Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উই দ্য পিপল অব ইণ্ডিয়া : দিলীপ মজুমদার সিনে সেন্ট্রালের লুসোফন চলচ্চিত্র উৎসবে পর্তুগিজ ছবি — ফ্লাইট অফ ক্রোকোডাইল : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মুখার্জিবাড়ি — জিরাট ও রসা রোড : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৫৯ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

ধারাবাহিক ১৮৭ আর ১৯০ স্তবকের টিকা

গত কিস্তির মুখড়ার পর এই পর্বে বিস্তারিত আলোচনায় প্রবেশ করা যাক।

ঐতিহাসিক বলদাখাল (Baldacaul) তৎকালীন ত্রিপুরা জেলার প্রাচীন রাজস্ব অঞ্চল, যাকে শোর তাঁর মিনিটে জমিদারি পুনর্বহাল নীতির ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে তুলেধরেছেন। শোর স্পষ্ট করে বলছেন, ওই জমিদার “নাবালক ছিলেন না, নারীও ছিলেন না” — অর্থাৎ তিনি সক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ। এই উল্লেখের মধ্যেই নারী জমিদারদের প্রতি ব্রিটিশ প্রশাসনের বিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গি লুকিয়ে আছে। আঠেরো শতকের দ্বিতীয়ার্ধে মহিলা জমিদারদের গৌরবজ্জ্বল ভূমিকা বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে — দেবী জয়দুর্গা চৌধুরানী, রাণী বিষ্ণুকুমারী, অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণী ভবানী, রাণী স্বর্ণময়ী, রাণী শিরোমণি, রাণী সরস্বতীর মতো মহিলা জমিদাররা কেবল যে জমিদারি পরিচালনা করতেন তাই নয়, তাদের মধ্যে মাত্র ৩ জন মহিলা জমিদার ব্রিটিশ কোষাগারে বছরে ৭৫ লক্ষ টাকারও বেশি রাজস্ব জমা দিতেন [অন্য মহিলা জমিদারের ভূমি রাজস্ব মেলালে স্বাভাবিকভাবে রাজস্বের পরিমান আরও বড় হবে]। এক্কেবারে উপকূল অঞ্চলের তুমলুক থেকে উত্তরবঙ্গের নদীবিধৌত রংপুর অঞ্চলের দুই অঙ্কের মহিলা জমিদারেরা ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী, স্বাধীনচেতা এবং জমিদারি পরিচালনায় আর পরিকাঠামো বিকাশে অত্যন্ত দক্ষ এবং শেষ প্রজাদরদী শাসকদের মধ্যে শেষ দল যারা ছিয়াত্তরের গণহত্যায় – আমি অন্তত দু’জনের কথা বলতে পারি হুগলী যশোরের রাণী মন্নুজান বেগম এবং অর্ধবঙ্গেশ্বরী রাণীভবানী তাঁদের খাজাঞ্চিখানা খুলে দিয়েছেন আর রাণী ভবাণী ব্রিটশদের চিঠি ল।ইখে বলেছিলেন দেশ লুণ্ঠিত হইয়াছে — ছিলেন দেবী চৌধুরাণী (জয়দুর্গা)-এর মতো বিদ্রোহী নেত্রীও, যিনি ফকির-সন্ন্যাসী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলেছিলেন; ফকির-সন্ন্যাসীরা রাণী ভবানীর কাছে তাদের ওপর নামিয়ে আনা ব্রিটিশ অত্যাচারের অভিযোগ জানিয়েছিলেন তাঁকে অর্ধবঙ্গেশ্বরী উপাধি দিয়ে — এতটাই ছিল তার জমিদারির ব্যপ্তি আর তাঁর ক্ষমতার প্রভাব আর ছিলেন রাণী শিরোমণি — যাঁকে বিদ্রোহের আগুণ জ্বালানোর অভিযোগে কারান্তরালে রাখা হয়।

পলাশীর পরের সময় থেকেই — বিশেষ করে বাংলার প্রশাসনিক ক্ষমতা যখন কার্যত ব্রিটিশদের হাতে গেল, ব্রিটিশ প্রশাসন এদের ‘স্বীকৃতি’ দেওয়া তো দূরস্থান, ছলে-বলে-কৌশলে মহিলাদের নেতৃত্বের জমিদারিগুলো কেড়ে নেওয়ার উদ্যম নিতে শুরু করল; মাথায় রাখতে হবে উপনিবেশের শুরুর দিকে অন্তত ২৫ মহিলা জমিদারের দাপটে জমিদারি পরিচালনার বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছিল; তার একটা বড় কারণ হল, মহিলা জমিদারেরা ব্রিটিশদের আগে থেকেই জমিদারি পরিচালনা করছিলেন — তারা ব্রিটিশই হোক বা পরে রামমোহন রায়েরি হোক কোনও পুরুষের দয়ার প্রত্যাশী ছিলেন না, আজও নেই।

ধীরে ধীরে আইনি কাঠামো বদল করে ব্রিটিশ শাসকেরা সার্বিকভাবে মহিলা নিয়ে বাংলা দেশের প্রথা বিরোধী অবস্থান নিতে শুরু করে — বিশেষ করে মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার, রোজগার ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকে এবং বিধবা শাসকদের ‘অক্ষম’ দাগিয়ে দেয়। হেস্টিংস প্রবর্তিত হ্যালহেডের হিন্দু আইনে সতীপ্রথার বৈধতার গুণগান করা হয় [যদিও তখনও সতীপ্রথা বাংলায় ছিল না; আমরা মনে করি বাংলায় মেয়েদের সম্পত্তি আর জমিদারির অধিকার কেড়ে নেওয়ার বিরুদ্ধে মহিলাদের যে অলিখিত বিরোধিতা সামাজিক আর পারিবারিক স্তরে এসেছিল তাকে কাউন্টার করতে গিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতাশালী বাঙালি ভদ্রবিত্ত ৫০০০ বাঙালি মহিলাকে পুড়িয়ে মারে — এই ইতিহাস ব্রিটিশ আর রামমোহনকে গ্লোরিফাই করছে স্রেফ মুছে দেওয়া হয়েছে], এবং ১৭৮৪ সালে বর্ধমানের রাণী বিষ্ণুকুমারীর সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেওয়ার [এই পর্বের সরাসরি বেনিফিশয়ারি রামমোহনের পরিবার; তাদের উত্থান ঘটল] ঘটনার পর সার্বিকভাবে মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার কেড়ে নেয় এবং কোর্ট অব ওয়ার্ডস তৈরি করে সেই জমিদারিগুলো বাজেয়াপ্ত করতে থাকে। ১৭৯০-এর দশকে এই নীতিই মহিলা জমিদারদের জমিদারি হরণের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। শোরের ১৮৭ স্তবক তাই নিছক প্রশাসনিক মন্তব্য নয় — ফ্যাটফ্যাটে ঔপনিবেশিক রাজস্ব নীতির লিঙ্গ-ভিত্তিক শোষণ-কাঠামোর সরাসরি প্রকাশ, যেখানে ‘আপাত ন্যায়বিচার’ ও ‘মানবতা’ পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছে, আর তার শিকার হয়েছেন বাংলার শক্তিশালী মহিলা জমিদাররা, যাঁদের শ্রম ও সম্পদ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভিত্তি নির্মাণ করেছিল।

জন শোর আলোচ্য স্তবকে নারী জমিদারদের ‘অযোগ্যতা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন — এটা শুধু তাঁর প্রশাসনিক পর্যবেক্ষণ নয়; বরং তৎকালীন ব্রিটিশ আইনি দর্শন ও সামাজিক মনস্তত্ত্বের সুসংহত প্রতিফলন – এবং এই ব্রিটিশ বাস্তবতা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাংলায় সম্পত্তি আর জমিদারি অধিকার রক্ষা করা নারীদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করার কাঠামো তৈরি করেছিল। শোরের বক্তব্যের সামাজিক ভিত্তি ছিল ইংরেজ কমন ল’-এর ‘কাভারচার’ (Coverture) আইন। ব্ল্যাকস্টোনের ভাষায়, “বিবাহের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রী আইনের চোখে একই ব্যক্তি; অর্থাৎ স্ত্রীর আইনি অস্তিত্ব বিবাহের সময় স্থগিত বা বিলুপ্ত হয়” । ব্রিটিশ এই আইনি মতবাদ অনুযায়ী, বিবাহিত নারীর সম্পত্তি, আয়, এমনকি সন্তানের ওপরও তার নিজের নয়, একমাত্র স্বামীর পূর্ণ কর্তৃত্ব ছিল — মহিলাদের সন্তান জন্ম দিয়ে আর বড় করেই দায়িত্ব শেষ। ব্রিটিশ আইনজ্ঞ হিসেবে, শোর, এই ইওরোপিয় মহিলাবিদ্বেষী দৃষ্টিভঙ্গিকেই ভারতীয় প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করছেন; শোর সূত্রে সামগ্রিকভাবে মহিলা জমিদারদের ‘সুরক্ষার অযোগ্য’ ও ‘অস্থায়ী’ বলে চিহ্নিত করে দেওয়া হয়। আমরা যেন ভুলে না যাই, শোরের মিনিট তৎকালীন সরকারি প্রশাসনকে ঢেলে সাজতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে – এবং এই মিনিটের পরের বছর মহিলা জমিদারদের জমিদারি করার অধিকার কেড়ে নেওয়া হবে — এবং দুই বাংলার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ইতিহাস লেখা বাঘা বাঘা ইতিহাসবিদ, এই ঘটনা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ইতিহাসে ঠাঁই দেন না। আদতে ভুলেগেলে চলবে না চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আগের এক দশক ধরে মহিলাদের সম্পত্তির অধিকার হরণের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে একচেটিয়া পুংতন্ত্রের পকড়; হয়ত রোপন হবে সতীদাহের বীজ।

শোরের ১৯০ স্তবকে বর্ধমান, দিনাজপুর ও বিষ্ণুপুরের নারী জমিদারদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে, যেখানে তিনি দাবি করেছেন যে তাদের অধীনে জমিদারি কর্মচারীদের মধ্যে “পারস্পরিক দ্বন্দ্ব প্রায় কখনোই থামে না”। কিন্তু এই ‘দ্বন্দ্ব’ আসলে ব্রিটিশ প্রশাসনের তৈরি — তারা ইচ্ছা করেই নারী জমিদারদের ‘অযোগ্য’তা প্রমাণের জন্য কর্মচারীদের উস্কে দিচ্ছিল, যাতে ‘সুরক্ষা’র নামে তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া যায়। ১৮৭ স্তবকে তিনি বল্দাকাউলের জমিদারের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, তিনি “নাবালকও ছিলেন না, নারীও ছিলেন না” — যার অর্থ তিনি পরোক্ষভাবে স্বীকার করেছেন যে নারী ও নাবালক জমিদারদের অবস্থা আরও দুর্বল। ব্ল্যাকস্টোনের কমেন্টারি শোরের দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও শক্তিশালী করেছে বলেই তিনি বলেতে পারছেন নারীদের ‘অক্ষমতা’ আসলে তাদের ‘সুরক্ষা’-র জন্য ব্রিটিশদের মাথাব্যথা। শোরও এই যুক্তি ব্যবহার করেছেন: “জমিদারি পুনর্বহালের আপাত ন্যায়বিচার সবসময় মানবিকতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয়নি” — অর্থাৎ, তিনি স্বীকার করেছেন যে নারী জমিদারদের ‘সুরক্ষা’র নামে তাদের সম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তিনি একজন ব্রিটিশ আমলা হিসেবে এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ করেননি; বরং তিনি এই কাঠামোরই অংশ ছিলেন। অথচ বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলার রাণী ভবানী, রাণী স্বর্ণময়ী, রাণী শিরোমণি ও দেবী চৌধুরাণী-র মতো নারী জমিদাররা অত্যন্ত দক্ষতায় জমিদারি পরিচালনা করতেন এবং ব্রিটিশ কোষাগারে বছরে ৭৫ লক্ষ টাকার বেশি রাজস্ব জমা দিতেন [সূত্র ১৩ জ্ঞানগঞ্জ পুথি অনন্ত লুঠের বাখান-এ দেবোত্তম চক্রবর্তীর প্রবন্ধ]। তারা ছিলেন শক্তিশালী, স্বাধীনচেতা আর বিদ্রোহী — যারা প্রমাণ করেছিলেন যে তারা পুরুষ জমিদারদের তুলনায় কম দক্ষ ছিলেন না। অথচ ব্রিটিশ প্রশাসন ‘কাভারচার’-এর আদর্শকে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে প্রয়োগ করে মহিলা জমিদারদের ‘অযোগ্য’ হিশেবে চিহ্নিত করে, ১৭৯০ সালের আইনে তাদের জমিদারি কেড়ে নেয় এবং ‘সুরক্ষা’র নামে শোষণ চালায়। শোরের এই স্তবক দুটো তাই ঔপনিবেশিক রাজস্ব নীতির লিঙ্গ-ভিত্তিক শোষণ-কাঠামোর প্রয়োগবাদী দলিল — যেখানে ইংরেজ আইনি দর্শন ও সামাজিক মনস্তত্ত্বকে ব্যবহার করে নারী জমিদারদের সম্পত্তি হরণের আইনি অজুহাত তৈরি করা হয়েছিল, যদিও তারা প্রমাণ করেছিলেন যে তারা পুরুষদের তুলনায় কম যোগ্য ছিলেন না।

অর্থাৎ উপনিবেশের প্রথম ৩ দশকের মধ্যেই বিপুল নারী জমিদারদের দমন আর নারীদের সম্পত্তির অধিকার কাড়ার ব্রিটিশ কৌশল হল ‘অযোগ্যতা’ তৈরি করে সম্পত্তি হরণ প্রকল্প রূপায়ণ। শোরের এই স্তবক দুটো নারী অধিকার হরণের ঔপনিবেশিক কৌশলের চার ধাপের অংশ ছিল। প্রথম ধাপ ছিল নারী জমিদারদের ‘অযোগ্য’ দাগিয়ে দেওয়া (শোরের ১৯০ স্তবক)। দ্বিতীয় ধাপ ছিল হ্যালহেডের হিন্দু আইন-এ সতীপ্রথাকে বৈধতা দেওয়া (যদিও বাংলায় তখন সতীপ্রথা ছিল না)। তৃতীয় ধাপ হল ১৭৮৪ সালে বর্ধমানের রাণী বিষ্ণুকুমারীর ঘটনার পর সার্বিকভাবে মহিলাদের সম্পত্তি অধিকার কেড়ে নেওয়া। চতুর্থ আর শেষ ধাপ — কোর্ট অব ওয়ার্ডস তৈরি করে মহিলা জমিদারিদের বাজেয়াপ্ত করা (১৭৯০-এর দশক)। এই চার কৌশলে ব্রিটিশ প্রশাসন ‘সুরক্ষা’র নামে শোষণ চালায় — নারী জমিদারদের ‘অক্ষম’ দাগিয়ে দিয়ে তাদের অধীনে থাকা সম্পত্তি প্রশাসন নিজের হাতে তুলে নেয়।

পাঠকের জন্য ১৭৫০-১৮০০ সময়কালের ২৫ নারী জমিদারদের খসড়া তালিকা দিয়ে রাখলাম

মহিলা জমিদারদের নাম তিনটে প্রধান স্তরে ভাগ করেছি

ক) বিশেষ পরগনা ও ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখিত নারী জমিদার এই বিভাগে মূলত স্থানীয় ইতিহাস, রাজবংশীয় বৃত্তান্ত, লোকশ্রুতি অনুযায়ী গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরা স্থান পেয়েছেন। তাঁরা শাসন, প্রতিরোধ দুই ক্ষেত্রেই সক্রিয় ছিলেন।

মন্নুজান বেগম (হুগলি ও যশোর) — সৈয়দপুর এস্টেটের দানবীর ও অত্যন্ত প্রভাবশালী নারী জমিদার। একাধিক সূত্রে তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার উল্লেখ রয়েছে।

সন্তোষপ্রিয়া দেবী (তমলুক অঞ্চল) — তমলুক অঞ্চলের জমিদারি এস্টেটের সাথে যুক্ত, যিনি জমিদারি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন বলে জানা যায়।

কৃষ্ণপ্রিয়া দেবী (মহিষাদল রাজপরিবার) — রাজপরিবারের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সক্রিয় ভূমিকা রাখা মহীয়সী নারী জমিদার।

রাণী শিরোমণি (মেদিনীপুরের কর্ণগড়) — চুয়াড় বিদ্রোহের কিংবদন্তি নেত্রী, যিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

খ) গৌতম কুমার দাসের গবেষণায় দেবী চৌধুরাণী পরম্পরা

জয়মণি দেবী চৌধুরাণী

অনঙ্গ মঞ্জরী দেবী চৌধুরাণী

গঙ্গা সুন্দরী দেবী চৌধুরাণী

সারদাময়ী দেবী চৌধুরাণী

চণ্ডী দেবী চৌধুরাণী

পবিত্র দেবী চৌধুরাণী

জগদীশ্বরী জয়দুর্গা দেবী চৌধুরাণী

শ্যাম সুন্দরী দেবী চৌধুরাণী

দু’জন জয়দুর্গা দেবী চৌধুরাণী

ভবতারিণী দেবী চৌধুরাণী

গ) প্রধান ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও রাজবংশীয় শাসক

এঁরা হলেন বাংলার ইতিহাসে সর্বাধিক পরিচিত ও আলোচিত নারী জমিদার, যাঁদের কর্তৃত্ব ও প্রতিরোধের কাহিনি বিশেষভাবে নথিভুক্ত।

রাণী ভবানী (নাটোর/রাজশাহী) — অর্ধবঙ্গেশ্বরী অষ্টাদশ শতকের সবচেয়ে শক্তিশালী জমিদার, পাঁচ দশক ধরে বিশাল অঞ্চল শাসন করেন।

রাণী জানকী দেবী (মহিষাদল) — মহিষাদল রাজবংশের স্বাধীনচেতা নারী শাসক, প্রশাসনিক দক্ষতার জন্য সুপরিচিত।

রাণী সরস্বতী এবং লক্ষ্মী (দিনাজপুর) — কোম্পানির শোষণ ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াই করা দিনাজপুর রাজবংশের অভিভাবক জমিদার।

রাণী জয়দুর্গা দেবী (দিনাজপুর রাজপরিবার) — দিনাজপুরের ইতিহাসে ভিন্ন একটি পর্বে জমিদারি পরিচালনায় এবং ব্রিটিশ বিরোধী রংপুরের লড়াইএর নেতৃত্বে ছিলেন।

মহারাণী বিশ্বেশ্বরী দেবী (নাটোর) — রাণী ভবানীর পরবর্তী পর্যায়ের নাটোরের শাসক।

রাণী সারদা সুন্দরী দেবী ও রাণী ভুবনময়ী দেবী (পুঠিয়া) — পুঠিয়া রাজপরিবারের নারী শাসক।

রাণী ব্রজসুন্দরী দেবী (নলডাঙ্গা) — নলডাঙ্গা রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ নারী ব্যক্তিত্ব।

রাণী ত্রিপুরা সুন্দরী (দিনাজপুর) — ১৮০১ সালের ঠিক শুরুতে রাধানাথের মৃত্যুর পর দিনাজপুরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, যা সময়কালগতভাবে ১৮০০ সালের সীমানা ছুঁয়েছে।

ইতিহাসের ফাঁকে যাঁরা বিলীন

আমরা যে এই নাম উদ্ধার করলাম, সেটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু যথেষ্ট নয়, কারণ উপনিবেশিক রেকর্ড ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাসে তাঁদের উপস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে অস্বীকার করেছে। আজও বড়ভাবে খুঁজতে হবে। ইন্দ্রাণী চ্যাটার্জী একে কালেক্টিভ এমনেশিয়া বলছেন।

১. উপনিবেশিক প্রশাসনের অক্ষমতা — ব্রিটিশ শাসকরা নারী জমিদারদের অপ্রাপ্তবয়স্ক বা অক্ষম বলতে পছন্দ করত। কারণ, নারীরা যদি প্রশাসনের দাবি বুঝে রাজস্ব নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতেন (মন্নুজান বেগম), তবে তাঁদের কর্তৃত্বকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করে জমিদারি দখলের সুযোগ কমত। অন্যদিকে, রাণী ভবানী, জয়দুর্গা চৌধুরাণী বা রাণী শিরোমণির মতো ব্যক্তিত্বরা কোম্পানির বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।

২. জাতীয়তাবাদী ইতিহাসের নীরবতা — রণজিৎ গুহ থেকে শুরু করে পরবর্তী ইতিহাসবিদরা জমিদারি আন্দোলন লিখেছেন, কিন্তু নারী জমিদারদের অন্তর্ভুক্তি প্রায় শূন্য। নারীদের একজনও জমিদারি ভোগ করলে তাঁকে ব্যতিক্রমী বা নিষ্ক্রিয় বলা হয়েছে, যদিও বাস্তবে তাঁরা সক্রিয় শাসক ছিলেন। যেমন রাণী জানকী দেবীর সেনাবাহিনী বা রাণী সরস্বতী পুরুষ উত্তরাধিকারীর অভাবে নয়, বরং নিজস্ব দক্ষতায় রাজ্য চালাতেন।

এই তালিকা প্রমাণ ১৭৫০-১৮০০ সালের বাংলা নিরবচ্ছিন্ন পুরুষতান্ত্রিক অঞ্চল ছিল না, বরং নারীরা জমিদারি সিংহাসনে বসে যুদ্ধ, প্রশাসন ও অর্থনীতি পরিচালনা করতেন। রাণী শিরোমণি চুয়াড় বিদ্রোহের নেত্রী হয়েছিলেন, আবার মন্নুজান বেগম হয়েছিলেন দানবীর।

ইতিহাস নতুন করে লিখতে হবে – আমাদেরই লিখতে হবে।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন