Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ এনকাউন্টার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘ফুলমনির মাঠ’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শুনুন নেতাজি সুভাষ, শুনছেন — : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলতলার ঝগড়ার ‘কলতলা’ ছিল জলের কল আসার অনেক আগেই : অসিত দাস মাড়ির অসুখ থেকে সাবধান সুগার ও প্রেগন্যান্সিরা! হতে পারে ক্যান্সার : ডাঃ পিয়ালী চট্টোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘সাড়ে তিন হাত বারান্দা’ গুণ্ডা দমন, মন উচাটন, আসছে শমন, বাপ রে বাপ : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ‘একা এক নারী’র জয়, পরাজয় এবং… : দিলীপ মজুমদার ভরতমুনির নাটকের ডিম ও ঘোড়ার ডিম : অসিত দাস পাণিহাটির মহোৎসব : স্বামী সারদানন্দ শিবশঙ্করের জীবনানন্দ দর্শন : জ্যোতি বন্দ্যোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ব্যক্তিস্বাধীনতা পগার পার, বললেন বিচারক জামদার : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মঙ্গল কাব্যে কারিগরি পণ্য এবং হাতিয়ার : ড. ললিতা ঘোষ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ শতবার্ষিকী মুক্তি পত্রিকা ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলন : ড. দয়াময় রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নন্দিনী অধিকারী-র ছোটগল্প ‘রাত পাহারা’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বই পড়া : প্রসেনজিৎ দাস অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘নীলমণির প্রত্যাবর্তন’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ স্যাটা গরম করে দেওয়া, স্যাটা ভেঙে দেওয়ার গোড়ার কথা : অসিত দাস
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৬০ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ১৩ জুলাই, ২০২৬

অনুবাদকের বিস্তৃত ভূমিকা

ফিফথ রিপোর্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: দক্ষিণ এশিয়ায় বিস্তৃত লুঠ স্থাপত্য

ফিফথ রিপোটের ধাক্কা — ১৮১৩-র পার্লামেন্ট ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্য অধিকারের রুটিন সনদ পাসের বদলে দক্ষিণ এশিয়ার বাজার কোম্পানির থেকে কেড়ে নতুন আউটপোর্ট কর্পোরেটদের হাতে তুলে দেওয়ার প্রবল ধাক্কা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পক্ষে কোম্পানিকে শুধুই দক্ষিণ এশিয়ার প্রশাসনিক কাজ চালানোর দায়িত্ব দেওয়া এই অঞ্চলের ইতিহাসে যুগান্তকারী মোড়। এর ফলে শুধু ব্রিটিশ সাম্রাজ্য আর শাসনের কাঠামোই বদল হয়নি, একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি সমাজব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে, ইওরোপিয়দের বশবর্তী হয়েছে — এবং এই ধাক্কার রেশ চলছে আজও। এই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের চারটে প্রধান মাত্রা আমরা চিহ্নিত করেছি —

রাজস্ব আর বাজার লুঠের স্থায়িত্ব: চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আর কারিগর-কৃষক-দারিদ্র্য

১৭৯৩ সালে ফিলিপ ফ্রান্সিসের ড্রাফট করে যাওয়া নথিকে লর্ড কর্নওয়ালিস চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে Permanent Settlement পরিণত করবেন। এই কাঠামো শুধু ভারতের ইতিহাসেই নয়, বিশ্বের বুকেও দীর্ঘতম স্থায়ী কৃষি প্রকল্পগুলোর অন্যতম। ১৯৫০-এ উত্তর প্রদেশে জমিদারি রদ আইনের সঙ্গে ১৯৫৫-য় পশ্চিমবঙ্গে ভূমিসংস্কার আইন, পশ্চিমবঙ্গ অ-কৃষি জমি প্রজা আইন আসা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা ১৬৩ বছর ধরে চালু ছিল। পৃথিবীর অন্য কোনো ভূমি ব্যবস্থা এত দীর্ঘকাল চালু ছিল না। বিশ্বের অন্য অঞ্চলে ভূমি সংস্কার অনেক আগেই সম্পন্ন হয়েছিল — ব্রিটেনে ১৯৩৬এর আগে খাজনা সংস্কার, জাপানে ১৯৪৬-৪৭ সালে ভূমি সংস্কার, দক্ষিণ কোরিয়া-তাইওয়ানে ১৯৪০-৫০-এর দশকে সংস্কার হয়, এবং লাতিন আমেরিকায় ১৯৬০-এর দশক থেকে সংস্কার শুরু হয়। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এতটা দীর্ঘস্থায়ীতা ইতিহাসে বিরল ঘটনা।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দীর্ঘস্থায়িত্ব শুধু সময়ের দীর্ঘতার দিক থেকে নয়, বরং ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক প্রভাবেও প্রবল তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। এই কাঠামো উপনিবেশিক ভারতের কৃষি সমাজকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে এবং স্বাধীনতার পরেও তার প্রভাব বিন্দুমাত্রও কমেনি। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ আর বিশ্লেষণ, শোষণ আর লুঠের দীর্ঘ ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা চিহ্নিত করা দীর্ঘস্থায়ী কৃষি প্রকল্পের অক্ষহৃদয় উন্মোচনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।

যাই হোক, আমরা মনে করছি, ফিফথ রিপোর্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত নির্মাণের ফলে প্রকৃষ্টিভাবে রাজস্ব লুঠ কাঠামো সুসংহত আর পারপিচুয়াল করা। এই রিপোর্ট চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে ‘সফল সংস্কার’ আখ্যা দিয়েছে কেন বুঝতে মহকাশ বিজ্ঞানী হতে হয় না। প্রকল্পের ফল কৃষকের ওপর জমিদারি অত্যাচার বহুগুণ বৃদ্ধি আর ইউরোপের সমৃদ্ধি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদের স্থায়ী জমির মালিক করল; জমিদারদের প্রজা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা প্রায় সীমাহীন হল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তপূর্ব সময়ে কৃষকের স্থানীয় বা কেন্দ্রিয় ক্ষমতার সঙ্গে দরকষাকষির ক্ষমতা সুযোগ ধাপে ধাপে কেড়ে নিয়ে তাকে কার্যত ইওরোপিয় কৃষকদের মত জমিদারের দাসে পরিণত করা হল। জমিদার ইচ্ছামতো খাজনা বাড়ায়, প্রজার জমি দখল করে, তাদের ওপর নানা ধরনের অবৈধ কর আরোপ করে – যে সুযোগ মুঘল কৃষি বন্দোবস্তে ছিল না। অভদ্রবিত্তের ওপর সব ধরণের অত্যাচার চাপানোর অধিকার ক্রুসেডের পরম্পরা ধারণ করা কোম্পানি সাম্রাজ্য বাঙালি কোলাবরেটর ভদ্রবিত্তের হাতে তুলে দিল।

ফিফথ রিপোর্টের ‘সাফল্য’ আদতে বাংলার কৃষকের ঋণগ্রস্ততা ও দারিদ্র্যের ভয়াবহ চলচ্চিত্র। জমিদারি নিলামে বিক্রি হওয়ার ভয়ে জমিদাররা প্রজাদের ওপর লুঠেরা খাজনা, আবওয়াব কাঠামো চাপিয়ে ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে ফেলতে থাকে। মহাজন-জমিদারের সম্মিলিত শোষণের ধাক্কায় কৃষক হয় আসামী হয়ে জেল খাটল না হয় চির ঋণগ্রস্ত হয়ে জমিদারের বাঁধা মজদুরে পরিণত হল। ১৮৭১-৭৮-র পরিসংখ্যানে দেখি ভূমি-মামলা আর কৃষক উচ্ছেদের সংখ্যার সঙ্গে ব্যাপক বেড়েছে ভূমিহীন প্রজা আর কৃষি শ্রমিক।

১৮১৩-এর সনদ আইনের বড় ব্যাপার ছিল ভারতবর্ষীয় বাজার ব্রিটিশ শিল্পপতিদের পাতে পরিবেশন করা — যা আমরা এর আগে কিছুটা আলোচনা করেছি। এই একতরফা সিদ্ধান্ত দেশীয় তাঁতি আর কারিগরদের জন্য ছিল চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়। ম্যানচেস্টারের সুতিবস্ত্র, বার্মিংহামের লোহার সামগ্রী — সবই ভারতের বাজারে অবাধে প্রায় বিনাশুল্কে ঢুকল, অন্যদিকে, ভারতীয় পণ্য আমদানিতে বিপুল শুল্ক আরোপ করে তাকে প্রতিযোগিতা থেকে বাইরে বের করে দেওয়া হল।

