
আমার সুখী সুখী জীবন। মাস গেলে ভালোই মাইনে, কাজকর্ম নিয়ে তেমন কোন টেনশন নেই। কর্তার ইচ্ছায় কর্ম করি। সরকার যা বলে সেটা পড়িয়ে দিনের শেষে বাড়ি ফিরে টিউশনি। এটাই উপরি। পেলে ভালোই লাগে। আমার ছোট্ট ঘর। ছোট্ট বাচ্চা। রোজ রাত্রে বউকে চুমু খেয়ে তাড়াতাড়ি শুতে যাই। ভোর হলেই ট্রেন চেপে দত্তপুকুর স্টেশনে নেমে ভ্যানে চেপে যশোর রোড, তারপর বাসে করে দেগঙ্গা। সেখানে একটা হাই স্কুলের ভূগোলের টিচার আমি। আমি মাস্টার মশাই।
শিক্ষকদের এখন অনেক মাইনে, কাজও অনেক। সরকারের নির্দেশ আসতেই আছে। মিড ডে মিলের হিসেব থেকে জনগণনা, যাকে বলে জুতো সেলাই থেকে চণ্ডী পাঠ — সব কিছুতেই মাস্টার, শুধু পড়ানো বাদ দিলেই হল। সে সব কাজ করে দিলে কোন সমস্যা নেই। আপাতত কাজের লক্ষ্য একটাই বাংলাদেশি আর রোহিঙ্গা খুঁজে বের করা।
কমিশন নির্দেশপত্রে যা লেখে, নেতারা বলেন অন্য কথা। গলায় গেরুয়া গামছা ঝুলিয়ে এক স্মাগলার অঞ্চলের বড় নেতা। চাপা স্বরে বলে গেছে : বেছে বেছে মুসলিমদের নাম কেটে দিতে হবে। আমার এলাকা মুসলিম অধ্যুষিত। আমাকে প্রায় ৭২ শতাংশ নাম কেটে দিতে হয়েছে। কমিশন, নেতা, হেড মাস্টার সকলেই আমার কাজে খুশি।
মনে মনে মেনে নিতে পারি না। বাড়ি ফেরার পথে ওই নাম কাটা মুখগুলো ভেসে ওঠে। ওরা আমার ছাত্রদের কেউ বাবা, কেউ মা, কেউ অন্য কিছু। আমাকে দেখলেই বলে : স্যার, আমাদের নাম থাকবে তো? ওরা আমাকে খুব ভরসা করে। ওদের ছেলে মেয়েদের এতদিন পড়িয়েছি, ওরা আমাকে মাস্টার বলে জানে।
রাত্রে বাড়ি ফিরে ফের ভোটার তালিকা নিয়ে বসি। পাশে বসে বউ আমার কাজে হাত লাগায়। ওকেই মুসলিম নাম বাছতে বলেছি। বেছে বেছে নানা অজুহাত খাঁড়া করে ওদের সমন পাঠানোর ব্যবস্থা করি। বউ বলছিল, এসব করে লোকের সর্বনাশ করার কী দরকার! কিন্তু আমার তো দোতলার লোন এখনো শোধ হয় নি। এসব না করলে চাকরি নিয়ে টানাটানি পড়বে, তখন? বাড়িতে টিউশনি করে সংসার চলবে? আদর্শ তো ছিল সৎ হয়ে বাঁচব, তাই তো শিক্ষক হতে চেয়েছিলাম। মা বলত, আর যাই করিস বাবা, মিথ্যে কথা বলে টাকা আয় করিস না। ওসব টাকা ঘরে থাকে না, তাতে রোগ শোক বাড়ে। মা থাকলে বুঝত, ন্যায় আর সততা শব্দটা নিজেই কত অসহায়। স্কুলে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দের জন্মদিনে তাঁদের ছবিতে মালা দিয়ে ভাষণ দিয়ে বলেছি — সত্যের জন্য সবকিছু ত্যাগ করা যায় কিন্তু কোন কিছুর জন্যই সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।
বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্র রচনাবলী এখন আর পড়ি না। তাকে রেখেছি, লোক ঘরে ঢুকে দেখে। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সততা নিয়ে এতদিন যত কথা লিখেছি, সব বাঁধিয়ে অ্যালবামে রেখেছি। পরের প্রজন্ম এসে দেখবে, আমিও এসব নিয়ে কাগজে লিখতাম!
এখন সব বুকের নিচে দলা পাকিয়ে উঠে এসে বমি হতে চায়। রাত অনেক। ঘুমন্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবি, ওকে তো নবোদয় স্কুলে ভর্তি করতে হবে, গেরুয়াধারী কারুর সুপারিশ চাই।
ঘরে উল্টো দিকের সাদা দেওয়ালে সারি সারি স্কুলের মুসলিম বাচ্চাগুলোর মুখ। আমার দিকে তাকিয়ে।
আমার ছেলের মুখ ওদের সঙ্গে মিশে গেছে। সকলে একসঙ্গে আমার দিকে তাকিয়ে বলছে। কী বলছে, কেন বলছে, কিছু বুঝতে পারছি না, শুধু একটা শব্দ বুকে ধাক্কা দিচ্ছে — স্যার..