কমিশনারেরা তাঁদের প্রতিবেদনে স্বাভাবিক বিনয়ে, ফ্রান্সিস বিশেষভাবে সামনে আনা সেই প্রশ্নটিতে প্রবেশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, সেই মৌল প্রশ্নটি হল অর্থাৎ, জমিদাররাই কি প্রকৃতপক্ষে জমির মালিক? তবে হ্যারিংটনের মন্তব্য ছিল, তাঁরা যদি ভূমি রাজস্বকে ‘খাজনা’ (rent) হিসেবে অভিহিত করা থেকে বিরত থাকতেন, তবে হয়তো এই সমস্যার উপযুক্ত ব্যাখ্যা দিতে পারতেন। তাঁরা বলছেন, রাজস্ব নির্ধারণের প্রাচীন পদ্ধতি ছিল প্রকৃত মূল্যায়ন নির্ভর; কিন্তু যত সময় গিয়েছে, মুসলিম শাসনামলে প্রকৃত মূল্যায়নের বদলে অনুমান ভিত্তি করে রাজস্ব নির্ধারণের প্রথা ক্রমান্বয়ে চালু হয়েছে। “সরকারি পক্ষে শুরু করা এই নতুন প্রথা জমিদারদেরও একই কার্যপন্থা অবলম্বনের বৈধতা দিল; ফলে জমিদারদের ওপর যখনই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বোঝা চাপানো হতো, তাঁরা অধীনস্থ প্রজা আর রায়তদের ওপর পুঞ্জীভূত কর আরোপ করে সেই অর্থ উসুল করতেন।” এই পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী আর নেতিবাচক প্রভাব তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছিল কৃষকদের ক্রমাগত জমি ছেড়ে যাওয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে; আর এই জমি ত্যাগের ফলে তৈরি হওয়া রাজস্ব ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে প্রজা আর রায়তদের ওপর করের বোঝা আরও বাড়িয়ে দেওয়া হতো (এ বিষয়ে ‘নজাই’ প্রথা প্রসঙ্গে আগে যা বলা হয়েছে, তা দ্রষ্টব্য)। কমিশনারদের প্রতিবেদন নিচে উল্লিখিত যুক্তি আর বিবেচনা সূত্রে, আরও বেশি তথ্য সংগ্রহের জন্য ওয়ারেন হেস্টিংসের আবেদনকে যথার্থ বলে সমর্থন জানিয়েছে : —
১. রাজস্বের হার কমানোর পক্ষে জোরালো যুক্তি আর দাবি-দাওয়া পেশ করা হয়েছিল। কমিশনারদের গোচরে আনা তথ্য-প্রমাণাগুলো থেকে এই বিষয়টা মনে হয় যে, “দেশের কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি আর সার্বিক উন্নয়নের ফলে ভবিষ্যতে যে সম্ভাব্য ও আনুষঙ্গিক সুফল লাভের সম্ভাবনা রয়েছে (জমিদারকে ‘উন্নয়নকামী ভূস্বামী’ হিসেবে গণ্য করার ভ্রান্ত ধারণা প্রসঙ্গে দেখুন: সেটোন-কার রচিত ‘কর্নওয়ালিস’ গ্রন্থ), তা জমিদারদের প্রলুব্ধ করার পক্ষে যথেষ্ট শক্তিশালী অনুপ্রেরণা বা উদ্দেশ্য হিসেবে কাজ করে না। ফলে জমিদাররা তাঁদের জমিদারির আওতার জমির ওপর অত্যধিক হারে খাজনা ধার্য করে এবং প্রজা ও রায়তদের থেকে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে তাঁরা বর্তমানে যে তাৎক্ষণিক ও প্রত্যক্ষ সুবিধা ভোগ করছেন, তা স্বেচ্ছায় ত্যাগ করতে মোটেও আগ্রহী হন না… এমন ঘটনার নজির মোটেও বিরল নয় — বিশেষ করে বড় জমিদারীগুলোর ক্ষেত্রে — যেখানে সরকারের পক্ষ থেকে রাজস্বের দাবি কমানোর পরপরই, জমিদাররা তাঁদের প্রজা ও রায়তদের ওপর নতুন নতুন কর ও চাঁদা চাপিয়েছেন।”
২. অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে, কোনো এক সমগ্র জেলার মোট কর নির্ধারণের তুলনায় কোনো এক করের অনুপাত প্রথমে নির্ণয় করা না হলে, সেই কর বিলুপ্ত হয়ে গেলে তার পরিমাণ কত ছিল তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। (কমিশনাররা নিম্নলিখিত প্রাসঙ্গিক দৃষ্টান্তটি উল্লেখ করেছেন” ক) ১৭৭১-এ, কোম্পানির আদেশে ‘বাজি জমা’ প্রথা বিলুপ্ত করার আদেশ দেওয়া হয়, যা কেবল জরিমানা ও বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি নিয়ে তৈরি বলে মনে করা হতো। তখনও জানা ছিল না যে রাজস্বের এই বিস্তৃত শাখায় বহু নির্দোষ প্রকৃতির কর অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে…। খ) ১৭৭২-এ, ‘সায়ের চালুন্তা’ বা জমিদারদের জেলার মধ্য দিয়ে যাওয়া পণ্যে আদায় করা শুল্ক তুলে নেওয়া হয় এবং শুল্ক ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন ব্যবস্থা তৈরি হয়। এই ব্যবস্থার ফলে জমিদারদের যে ক্ষতি হয়েছিল তা পূরণ করার জন্য তাদের রাজস্ব থেকে একটি ছাড় মঞ্জুর করা হয়, কিন্তু এই খাতে প্রদেশ জুড়ে কত মোট অর্থ আদায় হয়েছিল বা প্রত্যেক জমিদারের নিজ নিজ অংশের আনুমানিক হিসাব তৈরির জন্য কোনো হিসাবখাতা না থাকায়, সরকার, জমিদারদের নিজেদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী ছাড় মঞ্জুর করতে বাধ্য হয়েছিল…। গ) মারুচা বা বিবাহের উপর কর বিলোপের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অসুবিধা দেখা দিয়েছিল; এবং এই নিপীড়নমূলক ও অবিবেচক করসমূহ বিলোপের কারণে দাবি উত্থাপন করা অব্যাহত রয়েছে, এই বিশ্বাস থেকে যে সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষে তা খণ্ডন করা অসম্ভব।)
৩. নদী দখল, নতুন বাজার তৈরি, এবং প্রতিবেশী জমিদারদের জবরদখলের ফলে রাজস্ব কমানোর দাবি করা হয়েছিল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য হাতে ছিল না।
৪. সরকারের তথ্যের অভাবের ফলে জমিদার আর তাদের কর্মকর্তারা অত্যন্ত ব্যাপক হারে নিজেদের জমি হস্তান্তর করেছিলেন। বিশ্বাস করা কঠিন যে মহম্মদশাহীর মতো একটি ছোট জেলায়, যা সরকারকে মাত্র ২,৯০,০০০ রুপি রাজস্ব দেয়, সেখানে ১,৬১,০০০-এরও বেশি মানুষ খাজনা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে। কিছু জমিদারিতে কর্মচারীদের ভরণপোষণের জন্য বরাদ্দ করা জমির বিশাল অংশ, বিশ্বাস করার জোরালো কারণ আছে, জোরাজুরির অনুদান ঢাকার জন্য এবং সরকারি রাজস্ব ককানোর জন্য ‘চাকেরান জমিন’ নাম ব্যবহার করা হয়েছে। (হ্যারিংটন কমিশনারদের সারসংক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে, “যেসব জেলায় আমিলদের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানো হয়েছিল (যা বাংলা প্রদেশের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ), সেখানে কর নির্ধারণ থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত জমির পরিমাণ ছিল ৪৩,৯৬,০৯৫ বিঘা। এছাড়া জমিদার কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভরণপোষণের জন্য ১২,০৪,৫৪৭ চাকেরান জমিও বরাদ্দ ছিল। এদের মধ্যে ১,৪৩,৪১৬টি বিঘা সামান্য খাজনা দিত, যার মোট পরিমাণ ছিল বছরে ৬৬,০৪৯ টাকা; বাকি ১০,৬১,৪৩০টি বিঘায় জমিদারদের খাজনা দিতে বাধ্য ছিল না, কারণ খাজনা থেকে প্রাপ্ত অর্থ মজুরির পরিবর্তে ব্যবহার করা হতো।”)
৫. “মুঘল সরকার — তাদের অধিকতর কর্মতৎপরতা, তাদের হাতে ন্যস্ত অবিভক্ত ও নিরঙ্কুশ ক্ষমতা এবং অপরাধীদের কঠোরতম শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপনের সক্ষমতার সুবাদে — এমন সব উপায়ে পারস্পরিক যোগসাজশ ও দুর্নীতি শনাক্ত ও প্রতিরোধ করতে পারত, যা আমাদের সরকারের কাছে ছিল সম্পূর্ণ অজানা এবং আমাদের শাসনব্যবস্থার মূল প্রকৃতির সাথে ছিল সম্পূর্ণ বেমানান। মুসলিম সরকারের হাতে ন্যস্ত সেই বিপুল ক্ষমতার প্রতি যে গভীর ভীতি — যা দীর্ঘকাল ধরে বশ্যতায় অভ্যস্ত প্রজাদের মনে গেঁথে গিয়েছিল — তা [নির্ববাদে সুপ্রশাসন দেওয়ার জন্য] একাই যথেষ্ট ছিল; যার ফলে বাস্তবে সেই ক্ষমতা প্রয়োগের প্রয়োজন খুব কমই দেখা দিত। ইংরেজরা যখন এই দেশের শাসনভার গ্রহণ করল, তখনও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে সেই চিরাচরিত কঠোর পদ্ধতিগুলোই বহাল রইল; যদিও মুঘল আমলের