Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ১১৩ জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা

ফিফথ রিপোর্ট-কর্পোরেট-জাতিরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের ‘ডেটা নির্ভর’ ‘বৈজ্ঞানিক’ ভিত্তি স্থাপনের প্রথম সফল প্রচেষ্টা

অনুবাদকের মনে করে ফিফথ রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনী দিক হল এর ‘বৈজ্ঞানিক’ চেহারা — যে চেহারাকে, পলাশীর পর বাংলা থেকে যাওয়া বিপুল লুঠ হওয়া সম্পদকে পুঁজিতে রূপান্তরিত করে, পশ্চিম ইওরোপ, সেটলার কলোনিগুলোয় পুঁজিবাদ আর উপনিবেশগুলোয় মেট্রোপলিটনের উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানি করার কাজে ব্যবহার করবে। ১৮১২ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সিলেক্ট কমিটি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ নবায়নকল্পে এই ফিফথ রিপোর্ট, পঞ্চম প্রতিবেদন নির্মাণ করে পার্লামেন্টে পেশ করে। এই রিপোর্ট বা সমীক্ষার উপাদান ছিল বিপুল-বিশাল পরিসংখ্যানের বোমাবাজি, গুনতি চোখ ধাঁধানো ঐতিহাসিক দলিলের সমাহার আর বিস্তৃত আইনি বিশ্লেষণ। এই সমীক্ষার মাধ্যমে কোম্পানির রাজস্ব আর বিচার ব্যবস্থার ‘নির্ভরযোগ্য’ আর ‘বস্তুনিষ্ঠ’ ছবি তুলে ধরে পুঁজিবাদের বিকাশে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে আরও বড়ভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ‘বৈজ্ঞানিক’ এই রিপোর্টের আবরণের নিচে লুকিয়ে ছিল এর প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য — কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রক্ষা আর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এই ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণই রিপোর্টকে ‘মাস্টারপিসে’ পরিণত করে, বিপুল তথ্য উপস্থাপনের মাধ্যমে শাসন-ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণে নতুন সময়ে নতুন কৌশল হিসেবে আবির্ভূত হয়।

ফিফথ রিপোর্টের তিনটে হাতিয়ার — পরিসংখ্যানের বিপুল ভিড়, অবাক করা ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ আর আইনি যুক্তির ঘেরাটোপ; সব মিলিয়ে পঞ্চম প্রতিবেদন বা ফিফথ রিপোর্ট হয়ে উঠল বাংলা লুঠে বলীয়ান পুঁজিপতিদের হাতে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্যভাণ্ডার, যার ভিত্তিতে মেট্রোপলিটন ১৮১৩ সালের সনদ আইন পাস করবে। কৌশল ছিল এক্কেবারে নতুন আর টাটকা — বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের মাধ্যমে উপনিবেশ তৈরি আর বলপ্রয়োগে সমুদ্রবাণিজ্যপথ দখল করতে থাকা ওয়ার-মার্কেন্টালিজম, ক্রমশ যুদ্ধক্রিয়া থেকে বেরিয়ে আসতে চেয়ে [যদিও এরপর এই যুদ্ধ আরও ১০০ বছর ধরে চলে কালমিনেট করবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আর এই যুদ্ধই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পতনের মুহাভারত রচনা করবে] শাসনকে বলপ্রয়োগে নয়, বরং ‘তথ্যের’ বেড়াজালে পরিচালন করতে চাইছিল, যাতে শোষণ আরও ‘স্বাভাবিক’ আর ‘অপরিহার্য’ মনে হয়। ফিফথ রিপোর্টের এই ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণ ছিল নবজাগরণী দৃষ্টিভঙ্গির প্রকৃত প্রতিফলন — উপনিবেশিক যুক্তি আর তথ্যের ভিত্তিতে শাসনকে অকাট্য সংস্কারের যুক্তিযুক্ত কাঠামো দেওয়া। এই ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণই রিপোর্টকে শাসনকর্মে উদ্দিষ্ট ‘নির্ভরযোগ্য’ দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ক’রে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের শক্তিশালী অজুহাত তৈরি করে।

ফিফথ রিপোর্টের ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণ ও তথ্য-নির্ভর শাসন-কৌশল আজকের প্ল্যাটফর্মাইজেশন যুগে আরও পরিশীলিত রূপ নিয়েছে। আঠারো শতকের শেষে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যেমন রাজস্ব আদায়ের ডেটা ব্যবহার করে শোষণ-কাঠামো তৈরি করেছিল, তেমনই আজকের গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের ডেটা সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে — শুধু বাজার নয়, জনমত, রাজনীতি এমনকি বিপ্লবও তৈরি করে। আরব স্প্রিং-এর সময় সোশ্যাল মিডিয়ার ডেটা যেমন আন্দোলনকে সংগঠিত করেছিল, তেমনই ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী অভিযানে ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকার ডেটা-বিশ্লেষণ জনমতকে প্রভাবিত করেছিল। ভারতেও আইটি সেল ও ডেটা-বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্বাচনী কৌশল তৈরি করা হয়, যা ফিফথ রিপোর্টের সেই ‘ডেটা-শাসনের’ আধুনিক সংস্করণ।

ফিফথ রিপোর্ট ছিল ডেটা-শাসনের আদিতম রূপ, যেখানে রাজস্ব আদায়, জমির পরিমাণ ও জনসংখ্যার পরিসংখ্যান ব্যবহার করে শাসন-কাঠামো তৈরি করা হল। আজকের প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি তার আধুনিক সংস্করণ, যেখানে ডেটা হলো ক্ষমতার নতুন ভাষা — যে ডেটা ব্যবহার করে কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্র জোট তাদের স্বার্থ রক্ষা করে, জনমত তৈরি করে, এমনকি বিপ্লবও বানায়। এই ডেটা-শাসনের মূল লক্ষ্য হলো কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা করা, জনগণের নয়। ফিফথ রিপোর্ট যেমন কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রক্ষা করতে ডেটা ব্যবহার করেছিল, আজকের প্ল্যাটফর্মগুলোও তাদের বাজার ও রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় ডেটা ব্যবহার করে। ডেটা হয়ে উঠল বিশ্বসাম্রাজ্য রক্ষায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। পঞ্চম প্রতিবেদন সূত্রে একটা বিষয় প্রথমবারের মত বোঝা গেল ডেটা যার হাতে বিশ্বশাসনের লাগাম তার হাতে।

ফিফথ রিপোর্টের ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণ ছিল তথ্যের মাধ্যমে শাসন-ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের এক নতুন দর্শনের সূচনা। উপনিবেশিক শাসনকে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোমার মন্ত্র লুকিয়েছিল ফিফথ রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে।। আজকের ডেটা-শাসন সেই দর্শনেরই বিবর্তিত রূপ, যেখানে তথ্য-বিশ্লেষণ ব্যবহার করে জনগণের মত, আচরণ আর পছন্দ-অপছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা হয়। ফিফথ রিপোর্টের কৃষক-কারিগর-হকারদের মতো, আজকের ডেটা-শাসনের শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ — যাঁরা প্ল্যাটফর্মের ‘ইউজার’ বা ‘কনজিউমার’, যাঁদের ডেটা লুঠ হয়ে যায় কর্পোরেটের মুনাফায়।

হকার, কারিগর ও চাষীদের জন্য এই ডেটা-শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অত্যন্ত জরুরি। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ যেমন সেই পুরোনো শোষণ-কাঠামোকে উন্মোচন করে, তেমনই আজকের ডেটা-শাসনের অন্তরাল উন্মোচন করতে হবে — কীভাবে ডেটা ব্যবহার করে জনগণের মতামত ও পছন্দ-অপছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কীভাবে তথ্য-বিশ্লেষণ ব্যবহার করে শোষণকে ‘স্বাভাবিক’ করা হয়, এবং কীভাবে ডেটা ব্যবহার করে কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্র জোট তাদের স্বার্থ রক্ষা করে। ফিফথ রিপোর্ট থেকে প্ল্যাটফর্ম যুগ পর্যন্ত এই ডেটা-শাসনের ইতিহাস আমাদের দেখায় যে শোষণের কাঠামো বদলায়, কিন্তু তার সারাংশ একই থাকে — কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় স্বার্থ রক্ষা, জনগণের নয়।

রিপোর্টের ‘বৈজ্ঞানিক’ চরিত্র বিশ্লেষণ

ফিফথ রিপোর্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল এর ‘বৈজ্ঞানিক’ চরিত্র, যা চারটি স্তরের মাধ্যমে নির্মিত হয়েছিল।

ফিফথ রিপোর্টের ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল এর ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণের প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর। রিপোর্টটি শুরু হয় কোম্পানির শাসনের বিস্তারিত ঐতিহাসিক বিবরণ দিয়ে, যা পলাশির যুদ্ধ থেকে শুরু করে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত পর্যন্ত বিবর্তনের সুসংহত গল্প বলে। এই আখ্যান কোম্পানির শাসনকে ‘স্বাভাবিক’ ও ‘প্রয়োজনীয়’ প্রক্রিয়া হিসেবে উপস্থাপন করে। এই যুক্তিক্রম রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ঐতিহাসিক ভিত্তি তৈরি করে। এই ঐতিহাসিক ভূমিকার মধ্য দিয়ে ফিফথ রিপোর্ট কোম্পানির শাসনকে ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে চিহ্নিত করে এবং পলাশির যুদ্ধকে ‘মহান ঐতিহাসিক ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যদিও বাস্তবে ছিল বিশ্বাসঘাতকতা আর সুযোগের খেলা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ‘সংস্কার’ হিসেবে দেখানো হয়, যা রাজস্ব ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা এনেছে — যদিও এর প্রকৃত পরিণতি ছিল কৃষকের ওপর জমিদারি অত্যাচার বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া। এই গল্পের মাধ্যমে কোম্পানির শাসন ভারতবর্ষীয় ইতিহাসের ‘প্রকৃত’ ধারাবাহিকতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হল, এর ফলে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা হয়। ফিফথ রিপোর্টের ঐতিহাসিক ভূমিকা তাই শুধু শুকনো তথ্যগত বিবরণ ছিল না; ছিল কোম্পানির শাসনকে বৈধতা দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার শক্তিশালী অস্ত্র, যা উপনিবেশিক শাসনকে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় স্তর ছিল পরিসংখ্যান ও তথ্যের বিশাল ভাণ্ডার। রাজস্ব আদায়, জমির পরিমাণ, জনসংখ্যা বিশ্লেষণ — এই সব চলকের বিস্তারিত পরিসংখ্যান রিপোর্টটিকে একটি ‘নির্ভরযোগ্য’ দলিলে রূপান্তরিত করে। এই পরিসংখ্যানগুলোর মাধ্যমে কোম্পানির শাসনের ‘সাফল্য’ প্রমাণ করে রিপোর্টের সিদ্ধান্তকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তোলা হল। পরিসংখ্যান ছিল রিপোর্টের ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণের মূল অস্ত্র। পরিসংখ্যানমালা কোম্পানির রাজস্ব নীতিকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ ও ‘তথ্য-নির্ভর’ হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও বাস্তবে এই তথ্যগুলো উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নির্বাচন করা হয় এবং তাকে আবার নব্যপুঁজিবাদের স্বার্থপূরণের উদ্দেশ্যে সাজানো হল। রাজস্ব আদায়ের পরিসংখ্যান দেখানো হতো কোম্পানির প্রশাসনিক দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে, অথচ এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে ছিল কৃষকের ঋণগ্রস্ততা ও জমিদারি অত্যাচার আর কোম্পানির আমলাদের অমিত লুঠ। জনসংখ্যা বিশ্লেষণ ব্যবহার করা হতো শাসনের ‘স্থিতিশীলতা’ প্রমাণের জন্য, যদিও ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষে ব্রিটিশ হিসেবেই তিনজন মানুষের একজন অর্থাৎ অন্তত ১ কোটি বাঙালি মারা গিয়েছিল। পরিসংখ্যানের এই ‘নির্ভরযোগ্য’ চেহারাই রিপোর্টকে ‘বস্তুনিষ্ঠ’ দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের জন্য একটি শক্তিশালী অজুহাত তৈরি করেছে। ফিফথ রিপোর্টের পরিসংখ্যান তাই শুধু তথ্যের সংগ্রহ ছিল না — ছিল কোম্পানির শাসনকে বৈধতা দেওয়ার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল, যা উপনিবেশিক শাসনকে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

