Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ভাসামানিক ভাসামানিক’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ হুগলি-চুঁচুড়ার স্মৃতি ও বঙ্কিম প্রতিভার উন্মেষ : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আর্ট কলেজ থেকে পাশ করে মুখ্যমন্ত্রী — বলে কি রে : বিজয় চৌধুরী বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কামারপুকুর পুরসভায় এলেন ঠাকুর রামকৃষ্ণ, কাজের জন্য মানুষ দরকার — লোকোত্তরানন্দ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায়
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’

অয়ন মুখোপাধ্যায় / ৫৯ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬

যেদিন সুবীরের বিয়ে ভাঙল, সেদিনই মালতী ঠিক করল তাদের বাড়ির সামনের বারান্দাটা বিক্রি করে দেবে।

বারান্দা বিক্রি হয় কি না, সে বিষয়ে মালতীর কোনো ধারণা ছিল না। কিন্তু জমি বিক্রি হয়, পুকুর বিক্রি হয়, মানুষের কিডনি পর্যন্ত বিক্রি হয়, তা হলে সাড়ে তিন হাত বারান্দা বিক্রি হবে না কেন?

সে দুপুরবেলা ভাত নামিয়ে স্বামীকে বলল,

— শোনো, বারান্দাটা বেচে দেব।

শশাঙ্ক ডালের মধ্যে কাঁচালঙ্কা চটকাচ্ছিল। মাথা তুলল না।

— কাকে?

— যে কিনবে।

— বারান্দা কিনে লোকটা করবে কী?

— আমি কি তার সংসারের পরামর্শদাতা?

শশাঙ্ক এবার স্ত্রীর দিকে তাকাল। আটান্ন বছরের দাম্পত্য নয়, আটান্ন বছর বয়স তার। কিন্তু মুখে এমন এক ক্লান্তি, যেন ভারতীয় রেল তার ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে চলে।

— সকাল থেকে কী হয়েছে?

মালতী বলল,

— তোমার ছেলে বিয়ে করবে না।

শশাঙ্ক আবার ডাল মাখল।

— ও।

— ও মানে?

— করবে না তো করবে না।

— মেয়ের বাড়িতে কী বলব?

— সত্যি বলবে।

— সত্যিটা কী?

এই প্রশ্নে শশাঙ্কর হাত থেমে গেল।

সত্যিটা ঠিক কী, সেটা সকাল দশটা থেকে কেউ বুঝতে পারছিল না।

সুবীরের বিয়ে ঠিক হয়েছিল রক্তিমার সঙ্গে। রক্তিমা মেয়ে। নাম শুনে প্রথম দিন শশাঙ্ক ভুল করেছিল। ফোনে বলেছিল, “রক্তিমবাবু, নমস্কার।” ওপাশ থেকে মেয়েটি বলেছিল, “আমি বাবু নই, তবে নমস্কারটা রেখে দিচ্ছি।”

সেই থেকেই শশাঙ্কর মেয়েটিকে পছন্দ।

রক্তিমা একটি বেসরকারি স্কুলে ভূগোল পড়ায়। সুবীর ব্লক অফিসে চুক্তিভিত্তিক ডেটা এন্ট্রির কাজ করে। বিয়ে হতে আর উনিশ দিন বাকি।

সকাল ন’টা আটচল্লিশে সুবীর এসে বলেছে,

— আমি বিয়ে করব না।

মালতী তখন লাউ কাটছিল।

— কাকে?

— কাউকে না।

— রক্তিমাকে করবি না?

— না।

— অন্য কাউকে করবি?

— না।

মালতী ছুরি নামিয়ে ছেলের মুখ দেখেছিল।

— তুই কি সাধু হবি?

— না।

— তা হলে?

