রাজস্ব হ্রাসের সাধারণ প্রসঙ্গে, হেস্টিংস বারওয়েলের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে লিখেছেন। তিনি লিখেছেন, “যদি কোম্পানির নির্দেশাবলি এবং আর্থিক প্রয়োজনসমূহ এতে সায় দেয়, তবে আমি রাজস্ব হ্রাসের পদক্ষেপে যোগ দিতে প্রস্তুত থাকব; কিন্তু এই সরকারের বিশেষ প্রয়োজনগুলোর জন্য সম্ভবত খাজনার পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে না। আর — পরিমাণ যা-ই হোক না কেন — এই কমানোর উদ্যমকে প্রকৃত স্বস্তি হিসেবে তখনই অনুভব করা যাবে, যখন এর সুষম বন্টন নিশ্চিত করা যাবে এবং যারা এই অর্থ পরিশোধ করবেন, তাদের আর্থিক অবস্থা আর সামর্থ্যের সাথে এই হ্রাসের অনুপাত যথাযথভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।” তিনি তাঁর দীর্ঘ কার্যবিবরণীটির ইতি টানেন ফ্রান্সিসের উত্থাপিত কিছু ব্যাখ্যা ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হিসেবে খারিজ করে — বিশেষত রায়তদের “চিরস্থায়ী অধিকার” perpetual possessions সংক্রান্ত তাঁর বক্তব্যের ওপর ফ্রান্সিস যে অর্থ আরোপ করেছিলেন, কিংবা “সমাজের মধ্যবর্তী স্তরগুলোকে ধ্বংস করার” এবং “সর্বোচ্চ সম্ভাব্য রাজস্ব আদায়ের” যে কথিত পরিকল্পনার অভিযোগ তুলেছিলেন, সেগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেন।
হেস্টিংসের তোলা কিছু যুক্তি খণ্ডন করার প্রচেষ্টায় ফ্রান্সিস সংশ্লিষ্ট তথ্যাবলির সত্যতা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করেন। হেস্টিংস তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেছিলেন, বাংলায় সাধারণত মোট নিট উৎপাদনের দশ ভাগের নয় ভাগ — বা প্রতি পাউন্ডে আঠারো শিলিং — সরকারের প্রাপ্য হিসেবে গণ্য করা হয় এবং অবশিষ্ট দশ ভাগের এক ভাগ জমির মালিক বা ভূস্বামীর সম্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়। বস্তুতপক্ষে, হেস্টিংস এই অনুপাতকে ভবিষ্যতের রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কোনো ‘চিরস্থায়ী মানদণ্ড’ হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং তাঁর যুক্তিকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে তিনি কেবল কিছু কাল্পনিক বা অনুমানভিত্তিক পরিসংখ্যানের আশ্রয় নিয়েছিলেন। (“আমি এই পরিসংখ্যানগুলোকে কোনো স্থির বা অপরিবর্তনীয় মানদণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করছি না। আমি এগুলোকে কেবল সাধারণ অনুমান হিসেবে তুলে ধরেছি — যাতে এই দেশে এবং ইউরোপে ভূমি-রাজস্বের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা এবং অসম কর-নির্ধারণের ফলে উভয় ক্ষেত্রে যে অত্যন্ত ভিন্নধর্মী প্রভাব সৃষ্টি হয়, তা প্রদর্শন করা যায়…. বাস্তব তথ্য-প্রমাণ থেকে প্রমাণ করা গিয়েছে কোনো কোনো জমির ওপর আরোপিত রাজস্বের পরিমাণ এতটাই বেশি থাকে যে, তা জমির মালিকের (প্রোপাইটর) হাতে কিছুই অবশিষ্ট পড়ে থাকে না; অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ভূমি-রাজস্ব পরিশোধের জন্য প্রায়শই জমিদারি বা এস্টেট বিক্রি করে দিতে হয়। ‘এক-দশমাংশ’-এর যে অনুপাতটি আমি ব্যবহার করেছি, তা কেবল আমার যুক্তিগুলোকে বিশদভাবে বোঝানোর উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়েছিল। এই অনুপাত গঠিত হয়েছিল স্থানীয় অধিবাসীদের মতামত, আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতা আর বিশ্বাস, এবং প্রতিবেশী প্রদেশ বিহারের প্রচলিত প্রথা নির্ভর করে — যেখানে জমির উৎপাদিত ফসলের ওপর প্রত্যেক জমিদারের প্রাপ্য অংশ অপরিবর্তনীয়ভাবে ‘এক-দশমাংশ’ হিসেবেই নির্ধারিত। এই অংশকে বলা হয় তাঁর ‘মালেকানা’ — যা দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত পরিভাষা; আর তাই এটাই প্রমাণ করে, এই নিয়ম ব্রিটিশ সরকারের কার্যপদ্ধতি থেকে উদ্ভূত হয়নি, কিংবা ব্রিটিশ শাসনের ঠিক পূর্ববর্তী সময়ের অবৈধ দখলদারিত্বের usurpation প্রথা থেকেও গৃহীত হয়নি।” — হেস্টিংসের কার্যবিবরণী ‘মিনিট’, ২৯ নভেম্বর, ১৭৭৬) ফ্রান্সিস তাঁর চিরাচরিত পদ্ধতি অনুসরণ করে এই সত্যকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করলেন, ওই পরিসংখ্যানগুলো কেবল একটা নির্দিষ্ট বিষয়কে দৃষ্টান্তসহ বোঝানোর উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়েছিল; বরং তিনি জোর দিয়ে দাবি করলেন, গভর্নরের প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল জমির মোট উৎপাদনের ‘নয়-দশমাংশ’ই রাজস্ব হিসেবে আদায় করা — এবং এই অভিযোগের ভিত্তিতে তিনি গভর্নরের বিরুদ্ধে তীব্র আর কঠোর নিন্দায় ফেটে পড়লেন। “দেশের নিট উৎপাদনের দশ ভাগের নয় ভাগই আত্মসাৎ করার যে প্রচেষ্টা,” তিনি সবিস্ময়ে বলে ওঠেন, “তার পাশাপাশি অত্যন্ত চতুরতার সাথে এমন একটি অপপ্রয়াসও চালানো হচ্ছে — যাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হবে, সেই মানুষগুলোকেই কলঙ্কিত করার। হাজার হাজার অভিজাতবর্গ, ভদ্রলোক এবং স্বাধীন ভূস্বামীর (কেননা ইংল্যান্ডের মতোই বাংলাতেও এমন বিভিন্ন সামাজিক স্তর বিদ্যমান ছিল) ওপর বলপ্রয়োগ করে আর স্বেচ্ছাচারী পন্থায় তাদের জীবনযাত্রার মান কঠোরভাবে সংকুচিত করে কেবল ‘ন্যূনতম জীবনধারণের উপযোগী’ পর্যায়ে — অর্থাৎ সাধারণ কৃষকশ্রেণির সমতলে — নামিয়ে আনার এই ঘটনা হয়তো ইংল্যান্ডের মানুষের মনে কিছুটা অনুশোচনা আর সহানুভূতির উদ্রেক করতে পারত। তাই পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে, ওই মানুষগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় নিজেরাই অক্ষম; অথবা তারা কোনো প্রকার দয়া অথবা করুণারই যোগ্য নয়। হেস্টিংসের ওপর তিনি যে নীতির দায়ভার আরোপ করেছেন, তা মূলত নবাব কাসিম আলীর প্রবর্তিত সেই শাসনব্যবস্থাই পুনরুজ্জীবিত করার অভিপ্রায় — যে ব্যবস্থায় সরকার সরাসরি কৃষকদের সাথে লেনদেন বা সম্পর্ক স্থাপন করত। মুঘল শাসকরা কখনো ফসলের দশ ভাগের নয় ভাগই রাজস্ব হিসেবে আদায় করতেন — এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত, দেশের অতীতকালের বিপুল বিত্তবৈভবই তার অকাট্য প্রমাণ। গভর্নর-জেনারেল যখন একটা ‘সাধারণ অনুমানের’ কথা উল্লেখ করে দাবি করেন, ফসলের দশ ভাগের নয় ভাগই সরকারের প্রাপ্য — তখন আমি ভাবি – ‘এই অনুমানটি ঠিক কারা তৈরি করল? কিংবা কী এমন প্রমাণের ভিত্তিতেই বা তারা এমন সিদ্ধান্তে উপনীত হলো?’ — সম্ভবত একমাত্র ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব কার্যপদ্ধতি কিংবা ঠিক তার অব্যবহিত পূর্বে বিদ্যমান সেই ‘জবরদখলকারী শাসনব্যবস্থার’ (usurpation) নজির ছাড়া আর কোনো প্রমাণই এর পেছনে থাকার কথা নয়। তবে মনে রাখা প্রয়োজন নিছক কোনো ‘ঘটনা’ বা কার্যপদ্ধতি কখনো কোনো ‘অধিকারের’ বৈধ প্রমাণ হতে পারে না। অনারেবল কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর (সম্মানিত পরিচালক পর্ষদ) হাতে বর্তমানে এমন সব প্রামাণ্য নথিপত্র সংরক্ষিত আছে, যা দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রমাণ করে যে — মুঘল সরকার এই প্রদেশগুলোর ওপর রাজস্বের যে হার নির্ধারণ করেছিল, আমাদের বর্তমান হারের তুলনায় তা ছিল অত্যন্ত লঘু ও সহনীয়।”
১৭৭৬ সালের ২৯শে নভেম্বরের একটি কার্যবিবরণীতে, হেস্টিংস মুঘল আমলের ভূমি-রাজস্বের কথিত লঘুত্ব বা স্বল্পতা বিষয়ক প্রসঙ্গটি উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে প্রাপ্ত মোট রাজস্বের পরিমাণের সাথে বর্তমান সময়ের প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণের কেবল তুলনা করাই যথেষ্ট নয়। তিনি লিখেছেন, “মোটা চালের দাম — যা জনসাধারণের খাদ্যের প্রধান উপাদান — সুজা খানের শাসনামলে বর্তমান সময়ের তুলনায় সাড়ে পাঁচ গুণ কম ছিল।” (টিকা ১)
টিকা ১

চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