মতো চরম কঠোরতা হয়তো আর প্রয়োগ করা হতো না, তবুও ‘নিরঙ্কুশ ও অবিভক্ত ক্ষমতা’-র সেই ধারণা তখনও সক্রিয় ছিল এবং সেই ধারণার প্রভাব আজও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। কিন্তু বর্তমান শাসনব্যবস্থায় — যেখানে সরকারের প্রতিটি কর্তৃত্বমূলক পদক্ষেপ এবং প্রতিটি অধিকারই প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার বা আইনি বিতর্কের সম্মুখীন হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে — সেখানে সম্ভবত কেবল সুশৃঙ্খল কার্যপদ্ধতি এবং যথাযথ দাপ্তরিক তদারকির মাধ্যমেই সরকারি রাজস্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। কারণ এই বিষয়টা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, একজন জমিদারের নিজস্ব স্বার্থ নিহিত থাকে হয় তার ওপর ধার্য করা রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে নেওয়ার মধ্যে, অথবা তার নিয়ন্ত্রণের এলাকায় নির্ধারিত রাজস্বের অর্থ শোধ করা থেকে কোনোভাবে নিজেকে সরিয়ে রাখায়। এমতাবস্থায়, অনেক সময় জমিদারের হাত থেকে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব কেড়ে নেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়ে; তখন হয় সরকার সরাসরি নিযুক্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে রাজস্ব আদায় হয় — যা ‘খাস আদায়’ নামে পরিচিত — অথবা নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব ইজারাদারকে farmer হস্তান্তর করা হয়, যিনি সেই অর্থ আদায় করে সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা দেন। এই ইজারাদার — অথবা সরকারের পক্ষ থেকে নিযুক্ত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (যাঁদের ‘সাজাওয়াল’ বা ‘আমিল’ উপাধিতে অভিহিত করা হতো) — জমিদারের স্থলাভিষিক্ত হন এবং ‘মাজকুড়ি’ (এখানে ‘মজকুরি’ বলতে এমন একজন তালুকদারকে বোঝানো হয়েছে যিনি জমিদারের মাধ্যমে তাঁর রাজস্ব পরিশোধ করেন; যদিও গ্ল্যাডউইন এই শব্দটির ভিন্ন একটি সংজ্ঞা দিয়েছেন (মুঘল ও ব্রিটিশ আমলে এক শ্রেণীর তালুকদার বা জমিদারকে ‘মাজকুড়ি’ বলা হতো। মাজকুড়ি তালুকদারেরা সরাসরি সরকারের রাজকোষে রাজস্ব জমা না দিয়ে, বড় কোনো জমিদার বা প্রভাবশালী তালুকদারের মাধ্যমে রাজস্ব প্রদান করতেন। এটা ছিল তৎকালীন জমিদারি বা রাজস্ব আদায়ের একটি প্রশাসনিক স্তর। ওড়িশা অঞ্চলের ৬টি ঐতিহাসিক রাজস্ব এলাকার (সরকার) মধ্যে একটি ছিল ‘মাজকুড়ি — অনুবাদক)), ‘শাইকদার’ এবং ‘কুতকিনাদার’ (কাটকিনাদার — “কৃষকদের কুটকিনাদার বলা হয় এবং তাঁরা ঠিক শেখদার বা এতমদারদের স্থলাভিষিক্ত হন। শেখদাররা বেতন পান এবং যা সংগ্রহ করেন তার জন্য জবাবদিহি করেন, কিন্তু কৃষকদের সুবিধা নির্ভর করে তাদের করা চুক্তির ওপর।”) প্রমুখের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করেন। কিন্তু যদি জমিদারের হাতে সংশ্লিষ্ট এলাকার হিসাবপত্র ও রাজস্ব সংক্রান্ত তথ্যাবলি থেকে যায়, তবে তার নিজস্ব স্বার্থই তাকে প্ররোচিত করবে এবং তার প্রভাব-প্রতিপত্তি তাকে সর্বদা এই সুযোগ করে দেবে যে, তিনি সাজাওয়াল বা ইজারাদারের রাজস্ব আদায়ের কাজে নানাবিধ প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবেন; তাঁর এই অপচেষ্টার মূল লক্ষ্য থাকে শেষ পর্যন্ত সরকারকে এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি করা, যাতে সরকার বাধ্য হয়েই তাঁর নিজস্ব শর্তাবলির ভিত্তিতে পুনরায় তাঁর হাতেই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়।”
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