খাওয়ার ডিম আর ছোঁড়ার ডিম ছাড়াও বাংলাভাষায় আর একপ্রকার ডিম আছে, তা হল, নাটকের ডিম।
এর আভিধানিক অর্থ দৃশ্যকাব্যরূপনাটকভেদ, এই দৃশ্যকাব্যে মায়া, ইন্দ্রজাল, সংগ্রাম, ক্রোধ, উদ্ভ্রান্তাদিবেষ্টিত উপরাগ বাহুল্যরূপে বর্ণিত হওয়া আবশ্যক। ইহাতে রৌদ্ররস অঙ্গী (অর্থাৎ প্রধান), অঙ্ক ৪টি, বিষ্কন্তক ও প্রবেশকের প্রয়োগ করিবে না। ইহাতে দেবতা, গন্ধর্ব, যক্ষ রক্ষঃ বা মহোরগ নায়ক হইবে। ভূত, প্রেত ও পিশাচাদি অত্যন্ত উদ্ধত হইবে। বৃত্তি সকল কৈশিকীহীন (নাটক প্রসিদ্ধ রচনা বিশেষের নাম কৈশিকী) ও সন্ধিসকল বিমর্ষরহিত হইবে। শান্ত; হাস্য ও শৃঙ্গার, এই ৩টি রস ইহাতে বর্জনীয়। অন্য ৩টি রস প্রদীপ্ত হওয়া আবশ্যক। (বিশ্বকোষ — নগেন্দ্রনাথ বসু প্রণীত)।
হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় এতো ডিটেলে দেননি ডিমের মর্মার্থ, তবে লিখেছেন, রূপকভেদ।
বামন শিবরাম আপ্তে সংস্কৃত অভিধানে লিখেছেন ডিম মানে শুধু অণ্ড নয়, ডিম মানে ‘আহত করা’ও (Hurt) হয়। নাটকের ডিমের কথাও লিখেছেন অভিধানে।
‘ডিম’ (ডিম্ব নয়) হলো সংস্কৃত নাট্যশাস্ত্রের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ঐতিহ্যবাহী নাট্যরূপ। আচার্য ভরত মুনি প্রণীত ‘নাট্যশাস্ত্র’ গ্রন্থে যে দশ প্রকার প্রধান রূপক বা নাট্যের (দশরূপক) উল্লেখ রয়েছে, ‘ডিম’ তার অন্যতম। এটি মূলত বীর ও রৌদ্র রসপ্রধান একটি রূপক, যা সাধারণ সামাজিক নাটক থেকে সম্পূর্ণ আলাদা এবং এর উপস্থাপনা অত্যন্ত জমকালো ও সংঘাতময়।
‘ডিম’ নাট্যশাস্ত্রের প্রধান বৈশিষ্ট্য, গঠন এবং তাৎপর্য বিস্তারিতভাবে আলোচনা করতেই হয়, বিশেষ করে এই ডিমথেরাপির নৈরাজ্যের সময়।
১. ‘ডিম’ শব্দের অর্থ ও নামকরণ
সংস্কৃত ‘ডিম্’ ধাতু থেকে এই শব্দের উৎপত্তি, যার অর্থ সঙ্ঘাত, উৎপীড়ন বা আলোড়ন। নাট্যশাস্ত্রে যেখানে মায়া, ইন্দ্রজাল, যুদ্ধ এবং প্রচণ্ড কোলাহলের মাধ্যমে কাহিনীর গতিপ্রকৃতি নিয়ন্ত্রিত হয়, তাকেই ‘ডিম’ বলা হয়। ভরত মুনির মতে, এই নাট্যরূপটি দর্শকমনকে একপ্রকার তীব্র উত্তেজনা ও আলোড়নের মধ্যে রাখে বলেই এর নাম ‘ডিম’।
২. কাহিনীর উৎস ও নায়কচরিত্র
‘ডিম’ জাতীয় নাটকের কাহিনী কাল্পনিক হয় না, এটি সর্বদা পৌরাণিক বা ইতিহাস-আশ্রিত হতে হয়। এর প্রধান চরিত্র বা নায়কেরা কোনো সাধারণ মানুষ বা মর্ত্যের বাসিন্দা হন না। ‘ডিম’-এর নায়ক হন অত্যন্ত উদাত্ত, প্রতাপশালী এবং দেবচরিত্রের। নাট্যশাস্ত্র অনুযায়ী এতে দেব, দানব, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস, পিশাচ এবং ভূত-প্রেত মিলিয়ে মোট ১৬ জন নায়ক থাকতে পারেন। তবে এখানে কোনো শৃঙ্গার বা ললিত স্বভাবের নায়ক থাকেন না; নায়কেরা মূলত যুদ্ধপ্রিয় ও সংঘাতপ্রবণ হন।
