Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার

দিলীপ মজুমদার / ৫৮ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

সত্তরের দশকের একেবারে প্রথম দিক। থাকি তারাতলার একটি সরকারি আবাসনে। ভাড়ায়। আমার সঙ্গে থাকেন পিসিমা আর অজয় কোলে। তারকেশ্বরের ছেলে অজয় পড়ে রবীন্দ্র ভারতীতে। একটু ময়লা রঙ। গাঁট্টা গোট্টা। একদিন মধ্যরাতে দরজায় প্রবল ধাক্কা। জানালা খুলে দেখি পুলিশের বিশাল দল। আমার ঘর সার্চ করতে চান। কেন? এক নকশাল নেতা লুকিয়ে আছেন।

দরজা খুলে দিতে ওঁরা হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে এলেন। সার্চের নামে লণ্ডভণ্ড করতে লাগলেন। আর বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন অজয়ের দিকে। সন্দেহ। অবশেষে বুঝলেন আমি শিক্ষকতা করি। নিরীহ মানুষ। যাবার সময়ে অজয়কে নিয়ে যেতে চাইলেন থানায়। সন্দেহ আর কি! তখন হাওয়ায় ভাসে এনকাউন্টার শব্দটা। গা ছমছম করা শব্দ। অপরাধীকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। খোলা জায়গায় তাকে ছেড়ে দিয়ে বলে, ‘যা পালা’। পালাতে গেলে গুলি করে পেছন থেকে। এসব শুনেছি বলে পুলিশকর্তাকে অনুরোধ করি, ‘কাল সকালে আমি একে থানায় নিয়ে যাব। আজকে রেহাই দিন।’

অনুরোধ শুনলেন তাঁরা। পরের দিন অজয়কে নিয়ে থানায় গেলাম। ওসি বললেন তাঁদের একটা ভুল হয়েছিল। তাঁরা আমাদের ফ্ল্যাটের উল্টোদিকের ফ্লাটে হানা দিয়েছিলেন। ওখানেই ছিলেন নকশাল নেতা। কিন্তু একজন বয়স্ক মহিলা আমাদের ফ্ল্যাটটা দেখিয়ে দেন। আমাদের ফ্ল্যাট থেকে যখন তাঁরা আবার সেই ফ্ল্যাটে যান, তখন পাখি ফুড়ুৎ। অবশ্য ভোর রাতে তাঁরা জিনজিরা বাজারের এক আস্তানা থেকে নকশাল নেতাকে ধরেন। সে নেতার যে এনকাউন্টার হয়ে গেছে সে কথা শুনলাম সেদিন বিকেলে।

দিন কয়েক পরে শুনলাম সরোজ দত্তের এনকাউন্টারের কথা। সরোজ দত্ত ছিলেন সাংবাদিক, কবি ও লেখক। নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন। গভীর রাতে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি থেকে পুলিশ তাঁকে তুলে নিয়ে যায় ময়দানে। পুলিশি এনকাউন্টারে মারা যান তিনি। কথিত আছে মহানায়ক উত্তমকুমার প্রাতঃভ্রমণে এসে সে দৃশ্য দেখে ফেলেন। তারপর ভীত হয়ে তিনি চলে যান মুম্বাই।

এনকাউন্টার ও আইন

ভারতীয় আইনে ‘এনকাউন্টার’ বলে কোন শব্দ নেই। অপরাধীকে নিশ্চয়ই পুলিশ ধরবে, তবে তার বিচার হবে আদালতে। অবশ্য সিআরপিসির ৪৬ নং ধারা অনুযায়ী আত্মরক্ষার জন্য পুলিশের বলপ্রয়োগের কথা আছে। এনকাউন্টারের নামে বিচার বহির্ভূত হত্যা যাতে না হয় তার জন্য জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও সুপ্রিম কোর্টের কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশিকা আছে : —

১] আইপিসি বা ভারতীয় দণ্ডবিধির ৯৬-১০৬ ধারা অনুসারে নিজের বা অন্যের জীবন রক্ষার্থে পুলিশ শুধুমাত্র ন্যূনতম বলপ্রয়োগ করতে পারে।

২] এনকাউন্টারের পর এফআইআর দায়ের করা বাধ্যতামূলক। সেটি উপযুক্ত রেজিস্টারে নথিভুক্ত করতে হবে।

৩] ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত যাতে হয় তার জন্য অন্য থানার পুলিশ বা সিআইডিকে তদন্তভার দিতে হবে।

৪] একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে পৃথক তদন্ত হবে ঘটনার।

৫] অবিলম্বে ঘটনাটি রাজ্য বা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের গোচরে আনতে হবে। তিন মাসের মধ্যে কমিশনে দ্বিতীয় প্রতিবেদন পাঠাতে হবে।

৬] যদি প্রমাণিত হয় যে পুলিশ আত্মরক্ষার নামে বেআইনিভাবে, পরিকল্পনামাফিক কোন মানুষকে হত্যা করেছে, তাহলে সেই পুলিশের বিরুদ্ধে ৩০২ ধারায় মামলা হবে।

ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে ভারতের সংবিধানের ১৪১ অনুচ্ছেদের অধীনে এই সব নিয়মগুলিকে আইন হিসেবে গণ্য করে সমস্ত পুলিশি এনকাউন্টারের ক্ষেত্রে তা পালন করতে হবে। একটি শক্তিশালী ও ন্যায্য আইনি প্রক্রিয়া তৈরির লক্ষ্যে জারি করা হয় এই সব নির্দেশিকা। এর উদ্দেশ্য ছিল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার যেন লঙ্ঘিত না হয়, তা সুনিশ্চিত করা। এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল যে এগুলো মৃত ব্যক্তির মৌলিক অধিকার — যেমন, জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার, মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকার যেন স্বীকৃত হয়।

অংশিকা শর্মা ও অর্ণব শর্মার মন্তব্য :

‘অপরাধ দমনের রবিনহুড মিশনের পরিবর্তে এনকাউন্টার সংস্কৃতিকে মানবাধিকারের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অপরাধ দমন তখনই নৈতিক, যখন অপরাধটি গুরুতর প্রকৃতির হয়, যা আমাদের দেশের জাতীয় নিরাপত্তার হুমকিস্বরূপ, অথবা যেখানে আত্মরক্ষা বা ব্যক্তিগত সুরক্ষার প্রয়োজন হয়। এটি নিশ্চিত করতে হবে যে একটি যথাযথ আচরণবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে অর্থাৎ অপরাধীদের ধরার জন্য এনকাউন্টারকে শেষ উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যখন অন্য সব উপায় শেষ হয়ে যায়। দেশজুড়ে এনকাউন্টার কিলিং-এর প্রভাব সম্পর্কে আমাদের সবাইকে সচেতন করা উচিত। মানুষের বোঝা উচিত যে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার জন্য এনকাউন্টার প্রথম উপায় নয়। আমাদের এটিকে শেষ উপায় হিসেবে অবলম্বন করা উচিত। যদি এনকাউন্টার সংস্কৃতি বৃদ্ধি পায়, তবে ন্যায়বিচার/বিচার ব্যবস্থার উপর মানুষের বিশ্বাস কমে যাবে।’

অপারেশন স্টিপলচেজ

পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, ওড়িশায় নকশাল দমনের জন্য ইন্দিরা গান্ধি এই ‘তিন কর্ডন’ অভিযানের আয়োজন করেন। নকশালদের কোন বসতি/ গোষ্ঠিকে বাইরের বা প্রথম কর্ডন দিয়ে ঘিরে ফেলা হত, যেখানে থাকত সেনাবাহিনী; দ্বিতীয় বা মাঝের কর্ডনটি থাকত আধা-সামরিক বাহিনী দিয়ে; তৃতীয় কর্ডনটি থাকত রাজ্য পুলিশ দিয়ে যারা যোদ্ধা বা অ-যোদ্ধা সব ধরণের নকশালদের নির্মূল করার জন্য অগ্রসর হত। এই অভিযানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ ও পূর্বাঞ্চলীয় সেনা কম্যাণ্ডের তৎকালীন চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জেএফআর জ্যাকব।

