তবে তাঁর বক্তব্য ছিল কোম্পানিকে এই মর্মে আশ্বস্ত করা দরকার, তাদের স্বার্থ কোনোভাবেই উপেক্ষিত হয়নি; সেই সাথে ভবিষ্যৎ প্রশাসনের সামনে বর্তমান প্রশাসনকে — স্পষ্টতই অপর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করার অভিযোগে — সমালোচনা করার কোনো সুযোগই অবশিষ্ট না রাখা প্রয়োজন; এবং সর্বোপরি, প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর প্রকৃত ন্যায়সংগত প্রকৃতি সম্পর্কে ভারতীয় জনমানসকে নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। মিস্টার ফ্রান্সিসের পাণ্ডিত্যপূর্ণ প্রজ্ঞার প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা রেখেই তিনি বললেন যে, মিস্টার হেস্টিংস বর্তমানে যে প্রস্তাব পেশ করেছেন, সেটা ফ্রান্সের মহান ‘দ্যুক দ্য সুলি’ (Duc de Sully)-র প্রণীত পরিকল্পনারই অনুরূপ একটি পদক্ষেপ। এরপর বারওয়েল রায়তদের সুরক্ষার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপের সমর্থনে যুক্তি উপস্থাপন করতে থাকেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “এই দেশে, যেখানে সমস্ত ভূ-সম্পত্তির মালিকানা চূড়ান্তভাবে সরকারের হাতে ন্যস্ত থাকে — এবং যেখানে জমিদার তাঁর জমি ভোগ করেন ‘পাট্টা’র (দলিলের) মাধ্যমে — ঠিক সেই একই ধরণের স্বত্ব বা শর্তের ভিত্তিতে তাঁর অধস্তন প্রজা বা রায়তও জমিদারের থেকে জমি ভোগ করে থাকেন; আমার মতে, জনসাধারণের নজরদারি কেবল জমিদারদের ওপরই নয়, বরং এই অধস্তন প্রজাদের স্বত্বের ওপরও থাকা উচিত। আমি মনে করি, এটি রাষ্ট্রের স্বার্থের জন্য যেমন হিতকর হবে, তেমনি অধিকাংশ অধিবাসীর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যও সহায়ক হবে — যদি সমস্ত পাট্টার শর্ত সমানভাবে সুনির্দিষ্ট আর সুস্পষ্ট হয় এবং সমান আইনি ক্ষমতার বলে সেগুলোকে যেকোনো ধরণের লঙ্ঘন বা হস্তক্ষেপের থেকে যথাযোগ্য প্রশাসনিক উদ্যমে ভাবে সুরক্ষিত করা হয়। ব্যক্তিগত সম্পত্তি — সেটা দরিদ্রের সামান্য সঞ্চয়ই হোক কিংবা ধনীর বিপুল বিত্ত — উভয় ক্ষেত্রেই সমান পবিত্র ও অলঙ্ঘনীয় হিসেবে গণ্য করা উচিত। এবং যেহেতু আমি আগেই বলেছি যে, ‘কৃষক এবং কারিগরদের কল্যাণই হলো সুশাসিত রাষ্ট্রের সাধারণ ভিত্তি,’ তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি মনে করি, এই সরকারের প্রধান আর প্রাথমিক লক্ষ্য হওয়া উচিত রায়তদের, জমিদারদের স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতার প্রভাব থেকে রক্ষা করা আর তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অন্যথায়, আমরা যে বিধিবিধানই প্রণয়ন করি না কেন — তার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনো ফলই, সেই বিধিবিধান যে উদ্দেশ্যেই প্রণীত হয়েছিল, সেই জনহিতকর উদ্দেশ্য সাধনে সক্ষম হবে না। প্রতিটি দেশের প্রকৃত সম্পদ কেবল সেই দেশের সাধারণ মানুষের সম্পদে নিহিত থাকে — বিশেষ করে এই দেশে; যেখানে উচ্চবিত্ত শ্রেণীর বিশেষ রীতিনীতি ও কুসংস্কারগুলো সাধারণ মানুষকে প্রভাবিত করে — যাতে তাঁরা তাঁদের অর্জিত সম্পদ হয় গোপন রাখেন, অথবা প্রদেশের বাইরে অবস্থিত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করে তা অপচয় করেন, কিংবা এক ধরণের আড়ম্বরপূর্ণ বোকামির বশবর্তী হয়ে একদল অলস আর পরনির্ভর ব্যক্তিকে প্রতিদিন অন্ন-বস্ত্র জুগিয়ে প্রতিপালন করেন। এই প্রক্রিয়ার ফলে সেই পরনির্ভর ব্যক্তিরা সাধারণ জনগোষ্ঠীর মূল স্রোত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে — অন্যথায় তাঁরা দেশের কৃষি ও শিল্প-কারখানার কাজে নিয়োজিত হতে পারত। আমি স্বীকার করছি যে, এই কাজ অত্যন্ত কঠিন এবং যথেষ্ট শ্রমসাধ্যও বটে; কিন্তু সাধারণ মানুষের অধিকারগুলো যদি সুনির্দিষ্ট ও সুরক্ষিত না করা হয়, তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি — আমাদের সমস্ত পরিকল্পনা ও উদ্যোগের ফল কেবল জমিদারদের আরও বিত্তবান করে তুলবে। এর ফলে হয় দেশের প্রচলিত মুদ্রার এক বিশাল অংশ অলসভাবে আটকে পড়ে থাকবে, অথবা তা অত্যন্ত ক্ষতিকর আর অহিতকর উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে — এবং শেষমেশ সেই অবক্ষয়কেই ত্বরান্বিত করবে, যা রোধ করার জন্য আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”
সেই একই দিনে (১২ই নভেম্বর), হেস্টিংস ৫ই নভেম্বর তারিখে ফ্রান্সিসের পেশ করা স্মারকলিপির (minute) জবাব দেন। “তাত্ত্বিক জল্পনা-কল্পনার চেয়ে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে অধিক অভ্যস্ত” হেস্টিংস তাই অনুরোধ জানান যেন তাঁকে সেইসব বিমূর্ত ও সাধারণ নীতিমালার আলোচনা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় — যা যেকোনো দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য বলে মনে করা হয় — এবং তাঁকে যেন বাংলার প্রকৃত পরিস্থিতির ওপরই মনোযোগ নিবদ্ধ করার সুযোগ দেওয়া হয়। ফ্রান্সিস যেসব মতবাদ-ভিত্তিক (doctrinaire) অভিমত উদ্ধৃত করেছেন, তা হয়তো সেইসব দেশের ক্ষেত্রে যথার্থভাবেই প্রয়োগ করা সম্ভব, যেখানে জমির উৎপাদনের তুলনায় ভূমি করের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য; কিন্তু বাংলার ক্ষেত্রে — যেখানে ভূমি রাজস্বের পরিমাণ উৎপাদনের দশ ভাগের নয় ভাগ পর্যন্ত হতে পারে — সেইসব বিমূর্ত নীতিমালার কোনো প্রয়োগ নেই। (এর জবাবে ফ্রান্সিস অবশ্য পাল্টা বলেন, ইংল্যান্ড আর বাংলার মধ্যে যে পার্থক্য টানা হচ্ছে, তার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বৈরাচারী সরকারকে দমনমূলক ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকার দেওয়া) ফ্রান্সিস বলছেন যে, অসম কর নির্ধারণের ফলে তৈরি হওয়া অসুবিধা এতটাই নগণ্য হবে যে, সেগুলোকে সহজেই উপেক্ষা করা যেতে পারে। এখন ধরা যাক, ইংল্যান্ডে সরকারের দাবি করা খাজনার পরিমাণ হলো মোট উৎপাদনের পাঁচ ভাগের এক ভাগ; সেক্ষেত্রে জমির মালিকের হাতে নিজের জন্য অবশিষ্ট থাকবে পাঁচ ভাগের চার ভাগ (বা প্রতি পাউন্ডে ১৬ শিলিং)। এখন যদি কর নির্ধারণের অসাম্যের কারণে কোনো কোনো জায়গায় সরকার উৎপাদনের আট ভাগের এক ভাগ আদায় করে, তবুও জমির মালিকের হাতে অবশিষ্ট থাকবে আট ভাগের সাত ভাগ — বা ১৭ শিলিং ও ৬ পেন্স। কিন্তু বাংলায়, “মোট উৎপাদনের দশ ভাগের নয় ভাগ — কিংবা প্রতি পাউন্ডে আঠারো শিলিং — সাধারণত সরকারের প্রাপ্য বলে গণ্য করা হয়; আর অবশিষ্ট দশ ভাগের এক ভাগকে মনে করা হয় ভূস্বামীর সম্পত্তি। একজন জমিদার, যার জমি থেকে ১,০০,০০০ টাকা আয় হয়, তিনি সরকারকে ৯০,০০০ টাকা দেন এবং অবশিষ্ট ১০,০০০ টাকার ওপর তাঁর অধিকার থাকে। যদি এই জমির মূল্য ১,০৫,০০০ টাকা হিসেবে অতিরিক্ত ধার্য করা হয় — অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যের চেয়ে মাত্র বিশ ভাগের এক ভাগ বেশি ধরা হয় — তবে ১০,০০০ টাকার পরিবর্তে তিনি পাবেন মাত্র ৫,৫০০ টাকা; যা তাঁর ন্যায্য আয়ের অর্ধেকের চেয়ে সামান্য বেশি মাত্র। অন্যদিকে, অন্য একজন ব্যক্তি যদি সমমূল্যের এমন এক জমিদারি উত্তরাধিকারসূত্রে লাভ করেন, যার মূল্য ৯৫,০০০ টাকা নির্ধারিত হয়েছে — অর্থাৎ প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বিশ ভাগের এক ভাগ কম ধরা হয়েছে — তবে তিনি ১০,০০০ টাকার পরিবর্তে ১৪,৫০০ টাকা আয়ের সুযোগ পাবেন। এভাবেই, জমির মূল্যায়নে বিশ ভাগের এক ভাগ পরিমাণ — কম বা বেশি — ত্রুটি থাকার ফলে, একজন জমিদারের জমিদারি তাঁর কাছে অন্য একজন জমিদারের জমিদারির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি লাভজনক হয়ে ওঠে; অথচ সেই অন্য জমিদারের জমির মূল্যও ছিল হুবহু সমান।” এরপর হেস্টিংস জমির ওপর অসম কর ধার্য করার ফলে উদ্ভূত কুফলগুলোর দৃষ্টান্ত তুলে ধরেন। (ঢাকা জেলায় জমিদারি বিক্রি, নদিয়ার রাজার জমি বিক্রির প্রস্তাব, বিহারের ধনী কৃষকদের সর্বনাশ এবং সম্প্রতি মুর্শিদাবাদ প্রাদেশিক পরিষদ কর্তৃক তালুক বিক্রি।)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