বাংলার জমিদারি ঐতিহ্যকে উপলব্ধি করার জন্য এখন আর সিনেমা ও কল্পনাকে ভরসা করার কোনও দরকার নেই। হাত বাড়ালেই কলকাতার আশেপাশে এইরকম অনের জমিদার বাড়ি রয়েছে যেখানে দু-দন্ড শান্তির হাতছানি লুকিয়ে রয়েছে। বনেদি প্রাসাদের অন্দরে জমিদারি মেজাজে রাত কাটানোর সুযোগ। ফিরে যেতে পারেন বাংলার বাবুবিলাসের যুগে। তবে হ্যাঁ সেই জমিদারি নেই, নেই সেই জৌলুশ, তবে ছিটে ফোঁটা যেটুকু রয়েছে তাতেই টের পাওয়া যাবে সেই সময়ের স্মৃতি। নেই জমিদারবাবুর গড়গড়ার আওয়াজ, অন্দরমহলে গৃহিনীদের পায়েলর রুনুঝুনু, শোনা যাবে না, বিচারের আশায় সদরে আসা প্রজার ভীতু চাউনি, নাচমহলে তবলার বোল, তবু সেই পুরনো ইতিহাসের আবহে কেটে যাবে চমত্কার সময়।
দশ বছর ধরে একসাথে কাটানো, রাগ-অভিমান, সুখ- দুঃখ, আনন্দ-অনুরাগে কেটে গেল অনেকটা সময়। এক মেয়ের বাবা-মা হয়ে উঠলাম দুজন। তো সেই দশম বিবাহবার্ষিকীতে গয়না-গাটি, বাহ্যিক অন্য সম্পদের চেয়ে ঘুরতে যাওয়ায় আসক্তি অনেক বেশি হওয়ায় উপহার হিসেবে মেয়ের বাবার কাছে ওর মা একটা দিন ঘুরতে যাওয়ার দাবি রেখেছিল। মেয়ের পরীক্ষা থাকায় একবেলা ভ্রমণেই মনের ইচ্ছে কিছুটা মিটিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হলো।

কোলকাতার কাছে বাওয়ালী রাজবাড়ীতে ‘ডে আউটিং’-এর খোঁজ মিললো। অনলাইন-এ খোঁজখবর নিয়ে সময় মত অগ্রিম বুকিং করে ফেলা হল। আমরা সকালে ১১টা নাগাদ আমাদের বারাসাতের বাড়ি থেকে রওনা দিয়ে ১.৩০টা নাগাদ পৌঁছালাম রাজবাড়ীর দরবারে। শঙ্খ, কুলো-সহ বরণ করে আমাদের স্বাগতম করা হলো। তার সাথে কিন্তু ‘থার্মাল গান’-এ উষ্ণতা মাপা এবং স্যানিটাইজ প্রদানও হলো। এরপর ঠান্ডা শীতল পানীয় খেয়ে শরীর জুড়ে প্রশান্তি এলো। এবার অভ্যর্থনা কক্ষ থেকে জানানো হলো যে আমরা রাজবাড়ীর সর্বত্র ঘুরে দেখতে পারি, শুধুমাত্র দোতলা এবং ছাদের দিক ছাড়া। কারণ ওখানে যারা ঘরে রাত্রিযাপন করবেন, তাদের প্রইভেসি বজায় রাখার জন্য, এই নিষেধাজ্ঞা।

ঘুরতে ঘুরতে ইতিহাস ছুঁতে চাইলাম বেশ মনে পড়ে বজবজ দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক সমৃদ্ধ জনপদ। সমরেশ বসু কালকূট ছদ্মনামে নামে লিখেছিলেন মুক্ত বেনীর উজানে। তাঁর কথায় যুক্ত বেনী সঙ্গম এলাহাবাদে আর মুক্ত বেনী ত্রিবেনীতে। সে অনেক কথা। তবে বাংলার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে ইতিহাস। সেই ইতিহাস চর্চায় অনেকেই যান না। জানেন না, যে জায়গায়টায় ঘুরতে গেছি তার পেছনে ইতিহাসের কি হাতছানি আছে। এক সময়ে গঙ্গা-ভাগীরথী নদী ব্যান্ডেলের কাছে ত্রিবেণীতে ৩টি শাখায় ভাগ হয়ে যেত। দক্ষিণ পশ্চিম দিকে সপ্তগ্রামের পাশ দিয়ে বজবজ, ফলতা, ডায়মন্ডহারবার হয়ে সমুদ্রে মিশত সরস্বতী নদী। যমুনা নদী বয়ে যেত দক্ষিণ-পূর্ব দিয়ে। এই যমুনা অবশ্য উত্তর ভারত এবং বাংলাদেশের যমুনার থেকে আলাদা। সরস্বতী আর যমুনার মাঝখানে বয়ে যেত হুগলি নদী। এই হুগলি নদীর আদি খাতটিকে বলা হত আদিগঙ্গা। বজবজ এক সময়ে ছিল সুন্দরবনের অংশ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মৃতি বিজড়িত খুকি মার মন্দির, ১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দের স্মৃতিবাহক পুরোনো বজবজ স্টেশন তুলে ধরে বজবজের ঐতিহাসিক মাহাত্ম্যকে।

অভিধান অনুযায়ী, বাওয়ালি শব্দের অর্থ যিনি বাঘ বশ করার মন্ত্র জানেন। অথবা সুন্দরবন থেকে কাঠ, মধু সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। নাম ‘বাওয়ালি’ হলেও শব্দটির তাৎপর্য খুব গভীর। এখানকার অধিবাসীদের বলা হত বাওল সম্প্রদায়। বন-জঙ্গলের ওপরই ছিল তাঁদের জীবন নির্ভরশীল। মাছ ধরা, মধু সংগ্রহ করা ছিল তাঁদের প্রধান জীবিকা। বাঘের দেবতা দক্ষিণ রায়, বনের দেবী বনবিবির পুজো করতেন তাঁরা। চারশ বছর আগের কথা, তখন মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্ব। তাঁর প্রধান সেনাপতি ছিলেন দোর্দণ্ডপ্রতাপ মান সিংহ। মান সিংহের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন সেনা আধিকারিক বাসুদেব রাম রাই, যাঁর আদিনিবাস উত্তরপ্রদেশ এলাকা। সফলভাবে কৃষক বিদ্রোহ এবং দস্যুবৃত্তি দমন করার জন্য তাঁকে মুঘল প্রশাসন থেকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সুদূর বাংলায় ৩ লক্ষ একর জমি এবং ‘মণ্ডল’ উপাধি। এইভাবেই বাওয়ালিতে মণ্ডল বংশের জমিদারি শুরু হল। মোটামুটি ২৫০ বছর আগে গড়ে উঠেছিল বাওয়ালি রাজবাড়ি। বিশালতাই সেই প্রাসাদের মূল আকর্ষণ। ঢোকার মুখে বড়ো সিঁড়ি, জমকালো থাম, প্রশস্ত উঠোন, বারান্দা যে কোনো মানুষের মনকে নিয়ে যাবে অন্য এক রূপকথার যুগে। সেই প্রাসাদ এখন হেরিটেজ রিসর্ট।

রাজবাড়ির সামনেই মুক্ত মঞ্চ, আর সিঁড়ির ধাপে দেওয়ানী দালান। শীতকালীন ফুলের শোভাতে চারপাশ আরো সুন্দর। ছবি তোলার আদর্শ জায়গা, প্রতিটি প্রান্ত সাজানো গোছানো। ঐ দালান পেরিয়ে দু-ধারে সুন্দর সুন্দর থাকার ঘর। তারপরই আছে রাজহাঁস ভেসে বেড়ানো পুকুরঘাট। রঙিন ফুলের পসরা ঘেরা রাস্তা ধরে হেঁটে পৌঁছালাম খোলামেলা খাওয়ার জায়গায়। খেতে বসে সামনের ঝিলে কৃত্রিম ঝর্ণার দৃশ্য আরো প্রাণোচ্ছল করেছে ওই জায়গাকে। তারপর আমাদের নির্দিষ্ট খাবারের সামগ্রী এলো। এত অপরূপ করে সাজানো, মাটির বাসনে পরিবেশিত খাদ্য দ্রব্যের স্বাদ এখনও মুখে লেগে। তিতিরের জন্যও বাচ্চাদের থালির ব্যবস্থা ছিল। খাদ্য তালিকাটি এমন— সাদা ভাত, শাক, আলুভাজা, বেগুন ভাজা, আলু পোস্ত, স্যালাড, শুক্তো, মুগডাল, চিংড়ির তরকারি, ভেটকি পাতুরি, লুচি, খাসির মাংস, চাটনী, পাঁপড় আর সবশেষে দই, গরম নলেনগুড়ের রসগোল্লা, কাঁচাগোল্লা। এখনও এই লিখতে গিয়ে জিভে জল এলো, ঐ খাবারের কথা মনে করে! শেষে পান, মুখশুদ্ধি।

পেট পুরে খেয়ে এবার রাজবাড়ী ঘুরে দেখার পালা। সুইমিং পুলের মত অত্যাধুনিক ব্যবস্থাপনাও আছে ওখানে, তেমনই পুরনো জিনিস দিয়ে সাজানো লাইব্রেরিও আছে। খেলার জন্য টিটি বোর্ড থেকে আরো বিভিন্ন সরঞ্জামের ব্যবস্থা আছে। সুইমিং পুল, পুকুর পাড়, দালান চত্বরে বসে, ছবি তুলেই বিকেল কাটলো। জেলখানা নামে এক সুন্দর বিশ্রামের জায়গাও আছে। এই জমিদার পরিবার ছিল কৃষ্ণের উপাসক, বাওয়ালিতে তাঁরা স্থাপনা করেছিলেন বেশ কয়েকটি মন্দির। সম্ভবত ১৭৭২ সালে গড়ে ওঠে শ্রী শ্রী রাধাকান্ত জিউর মন্দির। শ্রী শ্রী গোপীনাথ মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৯৯ সালে। এছাড়াও আছে, নবরত্ন মন্দির, দ্বাদশ শিবমন্দির— প্রত্যেকটি মন্দিরেই প্রাচীনতার ছাপ রয়েছে।
সব ঘুরে ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যার চা পর্ব সংক্ষিপ্ত করে সেরে আমরা বাড়ি ফিরে এসেছিলাম। তবে ওখানের আতিথ্যতা, ব্যবস্থাপনা সত্যিই মুগ্ধ করে। বাইরেই ২-৩ জায়গায় শৌচালয়, সে জায়গার পরিচ্ছন্নতা যে কোন জায়গাকে হার মানাবে। প্রতিটি পদক্ষেপে ওখানের কর্মীরা থাকেন সাথে, যেকোন দরকারে খুব সাহায্য করেন।

ঝিন্দের বন্দী, প্রেম রতন ধন পায়ো, ছবিগুলোর মধ্যে কোথায় মিল বলুন তো? স্রেফ কাহিনিরেখায় নয়! আসলে তো দুটো ছবিই একটা নির্দিষ্ট ইচ্ছে পূরণের গল্প। হঠাৎ একদিন রাজা সাজা, রাজার হালে দিন কাটাবার ইচ্ছে পূরণের গল্প। এরকম ইচ্ছে কি আমাদের সবারই মনের মধ্যে কোথাও একটা লুকিয়ে থাকে না? পুরনো রাজপ্রাসাদ দেখলে কি তার একটা ঘরে অন্তত একটা রাতও থেকে যেতে ইচ্ছে করে না? তাহলে একদিনের জন্য চলে আসুন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বজবজ ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে সেই বাওয়ালি রাজবাড়িতে।

আমাদের ড্রাইভারসহ তিনজনের একবেলায় খরচ পড়েছে ৬০০০ টাকা মত। জন প্রতি ১৫০০ টাকা নন ভেজ থালি, বাচ্চাদের আলাদা চার্জ। এছাড়া কেউ যদি রাত্রিবাস করতে চান তার জন্যও আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে তার জন্য অবশ্য খরচ আলাদা। ওখানে রাত্রিবাসের জন্য প্রতি রুমের ট্যারিফ প্রায় ৯০০০ থেকে শুরু। বাওয়ালী রাজবাড়ী নামে সার্চ করলেই ওদের নিজস্ব সাইটে যাবতীয় তথ্য পাওয়া যাবে।

মেয়ের হাত ধরে এমন সুন্দর দিনটা কাটলো আমাদের, আরো কয়েক দশক এমন করেই ভ্রমণকে ভালোবেসে আমাদের দাম্পত্যকে জীবন্ত প্রাণবন্ত রাখতে চাই।