আমাদের মুখ্যমন্ত্রী বড্ড কড়া ধাতের মানুষ। বেনিয়ম তিনি সহ্য করতে পারেন না। বেআইনি কাজ-কম্ম তাঁর ভীষণ অসহ্য। নিয়মনিষ্ঠ তিনি। নীতিনিষ্ঠ। কলকাতার হগ মার্কেটে বেআইনি নির্মাণ ছিল। নির্বাচনে জিতে, শপথ নেওয়ার আগেই তিনি বুলডোজার বাবার পথানুসরণ করে গুঁড়িয়ে দিলেন সে বে আইনি নির্মাণ। তারপর থেকে চলতে লাগল বুলডোজার। হকার উচ্ছেদ। তারা বুক চাপড়াচ্ছে। আর্তনাদ করছে। কিন্তু আইনের রক্ষক মুখ্যমন্ত্রী সেদিকে তাকান নি। বিচারককে নির্মম না হলে চলে!
বিরোধী নেতা থাকার সময়েই তিনি বলেছিলেন সে সকথা। বলেছিলেন আগের মুখ্যমন্ত্রীর মতো তাঁর আঠারো মাসে বছর নয়। তাঁর মতো দুর্বল তিনি নন। কালক্ষেপ না করে তিনি তাঁর কর্তব্যকর্ম করে যাবেন। এই রকম তড়িঘড়ি দেখে কোন কোন নিন্দুক বলেন : ‘তড়বড়ি ঘোড়া চড়ি কোথা তুমি যাও হে’! উত্তরে তিনি নীরবে বলেছিলেন : ‘সমরে চলিনু আমি আমে না ফেরাও হে’। সমর! সমর মানে যুদ্ধ। সত্যজিতের হল্লা রাজার যুদ্ধ নয় মশাই। এ একেবারে নির্ভেজাল যুদ্ধ। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি বললেন, ‘এবার সব ফাইল খোলা হবে।’ ফাইল মানে বিরোধীদের কুকর্মের ফাইল। টপাটপ খুলতে লাগল ফাইল। গপাগপ গ্রেপ্তার। কোমরে দড়ি বেঁধে টানা আছে। ডিম থেরাপি আছে। এইসব অনুমান করে কিছু বিরোধী আবার ‘ভালো বিরোধী’ হয়ে গেলেন। তাঁদের কোমরে দড়ি বাঁধা হয় না। তাঁদের মুখে-মাথায়-জামায়-কাপড়ে ডিম পড়ে না। নিন্দুকেরা বলল, ‘এঁরা বিরোধী নন, এঁরা সরকারের বি-টিম’। আরও যে কত ফাইল খোলা হবে কে জানে! নকুড়বাবু ভারি বেয়াদব মানুষ। তিনি মুচকি হেসে বললেন, ‘ফাইল যিনি খুলছেন, তাঁর নিজের ফাইল খুলবে কে? তাঁর আপ্তসহায়কের অপঘাত মৃত্যুর তদন্ত হবে কি?’
বিরোধী নেতা থাকার সময়ে তিনি আরও একটা কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘আমাদের রাজত্বে ধর্ষণ বলে কোন কথা থাকবে না ; ‘ধর্ষককে সকালে ধরব, বিকেলে খরচ করে দেব”। কি রকম ঝাঁঝালো কথা বলুন তো! কি রকম উদ্দীপক! এ যেন সেই ‘কৃষ্ণকান্তের উইল’এর জমিদারের কথা : ‘আমিই জজ, আমিই ব্যারিস্টর’। খুব ভালো লেগেছিল আমাদের। মনে পড়ে গিয়েছিল তাঁদের স্লোগানের কথা : ‘ভয় out, ভরসা in’। আসলে হাসপাতালের সেই মর্মান্তিক ঘটনায় বড্ড বিচলিত হয়েছিলেন তিনি। নেমে পড়েছিলেন পথে। আগের মুখ্যমন্ত্রীর কার্যালয় অবরোধ করেছিলেন দল-বল নিয়ে। সঙ্গে নিয়েছিলেন নির্যাতিতার মা-বাবাকে। মেয়ের মৃত্যুর বিচার চান তাঁরা। স্বাভাবিক। মেয়ের মাকে বিধায়ক করে জিতিয়ে আনলেন। এবার খপাখপ বিচার আসবে। কেননা ভয় যে আউট, ভরসা যে ইন।
বিড়ি টানতে টানতে নকুড়বাবু ফিচেলের মতো হাসছিলেন। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ওরকম হাসছেন কেন? হাসার কি হল বলুন তো?’ তিনি বললেন, ‘মশাই, এই দু’মাসে আট-দশটা ধর্ষণ হয়ে গেল। এ্ই তো সেদিন, সেই হাসপাতালেই এক রোগীর আত্মীয়াকে…. সেনা বাহিনীর লোক …. যে রক্ষক সেই যে ভক্ষক হয়ে গেল।’ একটু থেমে নকুড়বাবু বললেন, ‘আচ্ছা মশাই, ভোটপর্ব তো মিটে গেছে, এখনও এত সেনা আছে কেন, আপনি জানেন কিছু?’ না, জানি না। তবে এটা কোন বিষয় নয়। আইন-শৃঙ্খলার প্রশ্ন আছে। ত্যাঁদোড় বিরোধীরা গোলমাল পাকাতে পারেন। যদিও তাঁরা ছত্রভঙ্গ, তবু হারাধনের তিনটি ছেলে এখনও ‘ভোট চোর ভোট চোর’ বলে চিল্লে চলেছেন।
নকুড়বাবু এবার ফিচলেমি ঝেড়ে ফেলে রোষকষায়িত দৃষ্টিতে তাকালেন আমার দিকে। বললেন, ‘বারুইপুরের ঘটনা সম্বন্ধে কি বলবেন?’ আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলতে চেষ্টা করি, ‘আরে তার জন্যই তো গুণ্ডা দমন আইন।’ নকুড়বাবু বললেন, ‘কই মশাই, মোমবাতি মিছিল কই? রিমঝিম সিনহা কই? সেলিব্রিটিরা কই? রাতদখল কই? দাবি এক/দফা এক/পদত্যাগ পদত্যাগের স্লোগান কই? ঘন্টাখানেক সঙ্গে…. এর আলোচনাসভা কোথায়? পেট্রোলের দাম বেড়েছে বলে জো-হুজুর মিডিয়া কি বারুইপুর যেতে পারছে না?’
একতোড়ে এতগুলো কথা বলে হাঁপাতে লাগলেন নকুড়বাবু। মন চাইলেও তাঁর যুক্তি অস্বীকার করতে পারলাম না। তিনি বক্রহাসিতে ফেটে পড়ে বললেন, ‘সকালে জমা, বিকেলে খরচের কি হল? নিষ্ক্রিয় কেন পুলিশ? গ্রামবাসী হিন্দু-মুসলমান একত্র হয়ে না খুঁজলে তো বাচ্চা মেয়েটার লাশই পাওয়া যেত না। বারো বছরের যে শিশুর যৌনতার বিকাশই হয় নি, তাকে শুধু ধর্ষণই করে নি, তার জিভ কেটে দিয়েছে, চোখ উপড়ে ফেলেছে। শাসক দলের লোক ধর্ষককে বাঁচিয়েছে বলে ক্ষিপ্ত গ্রামের মানুষ। হাঃ হাঃ হাঃ …. জিরো টলারেন্স, কোথায় সেই সেলিব্রিটির দল, গ্লিসারিন মেখে অশ্রুজলনিক্ষেপকারী ইনটেলেকচুয়ালরা গেল কোথায়? আর শুনেছেন, মুখ্যমন্ত্রীর কথা! ধর্ষণের জমা-খরচ করবেন বলেছেন, আর সেই সঙ্গে জনরোষের পেছনে যড়যন্ত্রেরও বিচার করবেন। বুঝলেন ব্যাপারটা! আরে মশাই, বিরোধীদের যখন ডিম ছোঁড়া হচ্ছিল, তখন ছিল সেটা জনরোষ ; আর এখন এটা হল যড়যন্ত্র। গন্ধটা সন্দেহজনক, বুঝলেন মশাই।’
হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি। কিন্তু বুঝতে কষ্ট হচ্ছে। আমার সাদা মনে কাদা নেই। তাই মুখ্যমন্ত্রীর মুখের ভাষা আর মনের ভাষা এক বলেই মনে করেছি।
নকুড়বাবু মড়ার উপরে খাঁড়ার ঘা দিয়ে যাচ্ছেন। বললেন, “মন্ত্রীসভার আর এক সদস্য কি বলেছেন শুনেছেন? রাখঢাক না করে তিনি বলেছেন মেয়েটা মুসলিম বলে এত দরদ? হিন্দুমেয়েদের ধর্ষণ হলে এমন দরদ দেখান? অথচ আশ্চর্যের কথা হল ফুটফুটে মেয়েটা তার হিন্দু বন্ধুর জন্মদিনে উপহার কিনতে গিয়ে জন্মের মতো হারিয়ে গেল। আর তার হিন্দু বন্ধুর গোটা পরিবার শোকাহত।”
এঁদের খালি হিন্দু-মুসলমান হিন্দু-মুসলমান। কিন্তু বারুইপুরের হিন্দু আর মুসলমান একত্রিত হয়ে তাদের কাজের মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছে –‘জাতের নামে বজ্জাতি আজ, জাত জালিয়াত খেলছে জুয়া।”