তিনি হাসান, হোসেন কিংবা আবদুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী নন। ১৯৩৩ সালে যখন পার্ক সার্কাসের পঞ্চম রাস্তাটির নামকরণের প্রস্তাব আসে তখন রাস্তাটির নামকরণ করা হয় হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাবা মৌলানা ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দীর নামে। যখন নামকরণের প্রস্তাব হয় তখন হাসান সোহরাওয়ার্দী উপাচার্যের পদে আসীন। জীবিত ব্যক্তির নামে কোন কিছুর নামকরণ আমাদের দেশের প্রথা নয়। সর্বোপরি তিনি মারা যান ১৯৪৬ সালে। অজিত কুমার বসু তাঁর দুখন্ডের ‘কলিকাতার রাজপথ’ বইতে উল্লেখ করেছেন নতুন রাস্তা ‘সুরাবর্দি অ্যাভিনিউ’ নামে নামঙ্কিত হয়। মৌলানা সুরাবর্দি ছিলেন সাধু প্রকৃতির, জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলেই তাঁকে ভক্তি শ্রদ্ধা করত। ১৯৩৩ এর ৮ই মার্চ এই নামকরণ সংক্রান্ত প্রস্তাব আনেন এক ব্রাহ্মণ সন্তান। নাম শৈলেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়। এটাই বাঙালির সৌহার্দ্যতার প্রতীক।

হাসান সোহরাওয়ার্দী
কিন্তু কে ছিলেন ওবায়দুল্লাহ সোহরাওয়ার্দী?
তিনি ছিলেন মেদিনীপুর শহরের বিখ্যাত সোহরাওয়ার্দী পরিবারের কৃতী সন্তান ওবায়দুল্লাহ আল ওবায়দী সোহরাওয়ার্দী (১৮৩২-১৮৮৬)। তৎকালীন বাংলার বিখ্যাত তিনটি মুসলিম পরিবারের মধ্যে সোহরাওয়ার্দী পরিবার, মুর্শিদাবাদের মুর্শেদ পরিবার এবং খন্দকার পরিবার ছিল অন্যতম (ড. সালেহা বেগম — পথিকৃৎ মুসলমান নারী )। পরিবারের ঐতিহ্য অনুসারে তিনি আরবি ও ফারসি ভাষা শিক্ষা করেন। তখন ইংরেজরা দেশের রাজা হলেও এই দুই দরবারি ভাষার কদর ছিল। কিন্তু অগ্রসর সোহরাওয়ার্দী পরিবার উপলব্ধি করে ছিলেন সামনের দিন রাজার ভাষার কদর হবে। ওবায়দুল্লাহও এই সত্য বুঝেছিলেন। তিনি প্রায় স্ব-উদ্যোগে ইংরেজি ভাষা রপ্ত করেন এবং ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকরি করবেন বলে মনস্থ করেন। সে সময় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিলনা। প্রথমে তাঁর চাকরি হয় ভাইসরয় লিগ্যাল লেজিসলেটিভ কাউনসিলের অনুবাদ বিভাগের প্রধান মুনসী হিসাবে। এরপর তিনি হুগলী ইমামবাড়া কলেজে অ্যাংলো-আরবি পদে অধ্যাপক হন। এখানে তিনি ছাত্র হিসেবে পান — সৈয়দ আমির আলি, কবি কায়কোবাদ, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, ঢাকার নবাব আব্দুল গনি ও নবাব আহসানুল্লাহ — প্রমুখ ভবিষ্যৎ ভারতের খ্যাতনামা মুসলিম চিন্তাবিদদের।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসান সোহরাওয়ার্দী
রাজনৈতিক আদর্শের দিক থেকে তিনি সৈয়দ আহমেদের আলিগড় আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। আলিগড় কলেজের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর ছিলেন ওবায়দুল্লাহ। সৈয়দ আহমেদের ‘তহজিবুল আখলাখ’ পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন। তাঁর কবিতার সংকলন ‘দিওয়ান-ই-ওবায়দী’ ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। তিনি ফারসি ভাষায় শিক্ষার্থীদের সড়গড় করার জন্য ‘দস্তুরি ফারসি আমোজ’ নামে একটি ব্যাকরণ বই লিখেছিলেন।
মৌলানা ওবেদউল্লা আল-ওবেইদি সোহরাওয়ার্দী (Maulana Obaidullah al-Obaidi Suhrawardy)-র ঢাকার সমাজ সংস্কৃতির সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিল। এখানে ‘সমাজ সম্মিলনী সভা’ নামে একটি শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। ‘ঢাকা মুসলমান সুহৃদ সমিতি’ গঠনেও তিনি ছিলেন একজন পুরোধা ব্যক্তিত্ব। তাঁর জ্ঞান, সাধনা ও সমাজ সেবার পুরস্কার স্বরূপ সরকার তাঁকে ‘বাহর-উল-উলুম’ (বিদ্যাসাগর) উপাধিতে তাঁকে ভূষিত কর হয় সম্পর্কে ইনি হচ্ছেন হুসেন সোহরাওয়ার্দীর মাতামহ। সোহরাওয়ার্দীর জননী বেগম খুজিস্তা আখতার বানু হলেন মৌলানা ওবেদউল্লার জ্যেষ্ঠা কন্যা এবং সিনিয়র কেম্ব্রিজ পাশ করা প্রথম মুসলিম মহিলা। সৈয়দ আমির আলী খান তাঁর আত্মজীবনীতে ওবায়দুল্লাহ সম্পর্কে লিখেছিলেন — He (Obaidullah) was a scholarly man conversant with English… He was a man of worthy of respect…।

মৌলানা ওবেদউল্লা আল-ওবেইদি সোহরাওয়ার্দী
ওবায়দুল্লাহর জ্যেষ্ঠ পুত্র আবদুল্লাহ সুরাবর্দী ১৯০৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুসলিম আইন সম্পর্কে গবেষণা করে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর অপর পুত্র হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন উচ্চ-শিক্ষিত। তিনি ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম এফ.আর.সি.এস ছিলেন (ওয়াকিল আহমদ — উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা ও চেতনার ধারা)। খুজিস্তা আখতার বানু ছিলেন ওবায়দুল্লাহর মেয়ে। তিনি প্রথম সিনিয়র কেম্ব্রিজ মুসলিম মহিলা। উপমহাদেশে তিনিই প্রথম মহিলা যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় এর এম.এ ক্লাসের পরীক্ষক নিযুক্ত হয়েছিলেন। খুজিস্তা কলকাতায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন, যার নাম পরবর্তী সময়ে হয় সুহরাবর্দী বেগম মুসলিম গার্লস স্কুল। এই স্কুল স্থাপনে তিনি তাঁর অপর ভাই আবদুল্লাহ আল আমুন সোহরাওয়ার্দীর সাহায্য পেয়েছিলেন! (সালেহা বেগম — ঐ)। ’৪৬-এর দাঙ্গার প্রত্যক্ষ মদতদাতা বলে কুখ্যাত হোসেন শহিদ সুরাবর্দী ছিলেন খুজিস্তা বানু ও ব্যারিস্টার জাহিদ সুরাবর্দীর পুত্র। সে অর্থে, যার নাম জড়িয়ে ঐতিহাসিক ফ্যাক্ট-চেক অব্যাহত সেই তিনি ছিলেন মৌলানা ওবায়দুল্লাহর দৌহিত্র মাত্র। তাঁর সাথে সুরাবর্দী অ্যাভিনিউর দূরতম কোন সম্পর্কই নেই।

প্রসঙ্গত, মৌলানা ওবেদউল্লা ১৮৮৪ সালে তৎকালীন আদি ব্রাহ্মসমাজের সভাপতি রাজনারায়ণ বসুর উদ্যোগে রামমোহনের ফারসি গ্রন্থ তুহফাৎ-এর ইংরেজি অনুবাদ করেন। রাস্তাটা তাঁর নামে।