১৮৮২ সালের ৫ই অগাস্ট শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব কলকাতার বাদুড়বাগানে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বাসভবনে যান। তাঁদের সাক্ষাৎকারের বিবরণ বিভিন্ন বইতে আছে। আমরা কল্পনা করেছি রামকৃষ্ণ কর্কট রোগে আক্রান্ত হবার পরে বিদ্যাসাগর এসেছিলেন রামকৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করতে। কল্পিত সেই সাক্ষাৎকারটি এই রকম : —
কর্কট রোগে আক্রান্ত হয়েছেন রামকৃষ্ণ। তাঁর গলায় খুব ব্যথা। খেতে পারছেন না। কথা বলতে পারছেন না ভালো করে। রামকৃষ্ণের অসুস্থতার কথা শুনে বিদ্যাসাগর তাঁকে দেখতে এসেছেন। বিদ্যাসাগরকে দেখে খুব খুশি রামকৃষ্ণ। তিনি বললেন, কি গো, বিদ্যাসাগর, তুমি দেখতে এসেছ আমায়? কি যে ভালো লাগছে।
বিদ্যাসাগর বললেন, হ্যাঁ, এলাম আপনার কাছে। এলাম ঝগড়া করতে।
বিদ্যাসাগরের কথা শুনে হাসেন রামকৃষ্ণ। বড় নিষ্পাপ, সরল ও সুন্দর হাসি। বলেন, ঝগড়া কেন গো! আমি আবার কি করলাম! আমার সঙ্গে তোমার কিসের ঝগড়া? দ্যাখো বাপু, আমি মুখ্যু সুখ্যু মানুষ। তুমি মস্ত পণ্ডিত। শাস্ত্র নিয়ে আমার সঙ্গে ঝগড়া-টগড়া করো না। সে আমি পারব না।
তাঁর কথা শুনে বিদ্যাসাগর হেসে ফেলেন, বলেন, না, না, শা্স্ত্র নিয়ে ঝগড়া করব না।
— তাহলে?
— আপনার ওই মাকে নিয়ে ঝগড়া করতে এসেছি।
অবাক রামকৃষ্ণ, বলেন, একটু খোলসা করে বলতো বাপু।
— এই যে আপনি সারাক্ষণ মা মা করেন, এই মা তো আপনার কষ্ট দূর করে দিচ্ছেন না!
— কষ্ট! কই আমার তো কোন কষ্ট নেই।
— বললে হবে! কর্কট রোগের কষ্ট যে দারুণ!
রামকৃষ্ণ হাসেন, এটাও বোধ হয় আমার মায়ের একটা পরীক্ষা, বুঝলে বিদ্যাসাগর।
— পরীক্ষা!
— তাই তো। তাছাড়া, পৃথিবীতে মানুষ যেমন আসে, তেমনি তাকে চলেও যেতে হয়। এই যাওয়াটা নানা রকমের। কেউ রোগে যায়, কেউ শোকে যায়, কেউ দুর্ঘটনায় যায়। তুমি বুদ্ধদেবের কাহিনি তো জানো। তখন তিনি রাজগীরে আছেন। তাঁর কাছে ছুটে এলেন কিসা গৌতমী। তাঁর একমাত্র সন্তান সাপের কামড়ে মারা গেছে। তাকে বাঁচিয়ে দিতে হবে। কিন্তু তা যে সম্ভব নয়। তখন বুদ্ধ একটা কৌশলের আশ্রয় নিলেন। তিনি সেই সন্তানহারা নারীকে বললেন যে বাড়িতে কখনও কোন শোক প্রবেশ করেনি সেই বাড়ি থেকে একমুঠো সর্ষপচয় নিয়ে এলে তার স্পর্শে মৃত সন্তান জীবিত হবে। কিসা গৌতমী সর্ষপ আনতে গিয়ে বুঝলেন শোকহীন বাড়ি কোথাও নেই। বুঝলেন মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। তাকে রোধ করার সাধ্য কারোরই নেই পৃথিবীতে।
বিদ্যাসাগর শুনলেন রামকৃষ্ণের কথা। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন রামকৃষ্ণকে।
রামকৃষ্ণ একটু হেসে বললেন, দক্ষিণেশ্বরে এসেছ তুমি, একবার আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করে যাও।
বিদ্যাসাগর বললেন, গত জন্মে আপনাকে কি বলেছিলাম মনে আছে?