সুবীর বলেছিল,

— আমার দ্বারা হবে না।

এই ‘আমার দ্বারা হবে না’ কথাটি মালতীর মাথায় তিন ঘণ্টা ধরে ঘুরছিল। তার অভিজ্ঞতায় পুরুষমানুষের দ্বারা কী হয় আর কী হয় না, সেটা পুরুষমানুষ নিজে সবচেয়ে কম জানে।

দুপুর আড়াইটায় রক্তিমা এল।

একা নয়।

সঙ্গে একটি সাত-আট বছরের ছেলে।

মালতী দরজা খুলে প্রথমে রক্তিমাকে, তারপর ছেলেটিকে দেখল।

— কে?

রক্তিমা বলল,

— এ আমার সঙ্গে এসেছে।

— সেটা দেখছি। কে?

ছেলেটি নিজেই বলল,

— আমার নাম অবকাশ।

শশাঙ্ক ভেতর থেকে শুনে বেরিয়ে এল।

— কী নাম?

— অবকাশ।

— বাহ্।

মালতী বিরক্ত হল।

— সব কিছুতে বাহ্ বলো কেন?

শশাঙ্ক বলল,

— ছেলেটার নাম যদি বাবলু হত, তুমি খুশি হতে?

রক্তিমা হাসল না। তার চোখ ফুলে ছিল।

সে বলল,

— সুবীর কোথায়?

মালতী বলল,

— ঘরে।

— ডাকবেন?

— তুমি নিজেই যাও।

রক্তিমা নড়ল না।

— আমি এখানে কথা বলব।

মালতী এবার বুঝল, দুপুরটা সহজে কাটবে না।

সুবীর বেরিয়ে এল। অবকাশকে দেখে তার মুখ বদলে গেল।

রক্তিমা বলল,

— চিনতে পারছ?

সুবীর উত্তর দিল না।

অবকাশ বারান্দার রেলিং ধরে বাইরে দেখছিল। রাস্তার ওপারে একটি ছাগল কাগজ খাচ্ছিল।

সে বলল,

— ওই ছাগলটা কি আপনাদের?

কেউ উত্তর দিল না।

রক্তিমা বলল,

— কাল তুমি আমার স্কুলে গিয়েছিলে কেন?

সুবীর বলল,

— কাজ ছিল।

— কী কাজ?

— তোমার সঙ্গে।

— তুমি নিজে না গিয়ে হেডমিস্ট্রেসের ঘরে কাউকে পাঠালে কেন?

মালতী এবার ছেলের দিকে তাকাল।

— তুই কাউকে পাঠিয়েছিলি?

সুবীর চুপ।

রক্তিমা ব্যাগ থেকে একটা কাগজ বের করল।

— তুমি জানতে চেয়েছ, আমার নামে কোনো গার্ডিয়ানশিপ রেকর্ড আছে কি না।

শশাঙ্ক ধীরে ধীরে চেয়ারে বসল।

মালতী বলল,

— গার্ডিয়ান কী?

অবকাশ বলল,

— যে বকতে পারে।

শশাঙ্ক এবারও ‘বাহ্’ বলতে যাচ্ছিল। স্ত্রীর মুখ দেখে থেমে গেল।

রক্তিমা বলল,

— অবকাশ আমার ছেলে নয়।

সুবীর হঠাৎ বলল,

— আমি জানি।

— কী জানো?

— ও তোমার দিদির ছেলে।

রক্তিমার মুখ শক্ত হল।

— আর?

— তোমার দিদি জেলে।

মালতীর হাত থেকে আঁচল পড়ে গেল।

শশাঙ্ক বলল,

— কেন?

রক্তিমা তাকাল।

— খুনের মামলা।

ঘরের মধ্যে একটি মাছি উড়ছিল। এতক্ষণ কেউ খেয়াল করেনি। এখন তার শব্দ শোনা গেল।

মালতী বসে পড়ল।

— তুমি আমাদের বলোনি কেন?

রক্তিমা বলল,

— কারণ আমি বিয়ে করছি। আমার দিদি নয়।

সুবীর বলল,

— কিন্তু ছেলেটা?

— আমার কাছে থাকে।

— বিয়ের পর?

— আমার কাছেই থাকবে।

— আমাকে বলোনি।

— বলতাম।

— কবে? ফুলশয্যায়?

অবকাশ এবার ঘুরে তাকাল।

— ফুলশয্যা কী?

শশাঙ্ক দ্রুত বলল,

— ফুল রাখার জায়গা।

মালতী স্বামীর দিকে এমনভাবে তাকাল, যেন এই লোকটির সঙ্গে এত বছর সংসার করাই তার প্রধান চারিত্রিক দুর্বলতা।

রক্তিমা বলল,

— আমি ভয় পেয়েছিলাম।

সুবীর হেসে উঠল।

— কীসের ভয়? আমি বিয়ে ভেঙে দেব?

— হ্যাঁ।

— দেখলে তো ঠিকই ভেবেছিলে।

রক্তিমা এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল।

— না। ভুল ভেবেছিলাম।

— কীভাবে?

— ভেবেছিলাম তুমি সত্যিটা জানলে চলে যাবে। এখন দেখছি, তুমি সত্যি জানার আগেই আমার পেছনে লোক লাগিয়েছ।

সুবীর চমকে উঠল।

— লোক?

রক্তিমা কাগজটা টেবিলে ছুড়ে দিল।

— আমি ভেবেছিলাম তুমি নিজে গিয়েছিলে। এই কাগজ বলছে, তুমি স্কুলে যাওইনি।

কেউ কথা বলল না।

— তোমার হয়ে গিয়েছিল বাপি।

মালতী বলল,

— কোন বাপি?

শশাঙ্ক খুব নিচু গলায় বলল,

— আমার ভাইপো।

এবার সুবীর বাবার দিকে তাকাল।

— তুমি জানলে কী করে?

শশাঙ্ক উত্তর দিল না।

মালতী বলল,

— তুমি কী জানো?

শশাঙ্ক ডান হাঁটু চুলকাল।

— সামান্য।

— তোমার সামান্য মানে কত?

— বাপি আমাকে ফোন করেছিল।

— কেন?

— টাকা চেয়েছিল।

সুবীর উঠে দাঁড়াল।

— তুমি ওকে টাকা দিয়েছ?

— দিয়েছি।

— কেন?

— তুই দিতে বলেছিলি।

— আমি পাঁচ হাজার বলেছিলাম।

— ও পনেরো চেয়েছে।

— তুমি দিয়েছ?

— হ্যাঁ।

সুবীর মাথায় হাত দিল।

রক্তিমা চুপচাপ দেখছিল।

মালতী বলল,

— কীসের টাকা?

কেউ উত্তর দিল না।

সে এবার চেঁচিয়ে উঠল,

— এই বাড়িতে সবাই কি গোয়েন্দাগিরি করছে?

অবকাশ বলল,

— আমি করছি না।

মালতী ছেলেটার দিকে তাকিয়ে একটু নরম হল।

— তুই বিস্কুট খাবি?

— কোন কোম্পানি?

— কেন?

— সব বিস্কুট ভালো নয়।

শশাঙ্ক বলল,

— এই ছেলেটা বাঁচবে।

রক্তিমা এবার সুবীরের দিকে এগিয়ে গেল।

— তুমি আমার দিদির ব্যাপারে খোঁজ করিয়েছ?

সুবীর বলল,

— হ্যাঁ।

— কেন?

— কারণ তুমি মিথ্যে বলছিলে।

— আমি কী মিথ্যে বলেছি?

— তুমি বলেছিলে তোমার দিদি বাইরে থাকে।

— জেল কি দেশের বাইরে?

মালতী মুখ ঘুরিয়ে ফেলল। তার হাসি পাচ্ছিল। এমন সময় হাসা উচিত নয়, তাই আরও পাচ্ছিল।

সুবীর বলল,

— শব্দ নিয়ে খেলো না।

রক্তিমা বলল,

— তুমি মানুষ নিয়ে খেলেছ।

তারপর অবকাশকে ডাকল।

— চল।

ছেলেটি নড়ল না।

— আমি বিস্কুট খাব।

— বাড়িতে দেব।

— এখানে কোনটা আছে দেখি।

মালতী বলল,

— বস। কেউ কোথাও যাবে না।

রক্তিমা বলল,

— মাসিমা, আর কিছু নেই।

মালতী শান্ত গলায় বলল,

— আছে। আমার ছেলে পনেরো হাজার টাকা খরচ করে কী খুঁজেছে, সেটা এখনও জানা হয়নি।

সুবীর বলল,

— মা!

— চুপ।

এই ‘চুপ’ শব্দটি এমন ছিল যে শশাঙ্ক পর্যন্ত সোজা হয়ে বসল।

সুবীর কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে থেকে বলল,

— আমি জানতে চেয়েছিলাম খুনটা কেন হয়েছিল।

রক্তিমার ঠোঁট কাঁপল।

— কেন?

— কারণ বিয়ের পর অবকাশ আমাদের সঙ্গে থাকবে।

— তার সঙ্গে খুনের সম্পর্ক?

— আছে।

— কী সম্পর্ক?

সুবীর এবার ছেলেটার দিকে তাকাল।

— ও খুনটা দেখেছিল।

রক্তিমা স্থির হয়ে গেল।

শশাঙ্ক বলল,

— কী বলছিস?

সুবীর বলল,

— বাপি কোর্টের এক ক্লার্কের সঙ্গে চেনাশোনার সূত্রে কাগজ বের করেছে। মামলায় অবকাশের প্রথম জবানবন্দি ছিল। পরে সেটা বদলানো হয়।

রক্তিমা ফিসফিস করে বলল,

— তুমি কাগজ পড়েছ?

— হ্যাঁ।

— সব?

— যতটা পেয়েছি।

রক্তিমা আচমকা সুবীরকে চড় মারল।

অবকাশ বিস্কুটের প্যাকেট হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। সে চমকাল না।

শুধু বলল,

— মাসি, তুমি আবার মারলে।

এই ‘আবার’ শব্দটা ঘরের মধ্যে ঢুকে সবকিছু বদলে দিল।

সুবীর গালে হাত রেখে বলল,

— আবার মানে?

রক্তিমা ছেলেটার দিকে তাকাল।

— চুপ কর।

অবকাশ বিস্কুট খুলতে খুলতে বলল,

— তুমি বলেছিলে কাউকে মারবে না।

মালতী খুব ধীরে জিজ্ঞেস করল,

— রক্তিমা, তোমার দিদি কাকে খুন করেছে?

রক্তিমা উত্তর দিল না।

অবকাশ বলল,

— বাবাকে।

কেউ নড়ল না।

ছেলেটি বিস্কুটে কামড় দিল।

— কিন্তু মা মারেনি।

রক্তিমা চেঁচিয়ে উঠল,

— অবকাশ!

— তুমিই তো মেরেছিলে।

বাইরে তখন ছাগলটা কাগজ খাওয়া শেষ করে বারান্দার কাছে চলে এসেছে।

ঘরের মধ্যে পাঁচজন বড় মানুষ। কেউ কথা বলতে পারছিল না।

রক্তিমা প্রথমে বসে পড়ল।

তারপর বলল,

— ও তখন পাঁচ বছরের।

সুবীর ফিসফিস করে বলল,

— কী হয়েছিল?

— কিছু না।

— এখনও মিথ্যে বলবে?

রক্তিমা দু’হাতে মুখ ঢাকল।

অবকাশ বলল,

— বাবা মাকে মারছিল।

মালতী চোখ বন্ধ করল।

ছেলেটি বলেই চলল, যেন স্কুলের মুখস্থ কবিতা বলছে।

— মা পড়ে গিয়েছিল। বাবা লাঠি নিয়েছিল। মাসি পেছন থেকে ঠেলেছিল। বাবা সিঁড়ি দিয়ে পড়ে যায়।

শশাঙ্ক বলল,

— তারপর?