ফল হল নৃশংস। ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’ বিশিল্পায়ন প্রক্রিয়া, স্বেন বেকার্টের ভাষায় একের পর এক তাঁতি ও কারিগরের কারখানায় তালা পড়ল চিরতরে। ঢাকার বিশ্ববিখ্যাত মসলিন শিল্প ধ্বংস হল; এ দেশ ব্রিটিশ কর্পোরেটের কাঁচামালের উৎসে পরিণত হল — তুলা, পাট, আফিম ইংল্যান্ডে রপ্তানি হতো, আর সেখান থেকে তৈরি পণ্য ভারতের বাজারে ডাম্প করা হল। এই প্রক্রিয়া শতাব্দীর পর শতাব্দী ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক কাঠামোকে বিকৃত করেছে, দক্ষিণ এশিয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব আজও স্পষ্ট।

ফিফথ রিপোর্টে কোম্পানির ‘স্ব-শাসনের’ অবসান ঘটল রাষ্ট্রীয় শাসনের সূচনা করে। নতুন পর্ব ছিল আরও সংগঠিত, পদ্ধতিগত লুঠেরা আমল। সবই এখন ব্রিটিশ রাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে। রাজস্ব আদায় আরও পদ্ধতিগত হয়, আইন আরও শক্তিশালী হয়, আর লুঠ আরও ‘আইনি’ চেহারা পায়।

ফিফথ রিপোর্টে ‘স্বাধীনতা’র মায়া আর উপনিবেশ-পরবর্তী লুঠের ভাষ্য

ফিফথ রিপোর্ট আর ১৮১৩-র আইনি সংস্কার আর উন্নয়নের ভাষা লুঠ প্রক্রিয়ায় জর্জর টেনে দেওয়ার কাজ করল। এই ভাষ্যই ছিল উপনিবেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রের ‘উন্নয়ন’ নীতির ভিত্তি এবং আজও সেই লুঠেরা ভাষ্য উন্নয়ন নাম নিয়ে নতুন রূপে টিকে আছে। জাতিরাষ্ট্রে ‘উন্নয়ন’ লুঠের নতুন নাম হল ঋণ, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর। এ সবই উপনিবেশিক শোষণের নতুন রূপ। স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের ভূমি সংস্কার, উদারীকরণ নীতি, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার চুক্তি — সবই ফিফথ রিপোর্টের পুরোনো কাঠামোরই আধুনিক সংস্করণ। ‘স্বাধীনতা’ এসেছে, কিন্তু শোষণ আর লুঠ কাঠামো থেকে মুক্তি আসেনি; শুধু রূপই বদলিয়েছে। ফিফথ রিপোর্টের সেই সংস্কার-’উন্নয়নের ভাষ্যই এখন জাতি-রাষ্ট্র আর বহুজাতিক কর্পোরেট লুঠের বৈধতা।

ফিফথ রিপোর্টের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক-সাংস্কৃতিকও বটে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে নতুন কোলাবরেটর জমিদারি ভদ্রবিত্ত শ্রেণির উত্থানে সামাজিক বৈষম্য চিরস্থায়ী হল। ব্রিটিশ শিল্পপণ্যের আগমনে কারিগর উৎপাদন কাঠামো ধ্বংস হল; বহু পেশা বিলুপ্ত হল। রাষ্ট্রীয় শাসনে আইনি আর প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করে লুঠ আরও সুসংহত হল। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের শিকার হলেন কৃষক, কারিগর, হকার, দিনমজুর — যাঁদের শ্রমের উদ্বৃত্তে গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি আর ইওরোপের সমৃদ্ধ, এবং যাঁদের বঞ্চনার ওপর ভিত্তি করে আজও দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতি, সমাজ গড়ে উঠছে। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ তাই সেই দীর্ঘমেয়াদি লুঠ-কাঠামো উন্মোচনের অস্ত্র, যা উপনিবেশ-পরবর্তী শোষণের নতুন রূপ চিহ্নিত করায়।

ফিফথ রিপোর্ট — লুঠ আর নিয়ন্ত্রণের ‘মাস্টারপিস’

