স্যার উইলিয়াম হান্টারের মতে, কালেক্টরদের পুনর্বহাল ছিল দোদুল্যমান দোলক-গতি’ (swing of the pendulum) — দেশীয় সংস্থার ওপর আস্থার পরিবেশ আর ইংরেজ প্রশাসকদের প্রতি অবিশ্বাসের পর্যায় থেকে সরে এসে ইংরেজ কাঠামোয় আস্থা ও দেশীয়দের প্রতি অবিশ্বাসে মোড় নেয়। বরং এটি ছিল একজন সৎ ইংরেজ কর্মীর ভালো কাজ করার এবং কর্মক্ষেত্রে তাঁর স্থানীয় সহকর্মীদের প্রশিক্ষিত করে তোলার সক্ষমতার ওপর আস্থাশীল হওয়ারই ফল। ‘প্রাদেশিক পরিষদ’ (Provincial Council) ব্যবস্থায় কোম্পানির বেশ কয়েকজন কর্মীকে বিভিন্ন প্রাদেশিক রাজধানীতে নিযুক্ত করা হয়েছিল; সেখানে অধিকাংশ কাজকর্মই মূলত নথিপত্র বা কাগজ-কলমে সম্পন্ন হতো। প্রাদেশিক পরিষদ ব্যবস্থায় কোম্পানির বেশ কিছু কর্মচারীকে প্রাদেশিক রাজধানীগুলোতে মোতায়েন করা হয়; সেখানে অধিকাংশ প্রশাসনিক কাজই কেবল ‘কাগজ-কলমে’ সম্পন্ন করার বিষয় হিসেবে তাঁদের সামনে আসত। রাজধানীগুলো থেকে সরিয়ে এনে — যেখানে প্রাদেশিক পরিষদগুলো সম্মিলিতভাবে ও একযোগে গ্রামীণ প্রশাসনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো দেখভাল করত — যখন তাঁদের নিজস্ব জেলা পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলো; যখন তাঁদের কাগজপত্রের পরিবর্তে রক্ত-মাংসের জীবন্ত মানুষদের নিয়ে কাজ করতে হলো; এবং যখন ব্যর্থতার দায়ভারের পাশাপাশি উচ্চাকাঙ্ক্ষা চরিতার্থ করার সুনির্দিষ্ট সুযোগও তাঁদের সামনে উন্মুক্ত হলো — তখন কোম্পানির কর্মচারীদের কর্মনিষ্ঠা, সততা ও অভিজ্ঞতার ক্ষেত্রে উন্নতি সাধন করা ছিল এক অনিবার্য পরিণতি। ইংরেজ সরকারের পূর্ববর্তী ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল মূলত এই বিষয় অনুধাবনে অক্ষমতা যে, এত বিশাল দেশের প্রশাসন পরিচালনার জন্য জেলাগুলোর তত্ত্বাবধানে কত বিপুল সংখ্যক ইংরেজ কর্মচারীর প্রয়োজন হবে। ‘দেওয়ানি’ ব্যবস্থাকে দেখে মনে হয়েছিল যেন এই কাঠামো সরকারের হাতে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রশাসনিক হাতিয়ার তুলে দিয়েছে। সেই ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের বছরেও এই প্রশাসনিক যন্ত্র সচল ছিল এবং কোম্পানির কোষাগারে রাজস্ব জমা হচ্ছিল প্রায় অপরিবর্তিত মাত্রায় [বলাভাল পূর্বের বছরের তুলনায় অনেক বেশি মাত্রায়]; কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি প্রমাণ, দেশীয় রাজস্ব প্রশাসনের এই যন্ত্রকে যদি কোনো শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হয়, তবে তা শেষ পর্যন্ত সেই রাজস্ব-উৎপাদনকারী দেশকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলবে। কোম্পানির কর্মচারীদের সংখ্যাগত অপ্রতুলতায় জেলা পর্যায়ে রাজস্ব ও বিচার দেওয়ার কাজের জন্য প্রয়োজনীয় ইংরেজ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল; কিন্তু ধীরে ধীরে এই উপলব্ধি জাগ্রত হলো — এই গুরুত্বপূর্ণ কাজকে যতই কঠিন মনে হোক না কেন — দেওয়ানি অধিকার-ভুক্ত এলাকাগুলোর জন্য উপযুক্ত জেলা কর্মকর্তা খুঁজে বের করতেই হবে; অন্যথায়, যেসব নিপীড়নের অভিযোগ প্রায়শই শোনা যেত, সেসব আরও বৃদ্ধি পাবে এবং বাংলায় কোম্পানির অবস্থানকে অসহনীয় করে তুলবে। ১৭৮১-র ফেব্রুয়ারিতে গৃহীত পদক্ষেপই বাংলায় প্রত্যক্ষ ইংরেজ গ্রামীণ প্রশাসনের সূচনা করেছিল — এমন দাবি করা বিভ্রান্তিকর; তবে প্রখ্যাত ঐতিহাসিকেরা যে এই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে উক্ত পদক্ষেপের গুরুত্বেরই পরিচায়ক। সেই একই বছরে, নতুন ‘মফস্বল আদালত’ প্রতিষ্ঠার করে দেওয়ানি বিচার ব্যবস্থাকে সুদৃঢ় করা হল। আঠারো জেলার মধ্যে চারটি — ছাপরা, ভাগলপুর, চট্টগ্রাম এবং রামপুর জেলায় কালেক্টরকেই একাধারে কালেক্টর-বিচারকের দায়িত্ব পালন করতে হতো; অপর চৌদ্দ জেলায় — মেদিনীপুর, পাটনা, দ্বারভাঙ্গা, তাজপুর, নাটোর, ঢাকা, বাকেরগঞ্জ, মাসি, রাজহাট, সুলতানসি, মুরলি, কলকাতা, বর্ধমান এবং মুর্শিদাবাদে বিচারক রাজস্ব প্রশাসনের কোনো কাজের সাথেই যুক্ত থাকতেন না।
সদর দেওয়ানি আদালতকে পুনর্গঠন করে স্যার এলিজা ইম্পের দক্ষ তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করার পর, হেস্টিংস ফৌজদারি আদালত বা অপরাধ বিষয়ক বিচারালয়গুলোর দিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ পান; এই আদালতগুলো তখনও তাত্ত্বিকভাবে মুর্শিদাবাদের নায়েব নাজিমের ওপর নির্ভরশীল ছিল। ১৭৭২-এর ২১শে আগস্টের প্রবিধান Regulations অনুযায়ী, রাজস্ব সংগ্রাহক বা কালেক্টরদের ওপর ফৌজদারি আদালতের কর্মকর্তাদের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। তাঁদের কাজ ছিল য়োজনীয় সাক্ষীদের তলব ও জেরা করা হচ্ছে কি না, তাঁদের সাক্ষ্যের যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কি না এবং আদালতের রায়গুলো নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রদান করা হচ্ছে কি না নিশ্চিত করা। যখন মুর্শিদাবাদের ‘কন্ট্রোলিং কাউন্সিল’ বিলুপ্ত করা হলে মুর্শিদাবাদের সদর নিজামত আদালতকে কলকাতায় সরিয়ে আনা হলো এবং একজন দারোগার তত্ত্বাবধানে ন্যস্ত করা হলো; এই দারোগা আবার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্টের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিলেন। কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নবাবের প্রতিনিধি হিসেবে গুরুতর অপরাধের মামলায় ফৌজদারি আদালতের প্রদত্ত দণ্ডাদেশগুলো পুনর্বিবেচনা করতেন। যেমনটি আমরা আগে দেখেছি, সুপ্রিম কোর্ট প্রতিষ্ঠার ফলে সদর দেওয়ানি আদালতের কাজকর্ম কার্যত স্থগিত করে দেওয়া হয়েছিল; এবং নিঃসন্দেহে সেই একই পরিস্থিতির দরুন, ১৭৭৫-এর ১৮ই অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট নিজামত আদালতকে নতুন করে পুরনো রাজধানী মুর্শিদাবাদে ফেরত পাঠায় এবং মোহাম্মদ রেজা খানকে ‘নায়েব নাজিম’ দপ্তর পরিচালনার দায়িত্ব অর্পণ করে। (কলকাতায় ফৌজদারি কারাগার ‘হরিণবাড়ি’ (হরিণশালা) নামক হিন্দু নামেই অধিক পরিচিত ছিল। দেখুন: Bengal: Past and Present, খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ৬৪-৮২।) ১৭৭৪-এ কালেক্টরদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়; ফলে জেলাগুলোতে ফৌজদারেরা — যাঁরা বিভিন্ন শ্রেণীর আইন-কর্মকর্তাদের সহায়তা পেতেন — আদালত পরিচালনা করতেন এবং শান্তি-রক্ষাকারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। ১৭৭৫-এ জমিদারদের পুলিশি এখতিয়ার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে হেস্টিংস আর ফ্রান্সিসের প্রস্তাবগুলোর কথা পূর্ববর্তী অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭৮১-এর ৬ই এপ্রিল, হেস্টিংস এমন এক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন যার উদ্দেশ্য ছিল ফৌজদারি আদালতগুলোর কার্যক্রম সহায়তা ও পরিপূরণ করা। এই আদালতগুলো তাদের কার্যক্রম যথারীতি