৩. রস ও বৃত্তির প্রয়োগ
নাট্যশাস্ত্রে রসের ব্যবহারে ‘ডিম’-এর নিজস্ব সুনির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে।
প্রধান রস : এতে রৌদ্র এবং বীর রসই প্রধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বর্জিত রস : ‘ডিম’-এ শৃঙ্গার (প্রেম-ভালোবাসা) এবং করুণ রসের কোনো স্থান নেই। অর্থাৎ, নারী চরিত্রের প্রাধান্য বা প্রণয়-উপাখ্যান এই নাট্যরূপে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
বৃত্তি : যেহেতু এটি যুদ্ধ ও সংঘাতের নাটক, তাই এখানে ‘কৈশিকী’ (ললিত বা সুকুমার) বৃত্তি বর্জিত হয়। পরিবর্তে ‘আরভটী’ (উদ্ধত ও সংঘাতময়) এবং ‘সাত্ত্বতী’ (ধৈর্য ও বীরত্বব্যঞ্জক) বৃত্তির প্রাধান্য দেখা যায়।
৪. অঙ্কের গঠন ও উপস্থাপন রীতি
একটি আদর্শ ‘ডিম’ নাটক চারটি অঙ্কে (Four Acts) বিভক্ত থাকে। এর দৃশ্যকাব্য অত্যন্ত গতিশীল ও উত্তেজনাপূর্ণ হয়। এতে মায়া, প্রবঞ্চনা, ইন্দ্রজাল, সূর্য ও চন্দ্রের গ্রহণ, উল্কাপাত এবং তীব্র যুদ্ধবিগ্রহের দৃশ্য অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। তবে নাট্যশাস্ত্রের সাধারণ নিয়ম মেনে মঞ্চে সরাসরি কারও বধ বা মৃত্যু দেখানো নিষিদ্ধ, কেবল যুদ্ধের তীব্রতা ও দ্বন্দ্বকেই বড় করে দেখানো হয়।
৫. ঐতিহাসিক উদাহরণ
ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্র অনুসারেই মহাদেব শিবের অনুচরেরা প্রথম এই ধারার নাটক অভিনয় করেছিলেন। ‘ডিম’ নাট্যরূপের প্রথম এবং শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলো ‘ত্রিপুরদাহ’। পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, ভগবান শিব কীভাবে ত্রিপুরাসুরকে বধ করে তিন পুরী ধ্বংস করেছিলেন, সেই অতিপ্রাকৃতিক ও বীরত্বগাথা নিয়েই এটি রচিত। এছাড়া ভৎসরাজের লেখা ‘ত্রিপুরদাহ’ এবং রামচন্দ্রের ‘যাদবোদয়’ ডিম ঘরানার উল্লেখযোগ্য নাটক।
তাহলেই বোঝা যাচ্ছে, ডিম যেমন খাওয়ার হয়, কিংবা শটপাট বা জ্যাভেলিন বা ডিসকাস ছোঁড়ার ডিম হয়, ডিম তেমনি নাটকের হয়। ঘোড়ার ডিমটাও নাটকের কিনা ভেবে দেখা দরকার। কারণ ঘোড়া দেবতাদের একটি বিশেষ বাহন। সূর্যের তো সাতসাতটি ঘোড়া। উচ্চৈঃশ্রবা দেবরাজ ইন্দ্রের বিখ্যাত ঘোড়া, সমুদ্রমন্থনের সময় উঠেছিল। ঘোড়াকে নিয়ে ডিম কেউ লিখে গেছেন কিনা তা আমি অন্তত জানি না।