ফিফথ রিপোর্ট তাই বিশ্বলুঠইতিহাসের অন্যতম ‘মাস্টারপিস’ — একইসঙ্গে কোম্পানির পক্ষে আর বিপক্ষের সমীক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের দলিল। এই সমীক্ষা কোম্পানির প্রশাসনিক সাফল্যের গল্প ব’লে তার বাণিজ্যিক স্বায়ত্তশাসন শেষ করে, এবং রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের ‘বৈজ্ঞানিক’ ভিত্তি তৈরি করে। ফিফথ রিপোর্টের এই ‘দ্বৈত’ চরিত্রই একে এত তাৎপর্যপূর্ণ আর কৌশলী করে তুলেছে। পঞ্চম সমীক্ষা প্রমাণ, উপনিবেশিক শাসন কেবল বলপ্রয়োগেই হয় নি, বরং অনেক বড়ভাবে তথ্য, আইন আর ‘বৈজ্ঞানিক’ বিশ্লেষণ প্রয়োগেও হয়েছে, এবং এই প্রক্রিয়া লুঠকে আরও সুসংহত আর দীর্ঘস্থায়ী করেছে। ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ আর বিশ্লেষণ এই ‘মাস্টারপিসের’ অক্ষহৃদয় খুলে ধরার জরুরি অস্ত্র। এই অনুবাদ সেই লুঠ-কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধারাবাহিকতা, যার ভিত্তি নির্মাণ হয়েছে ফিফথ রিপোর্ট আর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে।

১৭৬৫-র দেওয়ানি আর তার পরিণতি — ১৭৬৫-এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার দেওয়ানি কাঠামোয় ঢুকে শুধু রাজস্ব আদায়ের অধিকারই পায়নি, লুঠ করার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দখল নিয়ে কৃষক, কারিগরদের উৎপাদিত পণ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। দেওয়ানি লাভের পর কোম্পানির প্রাথমিক উদ্দেশ্য হল রাজস্ব আয় সর্বোচ্চ করা। কারিগর-কৃষকদের খাজনা বাড়ল, পণ্যের দাম কমল। ফলে তারা উৎপাদিত দ্রব্যের ন্যায্য মূল্য পেল না। বাড়তি খাজনা আদায়ে কোম্পানির কর্মচারীরা কারিগর-কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার নামিয়ে আনে। উৎপাদিত পণ্যের দাম কম থাকায় কৃষকরা দেনা পরিশোধে ব্যর্থ হয় এবং ঋণের ফাঁদে পড়তে শুরু করে। কোম্পানি ১৭৬৫-র পর যেহেতু কৃষক-কারিগরের দেওয়া খাজনায় তাদেরই পণ্য কিনল অনেক কম দামে, ফলে বাংলার অর্থনীতি থেকে ক্রমাগত উদ্বৃত্ত অদৃশ্য হল, তাঁতিরা কার্যত ক্রীতদাসে পরিণত হল। কোম্পানি বাণিজ্যিক স্বার্থে চাষী-কারিগর-তাঁতিকে অনেকটাই কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য করত; বোল্টস বলছেন তারা নিজেদের বুড়ো আঙুল কেটে গ্রাম ছেড়ে পালাল। ১৭৫৮ থেকে ১৭৬৩-র মধ্যে ঢাকার মসলিন তাঁতির এক-তৃতীয়াংশ আড়ং ছেড়ে পালিয়ে যায়। তাঁতিদের ওপর অত্যাচার এতটাই বেড়ে যায় যে তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করে। তাঁতিরা সন্ন্যাসী-ফকির লড়াইতে যোগ দেয় অথবা নিজেদের সংগঠিত করে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলন গড়ে তোলে।

১৭৭০-এর মহাগণহত্যা — ১৭৬৯-৭০-এর দুর্ভিক্ষ ছিল বাংলার ইতিহাসের কালো অধ্যায়। খরায় ফসল উৎপাদন কম হলেও ছিয়াত্তরের মন্বন্তর আদতে ইওরোপিয়দের চাপিয়ে দেওয়া পরিকল্পিত গণহত্যাই। ১৭৭০-এর এপ্রিলে, দুর্ভিক্ষ চরমে উঠলে কোম্পানি ১০% খাজনা বাড়ায়। ধান উৎপাদন কমলেও রাজস্বের চাপ কমে নি। কোম্পানির কর্মচারী আর গোমস্তারা খাদ্যশস্য মজুত করে দুর্ভিক্ষকে গণহত্যায় পরিণত করে। লাভের লোভে উদ্বৃত্ত শস্য রপ্তানি হলে দাম আকাশছোঁয়া হয়। জনসংখ্যার দশমাংশও ত্রাণ পায় নি। কোম্পানি কর্পোরেট স্বার্থে লাভের দিকে নজর দিল, প্রজার দুর্দশা উপেক্ষা করল। এই গণহত্যায় আনুমানিক ১০ থেকে ১২ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় — বাংলার জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। ভূমিহীন কৃষক ও কারিগর বহুগুণ বেড়ে যায়। যারা বেঁচে যায়, ডাকাতি ও লুণ্ঠনের পথ বেছে নেয়। এই বিশাল জনগোষ্ঠীই পরে সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের মূল শক্তি হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর জনশূন্য মাঠ-হাট-গ্রাম-গঞ্জ-বাজার-আড়ং বাংলার বিশিল্পায়নকে চূড়ান্ত পরিণতি দেয়।

পত্তনি প্রথা আর মধ্যসত্ত্বভোগীদের উত্থান — চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আরেকটা কুফল পত্তনি বা পাটনি প্রথা Patni System এবং মধ্যসত্ত্বভোগীদের উত্থান। জমিদারি নিলামে বিক্রি হলে নতুন এবসেন্টি জমিদারেরা এস্টেট দেখাশোনা না করে পত্তনি বা ইজারা দিল। কৃষক আর জমির মধ্যে জমিদার, তালুকদার, পত্তনিদার, দারপত্তনিদার, সেপত্তনিদারের মত বিপুল পরিমান মধ্যসত্ত্বভোগী তৈরি লয় — বিনয় ঘোষ ‘বাংলার নবজাগৃতি’-তে বলছেন, ‘জমিদাররা প্রজাদের উচ্ছেদ করা ও খাজনা বৃদ্ধি করার পূর্ণ অধিকার পেলেন। জমির ব্যক্তিগত মালিকানাপ্রথা প্রবর্তনের ফলে জমিদাররা বহু খুদে মালিক সৃষ্টি করলেন। পত্তনিদার দরপত্তনিদার গাঁতিদার প্রভৃতি মধ্যস্বত্বভোগীদের সংখ্যা বেড়ে গেল। সাইমন কমিশনের রিপোর্টে দেখা যায়, এক — একটি জেলায় ৫০ জন পর্যন্ত মধ্যস্বত্বভোগীর সৃষ্টি হল। জমিদাররা ধীরে ধীরে দায়িত্বজ্ঞানহীন অলস বিলাসী অত্যাচারী ব্যভিচারী রাজস্বভোগী ধনসঞ্চয়ী মালিকশ্রেণিতে পরিণত হলেন। ইংরেজের শাসন ও শোষণপ্রথার প্রধান স্তম্ভ হলেন এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তোত্তর জমিদারশ্রেণি’। এই ব্যবস্থা কৃষককে তার শ্রমের ন্যায্য ফসলের ভাগ থেকে বঞ্চিত করল।

প্রতিরোধের আগুন জ্বলালেন কৃষক, কারিগর

ফিফথ রিপোর্টে কৃষক, কারিগর ও হকারদের ওপর প্রভাব ছিল চরম লুঠেরা। ১৭৬৫ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাংলার দেওয়ানির অধিকারে লুঠ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো পায়, কৃষক-কারিগরদের উৎপাদিত পণ্যে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। কোম্পানির কর্মচারীরা কৃষকদের ওপর অত্যাচার চালাত, তাঁতিদের কার্যত ক্রীতদাসে পরিণত করল এবং ঢাকার বিশ্ববিখ্যাত মসলিন তাঁতিদের এক-তৃতীয়াংশ গ্রাম ছেড়ে পালাল। এই লুঠ-কাঠামো ১৭৭০ সালের মহাগণহত্যায় আরও ভয়াবহ রূপ নিল কোম্পানির বিপুল খাজনা বাড়ানোয়, খাদ্যশস্য মজুতে। দুর্ভিক্ষ গণহত্যায় পরিণত হলে বিপুল পরিমান বিশিল্পায়ন হল, কৃষক কারিগর উচ্ছেদ হল ভূমিহীন কৃষক আর আড়ং-কারখানাহীন কারিগর সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহের মূল শক্তি হল।

