১৬৪. ইজারাদারদের (ফার্মারদের) মাধ্যমে রাজস্ব আদায়ের সুবিধাগুলো নগণ্য আর সীমিত; পক্ষান্তরে এর অসুবিধাগুলো অনেক এবং ব্যাপক। কোনো জেলার রাজস্ব আদায়ের জন্য কোনো ইজারাদারের (ফার্মার) সাথে চুক্তি করা নিঃসন্দেহে সহজ ও সরল বিষয়; তবে এর পক্ষে কেবল এটুকুই বলা যেতে পারে — এর বেশি বাক্য ব্যয় সম্ভব নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, নিরাপত্তার দিক থেকে এই পদ্ধতিও ব্যাপক ত্রুটিপূর্ণ — কারণ ইজারাদার এবং জামিনদার — দু’পক্ষই বহু সময় লক্ষ্য পূরণে চরম ব্যর্থ হয়; তাছাড়া এদের প্রয়োগ প্রক্রিয়াও অত্যন্ত নিপীড়নমূলক। সরকারি কর্মকর্তাদের স্থানীয় পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব থাকায় ইজারাদারের সাথে নিখুঁত চুক্তি সম্পাদন করা প্রায়শই সম্ভব হয় না যা তাকে অন্যায়ভাবে বাড়তি অর্থ আদায়ের সুযোগ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে; আর পরবর্তীকালে সেই অনিয়ম সংশোধনের কোনো প্রচেষ্টাই সাধারণত তাকে রাজস্ব মওকুফের দাবি তোলার সুযোগ করে দেয়। অস্থায়ী ইজারাদার কখনোই ভবিষ্যতের উন্নতির কথা ভাবেন না; তাছাড়া এই ব্যবস্থা এমন সব ব্যক্তিকে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থাপনায় যুক্ত হওয়ার সুযোগ করে দেয় যাদের আসলে এই কাঠামো থেকে সিদ্ধান্ত নিয়েই দূরে রাখা উচিত — যেমন ইওরোপিয় আমলাদের কর্মচারী অথবা তাদের প্রভাবে থাকা ব্যক্তিরা। তবে যেহেতু এই ব্যবস্থা সর্বজনীনভাবে নিন্দিত, তাই এর স্বীকৃত অসুবিধাগুলো বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন নেই। বৃহত্তর অনিষ্ট প্রতিরোধের উপায় হিসেবে হয়তো প্রয়োজনে আংশিকভাবে ইজারাদারদের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
১৬৫. তৃতীয় পদ্ধতি হলো জমিদারদের সাথে বন্দোবস্ত; এবং এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য আমি আগাম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
১৬৬. জমিদারের অবস্থান দুটি সম্পর্ককে একত্রিত করে; প্রথমত, যা জমির সম্পত্তি থেকে উদ্ভূত, যার কিছু অংশের খাজনা তিনি রাষ্ট্রকে প্রদান করেন; এবং দ্বিতীয়ত, তাঁর সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে ক্ষমতায়, যা দেশের শান্তি রক্ষা এবং রাষ্ট্রের প্রজাদেরকে অত্যাচার থেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য। বিশেষ করে বর্ধমান, রাজশাহী, দিনাজপুর, নদীয়া, বীরভূম, বিষ্ণুপুর ও যশোরের জমিদারদের সম্পত্তি থেকে প্রায় এক কোটি টাকা — এক মিলিয়ন পাউন্ড স্টার্লিং-এর সমতুল্য রাজস্ব প্রাপ্ত হয়। (এই পর্বের টিকা পরে জোড়া যাবে – অনুবাদক)
১৬৭. আমরা যদি তাঁদের অবস্থান বা ভূমিকার বিষয়টি বিবেচনা করি, তবে তাঁদের চরিত্রের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ন্যায়পরায়ণতা, সততা, সংযম, মানবিকতা, নিজেদের ও প্রজাদের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান, কাজের প্রতি মনোযোগ এবং কাজের খুঁটিনাটি বিষয়ে সম্যক ধারণা — এসবই তাঁদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হওয়া উচিত। তাঁদের চরিত্রের নৈতিক দিকগুলো বাদ দিয়ে আমি বিশেষ করে শেষোক্ত দুটি গুণের (কাজের প্রতি মনোযোগ ও কাজের খুঁটিনাটি সম্পর্কে জ্ঞান) উপস্থিতি কতটা রয়েছে তা বিবেচনা করব; কারণ এই গুণগুলোর অনুপস্থিতিতে পূর্বোল্লিখিত গুণগুলো অনেকাংশেই নিষ্ক্রিয় ও অকার্যকর হয়ে পড়া সম্ভব।
১৬৮. এ দেশের অধিকাংশ বিষয়ের মতোই জমিদারদের বিষয়ে পরস্পরবিরোধী মতের প্রচলন রয়েছে। কেউ কেউ জমিদারদের রায়ত বা কৃষকদের স্বাভাবিক অভিভাবক ও হিতৈষী রক্ষক হিসেবে গণ্য করেন এবং তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি পোষণ করেন। আবার অন্যেরা তাঁদের অকর্মণ্য, অলস ও নিপীড়ক শ্রেণি হিসেবে অভিহিত করেন, যারা নানা ধরনের জবরদস্তি বা অর্থ আদায় (extortion) করে থাকে অথবা নিজেদের নিষ্ক্রিয়তা ও অজ্ঞতার কারণে এসব অপকর্মকে প্রশ্রয় দেয়।
১৬৯. বাংলার জমিদারদের কার্যকলাপ পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, খুব কম জমিদারই তাঁদের পৈতৃক জমিদারি পরিচালনার জন্য যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন; সাধারণত তাঁরা এই কাজের জন্য উপযুক্ত শিক্ষা পাননি। তাঁরা সাধারণ ব্যবসায়িক রীতিনীতি ও লেনদেনের পদ্ধতি সম্পর্কে অজ্ঞ; এমনকি যেখানে তাঁদের নিজেদের স্বার্থ সরাসরি জড়িত, সেখানেও তাঁরা কাজের তদারকিতে অমনোযোগী এবং দায়িত্ব গ্রহণে অনিচ্ছুক। এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত নারীরা তাঁদের নিজস্ব আইন ও প্রথা অনুযায়ী যাবতীয় প্রত্যক্ষ কার্যক্রম থেকে দূরে থাকেন। নাবালকরাও তাদের স্বাভাবিক অক্ষমতার কারণে একই পরিস্থিতির শিকার হয়।
১৭০. সাধারণভাবে কোনো জমিদারকে যদি প্রশ্ন করা হয় — তাঁর জেলায় বা এর কোনো অংশে খাজনার হার এবং তা নির্ধারণ আর আদায়ের নিয়মকানুন কী; কোনো পরগনার রাজস্বের পরিমাণ কত; কোনো নির্দিষ্ট অংশের প্রধান ফসল কী; সেই ফসলের উৎপাদন বেড়েছে না কমেছে; সেখানে কী কী শিল্প বা উৎপাদন ব্যবস্থা চালু আছে — সংক্ষেপে, দেশের অভ্যন্তরীণ কাজকর্ম ও অবস্থা সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্ন করা হলে তাঁর উত্তর সম্ভবত এমন হবে যেন তিনি কখনোই ওই এলাকায় যাননি; অথবা তথ্যের জন্য তিনি তাঁর দেওয়ান বা অন্য কোনো কর্মকর্তার দিকে আঙুল নির্দেশ করবেন। একটা বিষয়ে তিনি সর্বদা স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট — আর তা হলো নির্ধারিত রাজস্ব পরিশোধে তাঁর জমির অক্ষমতা; এবং এর কারণ হিসেবে চাষাবাদ হ্রাসের কথা উল্লেখ করতেও তিনি দ্বিধা করেন না — যদিও বাস্তবে এমনটা ঘটে থাকলে তার মূল কারণ মূলত তাঁর নিজস্ব অব্যবস্থাপনাই হয়ে থাকে।
১৭১. সামগ্রিকভাবে জমিদারি পরিচালনার কাজগুলো জমিদারির কর্মচারীরাই সম্পন্ন করে থাকেন; আর জমিদার কেবল এটুকু নিশ্চিত করতে চান যে, তাঁকে যেন কাজের ঝামেলা পোহাতে না হয়, সরকারি তাগাদা বা উপদ্রব থেকে তিনি যেন রেহাই পান এবং তাঁর বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রয়োজন মেটানোর মতো পর্যাপ্ত অর্থ যেন হাতে থাকে। নিজ বাড়িতে জমিদাররা তাঁদের গৃহকর্মচারীদের থেকে সম্মান ও মনোযোগ পেয়ে থাকেন; এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আশা, ভয় ও স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে তাঁরা তোষামোদ, সন্তুষ্টি ও সেবাপ্রাপ্তির পাত্র হন। কিন্তু কর্মচারীদের নিয়োগ ও বরখাস্ত করার ক্ষমতা জমিদারদের হাতে থাকা সত্ত্বেও — এবং এই ক্ষমতাকে তাঁরা অনেক সময় অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করলেও — বাস্তবতা হলো, কর্মচারীরা যেমন জমিদারদের ওপর নির্ভরশীল, জমিদাররাও ঠিক তেমনই তাঁদের কর্মচারীদের ওপর নির্ভরশীল।
১৭২. জমিদারদের প্রজারা সচরাচর তাঁর প্রশাসক জমিদারদের সাক্ষাৎ পায় না; আর যখন অভিযোগ ও আবেদন নিয়ে তাঁদের কাছে যাওয়ার অনুমতি মেলে কিংবা জোর করে তাঁদের সান্নিধ্যে পৌঁছায়, তখন দেওয়ানের কাছে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে অথবা জমিদারের নামে — কিন্তু আসলে দেওয়ানেরই নির্দেশিত — কোনো আদেশনামা ধরিয়ে দিয়ে তাদের বিদায় করা হয়; তাছাড়া তাঁদের মধ্যে অর্থের বিনিময়ে বিচার বিক্রির ঘটনাও বিরল নয়।
১৭৩. নিজেদের বংশানুক্রমিক অধিকারের বিষয় প্রকাশ্যে তুলে ধরা এবং ব্রিটিশ সরকারের পক্ষ থেকে সেই অধিকারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দানের ফলে জমিদারদের মনে এই ধারণা বদ্ধমূল হয়েছে যে, তাঁদের এই অধিকার অলঙ্ঘনীয়; বস্তুত, এই ধারণার বিপরীত কোনো দৃষ্টান্তও খুব একটা দেখা যায়নি। তাদের এখতিয়ারভুক্ত তালুকদার এবং রায়ত — সকল শ্রেণীর মানুষের মধ্যেই সমান দৃঢ়তার সাথে এই ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে; ফলে নিজেদের প্রজাদের ওপর তারা এক স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছে। আমার বিশ্বাস, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর প্রভাব দেশের জন্য খুব একটা কল্যাণকর হয়নি। একটা বিশেষ দিক থেকে এর ফলে গুরুতর অনিষ্টও হয়েছে — আর তা হলো, অন্যায়ভাবে অতিরিক্ত অর্থ বা কর আদায়ের বিরুদ্ধে রায়তদের অভিযোগ জানানোর পথ রুদ্ধ করে দেওয়া। শেষোক্ত কারণটি হলো এই যে, ‘যদিও আমরা এখন প্রতিকার পেতে পারি, তবুও ভবিষ্যতে আমাদের রোষানলের শিকার হতে হবে।’
১৭৪. জমিদারদের অজ্ঞতা এবং তাদের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে চরম অমনোযোগিতা — উভয়ই যেমন ব্যাপক, তেমনই শোচনীয়। এর ফলে যেসব পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, আমি তার কিছু বিবরণ দেব।
১৭৫. তাদের বিষয়ে সরকার যেসব নীতি অনুসরণ করে, সে সম্পর্কে তারা খুব কমই অবগত থাকে। প্রতিটি বিষয়কে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়; এমনকি শাসকগোষ্ঠী ন্যায়বোধ বা সংযম থেকে যেসব পদক্ষেপ নেয়, সেগুলোকে তারা, তাদের বিরুদ্ধে করা ষড়যন্ত্র অথবা প্রভাব বিস্তারের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকে।
১৭৬. প্রধান জমিদারদের সবারই কলকাতায় উকিল বা প্রতিনিধি থাকে, যাদের কাজ হলো তাদের নিয়ে কী ঘটছে বা কী ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তা জানানো। ষড়যন্ত্রের অভ্যাস এবং এমন কিছু পরোক্ষ উপায়ে হাসিল করার প্রবণতা — যা ন্যায্য হলে স্বাভাবিকভাবেই পাওয়া যেত এবং অন্যায় হলে কেউই দিত না — তা এতটাই দীর্ঘস্থায়ী ও বদ্ধমূল যে, কেবল সময়ের আবর্তনেই তা দূর করা সম্ভব। এর ফলে, কোনো জমিদার যখন তার উদ্দেশ্য সাধনে ব্যর্থ হন, তখন তিনি তার আইনজীবীদের আগ্রহের অভাব বা সরকারের ও এর কর্মকর্তাদের সুনাম ক্ষুণ্ণকারী অন্য কোনো কারণকে দায়ী করেন; আর যখন তিনি সফল হন, তখন প্রশাসনের প্রতি তার কোনো ইতিবাচক ধারণা তৈরি হয় না।
১৭৭. তবে অজ্ঞতার ওপর ভুল তথ্যের প্রভাব আরও সুদূরপ্রসারী। জমিদারদের অবাধ্যতা ও ফাঁকি দেওয়ার প্রবণতাকে উৎসাহিত করা হয়; তাদের শেখানো হয় যে, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের তিরস্কার বা সম্মতি আসলে ব্যক্তির বিশেষ অনুগ্রহ, প্রশ্রয় কিংবা রোষানলের ফল। তাদের বিশ্বাস করানো হয় যে, সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা নীতি নয়, সবকিছুই ষড়যন্ত্রের সফলতা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে। সরকারি কার্যপদ্ধতিতে স্বাভাবিক যেসব রদবদল ঘটে — যেখানে সব সময় কঠোরভাবে একরূপতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না — ফলে এই ধারণাগুলোকে আরও জোরালো করে তোলে; আর জমিদাররা স্বভাবতই সেগুলোকে নিজেদের আচরণের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করে নেয়।
১৭৮. কিন্তু জমিদারদের অজ্ঞতা ও অযোগ্যতার সবচেয়ে গুরুতর প্রভাব পড়ে তাদের প্রজাদের জীবনে। এমন এক ব্যক্তির পরিস্থিতির কথা বিবেচনা করুন, যিনি একটা বিশাল জমিদারির দায়িত্বে আছেন — যে জমিদারির ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির। একটা বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট যে, তাকে (জমিদারকে) অগণিত প্রতারণা আর জালিয়াতির শিকার হতে হয়। তার প্রধান ইজারাদাররা তদারককারী কর্মকর্তাকে ব্যক্তিগতভাবে অর্থ প্রদানের মাধ্যমে কম মূল্যে ইজারা নেয়; অথবা একই উপায়ে ইজারার মেয়াদ শেষে খাজনা মওকুফ করিয়ে নেয়। মধ্যবর্তী ইজারাদার থেকে শুরু করে সাধারণ রায়ত বা কৃষক সব স্তরেই এই ধরনের জালিয়াতি ও লুঠ প্রক্রিয়া চলতে থাকে; যার ফলে জমিদারের বা তার কর্মকর্তাদের অগোচরে জমি হাত বদল হতে থাকে; কোনো কোনো প্রজার খাজনা কমিয়ে অন্যদের ওপর তা বাড়িয়ে মোট আদায় পুষিয়ে নেওয়া হয়; ইজারার মেয়াদ শেষে হিসাবপত্র বিকৃত বা জাল করা হয়; সাময়িক চুক্তির আড়ালে প্রতারণামূলক তথ্য গোপন করা হয়; ক্রমাগত নতুন নতুন কর চাপানো হয়; ইজারার শুরুতে সন্তুষ্টির জন্য খাজনা মওকুফ করা হয় এবং মেয়াদ শেষে খেয়ালখুশিমতো অতিরিক্ত কর বা বোঝা চাপানো হয় — এসব ছাড়াও আরও অসংখ্য অনিয়ম ও অপকর্মের তালিকা রয়েছে যা মফস্বলের হিসাব-নিকাশকে জটিল করে তোলে এবং এই সব অনাচারের প্রতিকার পাওয়া কঠিন করে দেয়।