রক্তিমা মুখ তুলল।

— দিদি বলল, ও করেছে।

— কেন?

— কারণ আমার চাকরি ছিল। কারণ অবকাশ ছোট। কারণ দিদির ধারণা ছিল, তার জীবন এমনিতেই শেষ। কারণ মানুষ মাঝে মাঝে খুব বোকা হয়।

সুবীর বলল,

— তুমি দিদিকে জেলে থাকতে দিলে?

রক্তিমা এবার তার দিকে এমন চোখে তাকাল যে মালতী ভয় পেল।

— ‘দিলে’?

— আমি বলতে চাইছি—

— তুমি কিছুই বলতে চাইছ না। তুমি শুধু জানতে চাও। সব জানতে চাও। মানুষকে বিয়ে করার আগে তার রক্ত পরীক্ষা, বেতন পরীক্ষা, পরিবার পরীক্ষা, অতীত পরীক্ষা। তারপর নিরাপদ হলে ভালোবাসবে।

সুবীর বলল,

— আমি ভয় পেয়েছিলাম।

রক্তিমা থেমে গেল।

এই প্রথম সুবীরের গলা বদলেছে।

— কীসের?

সুবীর অবকাশের দিকে তাকাল।

— আমি ওর দায়িত্ব নিতে পারব কি না।

— তাই বিয়ে ভাঙলে?

— না।

— তা হলে?

সুবীর চেয়ার টেনে বসল।

— আমি কাল উকিলের কাছে গিয়েছিলাম।

রক্তিমা তাকিয়ে রইল।

— কেন?

— তোমার দিদির মামলা আবার খোলা যায় কি না জানতে।

এবার মালতী বলল,

— কী?

সুবীর মাথা নিচু করল।

— বাপিকে আমি তোমার চরিত্র খুঁজতে বলিনি। মামলার কাগজ আনতে বলেছিলাম।

রক্তিমা অনেকক্ষণ কিছু বলল না।

তারপর খুব ধীরে বলল,

— তা হলে সকালে বিয়ে ভাঙলে কেন?

সুবীর উত্তর দিল,

— কারণ উকিল বলেছে মামলা খুললে তোমারও জেল হতে পারে।

— হতে পারে।

— অবকাশ কোথায় থাকবে?

— আমি জানি না।

— আমিও জানি না।

— তাই পালাবে?

সুবীর এবার তাকাল।

— না। তাই বিয়েটা এখন করলে মনে হবে তোমার বিপদের সুযোগ নিচ্ছি।

রক্তিমা হেসে ফেলল। কান্নার মধ্যে এমন হাসি খুব খারাপ দেখায়।

— তুমি সত্যিই একটা নির্বোধ।

শশাঙ্ক বলল,

— এটা আমি ছোটবেলাতেই বুঝেছিলাম।

মালতী স্বামীকে ধমকাল,

— এখন তোমার রসিকতা না করলেও চলবে।

অবকাশ দ্বিতীয় বিস্কুট নিয়ে বলল,

— বিয়ে হবে না?

কেউ উত্তর দিল না।

সে সুবীরকে জিজ্ঞেস করল,

— আপনি মাসিকে বিয়ে করবেন?

সুবীর বলল,

— জানি না।

— মাসি আপনাকে করবে?

রক্তিমা বলল,

— জানি না।

অবকাশ কিছুক্ষণ ভাবল।

তারপর বলল,

— তা হলে বারান্দাটা আমি নেব।

মালতী চমকে উঠল।

— কোন বারান্দা?

— এটা।

— কেন?

— আমাদের বাড়িতে বারান্দা নেই।

মালতী ছেলেটার দিকে তাকিয়ে রইল।

সকাল থেকে সে বারান্দা বিক্রি করতে চাইছিল। কারণ বিয়ের জন্য ওই বারান্দায় নতুন গ্রিল বসানো হয়েছে, দেওয়ালে রং হয়েছে, কোণে রজনীগন্ধার টব রাখা হয়েছে। বিয়ে ভেঙে গেলে এসব দেখে তার সহ্য হবে না।

সে জিজ্ঞেস করল,

— কত টাকা দিবি?

অবকাশ পকেট থেকে এগারো টাকা বের করল।

— এত আছে।

মালতী টাকা গুনল।

— কম।

ছেলেটা বলল,

— বাকি পরে দেব।

— কবে?

— বড় হয়ে।

মালতী এগারো টাকা আঁচলে বেঁধে ফেলল।

— ঠিক আছে। আজ থেকে বারান্দা তোর।

রক্তিমা বলল,

— মাসিমা!

মালতী ধমকে উঠল,

— তুমি চুপ করো। সম্পত্তির ব্যাপার।

সন্ধের একটু আগে রক্তিমা চলে গেল। সুবীর তাকে এগিয়ে দিতে গেল না। শুধু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলল,

— কাল উকিলের কাছে যাব।

রক্তিমা বলল,

— আমি যাব কি না জানি না।

— ঠিক আছে।

— তুমি অপেক্ষা করবে?

সুবীর একটু ভেবে বলল,

— এটাও জানি না।

রক্তিমা মাথা নাড়ল।

— এই প্রথম একটা সত্যি কথা বললে।

সে চলে গেল।

অবকাশ গেল না।

বারান্দার মেঝেতে বসে রইল। এগারো টাকায় কেনা সম্পত্তি এত তাড়াতাড়ি ছেড়ে যাওয়ার কোনো মানে হয় না।

রাত আটটার সময় মালতী তাকে ভাত দিল। শশাঙ্ক মশারি নামাল। সুবীর ফোন হাতে বসে রইল, কিন্তু কাউকে ফোন করল না।

সাড়ে ন’টায় রক্তিমার ফোন এল।

সুবীর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

ধরল না।

দ্বিতীয়বার এল।

ধরল না।

তৃতীয়বার অবকাশ এসে ফোনটা তুলে নিল।

— হ্যালো?

ওপাশে কী বলা হল কেউ শুনতে পেল না।

অবকাশ শুধু বলল,

— আমি আমার বারান্দায় আছি।

তারপর একটু শুনে বলল,

— না, আজ ফিরব না।

আরও একটু চুপ থেকে বলল,

— তুমি কাল এসো।

ফোন কেটে সে সুবীরের দিকে তাকাল।

— মাসি কাঁদছিল।

সুবীর বলল,

— জানি।

— কী করে?

— মানুষ কাঁদলে সব সময় দেখতে হয় না।

অবকাশ কিছুক্ষণ তার মুখ দেখল।

তারপর বারান্দায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।

রাত বাড়ল।

রাস্তার আলো নতুন গ্রিলের ফাঁক দিয়ে মেঝেতে লম্বা লম্বা দাগ ফেলছিল। মালতী ঘুমোতে যাওয়ার আগে দেখল, শশাঙ্ক বারান্দায় একটা পুরোনো বালিশ রেখে এসেছে। সুবীর নিজের ঘরের দরজা খোলা রেখেছে। আর এগারো টাকার নতুন মালিক ঘুমের মধ্যে একবার হাত বাড়িয়ে গ্রিল ছুঁয়ে দেখছে।

মালতী হঠাৎ বুঝল, সকালে সে বারান্দাটা বিক্রি করতে চেয়েছিল কারণ তার মনে হয়েছিল বিয়ে ভেঙে গেলে জায়গাটা ফাঁকা হয়ে যাবে।

এখন বিয়ে হবে কি না জানা নেই। মামলা খুলবে কি না জানা নেই। রক্তিমা কাল আসবে কি না জানা নেই। সুবীর অপেক্ষা করবে কি না, সেটাও জানা নেই।

শুধু বারান্দাটা আর ফাঁকা নেই।

মালতী দরজা বন্ধ করল না।

সাড়ে তিন হাত জায়গা এগারো টাকায় বিক্রি করে জীবনে এই প্রথম তার মনে হল, সে সম্ভবত ঠকেনি।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন