাইরে তখন ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির জলে শহরের ধুলোবালি ধুয়ে যাচ্ছে। শৈলেনবাবু জানালার নীল কাঁচের ভেতর দিয়ে দেখলেন, কলকাতা শহরটাকেও আজ উত্তরবঙ্গের সেই স্টেশনের মতো মায়াবী লাগছে।
বেশ ভালো