চালিয়ে যাবে এবং নায়েব নাজিমের তত্ত্বাবধানেই থাকবে — এমনটাই স্থির ছিল; তবে দেওয়ানি আদালতের ইংরেজ বিচারকদের ‘ম্যাজিস্ট্রেট’ হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাঁদের অপরাধ ও লঘু অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করার এবং বিচারের জন্য নিকটস্থ ফৌজদারি আদালতে সোপর্দ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়; অবশ্য চূড়ান্ত রায় দেওয়ার ক্ষমতা নিজামতের হাতেই ছিল। এই পদক্ষেপ ইংরেজ জেলা কর্মকর্তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করতে এবং জেলাগুলোর শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। এর ফলে ফৌজদারদের সেই সহজ অজুহাত দেখানোর সুযোগ আর রইল না যে, ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রবল প্রভাবের কারণে তাঁরা নৈতিক কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছেন; পাশাপাশি, এই দাবি করার সুযোগও রুদ্ধ হয়ে গেল যে — আইন লঙ্ঘনকারীকে ধরতে পারলে তাঁরা নিশ্চয়ই কঠোর ব্যবস্থা নিতেন, কিন্তু তাঁদের পক্ষে তাকে ধরাটাই ছিল অসম্ভব। এই পদক্ষেপ সেই প্রাথমিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন বাধা অপসারিত করেছিল — যা এই ব্যবস্থা গৃহীত না হলে, ১৭৯০-তে লর্ড কর্নওয়ালিসকে মোকাবিলা করতে হতো; সেই সময়েই ‘সার্কিট আদালত’ Courts of Circuit প্রবর্তন করা হয়, যার প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল অপরাধ ও লঘু অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচার করা।
এই প্রসঙ্গে ইম্পের ‘দেওয়ানি কার্যবিধি’র Civil Procedure Code কথা অন্তত উল্লেখ করা প্রয়োজন, যা সদর ও মফস্বল দেওয়ানি আদালতের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এই কোড প্রণীত হয়েছিল। ১৭৮০-র ৩রা নভেম্বর তেরো অনুচ্ছেদের বিধি জারি করা হয় এবং এর ঠিক এক বছর পর, অর্থাৎ ১৭৮১-এর ৫ই জুলাই, পঁচানব্বই অনুচ্ছেদের সংশোধিত প্রবিধান প্রকাশ করা হয়। এটা ছিল “ব্রিটিশ ভারতে দেওয়ানি কার্যবিধির আইন সংহিতাবদ্ধ করার প্রথম প্রচেষ্টা।” (আচার্য্য: ব্রিটিশ ভারতে বিধিবদ্ধকরণ। ঠাকুর আইন বক্তৃতা, কলকাতা, পৃ. ৫৫। ১৭৭৩-এ ওয়ারেন হেস্টিংস ‘জেন্টু’ (হিন্দু) আইনের সংহিতা প্রণয়নের লক্ষ্যে পণ্ডিতদের নিয়ে কমিটি গঠন করেন। এই সংহিতা সংকলিত হয় এবং এন. বি. হ্যালহেডে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। আচার্য্য মহাশয়ের উক্ত গ্রন্থের পরিশিষ্ট ‘ক’ দ্রষ্টব্য; হ্যালহেড বা হেস্টিংসের এই সংহিতাতে পদ্ধতিগত ও মূল — উভয় প্রকার আইনেরই আলোচনা রয়েছে।) ১৭৮১-তে উইলিয়াম চেম্বার্স (স্যার রবার্ট চেম্বার্সের ভ্রাতা এবং ‘নতুন নিয়মাবলি’ বা নিউ টেস্টামেন্টের একাংশের ফারসি অনুবাদক) কর্তৃক এর একটি ফারসি অনুবাদ প্রকাশিত হয়; এবং ১৭৮৩-তে জোনাথন ডানকান (পরবর্তীতে বোম্বাইয়ের গভর্নর এবং প্রখ্যাত মানবতাবাদী রাষ্ট্রনায়ক) এর বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেন। (শ্রীরামপুরের মহান ধর্মপ্রচারকদের নিয়ে রচিত নিজের গ্রন্থে মার্শম্যান ইংরেজদের বাংলা ভাষা অবহেলার নিয়ে — বিশেষত কেরি সাহেবের আগমনের পূর্ববর্তী সময়ে — যে ব্যাপক ও সাধারণ মন্তব্যসমূহ করেছেন, সেগুলিকে অবশ্যই কিছুটা সতর্ক হয়েই cum grano salis গ্রহণ করা উচিত।)
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সংক্ষেপে দ্য ফিফথ রিপোর্ট।

বিশ্বেন্দু নন্দ