“মিনু চুপ, কথা বলতে দাও!!”…..চুপ তো দূর সে সমানে মিয়াও মিয়াও করেই যাচ্ছে।
সাল তারিখ আজ আর মনে নেই। কোন একবার দিল্লি গিয়ে তসলিমার বাড়িতে আড্ডা দিচ্ছি। ওর বিড়াল মিনু যে আমাকে চিনতো না এমন নয় কিন্তু সেদিন কোনো কারনে কথাই বলতে দিচ্ছে না। তসলিমা কয়েকবারই ‘অ্যাই মিনু যা….যা!’ …. কিন্তু সে মিয়াও মিয়াও করে এমন ব্যস্ত করছে যে কোনো কথা শুনছে না। শেষে বিরক্ত হয়ে ‘দাঁড়া তো’বলে মেইন দরজাটা খুলে দিলো তসলিমা।
আমি বললাম, “ওতো চলে গেল! বাইরে বার করে দিলে কেন!”
“না না …..ও কোথায় যাবে — বাইরে সিআরপিএফ-রা আছে ওদের সঙ্গে খেলা করবে।”
“সিআরপিএফদের সঙ্গে খেলা করবে!”….আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম!
“হ্যাঁ ওদের কাছে থাকে তো। ওদের সঙ্গে ওর খুব ভাব। খেলাধুলো করে!”
আমি দিল্লী গেলে কাজে কিংবা অন্য দরকারে একটা দিন দুপুর বা সন্ধ্যা তসলিমার বাড়িতে কাটাই। ও বহু রকম রান্না করে। আমি পেটুক মানুষ খেতে ভালোইবাসি। তসলিমাও খেতে ভালোবাসে। আবার খাওয়াতেও পছন্দ করে।
কখনও কখনও এটাও বলে, তুমি অমুক জায়গায় এসো। সেখানে হয়তো কোনো এক্সিবিশন বা কিছু হয়তো চলছে। তারপর বলে, ‘চলো প্রেস ক্লাবে যাই। ওখানেই বসি।,’ ওখানে গিয়ে একটু খাওয়া দাওয়া হয়। আড্ডা জমাতে তসলিমার বন্ধু, আমার বন্ধু-বান্ধব মিলে দু-তিন জন পাঁচ-জন অবধি নানা গল্প কথা জমে ওঠে। তারপর ও আমাকে বঙ্গভবনে ছেড়ে বাড়ি চলে যায়।
তসলিমার সঙ্গে আলাপ আনন্দবাজার পত্রিকা সূত্রেই…. কিন্তু আমি ওর সঙ্গে যোগাযোগের সেতুটা বাড়িয়েই চলেছিলাম। কারণ আমার সবসময় মনে হত একটি মেয়ে কিছু লেখালিখির জন্য দেশ ছেড়ে তাকে সারা পৃথিবীতে রিফিউজির মত ঘুড়ে বেড়াতে হচ্ছে। এটা আমাকে অবাক করতো। ফলে ও কি লিখলো, কেন লিখলো, কার বিরুদ্ধে লিখলো, কি ফতোয়া এসব নিয়ে আমার মাথাব্যথা ছিলো না।
আমরা যারা নিজের দেশে থাকি সেখানে মানুষের সঙ্গে মতের মিল অমিল যাই হোক না কেন তবু আমরা এই মাটিতেই পা দিয়ে হাঁটি। এই মাটির মানুষদের সঙ্গে কথা বলি। দুঃখ-কষ্ট যাই হোক এখানেই কাটিয়ে দিচ্ছি জীবন…. কিন্তু তসলিমা?
মা-বাবা পরিবার-পরিজনহীন হয়ে মৃত্যু ফতোয়া থেকে বাঁচতে আজ এদেশ কাল ওদেশ করতে হচ্ছে …. এই যে চাপা দুঃখ যেটা থেকে বেরোনো ক্ষোভটা ও ওর কাছের মানুষদের কাছে উগড়ে দিত।
আজ অবধি ওর যত ছবি তুলেছি বা ও আমাকে সুযোগ দিয়েছে তাতে এইরকম একটি মেয়ের ছবি তুলতে পেরেছি এরজন্য আমার নিজেকে ভাগ্যবানই মনে হয়।
কলকাতায় ওর সারা জীবনটাই কাটিয়ে দেবার ইচ্ছে ছিলো। এটা বলতে বাধা নেই রাজনৈতিক অঙ্কই ওর এখানে বসবাসের অন্তরায় হয়ে গেছিলো …. আসলে যার ভাগ্যের চাকা বারবার বয়ে আনে বিতর্কের ধোঁয়া তখন নির্বাসনের অভিশাপই বোধহয় নিয়তি হয়ে দাঁড়ায়। এ ভারি জটিল অঙ্ক।
“কলকাতায় থাকলে আমি বাংলাদেশের গন্ধ পাই। আমার দেশের কত মানুষের সঙ্গে কথা হয়। দেশটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। জানো অশোক, আমার পাশে আমার সাথে থাকা কোনো সাহিত্যিকই আমাকে সাপোর্ট করলো না।”…. এসব কথায় তসলিমার হতাশা বোঝা যেত।
“সুনীলদা আমার বিরুদ্ধে এরকম বললো যে, ওকে রাখা যায় না!” ….আমি দেখেছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, আবুল বাশার এদের উপর ওর একটা অসম্ভব অভিমান জন্মে আছে। তসলিমা যখন আড্ডার ছলে এগুলো বলতো আমি নীরব থাকতাম…. কি বলবো আমি? কি হয় এর উত্তর? তসলিমা যাদের কথা বলছে, তারা বাংলা সাহিত্যের অনুরক্ত প্রত্যেকের কাছে খুব খুব মর্যাদার আসনের অধিকারী….
“সিপিএম-রা তো একটা অছিলায় তাড়িয়েই দিলো। পালাবদলের পর তুমি জানো অশোক, আমি সরকারীভাবে কত চিঠি মমতাকে দিয়েছি? সাতখানা। উনি একটা চিঠিরও উত্তর দেননি। উনি দেশের ভালো করবেন…. এটা নিয়ে কিছু বলার নেই। কিন্তু একটা মেয়ে হিসাবেও কি আমার সঙ্গে একটা কথা বলা যেত না? আমি তো শরণার্থী…. আশ্রয় চাইছি….; আচ্ছা অশোক, তুমি তো ক্যামেরা নিয়ে সবসময় ওনার পিছনে ঘুরে বেড়াও; তো বলতে পারো না যে আমি ওয়েস্ট বেঙ্গলে থাকতে চাই। তুমি জানো কলকাতাতেও না থাকতে পারাটা কত দুঃখ কত কষ্ট দেয় আমায়?”
এমন প্রসঙ্গের ওজনের ভারে আমার বলার কি থাকতে পারে? তবে একটা কথার উল্লেখ না করলেই নয়। তখনও আমি আনন্দবাজারেই, সম্ভবত বারো কিংবা তেরো সাল হবে। সুন্দরবন বা গঙ্গাসাগর কোথাও একটা সরকারী ট্যুরে লঞ্চে সফর করছি। কোনো কথায় তসলিমার প্রসঙ্গ উঠেছে। সেখানে এক সিনিয়র সাংবাদিক হঠাৎ বলে ওঠেন, “দিদি তসলিমার কথা বলছো? ওই যে ওইযে দাঁড়িয়ে আছে ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলছে, ও সব জানে। তসলিমার বন্ধু। দিল্লীতে যায়। কত ছবি ওর আছে!”
বর্তমানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মুখটা ফিরিয়ে আমাকে দেখে বলেন, “এই তোর সাথে তসলিমার এত ভাব?”
“হ্যাঁ, আনন্দবাজারে নিয়মিত লেখে…. ওর বই আছে। ও লেখক। সারা বিশ্ব জুড়ে নাম। বিশ্বজুড়েই ঘুরে বেড়ায়। আমি আনন্দবাজারে কাজ করি। ছবি তো তুলতেই হয়। আর দেখো, ও কি লিখেছে? কার বিরুদ্ধে লিখেছে? রাজনৈতিক কি সমীকরণ হয় ওসব আমি ওত বুঝিনা; দেখিও না। আমি একটা মেয়ে বাঁচার জন্য পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয় তারজন্য আমি এক্সট্রা ছবি তুলে রাখি।”….আমার দিকে একটু অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে গেলেন।
একথাও আমি তসলিমাকে বলেছি। তবুও ওর ক্ষোভ ছিলো…. “এত ঘুরে বেড়াও, বোঝাতে পারো না?”
এমন একবারও হয়নি দিল্লীর প্রেসক্লাব বা যেখানেই বসে গল্প হয়েছে তসলিমার সঙ্গে, ও কলকাতায় ফেরার কথা বলেনি। পশ্চিমবাংলায় থাকার আকুতি জানিয়েছে। অন্তত বুক ফেয়ারে আসতে পারে, এটাও বহুবার ওর দিল্লীর বন্ধুবান্ধবও আমাকে বলেছে। এইসব যে কত মর্মবেদনা সেটা আমি যে বুঝতাম না তা নয়। কিন্তু সারাজীবনে আমি এই সূক্ষ্ম মননকে অনুধাবন করেছি বলেই হয়তো তসলিমা আমাকে ডাকতো…. “খেয়ে যাও, এখানে এসো, ওখানে চলো”…. এসব বলার মত বন্ধুত্ব হয়েছিলো।
তসলিমা ফিরে আসছে। দু-একদিন হয়তো থাকবে। অনেককিছু অনুষ্ঠান সংবর্ধনা হবে। ওর ভালোলাগার সঙ্গে আমরাও অনেকে সহমত। আনন্দ আমারও হচ্ছে। যারা এর পিছনে আবার রাজনৈতিক হিসাব মেলাতে চাইছেন তাদের অনুরোধ আপনারা এর মধ্যে ঢুকবেন না। পারলে একটা নির্বাসিত মেয়ের সাথে থাকুন।
আমি রাজনৈতিকভাবে বিষয়টা বুঝতে চাইছি না। কারা আনেনি, কারা তাড়িয়ে দিয়েছে, কারা আনতে চাইছে…. এসব চলতেই থাকবে। অনেক কিছু রাজনৈতিক রং দেখা হবে। বেশ কিছু লেখা পড়েওছি। কিন্তু ওর এই আসাটা রাজনৈতিক যোগ বিয়োগের অনেক অনেক বাইরে শুধু একটা মেয়ের বহু আকাঙ্ক্ষিত আশাটুকু জিয়ন কাঠির মত প্রাণ পাবে হয়তো।
তসলিমা কলকাতায় ফিরছে মানে তার দেশের ছোঁয়ায় ফিরছে। ভাষার আঁচলে ফিরছে। তার এই আনন্দটুকুর রাজনৈতিক ব্যাখ্যার গভীরতায় গিয়ে বিশ্লেষণ না করে আসুন আমরা তাকে সাদরে বরণ করে নিই। সারাজীবনের ওর দুঃখ কষ্ট একটু বুঝি। থাক না রাজনীতি দূরে।
কলকাতায় তসলিমা দু-একদিন হয়তো থাকবে। কিছু অনুষ্ঠান সংবর্ধনা হবে। নিঃসন্দেহে ওর কাঙ্ক্ষিত ভালোলাগার মুহূর্ত ভাগ করে নিতে আমরা অনেকেই ওকে দেখতে যাবো। এবং আশা করি তসলিমার আরেকটা দুঃখও মিটে যাবে। সামনের বুক ফেয়ারেও কলকাতা আসতে পারবে। তাছাড়া যখন সে এখানেই থাকতে চায় তখন বর্তমান সরকারের কাছে আমার অনুরোধ তসলিমার যাবতীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করেই ওকে এখানে থাকতে দেওয়া হোক।
তসলিমা জানে সে আর কখনোই বাড়ি ফিরতে পারবে না। ফিরলেই তাকে হয়তো মেরে ফেলা হবে। তাই সে থাকতে চায় কলকাতায়। বাংলাদেশ নাহোক কলকাতাই নাহয় আবার ফিরিয়ে দিক ওর দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড।
এখানে থেকেই সে বাঁচুক, সে স্বপ্ন দেখুক, ক্ষীণ হলেও আশা রাখুক যদি একবার পা ছোঁয়াতে পারে তার প্রিয় বাংলাদেশে…. যে মাটির গন্ধে সে বড় হয়েছে। যে মাটি তার জন্মভূমি। ত্রিশ বছর কেটে গেলেও যদি একবার ফিরতে পারে….
পোস্টের এই ছবিটি দিল্লী প্রেস ক্লাবে আমারই একসময়ের সহকর্মী বন্ধু শুধু নয় কবি ও সাহিত্যিক অগ্নি রায়ের তোলা। তসলিমার মত লেখিকার সঙ্গে ছবি থাকবে না এটা তো হয়না। কিন্তু অগ্নির তোলা এই ছবিটি আমার খুব পছন্দের। শেষ করছি কবিগুরুর দুটি লাইন দিয়ে যা তসলিমার নির্বাসনের জীবনের ভাবনার সঙ্গে একাত্ম হতে পারবেন….
আমার যা ছিলো, ফাঁকি দিয়ে নিতে
সবাই করেছে একতা,
বাকি যে এখন কত আছে ধন
না তোলাই ভালো সেকথা।
ভালো লিখেছেন এক দেশহীন ঘরহীন এক সত্যবাদিনী মেয়ের কথা। আমরাও চাই উনি ফিরে আসুন বাংলার মাটিতে পরদেশ হলেও মাতৃভাষায় লালিত স্বদেশ প্রিয়জনের কাছে। নৈকট্য হোক বাংলার জল মাটি আকাশ আর আপনত্বের সাথে। ভালো থাকুন অন্তত বাঙলাভাষার আঁচলের সুবাস জড়িয়ে।