বারাসাত এনকাউন্টার — ১৯ নভেম্বর, ১৯৭০

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বিভাগ ‘র’ ও প্রাদেশিক পুলিশ কর্তাদের পরামর্শ মতো নকশালপন্থীদের হত্যার জন্য কতকগুলি খুনি স্কোয়াড গড়া হয়েছে এবং তাদের কিছু সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছে যেমন ‘টনটন ম্যাকাউটে’, ‘পাপাডক’ প্রভৃতি। পশ্চিমবঙ্গের তদানীন্তন পুলিশপ্রধান রঞ্জিত গুপ্ত, গোয়েন্দাপ্রধান দেবী রায়, অফিসার রুনু গুহনিয়োগী ও তারাপদ বসু প্রমুখের নেতৃত্বে চলে এই অভিযান। ১৯৭০ সালের ১৯ নভেম্বর সংঘটিত হয় বারাসাত গণহত্যা। (টাইমস অব ইণ্ডিয়া) কলকাতা ময়দানের এক গোপন সভা পুলিশ ১১ জন তরুণ ও কিশোরকে তুলে নিয়ে যায়। পরে বারাসতের বড়বেড়িয়া অঞ্চলের ধানখেত থেকে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই ১১জনের মধ্যে ৮ জনের নাম জানা গেছে : কানাই ভট্টাচার্য, তরুণ দাস, সমীর মিত্র, স্বপন পাল, সমীরেন্দ্র দত্ত, যতীন দাস, গণেশ ঘটক, শংকর চট্টোপাধ্যায়। বারাসতের ঘটনা উল্লিখিত আছে নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’ উপন্যাসে। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কবিতায় নবারুণ লিখলেন : —

যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়

আমি তাকে ঘৃণা করি —

যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে

আমি তাকে ঘৃণা করি —

যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণি

প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না

আমি তাকে ঘৃণা করি —

আটজন মৃতদেহ

চেতনার পথ জুড়ে শুয়ে আছে

আমি অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যাচ্ছি।

কাশীপুর-বরানগর এনকাউন্টার ১২-১৩ আগস্ট, ১৯৭১

এই হত্যাকাণ্ডে পুলিশের সঙ্গে কংগ্রেসকর্মী বলে পরিচিত মানুষ জনেরাও ছিলেন। ১২ আগস্ট তারিখে কংগ্রেসনেতা নির্মল চট্টোপাধ্যায়কে নকশালরা হত্যা করে কাশীপুর রোড ও রতনবাবু রোডের মোড়ে। ‘নবজীবন ক্লাবে’র সভাপতি নির্মলবাবু যখন কাশীপুর রোড ও রতনবাবু রোডের সংযোগস্থলে, কংগ্রেস নেতা শত ঘোষের ‘নবজীবন সংঘে’র কাছে একটা চায়ের দোকানে চা খাচ্ছিলেন তখন নকশালদের বোমার আঘাতে মারা যান। নির্মলবাবু এই অঞ্চলের জনপ্রিয় নেতা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন নকশালদের বিরুদ্ধে। ১৩ আগস্টের ভোরবেলা রতনবাবু রোড ও চন্দ্রকুমার রায় লেনের মোড় থেকে সশস্ত্র মানুষ নকশালদের খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। এঁদের মধ্যে ছিলেন বাবলু ঘোষ, লকা, পঞ্চম রজক, সমর মুখার্জি, অলোক সাউ, নিমাই দাস প্রভৃতি। এঁদের অনেকের হাতে ছিল পুলিশের রিভলবার। প্রামাণিক ঘাট রোড হয়ে শ্মশানের পাশ দিয়ে তেড়ে আসেন পরেশ সাউ, ভোম্বল দত্ত, শুভেন্দু, দেবু দত্ত, বংশী, নিতাই, হাতকাটা কেলো, ট্যারা, শংকর, গোরা মণ্ডল প্রভৃতি। পুলিশ ও রাজনৈতিক কর্মীদের যৌথ আক্রমণে বা এনকাউন্টারে মারা যান ৩০০ থেকে ৫০০ মানুষ। এঁদের মধ্যে শুধু নকশালরা ছিলেন না, ছিলেন সাধারণ মানুষও। প্রত্যক্ষদর্শী দেবব্রত ঘোষ মৃতদের ১৭ জনের এক অসম্পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করেন, যার মধ্যে ছিল : করুণা সরকার, পাঁচুগোপাল দে, অষ্ট খাঁড়া, সমীর বড়াল, ভবানী বিশ্বাস, অমল বিশ্বাস, তপন সামন্ত, নেপাল চট্টোপাধ্যায়, শ্যামসুন্দর মাইতি, দীপু সরকার, পঞ্চানন রায়, অজিত মারিক, সুবোধ মারিক, কেলো, খোকন, খগেন, সুভাষ চক্রবর্তী।

অন্যান্য

১৯৮০-১৯৯০ সালে কলকাতা ও বন্দর এলাকায় কুখ্যাত গ্যাংস্টারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে গিয়ে এনকাউন্টার করা হয়। সংখ্যায় এগুলি খুব বেশি নয়। মাওবাদী দমনে পশ্চিম মেদিনীপুরের বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় কয়েকটি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটে ২০০৮-২০১১ সালে। ২০১১ সালের ২৪ নভেম্বর ঝাড়গ্রামের বুড়িশোল জঙ্গলে যৌথ বাহিনীর অভিযানে শীর্ষ মাওবাদী নেতা কিষেণজি ( মল্লোজুলা কোটেশ্বর রাও) নিহত হন। সরকারের দাবি ছিল এটা প্রকৃত বন্দুক যুদ্ধ। অন্যদিকে মাওবাদী সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ ছিল এটি পরিকল্পিত বা ফেক এনকাউন্টার।

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে

২০১৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এনকাউন্টারের হিসেব দিয়েছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন:

অন্ধ্র প্রদেশ-১১, অরুণাচল প্রদেশ-১৪, অসম-৭৯, বিহার-২৫, ছত্তিশগড়-২৫৯, গোয়া-০, গুজরাট-২, হরিয়ানা-১৬, হিমাচল প্রদেশ-১, ঝাড়খণ্ড-৫২, কর্নাটক–৬, কেরালা-৯, মধ্যপ্রদেশ-৮, মহারাষ্ট্র-৩৩, মনিপুর-১২, মেঘালয়–১৮, মিজোরাম-০, নাগাল্যাণ্ড-১, ওড়িশা-৪০, পাঞ্জাব-৮, রাজস্থান-১২, সিকিম-১, তামিলনাড়ু-১১, তেলেঙ্গানা-৮, ত্রিপুরা–৩, উত্তরপ্রদেশ-২৫৬, উত্তরাঞ্চল-১, পশ্চিমবঙ্গ-২১। …. দিল্লি-৯, আন্দামান-নিকোবর-১, জম্মু কাশ্মীর–৪৫।

এনকাউন্টারের ক্ষেত্রে উত্তরপ্রদেশের বিশিষ্ট স্থান আছে। মুখ্যমন্ত্রী বুলডোজার ও এনকাউন্টারের জন্য বিখ্যাত। তিনি চালু করেছেন ‘অপারেশন ক্লিন’। অপরাধের জঞ্জাল সব পরিষ্কার করার অভিযান তাঁর। ক্ষমতায় আসার আগেই তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে রাজ্যে ক্রমবর্ধমান অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে; যিনি সফলভাবে এনকাউন্টার পরিচালনা করবেন তাঁকে ১ লক্ষ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। যোগী আদিত্যনাথ ক্ষমতায় আসার ১০ মাসের মধ্যে ১১৪২টি পুলিশি এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে। নিহতদের সংখ্যা গ্রেপ্তার হওয়াদের (২৭৪৪) অর্ধেকের চেয়ে সামান্য কম। মানবাধিকার কর্মীর মতে :

‘উত্তরপ্রদেশ রাজ্য অন্য যে কোন রাজ্যের থেকে আলাদা। এখানে এনকাউন্টারকে অগ্রগতির চিহ্ন হিসেবে দেখানো হচ্ছে। এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হল, তাদের হত্যা করা হচ্ছে যাদের দোষ এখনও প্রমাণিত হয় নি।’

সমাজবাদী পার্টির নেতা রাজেন্দ্র চৌধুরী বলেছেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী যোগী অপরাধীদের সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু উল্টে রাজ্যে অপরাধ বেড়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকার জন্য এটা সরকারের একটা প্রচারণা মাত্র।’

কয়েকজন এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট

বিজয় সালাসকর — মুম্বাই পুলিশের অফিসার। অরুণ গাউলি গ্যাংকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলেন। কর্মজীবনে ৭৫-৮০ জন অপরাধীকে খতম করেন। ২০০৮ সালের নভেম্বরে মুম্বাই জঙ্গি হামলায় সন্ত্রাসবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইতে প্রাণ হারান।

আসলাম মোমিন — মুম্বাই পুলিশের অফিসার। ৩০-৩৫ জন অপরাধীকে এনকাউন্টারে খতম করেন। ডন দাউদ ইব্রাহিমের ভাই ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগে চাকরি থেকে বরখাস্ত হন।

রাজবীর সিং — দিল্লি পুলিশের অফিসার। ২০০১ সালে ভারতীয় সংসদে হামলা ও ২০০০ সালে লাল কেল্লায় হামলার মোকাবিলা করেন। ৫০টিরও বেশি এনকাউন্টার করেছিলেন। সম্পত্তি বিবাদকে কেন্দ্র করে তাঁর এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

প্রদীপ শর্মা — মুম্বাই পুলিশের এনকাউন্টার স্পেসালিস্ট। ১০০টিরও বেশি এনকাউন্টারে অংশ নিয়েছেন।

দয়া নায়ক — মুম্বাই পুলিশের এনকাউন্টার বিশেষজ্ঞ। ৮৩ জন কুখ্যাত গ্যাংস্টারকে হত্যা করেছেন। দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানি ও ছোট রাজনের অনেককে খতম করেন। তাঁর জীবন অবলম্বনে তৈরি হয়েছে ‘আব তক ছপ্পন’ চলচ্চিত্র।

রবীন্দ্র আংরে — মুম্বাই ও থানে অঞ্চলে মাফিয়া চক্রের বিনাশে তাঁর ভূমিকা ছিল। থানের কুখ্যাত গ্যাংস্টার সেরেশ মাঙ্কেওয়ালাকে খতম করেছিলেন। প্রায় ৫৪টি সফল এনকাউন্টার করেন।

অমিতকুমার — উত্তরপ্রদেশের এনকাউন্টার স্পেসালিস্ট। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত গ্যাং, হাইওয়ে লুটেরা ও কন্ট্রাক্ট কিলারদের এনকাউন্টার করেছেন। ১০০টারও বেশি এনকাউন্টার পরিচালনা করেছেন।

প্রফুল্ল ভোসলে — মুম্বাই পুলিশের অফিসার। প্রায় ৮৫ জন অপরাধীকে এনকাউন্টারে খতম করেন তিনি।

দীপক মিশ্র — দিল্লি পুলিশের অফিসার। দিল্লির বড় বড় অপরাধী চক্র ও মাফিয়া ডনদের ধরার জন্য তিনি একের পর এক সফল এনকাউন্টারের ব্লুপ্রিন্ট তৈরি করেন ও অভিযানের নেতৃত্ব দেন।

এছাড়া উল্লেখযোগ্য হলেন উত্তরপ্রদেশের অমিতাভ যশ, অজয় পাল শর্মা, নবনীত সিকারে; রাজস্থানের আনন্দ পাল সিং, এম এন দীনেশ; অন্ধ্রপ্রদেশের ভি এস সজনার, পি এস আর আঞ্জনাল্লু; ঝাড়খণ্ডের আমন সাহু, প্রমোদকুমার সিং প্রভৃতি।

রাজ্যের সাম্প্রতিক এনকাউন্টার : বারুইপুরের সূর্যপুরে

বারো বছরের এক নাবালিকাকে কয়েকজন অপহরণ করে, গণধর্ষণ করে হত্যা করে আর তারপরে চটের বস্তায় পুরে তাকে ফেলে দেয় পুকুরে। এই ঘটনায় পুলিশ প্রভাস মণ্ডল নামে এক ব্যক্তিকে নিয়ে মধ্য রাতে এক জলা জায়গায় ঘটনার পুনর্নিমাণের জন্য যায়। পুলিশের অভিযোগ সেই সময়ে প্রভাস পুলিশের রিভলবার ছিনতাই করে পালাতে যাচ্ছিল, তখন পুলিশ তাকে গুলি করে হত্যা করে।

এই এনকাউন্টারে কিছু মানুষ খুশি হয়েছেন। আবার কিছু মানুষ প্রশ্ন তুলেছেন। প্রসঙ্গত বলা যায় যে এনকাউন্টারের পটভূমিতে ছিল দুটি ঘটনা। এক] বিধানসভার নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের এক এনকাউন্টার স্পেসালিস্ট অজ্য় পাল শর্মার আগমন। দুই] বিধানসভায় ‘গুণ্ডা দমন’ বিল পাশ।

এবার মানবাধিকার কর্মীরা যে প্রশ্ন উথ্থাপন করেছেন সেগুলির দিকে দৃষ্টি দেওয়া যাক :

১] যে কোন অপরাধ পুনর্নগঠনের সময় সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি ভিডিয়োগ্রাফি করে রাখতে হয়। সেটি নথি হিসেবে আদালতে পেশ করতে হয়। এক্ষেত্রে তেমন ভিডিয়োগ্রাফি আছে কি?

২] পুনর্নিমাণের সময়টা ছিল মধ্যরাত্রি এবং অন্ধকার রাত্রি। এই সময়ে ভিডিয়োগ্রাফি কি সম্ভব?

৩] প্রভাস মণ্ডলকে নিয়ে পুলিশ রাত পৌনে একটায় যান, রাত সাড়ে তিনটায় গুলিবিদ্ধ প্রভাসকে থানায় নিয়ে আসেন। মধ্যবর্তী ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট পুলিশ কি করেছেন?

৪] নিয়মানুযায়ী স্থানীয় ২ জন ব্যক্তি কি সাক্ষী হিসেবে ছিলেন? তাঁরা কারা?

৫] কর্ডের ( লেন ইয়ার্ড) সাহায্যে কাঁধের সঙ্গে বাঁধা পুলিশের রিভলবার কি করে ছিনতাই করল?

৬] কর্দমাক্ত জায়গায় মাদকাসক্ত প্রভাস মণ্ডলের পক্ষে কি ছুটে পালানো সম্ভব?

৭] অভিযুক্ত প্রভাসকে হ্যাণ্ডকাফ পরানো হয়েছিল কি ও তার কোমরে দড়ি বাঁধা ছিল কি?

৮] পুলিশের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে তিন রাউণ্ড গুলি চলেছে, অথচ আশ-পাশের কোন মানুষ গুলির শব্দ পেলেন না কেন?

৯] প্রভাস যে প্রকৃত অপরাধী পুলিশ তার কি প্রমাণ পেয়েছেন?


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন