৫০. কৃষ্ণভাবিনী দাসের মনোবাসনা
এই যে মা, আমি স্বাধীন ব্রিটেনে চলে এসেছি।
অনেক অনেক আশা নিয়ে
আমি ভেবেছিলাম আমি চিরস্থায়ী শান্তি লাভ করব।
কিন্তু ভারতমাতা, সুখ কোথায়?
**
আমি এখানে স্বাধীনতার গান যত শুনি
চারপাশে আমি যত বেশি আনন্দিত মনোভাব দেখছি
আমার হৃদয় যত শত টুকরো হয়ে ভেঙে যায়
এবং অশ্রুসজল চোখে বয়ে যায়।
**
এই ব্রিটেন তোমার মেয়ের মতো
ছোট্ট দেশ, কিন্তু প্রাণশক্তিতে ভরপুর।
তার শক্তি ও সাহসিকতায় পৃথিবীকে কাঁপিয়ে তোলে,
মানবতা ভয়ে ভীত।
**
কিন্তু আমাদের কেউ ভয় পায় না
আমাদেরকে কাপুরুষ ভেবে তারা অনেক দূরে তাড়িয়ে দেয়।
মা! ওরা তোমার সমস্ত সম্পদ কেড়ে নিয়েছে,
এবং তার বদলে তোমাকে শিকল পরায়। …
আক্ষেপভরা এই কবিতা লিখেছিলেন কৃষ্ণভাবিনী দাস (১৮৬২-১৯১৯)। না, তিনি কোন খ্যাতি ও কীর্তিনন্দিত বাঙালি নারী ছিলেন না। ছিলেন এক সামান্য গৃহবধূ।
মুর্শিদাবাদের এক গ্রামে তাঁর জন্ম। নয় বৎসর বয়েসে দেবেন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়। তাই লেখাপড়ার সুযোগ তিনি পান নি। দেবেন্দ্রনাথ আইসিএস প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণের জন্য বিলেত যান এবং এই পরীক্ষায় তিনি ১৭তম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু সে বছর ১৬ জন প্রার্থীকে নিয়োগদানের জন্য দেবেন্দ্রনাথ চাকরি লাভ করতে পারেন নি। তখন তিনি কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে গণিতে ডিগ্রি লাভ করেন। ১৮৮২ সালে দেশে ফিরে ৬ মাস পরে তিনি কৃষ্ণভাবিনীকে নিয়ে বিলেত যান।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে কৃষ্ণভাবিনী নিজেকে স্বামীর উপযুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিল না, কিন্তু নিজের তাগিদে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে জনার্জন করেন। সেই সঙ্গে তিনি সংস্কারমুক্ত, উদার দৃষ্টির অধিকারী হন। তখন নারীর বিদেশভ্রমণ সমাজে নিন্দার বিষয় ছিল। কিন্তু কৃষ্ণভাবিনী সে নিন্দাকে উপেক্ষা করেন। পাঁচ বছরের কন্যাকে রেখে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন বিদেশে।
স্বামীর সঙ্গে বিলাতে গেলেন তিনি। এই ভ্রমণকে নিছক প্রমোদভ্রমণ করে তোলেন নি তিনি। অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে সে দেশে ঘুরেছিলেন তিনি। দেখেছিলেন সেখানকার জীবনাচরণ, রীতি-নীতি ল আর সেই দেখা নিয়ে তিনি লিখে ফেললেন একটি আশ্চর্য বই, যার নাম ‘ইংল্যাণ্ডে বঙ্গ মহিলা’। ১৮৮৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল সেই বই। প্রথাগত শিক্ষাহীন এক বঙ্গ নারীর প্রথম বই, কিন্তু সে বই বিদেশ ও স্বদেশে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছিল।
শিক্ষার আলোকপ্রাপ্ত ব্রিটেনের নারীদের মুক্তি ও স্বাধীনতার চেতনা তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি বাঙালি নারীদের মুক্তি বিষয়ে সচেতন করার জন্য এই বই লিখেছিলেন। তাঁর বক্তব্য :
‘যে ইংরাজ মহিলারা সংসদে মহিলা সদস্য নির্বাচিত করার জন্য সংগ্রাম করছেন,তাঁদের মতো যদি আমরাও আমাদের দাবি নিয়ে সোচ্চার হতে পারি, যদি আমরা নিজেদের দুর্বল ও বিনয়ী বলা বন্ধ করে প্রত্যেক ভারতীয়ের হৃদয়ে আঘাত হানতে পারি, হয়তো কেবল তখনই আমাদের পুরুষরা আমাদের দুর্দশা উপলব্ধি করবে।’
গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিসহ ইংল্যাণ্ডের নানা ইতিবাচক দিক তিনি পর্যালোচনা করেছিলেন নিপুণভাবে, আর সেই সঙ্গে ভোলেন নি নিজের দেশকে :
‘এই দেশে আমি অনেক নতুন জিনিস দেখেছি এবং অনেক নতুন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছি। কিন্তু আমি এখানে যতদিন থাকছি, যতই দেখছি ও শিখছি, ততই ভারতের কথা মনে পড়ছে এবং এতে আমার হৃদয় ব্যথিত হচ্ছে। যখন আমি এই দেশকে সে দেশের সাথে তুলনা করি, তখন তাদের মধ্যেকার পার্থক্যগুলো আরও ভালোভাবে বুঝতে পারি। ভারতের করুণ অবস্থা দেখে আমিও অনেক মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছি। … আমার মতো অনেকেই আমার দেশের শোচনীয় অবস্থা দেখে মানসিকভাবে কষ্ট পাচ্ছেন। তাই আশা করি তাঁরা স্বদেশ ও বিদেশের ভালো-মন্দ উভয় দিকের তুলনা করে আমাদের দেশের মঙ্গলের জন্য কিছু করার চেষ্টা করবেন।’