শুরু হল দ্বিতীয় পর্ব।।প্রথম কিস্তি
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার ফিফথ রিপোর্ট (বাংলা প্রদেশ পরিশিষ্ট) দ্বিতীয় খণ্ড অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
ইস্টইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কার্যকলাপ বিষয়ক হাউস অফ কমন্সের বিশেষ কমিটির পঞ্চম প্রতিবেদন।
তারিখ: ২৮শে জুলাই, ১৮১২।
সম্পাদনায়:
ভেনারবল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার,
(মার্টন কলেজ, অক্সফোর্ড), এম.এ., বি.ডি., বি. লিট.,
কলকাতা ডায়োসিসের আর্চডিকন,
সম্পাদক, ‘বেঙ্গল: পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট’,
এবং সভাপতি, ক্যালকাটা হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, ১৯১৪।
দ্বিতীয় খণ্ড।
ভূমিকা ও বাংলা বিষয়ক পরিশিষ্টসমূহ।
কলকাতা:
আর. ক্যাম্ব্রে অ্যান্ড কোং,
আইন ও দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থের বিক্রেতা ও প্রকাশক, ৯, হেস্টিংস স্ট্রিট।
১৯১৭।

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা
১
কেন উপনিবেশের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে প্রথম ৬০ বছরের উপনিবেশিক কর্মকাণ্ড আর তার আদর্শিক অবস্থান বুঝতে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে জমা পড়া ১৮১২র ফিফথ রিপোর্ট অধ্যয়ন জরুরি
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গারের সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্টের প্রথম খণ্ডের ধারাবাহিক অনুবাদ শেষ হয়েছে। দ্বিতীয় পর্ব ধারাবাহিকভাবে অনুবাদকর্মে প্রবেশের আগে আরও একবার আমরা পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই কোন প্রেক্ষাপটে এই প্রতিবেদন রচিত হল। ভূমিকার কয়েকটা কিস্তি হবে। এই প্রাথমিক কিস্তিগুলোয় আমরা বারবার পাঠককে চুম্বকে মনে করিয়ে দেব ফিফথ রিপোর্ট তৈরির আগের সেময়ে পলাশী-পরবর্তী সময়ের কৃষক-কারিগরের ওপর অত্যাচার, কোম্পানির আমলাদের অনাচার ও দুর্নীতি, ১৭৭০-এর গণহত্যা, নারীর সম্পত্তি আর জমিদারি অধিকার বঞ্চনা এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পটভূমি। ফিফথ রিপোর্টের পটভূমিকা বুঝতে আবার নতুন করে পিছনে ফেরা জরুরি। আমাদের বিশ্বাস এই বিশ্লেষণ ফিফথ রিপোর্ট কেন পার্লামেন্টে টেবল করার প্রয়োজন হল, সেটা বুঝতে সহায়ক হবে।
১. পলাশী-পরবর্তী শোষণ কাঠামো — দেওয়ানি লাভ ও দ্বৈত শাসনের বিভীষিকা — ১৭৬৫-তে কোম্পানি বাংলার রাজস্ব আদায়ের অধিকার বা দেওয়ানি লাভ করে। ক্লাইভের ‘মাস্কেড সিস্টেম’ বা দ্বৈত শাসন-এ নামমাত্র নবাব থাকলেও প্রকৃত রাজস্ব ক্ষমতা চলে যায় কোম্পানির হাতে। এই ব্যবস্থার অভিশাপ ছিল দায়িত্বহীনতা — কোম্পানি রাজস্ব আদায় করত, কিন্তু প্রজার কল্যাণের দায়িত্ব থাকত নবাবের ওপর। একদিকে কোম্পানি রাজস্ব বাড়ানোর চাপ, অন্যদিকে নবাবের প্রশাসনের দুর্বলতা আর অকার্যকারিতা আমরা দেখেছি ফিফথ রিপোর্টের ছত্রে ছত্রে। এর ফল চরম শোষণ — আমিল বা রাজস্ব-ঠিকাদাররা কৃষকদের রক্ত শোষণ, পুরোনো মুঘল জমিদারি কাঠামোদের জমিদারদের বিদ্রোহ। তাছাড়া লুঠের মানসিকতায় দক্ষিণ এশিয়ায় পা দেওয়া কোম্পানির আগ্রহ ছিল না প্রজার অবস্থায়, বরং সে টনটনে জাগ্রত থার্থ লন্ডনের বাণিজ্যিক স্বার্থপূরণে।
২. কোম্পানির আমলাদের অনাচার ও দুর্নীতি — ১৭৬৫-৭২ সময়কাল ছিল কোম্পানির আমলাদের অসীম লুণ্ঠনের সুযোগ। ক্লাইভ নিজে স্বীকার করেছেন, কোম্পানির কর্মচারীরা ‘বিনামূল্যে উপহার’ এবং বেসরকারি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন করত। ওয়ারেন হেস্টিংস-পরবর্তীকালেও এই দুর্নীতির শৃঙ্খল চলতে থাকে। ১৭৭২-এ ক্লাইভ পার্লামেন্টে বলেন যে সুযোগ পেলে প্রতিটি আমলা ‘বিপুল অর্থ উপার্জন করত’ কিন্তু তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ তাকে সেই পথে হাঁটতে বাধা দিয়েছে — আমরা জানি এর থেকে বড় মিথ্যে আর কিছুই হতে পারে না। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল গোমস্তা আর মধ্যএক্সস্বত্ত্বভোগী এজেন্টদের শোষণ। তারা কোম্পানির নামে কৃষক ও তাঁতিদের ওপর অত্যাচার চালাত, গ্রাম দখল করত, আর কোম্পানি তা উপেক্ষা করত।
৩. ১৭৭০-এর মহাদুর্ভিক্ষ — নীরব গণহত্যা — ১৭৬৯-৭০-এর দুর্ভিক্ষ বাংলার ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। খরার ধাক্কায় উপযুক্ত ফসল উৎপাদন হল না। শুরু হয়েছিল প্রাকৃতিক কারনে, কিন্তু তাকে টার্ন করিয়ে দেওয়া হল গণহত্যায় — প্রথমত কোম্পানি এই সময়ে সব থেকে বেশি রাজস্ব আদায় করেছে, দ্বিতীয় কারন হল — সে মনে করত তার পক্ষে বাংলার ৩ কোটি জনগণের থেকে রাজস্ব আদায় সম্ভব না। তাই এই বিপুল সংখ্যক ‘অনুৎপাদক’ প্রজাকে বসিয়ে খাইয়ে কাজ নেই। তারা মারা গেলে তাদের জমির ওপর দখলদারি বসিয়ে সেই উদ্বৃত্ত ফসল থেকে তাদের নিযুক্ত মধ্যসত্ত্বভোগীদের দিয়ে রাজস্ব আদায় করা। তৃতীয়ত দুর্ভিক্ষকে গণহত্যায় রূপান্তর করলে বাংলার বিশিল্পায়নের গতি আর আড়ং এবং কারিগরদের কারখানা থেকে কারিগর উচ্ছেদ করা, শিল্প উৎপাদন কাঠামো ধ্বংস হবে প্রাকৃতিক উপায়ে। তাই রিও দুর্ভিক্ষকে আমরা দুর্ভিক্ষকে মানবসৃষ্ট গণহত্যা বলি। আনুমানিক ৭০ লাখ থেকে ১ কোটি মানুষ মারা যায়—বাংলার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। এছাড়াও দুর্ভিক্ষকে নিয়ন্ত্রণ না করার কোম্পানির তৎকালীন নীতি এই দুর্যোগকে আরও ভয়াবহ করেছিল — ১। খাজনা বৃদ্ধি- ১৭৭০ সালের এপ্রিলে, যখন দুর্ভিক্ষ চরমে, কোম্পানি ১০% খাজনা বৃদ্ধি ঘোষণা করে। ধান উৎপাদন কমলেও রাজস্বের চাপ কমানো হয়নি। ২। খাদ্য মজুত ও লুণ্ঠন — কোম্পানির কর্মচারী ও গোমস্তারা খাদ্যশস্য মজুত করে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে। উদ্বৃত্ত শস্য রপ্তানি চলতে থাকে, দাম আকাশছোঁয়া হয়। ৩। উদাসীনতা ও অকার্যখাজনা ত্রাণ- জনসংখ্যার দশমাংশেরও কম ত্রাণ পায়। কোম্পানি কর্পোরেট স্বার্থে লাভের দিকে নজর দিল, প্রজার দুর্দশা উপেক্ষা করল। দুর্ভিক্ষের ফলে চাষাবাদ কমে যায়, গঞ্জ ও তাঁতশিল্প ধ্বংস হয়, এবং লুঠেরা-ডাকাত দল গড়ে ওঠে। পরের বছরগুলোয় জনবসতি ফিরে আসতে বহু বছর সময় লাগে। এই দুর্ভিক্ষকে বাহানা করে কোম্পানি ক্লাইভ প্রতিষ্ঠিত ১৭৬৫-র দ্বৈত শাসন বাতিল করে বাংলা সুবার সরাসরি প্রশাসন নিজের নিল।
৪. নারীদের সম্পত্তি অধিকার বঞ্চনা — ঔপনিবেশিক শাসনের আরেকটি বীভৎস অধ্যায় ছিল ভারতীয় নারীদের সম্পত্তি ও ব্যক্তিগত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা। ১৭৮৪তে বর্ধমানের রাণী বিষ্ণুকুমারীর সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়া, ১৭৯০তে মহিলাদের জমিদারির অধিকার কেড়ে নেওয়া এবং [ফ্রান্সিস-হেস্টিংসের নীতি অনুযায়ী] ১৭৯১-এর ১৫ই জুলাই, গভর্নর-জেনারেল আর তাঁর পরিষদ অযোগ্য জমিদারদের সম্পত্তি তত্ত্বাবধান করতে ‘কোর্ট অফ ওয়ার্ডস’ প্রতিষ্ঠা করে সে সব জমিদারি দখলি বিধিতে রূপান্তরিত হবে। মেট্রোপলিটনে তো মহিলা পুরুষের মধ্যে লিঙ্গসাম্য ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলা শাসন করা কোম্পানি বুঝতে পারে বাংলার সমাজ, অর্থনীতি আর জনপরিসরে মহিলাদের ভূমিকা অনতিক্রম্য — তাই তার প্রাথমিক কাজ ছিল মহিলাদের সম্পত্তি আর জনপরিসরে থাকাকে নিষিদ্ধ করা। তাছাড়া প্রথম যুগে ব্রিটিশ পুরুষ ও দেশীয় নারীদের মধ্যে যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তা ছিল অসম ও শোষণমূলক। এই নারীরা প্রায়শই সহিংসতা ও শোষণের শিকার হতেন। ইংরেজরা উইলের মাধ্যমে নিজেদের সম্পত্তি রেখে যেতেন, কিন্তু নারীদের অধিকার ছিল অনিশ্চিত। এমনকি মিশ্র-জাতি সন্তানদের নিয়েও জটিল আইনি প্রশ্ন দেখা দেয়। সাম্রাজ্যবাদী আইন ব্যবস্থা এই নারীদের দ্বিগুণ শোষণের শিকার করেছিল — একদিকে জাতিগত, অন্যদিকে লিঙ্গগত বৈষম্য।
৫. চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পটভূমি ও প্রকৃতি — দ্বৈত শাসনের ব্যর্থতা ও ১৭৭০-এর দুর্ভিক্ষের পর ১৭৭২ সালে ওয়ারেন হেস্টিংস সরাসরি রাজস্ব প্রশাসন গ্রহণ করেন। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘ বিতর্ক চলতে থাকে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ঘোষণা করেন, যার মূল বৈশিষ্ট্য ছিল — ১। রাজস্বের পরিমাণ জমিদারদের সঙ্গে চিরস্থায়ীভাবে নির্ধারিত করা। ২। রাজস্ব আদায় না হলে জমিদারি নিলামে বিক্রি করার বিধান। এই বন্দোবস্ত কোম্পানির জন্য স্থিতিশীল রাজস্ব নিশ্চিত করলেও এর পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ — ক. জমিদারি লুণ্ঠন ও কৃষকের দাসত্ব — জমিদাররা ‘স্থায়ী মালিক’-এ পরিণত হলে প্রজাদের ওপর অত্যাচার বহুগুণ বেড়ে যায়। জমিদাররা ইচ্ছামতো খাজনা বাড়াতে পারে। ১৭৯৯ সালের ‘হপ্তম’ [সপ্তম] আইন জমিদারদের প্রজাদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও তাদের গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেয়। ১৮১২ ও ১৮২২ সালের আইন জমিদারদের ক্ষমতা আরও বাড়ায়। ১৮৭১-৭৮ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায় ভূমি-বিষয়ক মামলা ও দখল-বঞ্চনার সংখ্যা ক্রমাগত বেড়েছে। মহাজন ও জমিদারের সম্মিলিত শোষণে চাষি প্রায়ই আসামী বা ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ত।
কৃষক বিদ্রোহ – এই শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকরা বারবার বিদ্রোহ করে। ১৮৩১ সালে তিতুমীরের নেতৃত্বে ২৪ পরগনার কৃষক বিদ্রোহ এর অন্যতম উদাহরণ। ১৮৫৯-৬০ সালের নীল বিদ্রোহ-ও ছিল জমিদার ও মহাজনদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ।
২
প্রথম রিপোর্টের এই প্রেক্ষাপট আর ভূমিকা নির্ভর করে পলাশীর পরের সময় কৃষক কারিগরের ওপর অত্যাচার, কোম্পানির আমলাদের অনাচার দুর্নীতি, আর ১৭৭০-এর গণহত্যা, মহিলাদের সম্পত্তি আর জমিদারির অধিকার কেড়ে নেওয়া, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ব্যাকগ্রাউন্ডে ১৮১২-য় পার্লামেন্টে জমা পড়া ফিফথ রিপোর্ট তার ১০০ বছর পরে সম্পাদনা করবেন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার। ১৮১২-র রিপোর্টের জমা পড়া বিষয়ে এই ভূমিকার তৈরি প্রয়োজন হল দুটো বড় কারনে ১। কোম্পানির হাত থেকে দক্ষিণ এশিয়ার একচেটিয়া বাজার ধরে রাখার বিপক্ষে, নতুন উদ্ভিন্ন লন্ডন – দ্য সিটির বাইরে ব্রিটেন জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অ-ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্পোরেটের উৎপাদিত পণ্য সেই বাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে, এবং ২। বিশাল বড় কোম্পানি স্টেট সরাসরি নিয়ন্ত্রণের রাষ্ট্রীয় মানসিকতা নির্ভর করে কোম্পানির সেলফ গভর্ন্যান্সের ওপর বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তো এই প্রেক্ষাপটে ফিফথ রিপোর্ট তৈরির প্রয়োজনীয়তা বুঝতে (১) কোম্পানির চাইরের অন্য কর্পোরেটের দক্ষিন এশিয়ার একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণ মুক্ত করার বিপুল চাপ, এবং (২) কোম্পানির ‘স্ব-শাসন’-এর ওপর রাষ্ট্রীয় আঘাত হানার গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ উন্মোচন করব।
ফিফথ রিপোর্টের তাৎক্ষণিক প্রেক্ষাপট — ১৮১৩ সালের সনদ নবায়নের লড়াই
১৮১২ সালের ফিফথ রিপোর্ট সরাসরি যুক্ত ছিল ১৮১৩ সালের সনদ আইন-এর সাথে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সনদ ১৮১৪ সালের মার্চে শেষ হওয়ার কথা ছিল, আর ১৮০৮ সাল থেকেই এই নিয়ে আলোচনা চলছিল। এই রিপোর্ট কেন তৈরি হলো? এর পেছনে ছিল দুটো শক্তিশালী আন্দোলন — প্রথমত, মুক্ত বাণিজ্য সমর্থক ও ধর্মপ্রচারকদের আন্দোলন। তাদের অভিযোগ ছিল, কোম্পানি ভারতকে অন্যায় ও উৎপীড়নমূলকভাবে শাসন করছে। তারা কোম্পানির অবিলম্বে বিলুপ্তি দাবি করছিল। দ্বিতীয়ত, ব্রিটেনের বিভিন্ন প্রদেশ ও বন্দরের ব্যবসায়ীদের চাপ। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো — প্রতিটি বড় বাণিজ্যিক শহর কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছিল।
“দ্য সিটি বনাম আউটপোর্ট” দ্বন্দ্ব কেবল ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিষয় ছিল না, এটি ছিল ভারতীয় বাজার দখল ও পুঁজিবাদের বিকাশের মূল চাবিকাঠি। এই সংগ্রামের ফলই নির্ধারণ করে দেয় কীভাবে ভারত ‘শোষণের উপনিবেশ’ থেকে ‘বাজার ও কাঁচামালের উৎস’-এ পরিণত হয়। আসুন এই ঐতিহাসিক লড়াইটিকে বিস্তৃতভাবে বিশ্লেষণ করি। ‘দ্য সিটি বনাম আউটপোর্ট’-এর ভূ-রাজনৈতিক অর্থনীতি — দ্য সিটি (লন্ডন) ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘাঁটি। কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য থেকে লাভবান হতেন লন্ডনের বণিক, ব্যাংকার, জাহাজমালিক ও গুদামের মালিকরা। কোম্পানির বার্ষিক নিলাম, আমদানি-রপ্তানির ওপর তাদের আধিপত্য ছিল অটুট। অন্যদিকে, আউটপোর্ট-গুলি (লিভারপুল, ম্যানচেস্টার, গ্লাসগো, ব্রিস্টল) ছিল শিল্পবিপ্লবের নতুন কেন্দ্র। এখানে উৎপাদিত পণ্যের বাজার প্রয়োজন ছিল, কিন্তু কোম্পানির একচেটিয়া তাদের সেই বাজারে প্রবেশে বাধা দিচ্ছিল।
ঐতিহাসিক যুক্তি ও প্রমাণ — এই দ্বন্দ্ব আদতে শিল্প-পুঁজি আর বাণিজ্য-পুঁজি-এর মধ্যে সংঘাত –
দ্য সিটি (লন্ডন) আউটপোর্ট (প্রাদেশিক শিল্প কেন্দ্র)
বাণিজ্য-পুঁজি (Merchant Capital) শিল্প-পুঁজি (Industrial Capital) [ভূমিকার শেষ কিস্তিতে এ বাবদে একটা বড় টিকা দেব]
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য থেকে লাভ ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের জন্য নতুন বাজার দরকার
ভারতীয় পণ্য আমদানি ও পুনঃরপ্তানি ব্রিটিশ তৈরি পণ্য রপ্তানি (বিশেষ করে সুতিবস্ত্র)
পুরনো ঔপনিবেশিক কাঠামোতে স্বার্থান্বেষী উদীয়মান শিল্প বুর্জোয়ারা, মুক্তবাণিজ্যের সমর্থক
আউটপোর্টগুলোর যুক্তি — ‘জাতীয় স্বার্থ’ বনাম ‘কোম্পানির স্বার্থ’
১৮১২-১৮১৩ সালে যখন কোম্পানির সনদ নবায়নের প্রশ্ন উঠল, তখন আউটপোর্টগুলোর পক্ষ থেকে পার্লামেন্টে একের পর এক আবেদন জমা পড়ে। ম্যানচেস্টার ও সালফোর্ডের বণিক ও শিল্পপতিদের আবেদন ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। তারা বলেন — “অনেক আবেদনকারী দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক কাজে নিযুক্ত রয়েছেন, যা মূলত এই রাজ্যের সুতিবস্ত্র বিক্রি ও রপ্তানির সঙ্গে জড়িত, যার ওপর ম্যানচেস্টার শহর ও তার আশপাশের অগণিত জনগোষ্ঠীর জীবিকা নির্ভর করে… একচেটিয়া ব্যবস্থা দেশের সাধারণ স্বার্থের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিখাজনা প্রমাণিত হয়েছে… এই যুদ্ধের সময় যখন বাণিজ্য চরম সংকটে, তখন নতুন ও স্থায়ী বাণিজ্যের উৎস খোলা অত্যন্ত জরুরি।”
গ্লাসগোর আবেদন আরও জোরালো ভাষায় বলে — “বাণিজ্যের স্বাধীনতা ব্রিটিশদের জন্মগত অধিকার, যা শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন বা সুস্পষ্ট জাতীয় স্বার্থেই সীমাবদ্ধ করা উচিত… বর্তমান প্রশ্নটি আসলে এই নয় যে পার্লামেন্ট একটি বাণিজ্যিক কর্পোরেশন থেকে তার স্বত্ব কেড়ে নেবে কিনা, বরং প্রশ্ন হলো, পার্লামেন্ট কি আরও একটি একচেটিয়া স্বত্বকে বৈধতা দিতে পারে, যা অভিজ্ঞতায় অত্যন্ত অনুপযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে?”
শ্রপশায়ারের লৌহশিল্পপতিরা যুক্তি দেন যে একচেটিয়া ব্যবস্থা শিল্পপণ্যের দাম বাড়ায় এবং উৎপাদন ব্যাহত করে। ল্যাঙ্কাস্টারের বণিকরা বলেন যে এই একচেটিয়া ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য অন্যান্য ইউরোপীয় ও আমেরিকান দেশগুলোর হাতে তুলে দিচ্ছে, যা ব্রিটেনের শত্রুকে শক্তিশালী করছে।
লিভারপুলের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লিভারপুল বণিকরা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন এবং লিভারপুল ইস্ট ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেন, যা পরবর্তীতে ১৮৭০-এর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। এই সংস্থা ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বাণিজ্য সংস্থার সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলে এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের এশিয়ান নীতিকে প্রভাবিত করে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