আবারও বলি এই লুঠের বিরুদ্ধে কৃষক, কারিগর বারবার বিদ্রোহ করেছে। ১৭৬০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে ১৮০০ সালের দিকে শেষ হওয়া সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ ছিল বাংলার কৃষক, কারিগরদের প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মজনু শাহ, মুসা শাহ, চেরাগ আলি, ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী-র মতো নেতারা সাধারণজনকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে উদ্বুদ্ধ করলেন। মেদিনীপুরের লাঠিয়ালদের [চুয়াড়] বিদ্রোহ, উত্তরবঙ্গের রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা বিদ্রোহ — এই সবই প্রমাণ করে যে জনগণ কখনো নীরব ভুক্তভোগী ছিল না; তারা ছিল প্রতিরোধের যোদ্ধা। তাঁতিরাও ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া, শোষণ আর লুঠের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, বোস্তম দাস, দুনিরাম পাল, নয়ন নন্দী ও বিজয়রাম-এর মতো তাঁতি নেতারা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করেন। সন্ন্যাসী ও ফকির বিদ্রোহ (১৭৬০-১৮০০) ১৭৬০-এর দশক থেকে শুরু হয়ে ১৮০০ -এর দিকে শেষ হয়। এই বিদ্রোহ বাংলার কৃষক, কারিগর ও হকারদের প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। সন্ন্যাসী-ফকিররা সাধারণ মানুষকে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে শেখায়; কোম্পানির গুদাম, জমিদারের কাছারি, মহাজনের ভাণ্ডার লক্ষ্য করে আক্রমণ চালাত। এই বিদ্রোহের সময় মজনু শাহ, মুসা শাহ, চেরাগ আলি, ভবানী পাঠক ও দেবী চৌধুরানী-র মতো নেতারা আবির্ভূত হন। লাঠিয়ালদের [চুয়াড়] বিদ্রোহ (১৭৬৬-১৮০০)- মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে লাঠিয়াল বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৭৭০ সালে এই বিদ্রোহ আরও তীব্র হয় এবং ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত চলে। জঙ্গলমহলের আদিবাসী ও কৃষকরা ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ, ধিং (১৭৮৩)- উত্তরবঙ্গের রংপুরে কৃষকদের সংগঠিত বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এটি ছিল ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত কৃষক আন্দোলনের একটি। তাঁতিদের প্রতিরোধ- ঢাকা, হুগলি, শান্তিপুর ও অন্যান্য অঞ্চলের তাঁতিরা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের একচেটিয়া ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। বোস্তম দাস, দুনিরাম পাল, নয়ন নন্দী ও বিজয়রাম-এর মতো তাঁতি নেতারা ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসহযোগিতা শুরু করেন। কেউ কেউ সন্ন্যাসী বিদ্রোহে যোগ দেয় অথবা নিজেদের সংগঠিত করে ব্রিটিশ ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। চাকমা বিদ্রোহ (১৭৭৬-১৭৮৭)- পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা জনগণ কোম্পানির লুঠমূলক কর নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। এই বিদ্রোহ দেখায় যে কোম্পানির লুঠ শুধু সমতলের কৃষক ও কারিগরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, পার্বত্য জনগোষ্ঠীও এর শিকার হয়েছিল।

ফিফথ রিপোর্টের প্রথম এবং দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদ ও বিশ্লেষণ সেই প্রতিরোধের ইতিহাস পুনরুদ্ধারের কাজ। এই কাঠামো বিশ্লেষণ আদতে উপনিবেশ-পরবর্তী লুঠ-কাঠামোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রেরণা। এই অনুবাদ শুধু ঐতিহাসিক দলিলের ভাষান্তর নয়; শোষিতের পক্ষে ভাষ্য, নীরব কণ্ঠস্বরকে ফিরিয়ে আনার সংগ্রাম, এবং সেই লুঠ-কাঠামোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা। ফিফথ রিপোর্টের কৃষক-কারিগর-হকারদের ওপর প্রভাব ছিল চরম লুঠমূলক, কিন্তু তাদের প্রতিরোধ ছিল অদম্য। এই প্রতিরোধের ইতিহাসই আজও আমাদের সংগ্রামের পথ দেখায় — উপনিবেশের লুঠ-কাঠামো যতই সুসংহত হোক না কেন, প্রতিরোধের আগুন কখনো নির্বাপিত হয় না। উপনিবেশের পতন হোক, আর সেই পতনের মধ্য দিয়ে উঠে আসুক কারিগর ও কৃষকদের কর্পোরেট-নিরপেক্ষ উৎপাদন ব্যবস্থার নতুন ভোর।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন