ফিলিপ ফ্রান্সিসের গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরোধিতা — সামগ্রিকভাবে ভারতের বুকে ইংরেজ সাম্রাজ্যের অস্তিত্বকেই বিপন্ন করে তুলেছিল নিঃসন্দেহে। কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই কিছু কিছু জায়গায় তাঁর প্রকৃত অর্থে যুক্তিসঙ্গত বিরোধিতা সাম্রাজ্য স্বার্থে সুফল বয়ে এনেছে। ঠিক যেমন ওয়ারেন হেস্টিংসের বিরুদ্ধে আনা অভিশংসন বা ইম্পিচমেন্ট প্রক্রিয়ার উদ্যোক্তা এবং পরিচালকরা সাম্রাজ্যের গৌরবের লজ্জা হিসেবে গণ্য হবেন, ঠিক তেমনই অতীতের যেসব বিষয় নিন্দাযোগ্য ছিল, সেগুলোকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করার ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আর গঠনমূলক ভূমিকা পালন করেছে; একইভাবে, অতীতের ত্রুটি-বিচ্যুতির বিরুদ্ধে ফ্রান্সিসের অভিযোগনামাও ভবিষ্যতের প্রশাসনে অধিকতর সতর্কতা ও কর্মদক্ষতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছিল। ওয়ারেন হেস্টিংসের অভিশংসন বা পার্লামেন্টারি বিচার চলার সময় আদতে বিচার এবং নিন্দার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছিল এমন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যা বাংলার জনগণের কল্যাণ সাধনের ক্ষেত্রে চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে — অবশ্যই হেস্টিংস নামক ব্যক্তি ওই দায়িত্বহীন ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রকৃত অর্থে পিতামহ-সুলভ paternal সরকারের প্রাথমিক রূপরেখা প্রবর্তনের লক্ষ্যে অসামান্য অবদান রেখেছিলেন। ফ্রান্সিসের কার্যবিবরণী বা মিনিটস অবলম্বন করে মূলত সেই প্রাচীন প্রশাসনিক পদ্ধতি ওপর তীব্র আঘাত হানা হয়েছিল যা কোর্ট অফ ডিরেক্টরস, কোম্পানির লন্ডনস্থিত পরিচালক পর্ষদ বারবার বাংলার কর্মরত ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে এসেছে; আর সেই পদ্ধতি ছিল — স্থানীয় জনগণের সম্পদ বা রাজস্ব আহরণ করে ইংরেজদের কোষাগার পূর্ণ করা এবং ভূমি-রাজস্বের নামে কৃষকদের ওপর যে চরম শোষণ বা র্যাক-রেন্টিং (Rack-rent এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে সম্পত্তির মালিক ভাড়াটিয়ার থেকে এমন এক অত্যধিক পরিমাণে খাজনা আদায় করেন যা প্রায় সম্পত্তির প্রকৃত বা সম্পূর্ণ বার্ষিক মূল্যের সমান — এটা একধরনের মাত্রাতিরিক্ত, লুঠেরা খাজনা আদায় প্রক্রিয়া — অনুবাদক) চালানো, তার দায়ভার একটি কমবেশি কাল্পনিক স্থানীয় প্রশাসন-এর কর্মচারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। সম্ভবত, সেই ঐতিহাসিকের দৃষ্টিকোণ থেকে — যিনি ফ্রান্সিসের বইটি প্রকাশের পরবর্তী ঘটনাবলির আলোকে সেটিকে বিচার করেন — বইটির প্রকৃত ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিহিত রয়েছে এই সত্যে, এটা শুধু নির্দিষ্ট রাজস্ব হার আর জমিদারি মালিকানা সংক্রান্ত কিছু ধারণাকেজনপ্রিয় করে তুলেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং এটা কোম্পানির অভ্যন্তরীণ প্রশাসন সংক্রান্ত বিচার-বিশ্লেষণকে কোর্ট অফ ডিরেক্টরস-এর চার দেয়ালের গণ্ডি পেরিয়ে ইংল্যান্ডের জনমতের বিচারালয়ে bar of public opinion উপস্থাপন করতে পেরেছিল। সর্বোপরি, ভূমি-রাজস্বের হার নির্ধারণ সরকারের মৌলিক প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত — এই জোরালো দাবি তুলে ফ্রান্সিসের বই সেই প্রাচীন আর ভুলভাল ব্যবস্থাকে কঠোর নিন্দা করে, যার আওতায় কোম্পানির বাণিজ্যিক বিনিয়োগের অর্থ সংস্থানের উদ্দেশ্যে জনগণের থেকে সংগৃহীত রাজস্বের অর্থ আত্মসাৎ করা হতো।
ষোড়শ অধ্যায়
১৭৭৬ -এর কমিশন
১৭৭৬-এর শেষের দিকে, গভর্নর-জেনারেল নতুন বন্দোবস্ত গঠনের বিষয়ে তাঁর প্রস্তাবাবলি পেশ করেন। ১৭৭৬-এর সেপ্টেম্বর মাসে কর্নেল মনসনের মৃত্যুতে গভর্নর-জেনারেল তাঁর নির্ণায়ক ভোট casting vote দিয়ে নিজের প্রস্তাবিত পদক্ষেপ অনুমোদন করিয়ে নিলেন। তাঁর প্রস্তাবের মূল বিষয় ছিল তদন্ত কমিশন তৈরি করা; ঠিক হল এই কমিশনে দুজন চুক্তিভুক্ত কর্মচারী covenanted servants এবং একজন দেশীয় দেওয়ান থাকবেন। তাঁদের সহায়তার জন্য এমন সব আধিকারিককে নিযুক্ত করা হবে, যাঁরা হয় খালসা বিভাগ থেকে নির্বাচিত, অথবা বিশেষভাবে এই কমিশনের কাজের জন্যই মনোনীত হয়েছেন। তদন্ত সংক্রান্ত সমস্ত আদেশ-নির্দেশ গভর্নর-জেনারেলের নামেই জারি করা হবে এবং তিনি স্বয়ং এই তদন্ত কার্যক্রমের ওপর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবেন। এই সংস্থার গঠনশৈলী এমন ছিল যে, তা সহজেই হেস্টিংসের বিরোধীদের ভুল ব্যাখ্যার সুযোগ করে দেয়। বিরোধীরা অবিলম্বে সোচ্চার হয়ে অভিযোগ তোলেন যে, গভর্নর-জেনারেলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত এই নতুন কমিশনের মূল উদ্দেশ্যই হলো — রাজস্ব প্রশাসনের নির্দেশনার ক্ষেত্রে কাউন্সিলের যে সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে, তা থেকে কাউন্সিলকে বঞ্চিত করা।
এই কমিশনের দায়িত্ব কেবল জমির মূল্যমান এবং ইজারাদারদের হিসাবপত্র সম্পর্কে বিস্তারিত তদন্ত করাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং রায়তদের সুরক্ষার বিষয়েও তাদের বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার কথা ছিল — যাতে রায়তরা তাদের জমির ওপর নিরবচ্ছিন্ন ও স্থায়ী দখলদারিত্ব নিশ্চিত করতে পারে – এখানে হেস্টিংস শব্দগুলো কিছুটা শিথিল অর্থে ব্যবহার করেছেন এবং সম্পত্তির কঠোর আইনি সংজ্ঞার আলোকে তা প্রয়োগ করেননি; তিনি মূলত খুদকাশত রায়তদের দখলস্বত্বের কথাই উল্লেখ করেছেন, জমির ওপর তাদের কোনো নিরঙ্কুশ মালিকানা স্বত্বের কথা নয় – যাতে তাদের ওপর চাপানো যেকোনো স্বেচ্ছাচারী ও অন্যায় অর্থদাবি থেকে তাদের রক্ষা করা যায়। হেস্টিংস আরও জোর দিয়ে বলেন, এই লক্ষ্য কেবল বিভিন্ন ঘোষণা ও ফরমান জারি করে কিংবা জমিদারদের প্রতি অতিরিক্ত উদারতা প্রদর্শন করে অর্জন করা সম্ভব নয়। কারণ, ঘোষণা ও ফরমানগুলো ততক্ষণ পর্যন্ত মান্য করা হবে না, যতক্ষণ না সেগুলোকে এমন সুচিন্তিত বিধিনিয়মের মাধ্যমে কার্যকর করা হয় — যা সরকারের প্রত্যক্ষ হস্তক্ষেপ বা সহায়তা ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে; আর জমিদারদের প্রতি উদারতা দেখানোর বিষয় — যদিও তা জমিদারদের বিলাসিতা কিংবা ইজারাদারদের লোভ-লালসা চরিতার্থ করতে সহায়ক হতে পারে — তবুও তা প্রকৃত কৃষকদের জন্য বিন্দুমাত্র স্বস্তি বয়ে আনবে না; অথচ কৃষকদের কল্যাণ সাধনই হওয়া উচিত সরকারের প্রধান ও প্রত্যক্ষ কর্তব্য। পাট্টার pattah মাধ্যমে রায়তদের প্রদেয় খাজনা নির্ধারণের প্রচেষ্টার প্রসঙ্গে হেস্টিংস মন্তব্য করেন, কমিটি অফ সার্কিটের কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনার সুরে যা কিছু বলা হয়েছিল, বর্তমান সরকারের তৎকালীন সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের নির্দেশে বর্ধমানে যে বন্দোবস্ত করা হয়েছিল — তার ক্ষেত্রেও সেই সমালোচনা সমানভাবেই প্রযোজ্য। সরকারের কঠোর নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বর্ধমান জেলায় একটি পাট্টাও দেওয়া হয়নি; এবং সরকারের হস্তক্ষেপ ছাড়া (বর্ধমানের প্রসঙ্গে ফ্রান্সিস বলেন: এই ধরনের পাট্টা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময়সীমা এখনও অতিক্রান্ত হয়নি, এবং আমি এখনও কিছুটা সাফল্য অর্জনের ব্যাপারে নিরাশ নই। বাকি কথা হলো, আমি কেবল এই মন্তব্য করেই ক্ষান্ত হব — বিভক্ত কাউন্সিলের গৃহীত পদক্ষেপগুলো তাদের আওতাবহির্ভূত নানাবিধ বাধার কারণে ব্যর্থ হতে পারে; এবং কোনো একটা প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার অর্থ কেবল এটুকুই যে — সেই পদক্ষেপ বাস্তবায়নের সময় সরকারের পূর্ণ শক্তি আর প্রভাব তার সহায়ক হিসেবে কাজ করেনি। আমার আশঙ্কা, প্রশাসনের এক অংশের যোগ্যতা ও সাফল্যকে যতক্ষণ পর্যন্ত অন্য অংশের কাছে সমালোচনার বিষয় হিসেবে অথবা অসন্তোষের দৃষ্টিতে দেখা হবে — ততদিন অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমনটিই ঘটতে থাকবে।” Ibid. p. 130) — সেই পট্টাগুলো কখনোই জারি করা সম্ভব হতো না। “ভবিষ্যৎদ্রষ্টার অলৌকিক ক্ষমতা ছাড়াই সাধারণ কিছু কারণ থেকে ভবিষ্যতের ফলাফল সম্পর্কে অনুমান করা সম্ভব। জমিদারের স্বার্থ নিহিত থাকে রায়তদের কাছ থেকে যথাসম্ভব সর্বোচ্চ পরিমাণ খাজনা আদায়ের মধ্যে; আর ঠিক ততটাই তার স্বার্থের পরিপন্থী হলো — এমন সব দলিলের মাধ্যমে রায়তদের জমির অধিকার ও খাজনা প্রদানের বিষয়টিকে নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে বেঁধে ফেলা, যা প্রকারান্তরে জমিদারের নিজস্ব ক্ষমতার বিরুদ্ধেই এক ধরনের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে।”
পূর্বের অধ্যায়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, ফ্রান্সিস বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট মূলনীতির প্রণয়নে নিজেকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছিলেন; সুতরাং বর্তমানের এই নতুন পদক্ষেপের প্রতি তাঁর বিরোধিতাকে কেবলই ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা বিরোধিতার মানসিকতা থেকে উদ্ভূত বলে মনে করা উচিত নয়। তিনি ইতিমধ্যেই রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির মূলনীতি হিসেবে এই মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন — সরকার সরাসরি রায়তদের স্তরে নেমে আসতে পারে না; অর্থাৎ, জমিদার ও রায়তের মধ্যকার সম্পর্কটি নির্ধারণের ভার অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক নিয়মের ওপরই ছেড়ে দেওয়া উচিত। জমির মূল্যায়নের উদ্দেশ্যে প্রস্তাবিত তদন্তের বিষয়টি তাঁকে এই প্রশ্নটি উত্থাপন করতে প্ররোচিত করেছিল যে — এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য বা সুফলটি ঠিক কী হবে? (বাংলায় পৌঁছানোর পরপরই ফ্রান্সিস ও সংখ্যাগরিষ্ঠরা প্রাদেশিক পরিষদ ঢাকার জমিদারদের ভূমি স্বত্ব সংক্রান্ত তদন্ত বন্ধ করে দিয়েছিলেন) তিনি ইতিপূর্বেই বলেছিলেন — সংগৃহীত রাজস্বের পরিমাণ সরকারের প্রকৃত প্রয়োজন অনুযায়ী নির্ধারিত হওয়া উচিত; এবং তিনি এমন কোনো রাজস্ব-নির্ধারণ পদ্ধতির তীব্র বিরোধিতা করেন, যা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ও সহনীয় মাত্রার উদ্বৃত্তের চেয়েও অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। যদি এই তদন্তগুলোর মূল উদ্দেশ্য – জনসাধারণের থেকে তাদের পক্ষে প্রদেয় সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থটুকু নিংড়ে নেওয়া — না-ই হয়ে থাকে — তবে এই ধরনের তদন্ত চালানোর সার্থকতা বা প্রয়োজনটি ঠিক কোথায়? গভর্নর যেসব অনুসন্ধান চালানোর অভিপ্রায় পোষণ করেন, তা থেকেই আমি তাঁর পরিকল্পনার ঘোষিত কিংবা নিহিত নীতিসমূহ অনুধাবন করি। তিনি যে ধরনের তথ্য সংগ্রহের প্রস্তাব করেছেন, তার প্রকৃতি দেখে আমার কাছে কেবল একটি উদ্দেশ্যই প্রতিভাত হয় — যার জন্য এই তথ্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