১২১. তৃতীয়ত, কোম্পানিকে হস্তান্তরের সময় নির্ধারিত রাজস্বের তুলনায় ‘সিডেড ল্যান্ডস’ বা সমর্পিত ভূখণ্ডের রাজস্ব বৃদ্ধি; যার ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, ‘দেওয়ানি’ এলাকার জমির ক্ষেত্রেও রাজস্বের পরিমাণ একইভাবে বৃদ্ধি সম্ভব।
মিস্টার গ্রান্টের ‘অ্যানালিসিস’-এ সমর্পিত ভূখণ্ড বা ‘সিডেড ল্যান্ডস’ সম্পর্কে নিম্নোক্ত বিবরণ রয়েছে: ১৭২২ সালের ‘আসল জমা’ (Assul Jumma) বা মূল রাজস্বের হিসাব;

১২২. তাঁর যুক্তি একটা তুলনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে – একদিকে মীর কাসিমের আমলে নির্ধারিত সামান্য বৃদ্ধি-সহ ৪০,৫১,৬৫১-এর সেই মোট অঙ্ক, আর অন্যদিকে কোম্পানি কর্তৃক হস্তান্তরিত ভূখণ্ডের (ceded lands) ওপর পরবর্তীকালে ধার্যকরা করের পরিমাণ। দেওয়ানি ভূখণ্ডর ওপর খাজনা অত্যধিক বেড়েছিল ১৭৬১ ও ১৭৬২ সালে; এবং সেই বর্ধিত হারের একটা বড় অংশ বহাল রেখেই সেই ভূখণ্ড আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। সুতরাং, এই খাজনা কমানোর দাবি অযৌক্তিক, কারণ তুলনার ভিত্তি বা পরিস্থিতি অভিন্ন নয়; বরং এর বিপরীতটাই সত্য — ১৭৬০ সালে আমরা যখন হস্তান্তরিত ভূখণ্ডর অধিকার পাই, তার তুলনায় ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি ভূখণ্ডর রাজস্ব অনেক বেশি ছিল। তাই দেওয়ানি ভূখণ্ডের ক্ষেত্রে যেখানে রাজস্ব কমানোর প্রয়োজন ছিল, সেখানে হস্তান্তরিত ভূখণ্ডগুলোর ক্ষেত্রে বরং রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ থাকার কথা।
১২৩. আমার বিশ্বাস, এই যুক্তি যথেষ্ট ন্যায্য এবং যে দাবির প্রেক্ষিতে এই যুক্তি তোলা হয়েছে, তার উপযুক্ত জবাব হিসেবে গণ্য হওয়া উচিৎ। এর বিপরীতে আমি আরও বলতে পারি যে, আমাদের প্রশাসনের অধীনে আসার পর দেওয়ানি ভূখণ্ডের রাজস্ব যদি হস্তান্তরিত ভূখণ্ডের মতোই বৃদ্ধির সক্ষমতা রাখত, তবে সেগুলোর রাজস্বও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পেত। দীর্ঘ আঠারো বছর ধরে এগুলো ইওরোপিয় ব্যবস্থাপনার অধীনে রয়েছে এবং রাজস্ব বাড়ানোর জন্য নানাবিধ পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়েছে। একটা জেলা থেকে আগে যে পরিমান রাজস্ব আদায় যেত তার চেয়ে এখন বেশি রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে বলেই যে অন্য জেলা থেকেও তা পাওয়া যাবে — এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না; স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে কোনো একটা ক্ষেত্রে এমনটা ঘটতে পারে যা অন্যগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের ফলে কোনো জেলার সম্পদ বা উৎপাদনক্ষমতা হ্রাস পায়; অথচ ন্যায়পরায়ণতা, সংযম আর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার ফলে অন্য জেলার সম্পদ বৃদ্ধি পায়। একইভাবে আমি এই কথাও বলতে পারি যে, যেহেতু কিছু জেলার মূল্যায়ন বা রাজস্ব-ক্ষমতা কমেছে, তাই সব জেলার ক্ষেত্রেই কর মওকুফ করা উচিত।
১২৪. খাজনার পরিমাণ বৃদ্ধির ধারণার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে নিম্নলিখিত তথ্য ও পর্যবেক্ষণগুলো বিবেচনার দাবি রাখে — প্রথমত, ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের ফলে জনসংখ্যা বিপুল পরিমান কমা — যার ফলে সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ীও মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ প্রাণ হারিয়েছিল। ১৭৮৪ সালেও একই ধরনের দুর্যোগ দেখা দিয়েছিল, যদিও তার তীব্রতা ছিল অনেক কম; এবং ১৭৮৭ সালে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে বন্যার কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, ঠিক যেমনটি গত বছরেও আংশিক খাদ্যসংকটের ফলে হয়েছিল।
২১১ টিকা
১২১ নম্বর স্তবক মীর কাশিমের রাজস্ব নীতির জটিল ও শোষণমূলক চরিত্রকে বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচের স্তবকে অয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ শব্দ-বন্ধের সংজ্ঞা দেওয়াগেল –
১. সার্ফ সিক্কা (Serf Sicca): মুদ্রার বিনিময় হার বা ‘বাটা’র উপর ধার্য কর। মীর কাশিম মুদ্রার মূল্য হ্রাস পাওয়ার অজুহাতে এই কর আরোপ করেন, যা আসলে রাজস্ব বৃদ্ধির পরোক্ষ উপায়। শোরের পরিসংখ্যানে এই খাত থেকে প্রায় ৪,৫৩,৪৪৮ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব পাওয়ার কথা উল্লেখ আছে।
২. কিফায়েত (Kefayet): জমিদার, ফৌজদার ও অন্য মধ্যসত্ত্বভোগী রাজস্ব আদায়কারীর থেকে ‘গোপন’ বা ‘আটকে রাখা’ অতিরিক্ত আয় বাজেয়াপ্ত করার একটি নীতি। মীর কাশিম বিশ্বাস করতেন এই মধ্যসত্ত্বভোগী থাকবন্দীগুলো রায়তদের থেকে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে সরকারকে ঠকাচ্ছে। তিনি এই আয়গুলোকে সরাসরি সরকারি কোষাগারে আনতে চেয়েছিলেন।
৩. আবওয়াব ফৌজদারি (Abwab Foujdary): ফৌজদারি অঞ্চলে ধার্য বিভিন্ন অতিরিক্ত কর আর শুল্ক। মীর কাশিম সীমান্তবর্তী জেলা এবং ফৌজদারদের অধীনে থাকা অঞ্চলগুলোর রাজস্ব পুনর্মূল্যায়ন করে এই কর বৃদ্ধি করেন, যা থেকে প্রায় ৩২,১৫,২৯৫ টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসে।
১২১ নম্বর স্তবকের বক্তব্য — জন শোর এই পরিসংখ্যানে দেখাতে চেয়েছেন যে মীর কাশিমের রাজস্ব বৃদ্ধি যুক্তিসঙ্গত বা সুপরিকল্পিত নীতি ছিল না। বরং ছিল একটি সংগঠিত লুণ্ঠন ও অতিরিক্ত শোষণ (pillage and rack-rent)। শোরের ভাষায়, এই বৃদ্ধি ছিল “নিছক লুঠতরাজ ও বাড়তি খাজনা আদায়”। তিনি আরও বলেছেন, মীর কাশিমের রাজস্ব দাবি ছিল সম্পূর্ণ কাগুজে (paper assessment) এবং বাস্তবে তা আদায় করা অসম্ভব ছিল। শোরের এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল জেমস গ্র্যান্টের যুক্তিকে খারিজ করা; গ্রান্ট দাবি করতেন যে মীর কাশিমের রাজস্ব হারই ভবিষ্যতের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভিত্তি হোক। শোর প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন এই উচ্চ রাজস্ব হার আদায় করা সম্ভব ছিল না এবং জনগণের জন্য অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক ছিল। এই স্তবক মীর কাশিমের রাজস্ব নীতির স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি, যা বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগের মধ্যে ফেলেছিল। এই নীতি দেখায় যে কীভাবে স্বল্পমেয়াদী রাজস্ব বৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বিসর্জন দেওয়া হয়েছিল। শোরের এই বিশ্লেষণই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভিত্তি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেখানে গ্র্যান্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়।
[আমরা এর আগের একটা টিকায় বিস্তৃতভাবে মীর কাশিমের এই রাজস্ব বৃদ্ধির উদ্যমকে অন্য নজরে দেখেছি; এখানে আমি শুধু শোরের দৃষ্টিভঙ্গীতে বিষয়টা বিশদে আলোচনা করলাম। মীর কাশিম রাজস্ব বৃদ্ধি করেছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আরও আরও বেশি অর্থ চাওয়া, ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া, বেআইনি ব্যবসা ইত্যাদি ব্ল্যাকমেলিং-এর হাত থেকে মুক্তি পেতে বড় সেনাবাহিনী তৈরি করার ভাবনায়]
১২২ টিকা
গ্র্যান্টের যুক্তি — গ্র্যান্ট বলেন বাংলার জমি ‘ভয়ানকভাবে কম মূল্যায়ন’ করা হয়েছে এবং মীর কাশিমের সময়ের রাজস্ব হার আদর্শ ধরে রাজস্ব বৃদ্ধি করা সম্ভব। তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন যে কোম্পানি দেওয়ানি লাভের পরেও যে রাজস্ব আদায় করছে, তা মীর কাশিমের সময়ের তুলনায় অনেক কম — অর্থাৎ রাজস্ব আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে।
শোর পাল্টা যুক্তি দিয়ে তিনটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন —
ক. ভিত্তির অসামঞ্জস্য — গ্র্যান্ট ৪০,৫১,৬৫১ টাকাকে ‘পরিমিত’ কর বৃদ্ধি হিসেবে দেখছেন, কিন্তু শোর বলছেন এই বৃদ্ধি আসলে অতিরিক্ত এবং অসম্ভবও ছিল। গ্র্যান্ট যে জমির কথা বলছেন (ceded lands), সেগুলো দেওয়ানি জমি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা — তাদের রাজস্বের ইতিহাস, উৎপাদনশীলতা ও খাজনার হার আলাদা। তাই তাদের তুলনা করাই ভুল।
খ. সময়গত পার্থক্য — দেওয়ানি জমিতে অতিরিক্ত কর আরোপ করা হয়েছিল ১৭৬১-৬২ সালে — যখন বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্থির ছিল। এই কর বৃদ্ধি এতটাই বিপর্যয়কর ছিল যে, কোম্পানি যখন ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভ করে, তখনও সেই করের একটি বড়ো অংশ বকেয়া ছিল। অর্থাৎ, এই কর আদায় করা সম্ভব হয় নি।
গ. সিদ্ধান্তের অসঙ্গতি — শোর বলছেন, ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি জমির রাজস্ব ১৭৬০ সালে কোম্পানি যখন বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রামকে সিডেড জমি হিশেবে পায়, তার তুলনায় অনেক বেশি ছিল। তাই তিনি বলেন, সিডেড জমিতে রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগ থাকলেও, দেওয়ানি জমিতে খাজনা কমানো উচিত — কারণ সেই জমিতে রাজস্ব ইতিমধ্যেই অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শোরের বক্তব্যের রাজনৈতিক ও আদর্শিক গুরুত্ব প্রবল। তিনি দেখাতে চান যে গ্র্যান্টের মতো তাত্ত্বিক হিসাবের ভিত্তিতে রাজস্ব নীতি প্রণয়ন করা যায় না — প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই যুক্তিই পরবর্তীতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময় শোরের ‘আরও সময় ও তথ্যের প্রয়োজন’-এর দাবির ভিত্তি তৈরি করে।
১২৪ টিকা
জন শোর ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ নিয়ে কবিতা লিখেছেন — এর প্রভাব নিয়ে উইলিয়াম হান্টার অনেকটাই আলোচনা করেছেন। এটা নিয়ে টিকা শেষে আলোচনা করছি।
১৭৭০-এর সরকারের উদাসীনতায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ গণহত্যায় পরিণত হয়। এই ঘটনা ছাড়াও বাংলা ১৭৮৪ আর ১৭৮৭ সালে আরও দুটো বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হবে — ১৭৭০-এর মতো ব্যাপক প্রাণহানি না হলেও, দুটো বছর বাংলার পূর্বাঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও দুর্ভিক্ষের জন্য আজও স্মরণীয় হয়ে আছে। শোর এই ঘটনাগুলোকে গ্রান্টের বিপক্ষে তার যুক্তি শানানোর অংশ করে তুলেছিলেন এই তথ্য প্রমাণের জন্য যে, গ্র্যান্টের প্রস্তাবিত উচ্চ রাজস্বের ভিত্তি (মীর কাশিমের সময়ের কাগুজে হিসাব) বাস্তবসম্মত নয়, কারণ দেশের উৎপাদন ক্ষমতা এই ধরনের বিপর্যয়ের পর আর আগের মতো নেই।
১৭৮৪ সালের বন্যা অতীতের ঐতিহ্যগত তীব্রতা ছাড়িয়ে যায়। ১৭৮৪ সালের বন্যা বাংলার ইতিহাসে ল্যান্ডমার্ক ঘটনা। সিলেটের মতো উঁচু জমির অঞ্চলও জলের নিচে তলিয়ে যায়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই বন্যার তীব্রতা আগের সময়ের সমস্ত রেকর্ড ছাড়িয়ে গিয়েছিল এবং বন্যা-পরবর্তী সময়ে ধ্বংসের মাত্রা নির্ণয় করার জন্য এই বন্যা নিজেই নতুন মানদণ্ড হিশেবে গণ্য হয় আজও।
ঢাকা অঞ্চলেও এই বন্যা প্রবল আকার ধারণ করে, ফসল ও জনজীবন বিধ্বস্ত করে। ১৭৮৩ সালেও বন্যা হয়েছিল, যার ক্ষতি তেমন বড় ছিল না, কিন্তু ১৭৮৪ সালের বন্যায় বর্ধমান জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে যায়। এই বন্যায় ফসল নষ্ট হয় এবং পরবর্তীকালে খাদ্য সংকট দেখা দেয়।
এই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, একটি বিষয় খেয়াল করা দরকার – ১৭৮৪ সালের বাংলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ উত্তর ভারতজুড়ে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল — সেখানে এই দুর্যোগ ‘চালিসা’ (Chalisa) দুর্ভিক্ষ নামে পরিচিত — প্রায় এক কোটি লোকের প্রাণহানি হয়।
১৭৮৭ সালের নভেম্বর মাসে আরও একটা প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় এবং তার সঙ্গে আসা প্রবল বন্যা পূর্ববাংলায় আঘাত হানে। এই বছর বাংলার ইতিহাসে মাইল ফলক কারন তিস্তা নদী সম্পূর্ণ নতুন গতিপথে বইতে শুরু করে। বহু ঐতিহাসিক এই দুর্যোগের কারণ হিশেবে শক্তিশালী ভূমিকম্প এবং তার সঙ্গে অতিবৃষ্টির ফলে প্রবল বন্যার কথা বলেছেন। ১৭৮৭ সালের ২৬শে মার্চ থেকে শুরু হয়ে এই বৃষ্টি একটানা পাঁচ মাস ধরে চলায় উত্তরবঙ্গে চরম বিপর্যয় ডেকে আনে। এই বন্যায় ব্রহ্মপুত্র নদের মূল প্রবাহপথ ভরাট হয় এবং জল ‘জোনাই খাল’ নামে পরিচিত একটি নতুন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে, যার ফলে যমুনা নদীর সৃষ্টি হয়। তিস্তা নদীও তার গতিপথ পরিবর্তন করে ব্রহ্মপুত্রের খাতের সঙ্গে মিলে যায়। এই ঘটনায় বাংলার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীপ্রবাহ, কৃষি আর জনজীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। রংপুর অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই বন্যা আর পরের বছরগুলোর দুর্ভিক্ষে রংপুরের পাঙ্গা পরগনায় অর্ধেকের বেশি জনসংখ্যা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় এবং পরবর্তী দুর্ভিক্ষে আরও ৬০,০০০ মানুষ মারা যায়।
এই দুর্যোগের বহুমাত্রিক প্রভাব —
১. ঘূর্ণিঝড় ও বন্যায় বহু মানুষ ও অসংখ্য গবাদি পশু প্রাণ হারায়।
২. বন্যায় জমি প্লাবিত হওয়ায় কৃষকরা চারা রোপণের মতো মৌলিক কাজও করতে পারেনি। পূর্ণিয়া, ২৪ পরগনা ও রাজশাহীর মতো অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
৩. এই বন্যার ফলে অনেক উর্বর জমি নষ্ট হয়ে যায় এবং সেগুলো নতুন করে চাষের অযোগ্য হয়ে পড়ে। ফলে কৃষকরা কম উৎপাদনশীল জমিতে চাষ করতে বাধ্য হয়।
শোরের বক্তব্যে এই দুর্যোগের গুরুত্ব হল তিনি ১৭৮৪ ও ১৭৮৭ সালের এই দুর্যোগগুলোকে গ্রান্টের তত্ত্ব খণ্ডলের প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগান —
১. উৎপাদনশীলতা হ্রাস ঘটা। এই ধারাবাহিক বিপর্যয়ের পর বাংলার কৃষি-উৎপাদনশীলতা ও জনসংখ্যা আগের মতো থাকল না। তাই মীর কাশিমের আমলের কাগুজে রাজস্বকে ভিত্তি হিশেবে গ্রহণ করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না।
২. তিনি সাবধানী রাজস্ব নীতির প্রয়োজনীয়তার কথা বলে বললেন পরপর এই ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর রাজস্ব কাঠামো বাস্তবসম্মতভাবে নির্ধারণ করতে হবে। এই দুর্যোগ প্রমাণ করে যে রাজস্ব নির্ধারণের আগে আরও বিস্তারিত তথ্য আর সময় প্রয়োজন।
৩. স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব — এই বিপর্যয়ের ফলে জমি ও উৎপাদনশীলতার স্থায়ী ক্ষতি হয়েছে, যা একটি টেকসই রাজস্ব নীতির ভিত্তি তৈরি করে। শেষ পর্যন্ত, এই দুর্যোগগুলোর প্রমাণ শোরের যুক্তিকে আরও দৃঢ় করেছিল যে গ্র্যান্টের রাজস্ব বৃদ্ধির প্রস্তাব ‘অকালপক্ক ও বিপজ্জনক’ হবে।
দুর্যোগ সূত্র
১। https://www.prothomalo.com/onnoalo/treatise/%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%A6%E0%A7%81%E0%A6%87-%E0%A6%AE%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%AC%E0%A6%A8
২। https://bn.banglapedia.org/index.php?title=%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A6%BE_%E0%A6%A8%E0%A6%A6%E0%A7%80
আরও একটা বিষয় উল্লেখ করা দরকার ১৭৭০-এর গণহত্যায় [গণহত্যা কেন বলছি — যে দুর্ভিক্ষর ব্যপ্তি রোধ করা যেত, অথচ উপনিবেশপূর্ব সময়ের দুর্ভিক্ষ রোধে সমস্ত সরকারী উদ্যমকেদুচ্ছাই করে সরকার শুধু নিষ্কৃয়ত হয়েই থাকে নি, জনগণের জীবনে প্রভূত র্ভোগ চাপিয়ে দিয়েছিল — তাই এই দুর্ভিক্ষকে গণহত্যা আখ্যা দিচ্ছি] প্রাণহানি। শোর বলছেন — ‘১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের ফলে সবচেয়ে রক্ষণশীল হিসাব অনুযায়ীও মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ প্রাণ হারিয়েছিল’। কিন্তু তার ১০০ বছর পরের এক আমলা উইলিয়াম হান্টার জানান ১/৩ অংশ মানুষ মারাগিয়েছেন। কোনটা ঠিক?