ফিফথ রিপোর্টের তৃতীয় স্তর ছিল আইনি বিশ্লেষণ। রিপোর্টটি কোম্পানির দেওয়ানি অধিকার, জমিদারি আইন ও বিচার ব্যবস্থার আইনি বিশ্লেষণের সমাহার, যা কোম্পানির শাসনের ‘আইনি ভিত্তি’ প্রমাণের চেষ্টা করে। এই আইনি বিশ্লেষণ কোম্পানির শাসনকে বৈধতা দেয় এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরি করে। রিপোর্টটি কোম্পানির দেওয়ানি অধিকারকে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে প্রাপ্ত ‘আইনি’ দলিল হিসেবে উপস্থাপন করে, যদিও বাস্তবে এই অধিকার অর্জিত হয়েছিল বলপ্রয়োগ ও কূটনৈতিক চাতুর্যের মাধ্যমে। জমিদারি আইনের বিশ্লেষণ জমিদারদের ‘ভূমির মালিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা মুঘল ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল এবং কোম্পানির রাজস্ব আদায়কে সহজ করেছিল। বিচার ব্যবস্থার আইনি বিশ্লেষণ দেখানোর চেষ্টা করে যে কোম্পানি একটি ‘ন্যায়বিচারমূলক’ শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, যদিও বাস্তবে বিচার ব্যবস্থা ছিল শোষণ-কাঠামোরই একটি অংশ। এই আইনি বিশ্লেষণ কোম্পানির শাসনকে ‘আইনি’ ও ‘সংবিধানসম্মত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, যা রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের জন্য একটি শক্তিশালী অজুহাত তৈরি করে। ফিফথ রিপোর্টের আইনি বিশ্লেষণ তাই শুধু একটি আইনি যুক্তি ছিল না; এটি ছিল কোম্পানির শাসনকে বৈধতা দেওয়ার এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি কৌশল, যা উপনিবেশিক শাসনকে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

চতুর্থত, পরিশিষ্ট ও মূলনথি — রিপোর্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল পরিশিষ্ট, যেখানে কোম্পানির গোপন চিঠিপত্র, আইনি নথি ও প্রশাসনিক রিপোর্ট সংরক্ষিত ছিল। এই নথিগুলো রিপোর্টের সিদ্ধান্তকে ‘প্রমাণিত’ করত এবং এটিকে আরও ‘বস্তুনিষ্ঠ’ ও ‘নির্ভরযোগ্য’ করে তোলে।

এই চার স্তরের আবরণে ফিফথ রিপোর্ট ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণ তৈরি করে, যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এর মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য — কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এই ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণই রিপোর্টকে একটি ‘মাস্টারপিস’-এ পরিণত করে, যা তথ্যের মাধ্যমে শাসন-ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের এক নতুন কৌশল তৈরি করছিল পুঁজিবাদের উত্থানের প্রথম পর্বে। ফিফথ রিপোর্টের এই কৌশল আজকের প্ল্যাটফর্মাইজেশন যুগেও প্রাসঙ্গিক, যেখানে ডেটা ও বিশ্লেষণকে কাজে লাগিয়ে কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্র জোট তাদের স্বার্থ রক্ষা করে। ফিফথ রিপোর্ট ছিল ডেটা-শাসনের আদিতম রূপ, আর আজকের প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি তার আধুনিক সংস্করণ — উভয় ক্ষেত্রেই ‘ডেটা’ হলো ক্ষমতার নতুন ভাষা। ফিফথ রিপোর্টের ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণ তাই শুধু একটি ঐতিহাসিক কৌশল ছিল না; এটি ছিল তথ্যের মাধ্যমে শাসন-ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের এক নতুন দর্শনের সূচনা, যা উপনিবেশিক শাসনকে আরও সুসংহত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে।

মাথায় রাখতে হবে এই তৈরি করা নবজাগরণী ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণের নিচে লুকিয়ে ছিল রিপোর্টের মৌলিক রাজনৈতিক উদ্দেশ্য — কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। কর্পোরেট-জাতিরাষ্ট্রের পক্ষে ‘ডেটা’ ব্যবহার করে শাসন ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করার নতুন কৌশল উদ্ভাবিত হল। ফিফথ রিপোর্টের ‘বৈজ্ঞানিক’ আবরণ তার প্রকৃত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যকে ঢেকে রাখার জন্য তৈরি করা হয়েছিল — কোম্পানির প্রশাসনিক ক্ষমতা রক্ষা করা ও রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এই প্রক্রিয়ায় ‘ডেটা’-র ব্যবহার ছিল এক নতুন কৌশল, যা কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্র জোটকে শাসন-ক্ষমতা আরও সুসংহত আর দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করে। ফিফথ রিপোর্টের বিশাল পরিসংখ্যান, ঐতিহাসিক দলিল ও আইনি বিশ্লেষণ — সব মিলিয়ে এক ‘নির্ভরযোগ্য’ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করেছিল, যার ভিত্তিতে ১৮১৩ সালের সনদ আইন পাস করা হয়। কৌশলটা সে সময়ের জন্য এক্কেবারেই ছিল ছিল নতুন — শাসনকে আর বলপ্রয়োগের মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং ‘তথ্যের’ সমাহারে পরিচালন করা, যাতে শোষণ আরও ‘স্বাভাবিক’ এবং ‘অপরিহার্য’ বলে মনে হয়। আজকের প্ল্যাটফরমাইজেশন যুগে এই কৌশল আরও পরিশীলিত রূপ নিয়েছে। গুগল, ফেসবুক, অ্যামাজনের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের ডেটা সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে, এবং সেই ডেটার ভিত্তিতে আমাদের পছন্দ-অপছন্দ, আচরণ, এমনকি মতামতও নিয়ন্ত্রণ করে। ফিফথ রিপোর্ট যেমন রাজস্ব আদায়ের ডেটাকে কাজে লাগিয়ে শাসন-কাঠামো তৈরি করেছিল, আজকের প্ল্যাটফর্মগুলো ভোক্তা ও নাগরিকদের ডেটাকে কাজে লাগিয়ে বাজার ও জনমত নিয়ন্ত্রণ করে। ফিফথ রিপোর্ট ছিল ডেটা-চালিত শাসনের আদি রূপ, আর আজকের প্ল্যাটফর্ম অর্থনীতি তার আধুনিক সংস্করণ — উভয় ক্ষেত্রেই ‘ডেটা’ হলো ক্ষমতার নতুন ভাষা, এবং উভয় ক্ষেত্রেই এর লক্ষ্য হলো কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা, জনগণের নয়। ফিফথ রিপোর্ট সেই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সূচনা, যার পরিণতি আমরা আজ প্ল্যাটফর্মাইজেশনের যুগে দেখছি, যেখানে ডেটাকে নতুন উপনিবেশিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, শিকার করা হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন — যাঁরা ফিফথ রিপোর্টের সময়ে ছিলেন কৃষক-কারিগর, আর আজকের যুগে তাঁরা হচ্ছেন প্ল্যাটফর্মের ‘ইউজার’ বা ‘কনজিউমার’।

উপনিবেশের পতন হোক — সেই পুরোনো শোষণ-কাঠামোর, আর তার আধুনিক ডেটা-নির্ভর সংস্করণের। কারণ ডেটা-শাসন যতই পরিশীলিত হোক, তার মূল লক্ষ্য একই — হকার, কারিগর ও চাষীদের শ্রমের উদ্বৃত্ত লুঠ করে কর্পোরেট-জাতি-রাষ্ট্র জোটকে শক্তিশালী করা। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ সেই চিরন্তন সংগ্রামেরই ধারাবাহিকতা — তথ্যের মাধ্যমে শোষণকে উন্মোচন করা, এবং সেই শোষণ-কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন