৫৫. প্রথম বাঙালি পক্ষীবিদ সত্যচরণ লাহা
বইটির নাম ‘পাখীর কথা’। ১৩২৮ সনে এই বই প্রকাশ করেছিলেন বেঙ্গল বুক কোম্পানি। বাংলা ভাষায় পাখিদের নিয়ে প্রথম বই। এই বইএর ভূমিকায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন :
‘শ্রীযুক্ত বাবু সত্যচরণ লাহা এম.এ, বি.এল মহাশয় যে ‘পাখীর কথা’ বলিয়া বই লিখিয়াছেন, সেখানি অতি অপূর্ব্ব। উহার তিন ভাগ : প্রথম খাঁচার পাখী ; দ্বিতীয় রাষ্ট্রসমস্যা ও পক্ষিতত্ত্ব; তৃতীয় কালিদাসের বিহঙ্গতত্ত্ব। বাঙ্গালায় এরূপ বই একেবারেই নাই। সত্যবাবুর নিজের পাখী পোষার সখ আছে। তিনি পাখী পোষেন, পাখীর চিড়িয়াখানা রাখেন। অবসর সময়ে নিজেই পাখীর সেবা করেন, দেশ-বিদেশ হইতে পাখী সংগ্রহ করেন এবং পাখীর রঙ্গীন ছবি আঁকান এবং সংগ্রহ করেন। সুতরাং তিনি পাখীর বিষয়ে কোন কথা বলিলে আমাদের মন দিয়া শোনা আবশ্যক।’
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মশায় এই বইএর তৃতীয় ভাগ সম্বন্ধে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তৃতীয় ভাগে ছিল কালিদাসের বিহঙ্গতত্ত্ব। শাস্ত্রী মশায় লিখেছিলেন :
‘সত্যবাবু অনেক দিন ধরিয়া বিজ্ঞানমতে পাখী লইয়া নাড়াচাড়া করিতেছেন। কিন্তু তিনি যে কালিদাসকে বুঝিবার ও বুঝাইবার জন্য এত চেষ্টা করিবেন বুঝিতে পারি নাই।’
১৩৪০ সানে গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় অ্যাণ্ড সন্স থেকে প্রকাশিত হয় সত্যচরণ লাহার বই ‘কালিদাসের পাখী’। কালিদাসের কাব্য ও নাটকে কোন কোন পাখির উল্লেখ আছে লেখক তার আলোচনা করেছেন :
।। মেঘদূতে : হংসপ্রব্রজন, রাজহংস ও চক্রবাক, বলাকা ও সারস,শিখী ও সারিকা, চাতক, পারাবত ও গৃহবলিভূক।।। ঋতুসংহারে : হংস, রাজহংস ও কাদম্ব, ক্রৌঞ্চ ও কারশুব, কোকিল-শিখী-শুক।।। রঘুবংশে ও কুমারসম্ভবে : হংস, সারস-ময়ূর-চাতক, হারীত ও পারাবত, গৃধ্র-শ্যেন-কুবরী।।। নাটকে : হংস, পরভৃত ও চাতক, সারস-কারশুক-শুক-পারাবত, ময়ূর-গৃধ্র-কুবরী।
সত্যচরণ লাহার (১৮৮৮-১৯৮৪) জন্ম উত্তর কলকাতারা কৈলাস বসু স্ট্রিটের (৫০এ) লাহা পরিবারে। সেকালের এক নামকরা পরিবার। তাঁর পূর্বপুরুষ দুর্গাচরণ লাহা ছিলেন বিখ্যাত জমিদার। তাঁর বাবা অম্বিকাচরণ লাহা ছিলেন আইনজীবী। পাখির শখ সত্যচরণের ছোটবেলা থেকে। একদিন তাঁর বাবার সলিসিটার বন্ধু শিশু সত্যচরণকে কয়েকটি পাখি উপহার দেন। অম্বিকাচরণকে তিনি সত্যচরণের জন্য একটি পক্ষীশালা তৈরি করে দিতে অনুরোধ করেন।
পাখিদের সঙ্গে খেলা করতে করতে সত্যচরণ লেখাপড়ার চর্চাও করে যাচ্ছিলেন। প্রথমে পড়েন মেট্রোপলিটান কলেজে। তারপরে প্রেসিডেন্সি কলেজে। ইতিহাসে এম এ পাশ করেন। তারপরে আইন নিয়ে বি এল ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় কলকাতার ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিক্যাল ইন্সটিটিউটের কোষাধ্যক্ষ হিসেবে।
প্রথাগত পড়াশুনো এবং চাকরির মধ্যেও পাখি নিয়ে পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা অব্যাহত ছিল। ঘুরে বেড়াতেন নানা স্থানে। পাখি দেখতেন। খাঁচার মধ্যে পাখিকে বন্দি করে তার আচরণ পর্যবেক্ষণের পক্ষপাতী ছিলেন না তিনি। বনে-জঙ্গলের বিচিত্র রকম পাখির আচার-আচরণ, বাসা তৈরির কৌশল, বাচ্চা প্রতিপালন ইত্যাদির নোট রাখতেন। পুরুলিয়ার পাখিদের নিয়ে তাঁর একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায়। পরবর্তীকালে ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘মর্মবাণী’, ‘বোম্বে জার্নাল অব ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ ‘এভিকালচার’, ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব এভিয়ান সায়েন্স’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর প্রবন্ধ।
পক্ষীবিদ আসলে ছিলেন পক্ষীপ্রেমিক। তাঁর ছিল একটি চমৎকার পক্ষীশালা। সেখানে দিশি প্রজাতির সঙ্গে ছিল বহু বিদেশি প্রজাতির পাখি। সেই পক্ষীশালার রক্ষণাবেক্ষণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতেন তিনি। সত্যচরণের পক্ষীচর্চা সেকালের বিজ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীদের উপর কিছুটা হলেও প্রভাব ফেলেছিল। প্রসঙ্গত মনে আসে বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের কথা। ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় আচার্য রায়ের ‘বাংলা ভাষায় নূতন গবেষণা’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন :
‘ইচ্ছা হইল একবার সচক্ষে তাহা ভালো করিয়া দেখিয়া আসি। যে পক্ষীভবন (Aviary) তাঁহার সযত্ন সংগৃহীত উদ্যান মধ্যে পালিত হইতেছে তাহা দেখিবার জিনিস। যে লতাকুঞ্জের অভ্যন্তরে ময়ূরগুলি বিচরণ করিতেছে, তাহা দর্শকের চক্ষু এড়াইতে পারে না। পুষ্পভবনে বিচিত্র বিদেশি পরগাছা (Orchid) শোভা পাইতেছে। স্বতন্ত্র বড় বড় পিঞ্জরে ছোট বড় পাখি সেবা পাইতেছে।’
১৮৮৪ সালে মারা যান সত্যচরণ। তারপর তাঁর সাধের পক্ষীশালা অবহেলার শিকার হয়। তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা বহু ফটো, পত্রিকা ও অন্যান্য দ্রষ্টব্য বস্তু লুপ্ত হতে থাকে। তাই ‘বঙ্গদর্শন’ পত্রিকায় সিমন রায় ক্ষোভের সঙ্গে লিখেছেন :
“যেহেতু বেশিরভাগ লেখা ইংরেজিতে লিখেছিলেন তাই তথাকথিত জনপ্রিয়তা বলতে যা বোঝায় তা অর্জন করতে পারেন নি সত্যচরণ লাহা। নীরবেই কাজ করে গিয়েছেন। পুরস্কার, উপাধি, খেতাব পাওয়া সত্ত্বেও আজও বাঙালি মানসে তিনি বিস্মৃত। ‘জাহাঙ্গীরের স্বর্ণমুদ্রা’ গল্পে সত্যজিৎ রায় উল্লেখ করলেন সালিম আলির কথা, উল্লেখ করলেন তাঁরই পাশে আর এক বাঙালি পক্ষীবিদ অজয় হোমের কথাও। অথচ অজয় হোমের জন্মের ২৫ বছর আগে জন্মানো সত্যচরণের কথাই কি তাঁর সর্বাগ্রে উল্লেখ করা উচিত ছিল না! এ প্রশ্নটা থেকেই যাবে।’