শোর বনাম হান্টার — শোর ছিলেন সমসাময়িক প্রত্যক্ষদর্শী প্রশাসক, আর হান্টার প্রায় এক শতাব্দী পরে দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে কাজ করেছিলেন। কিন্তু শোরের সময়ে সুসংহত জনসংখ্যা জরিপ ছিল না। তিনি সম্ভবত প্রশাসনিক এলাকার ভিত্তিতে আদায় করা রাজস্ব হ্রাস এবং কর্মকর্তাদের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে ২০% মৃত্যুর অনুমান করেছিলেন। হান্টার প্রায় ১০০ বছর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনিক রেকর্ড, সমসাময়িক ডায়েরি এবং স্থানীয় বিবরণী যাচাই করে বিস্তারিত গবেষণা করেন। The Annals of Rural Bengal (১৮৬৮)-এ তিনি দাবি করেন যে দুর্ভিক্ষে বাংলার জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মারা যায়।
শোরের ১/৫ অংশের ধারণা ছিল প্রাথমিক ও রক্ষণশীল অনুমান। কিন্তু একটা বিষয় মাথায় রাখা দরকার, হান্টার সে বিপুল মৃত্যু পরিসংখ্যান দিচ্ছেন, শোরের সমসাময়িক কর্মকর্তারা আরও ভয়াবহ পরিসংখ্যান দিয়েছেন। তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয় দুর্ভিক্ষের মাত্রা। ১৭৭০ সালের মে মাসে, কোম্পানির ডিরেক্টররা মনে করছিলেন জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মারা গেছে। ২রা জুন, রেসিডেন্ট বীচার (Becher) এই মৃত্যুর হার সংশোধন করে বলেন, প্রতি আটজনের মধ্যে প্রায় তিনজন মারা গেছেন। দুর্ভিক্ষের সময়কার কঠোর বাস্তবতা ও পরবর্তীকালের ঐতিহাসিক গবেষণায় ২০%-এর চেয়ে ৩৩%-এর হিসাবকেই বেশি গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়। হান্টার শুধু একটি সংখ্যা দেননি; তিনি সেই সংখ্যার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করেছিলেন। তিনি সরকারি নথিপত্র ও সমসাময়িক বিবরণী থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করেন যে কীভাবে দুর্ভিক্ষ বাংলার সমাজ ও অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। তাই তাঁর পরিসংখ্যান বর্তমান ঐতিহাসিক আলোচনায় বেশি প্রচলিত। মাথায় রাখতে হবে শোরই হোন বা হান্টার দুজনের অনুমানের ক্ষেত্রেই মৃত্যুর হার ছিল এতটাই ভয়াবহ যে শোরের অনুমানও উপনিবেশিক শাসনের ব্যর্থতা ও নিষ্ঠুরতা তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট।
উল্লেখ্য, এই দুর্ভিক্ষে কোম্পানি প্রয়োজনীয় ত্রাণ তো দেয়নি, বরং খাজনা ১০% বাড়িয়ে ছিল।
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