১৭৯. যেসব বাস্তব তথ্যের ওপর ভিত্তি করে এই মন্তব্যগুলো করা হয়েছে, সে সম্পর্কে যাদের অভিজ্ঞতা কম, তাদের কাছে বিষয়গুলো বোধগম্য করে তোলার জন্য আমি কিছু কথা বলতে চাই। সম্ভবত নিচের বিস্তারিত বিবরণটি এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।
১৮০. বিশাল এলাকার অধিকারী কোনো জমিদার সরকারের সাথে বন্দোবস্ত সম্পন্ন করার পর সেই এলাকা বিভিন্ন অংশে ভাগ করে কয়েকজন ইজারাদারকে নতুন করে ইজারা দেন; তারা আবার তাদের ইজারার সম্পূর্ণ বা আংশিক অংশ অন্যদের কাছে হস্তান্তর করেন; এবং সেই অন্যরা আবার অপেক্ষাকরা নিম্নস্তরের ইজারাদারদের কাছে তা হস্তান্তর করে। এই প্রক্রিয়ার বিপরীত ক্রমে দেখলে দেখা যায়, যারা সরাসরি জমি চাষাবাদ করেন সেই রায়তরা খাজনা দেন গ্রামের প্রধান রায়ত, মণ্ডল বা গোমস্তার কাছে (গ্রামের আয়তন অনুযায়ী এমন একজন বা একাধিক ব্যক্তি থাকতে পারেন); এরা আবার খাজনা জমা দেন দুই-তিনটে গ্রামের দায়িত্বপাওয়া ইজারাদারের কাছারিতে; তিনি জমা দেন ‘তরফ’ বা একাধিক গ্রামের সমষ্টিগত বিভাগের ইজারাদারের কাছে; এবং এভাবেই পরগনার ইজারাদার হয়ে তা জমিদারের কাছে এবং পরিশেষে সরকারি কর্মকর্তার কাছে পৌঁছায়।
১৮১. অধিকাংশ প্রধান জমিদারিতে কাজের ধারা বা পদ্ধতিটি এভাবেই পরিচালিত হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমিদাররা যদি নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগও করেন, তবুও মধ্যবর্তী স্তরের সংখ্যা খুব একটা কমে না। কেবল ছোট ছোট জমিদারি বা তালুকদারির ক্ষেত্রেই — এবং তাও সবসময় নয় — মালিকরা সরাসরি রায়তদের থেকে খাজনা আদায় করেন; সাধারণত তারা রায়তদের থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেন।
১৮২. যেখানে রাজস্ব আদায়ের মূল নীতিই সুনির্দিষ্ট নয়, সেখানে প্রতিটা জেলায় প্রতারণা, জোরকরে অর্থ আদায় এবং তথ্য গোপনের মধ্যে যে নিরন্তর দ্বন্দ্ব চলবে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। একজন জমিদার যখন তাঁর প্রত্যক্ষ ইজারাদারদের সাথে সম্পাদিত চুক্তির বাইরে আর কিছুই জানেন না — এবং সেই চুক্তি সম্পর্কেও তাঁর জ্ঞান অসম্পূর্ণ — তখন এই প্রক্রিয়ার পরিধি ও জটিলতা ব্যাপক আকার ধারণ করে। নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধির তাগিদ ছাড়া, জমিদারির কর্মচারীরাও কাজের বিভিন্ন পর্যায়ে আসলে কী ঘটছে, সে সম্পর্কে খুব কমই উপযুক্ত তথ্য রাখেন। [১৮৭]
চলবে
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