মনে পড়ল রামকৃষ্ণের। বললেন, হ্যাঁ, মনে পড়েছে। তুমি বলেছিলে ঈশ্বর আছেন কি নেই তা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই; বলেছিলে আমার কাজ তো আমাকেই করতে হবে, তিনি তো আমার কোন কাজে আসবেন না।
— ঠিক কথা, বিদ্যাসাগর বলেন, ব্রাহ্মণের সন্তান হয়েও আমি পুজোআচ্চাতে উৎসাহ বোধ করিনি, বেদান্ত ও সাংখ্যকে ভ্রান্ত বলেছি, গায়ত্রী মন্ত্র ভুলে গিয়েছিলাম, অনুপস্থিত ছিলাম স্ত্রীর শ্রাদ্ধতে। কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য তাই আমাকে নাস্তিক বলেছিলেন।
বিদ্যাসাগরের কথা শুনে মৃদু মৃদু হাসছিলেন রামকৃষ্ণ। একজন ঈশ্বরবিশ্বাসী মানুষ ঈশ্বরঅবিশ্বাসীর কথা শুনে ক্রুদ্ধ বা বিরক্ত হচ্ছেন না দেখে বিদ্যাসাগর অবাক হলেন। তাঁকে আরও অবাক করে দিয়ে রামকৃষ্ণ বলেন, নাই বা তুমি মানলে ঈশ্বরকে, কিন্তু তুমিও যে ভক্ত।
— তার মানে?
শিশুর মতো সরল হাসিতে উদ্ভাসিত মুখে রামকৃষ্ণ বলেন, বুঝতে পারলে না? তুমি যে মানুষকে ভালোবাসো, মানুষকে পুজো করো। তুমি যে মানবতার ভক্ত। আমার বিবেকানন্দ বলেছে না, ‘জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর’!
— ঠিক, ঠিক। আমি মানুষকে ভালোবাসি। নমি আমি নরদেবতারে, কি মহা বিস্ময়ে দাঁড়ায়েছ তুমি। মানব-ব্যতীত, মানব-অতীত কোনকিছুতে আমার আস্থা নেই।
কি যেন ভাবছেন রামকৃষ্ণ। একটু পরে বললেন, কিন্তু সেই মানুষ তোমাকে কত দাগা দিল বিদ্যাসাগর। তাই তো শেষের দিকে তুমি চলে গিয়েছিলে সরল সিধে সাঁওতালদের পাড়ায়। তুমি যাদের জন্য এত করলে তারা কত দুঃখ দিল তোমাকে। এসব ভেবে কষ্ট হয় না তোমার?
— হয় তো, খুব কষ্ট হয়। কিন্তু তাই বলে মানুষকে ছেড়ে আমি কাল্পনিক দেবতার পুজো করতে পারব না, বুঝলেন!
বিদ্যাসাগরের গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে রামকৃষ্ণ বলেন, আর আমি তোমাকে আমার মায়ের কাছে যেতে বলব না। তুমি তোমার পথেই চলো। সেও একটা পথ। যত মত তত পথ।
দক্ষিণেশ্বর থেকে ফেরার পথে রামকৃষ্ণের কথাগুলো ভাবছিলেন বিদ্যাসাগর। অভিমানে তাঁর চোখে জল এলো। যে মানুষকে তিনি ভালোবেসেছিলেন, সেই মানুষ তাঁকে অনেক দাগা দিয়েছে। দাগা দিয়েছে বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র, ভূদেব মুখার্জি, নবগোপাল মিত্র এবং আরও কতজন। দাগা দিয়েছে তাঁর আত্মীয়বান্ধবেরা। দাগা দিয়েছে ভাই শম্ভুচন্দ্র, মা ও বাবা, আর তাঁর পুত্র নারায়ণচন্দ্র। আর একটা কথা মনে পড়ল বিদ্যাসাগরের। রামকৃষ্ণ বলেছিলেন ‘যত মত তত পথ’। সেকথা কি তাঁর পরবর্তী প্রজন্ম মনে রেখেছে? না, তো। এই মত আর পথ নিয়ে মত্ত হয়েছে ঝগড়া-বিবাদে। কখনও কখনও সে বিবাদ বড় কুৎসিত আকার ধারণ করেছে। ভাগাভাগি ভাঙাভাঙির হরির লুঠ চলেছে দেশে। বিভাজনের বিদারণরেখা ক্ষত-বিক্ষত করেছে মানুষকে। তাঁর মানবতার সাধনা, রামকৃষ্ণের যত মত তত পথের সাধনা কি তাহলে হারিয়ে যাবে? বিদ্যাসাগরের মনে পড়ে গেল তাঁর উত্তরসূরী রবীন্দ্রনাথের কবিতার কয়েকটি লাইন। মনে মনে সেসব লাইন উচ্চরণ করে তিনি সান্ত্বনা লাভ করতে চাইলেন : —
জীবনে যত পূজা হল না সারা,
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।
যে ফুল না ফুটিতে ঝরেছে ধরণীতে,
যে নদী মরুপথে হারালো ধারা,
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।
জীবনে আজো যাহা রয়েছে পিছে,
জানি হে জানি তাও হয় নি মিছে।
আমার অনাগত আমার অনাহত
তোমার বীণাতারে বাজিছে তারা-
জানি হে জানি তাও হয় নি হারা।
বেশ নতুনত্ব রয়েছে আপনার প্রতিবেদনে।
এই ধরনের আরো লেখা পড়ার ইচ্ছা রইলো।