| | |
এই মুহূর্তে ::
গড়িয়াহাট কি ছিল অলস, অকর্মণ্য বলদের হাট : অসিত দাস চলচ্চিত্র অভিনয়ের সংজ্ঞা ছিলেন উত্তম : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আমার প্রিয় গল্পগুলো : নুসরাত সুলতানা ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার কবিদের লেখনীতে শরৎ ঋতু : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিঝুম রাতের পাড়ি : সুব্রত দত্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৫০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ জলবায়ূ দুর্যোগ কোনো সীমান্ত মানে না : নিকোলাস বিশ্বাস জিয়াউর রহমানের বিএনপি গঠন ও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ : অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার রবীন্দ্রনাথ ও বঙ্গপুঙ্গবের রাখী : অসিত দাস কবরের মানুষ : সোহেল আর রানা (তরু) আজ রাখী বন্ধন…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ নিম্নচাপের বৃষ্টিতে নষ্ট সবজি, আকাশ ছোঁয়া দামে নাজেহাল মানুষ : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় রামযাত্রার মাঠ ফাঁকা : অয়ন মুখোপাধ্যায় যাদবপুরের যাদবদের গোপালনের ইতিহাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাম নামে কাম নাই, আমিই তো রাম : দিলীপ মজুমদার তৃষিত মাঠের খসড়া : বিশ্বজিৎ মণ্ডল ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মাঠের মাছ ও একটি ঢ়োড়া সাপের গল্প : সুব্রত দত্ত রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছর — সমস্যা সমাধানে চ্যালেঞ্জ ও বাস্তবতা : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৪৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ রাখি পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ১৯৪ Views জন পড়েছেন
আপডেট শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

[আমি আর আলাদা করে টিকা জুড়ছি না  —  টিকার বহরের তুলনায় শোরের মূল টেক্সটের পরিমান কমছে। প্রত্যেকটা স্তবকের আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা না দিয়ে গোটা কিস্তির টিকার সারাংশ করে দেব। পড়ে যদি কোনও দিন বই হয়ে বেরোলে সেখানে বিস্তৃত টিকা থাকবে।

৩০ কিস্তির সবকটা স্তবক বাংলার জনসংখ্যা, মুদ্রা ও রাজস্ব কাঠামোর সংকটের আন্তঃসম্পর্কিত পতন নিয়ে শোরের গভীর বিশ্লেষণ আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি জেমস গ্র্যান্টের ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ তত্ত্বের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক প্রমাণ ব্যবহার করে দেখিয়েছেন যে ব্রিটিশ শাসন কীভাবে বাংলার অর্থনীতিকে ক্রমশ দুর্বল করেছে। শোর শুরু করেছেন ১৭৭০-এর মন্বন্তর ও জনসংখ্যা নিয়ে। তিনি দেখাচ্ছেন ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের পর উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি হ্রাস পেয়েছে, এবং বেঁচে যাওয়া কৃষকদের ওপর অতিরিক্ত রাজস্ব বোঝা চাপানো হয়। গ্র্যান্ট লবণের ব্যবহার বৃদ্ধিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, কিন্তু শোর এই যুক্তিকে অসম্ভব ও অনুমাননির্ভর বলে উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন বিপুল-বিশাল দুর্ভিক্ষের পর জনসংখ্যা পুনরুদ্ধারে আঠারো বছর অপর্যাপ্ত, এবং জমিদারদের সর্বত্রই দরিদ্র অবস্থা প্রমাণ করে যে কৃষি-অর্থনীতি খাদে পড়ে রয়েছে। শোর দুপর্বে বাংলা থেকে অর্থ-পাচার দেখিয়েছেন প্রথমবার সুজা খানের সুবাদারিত্বের সাড়ে দশ বছরে আর দ্বিতীয়বার ১৭৬৫-র পর। সুজা খানের আমলে বাংলা থেকে দিল্লিতে ৮ কোটি ১২ লাখ টাকা নগদে গিয়েছিল — অর্থাৎ বার্ষিক প্রায় ১ কোটি টাকা (প্রায় ১০.৫ লাখ পাউন্ড)। কিন্তু সেই সময় বাংলার মুদ্রার প্রচলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, কারণ বিপুল বাণিজ্যে সমতুল্য অর্থ ফিরে আসত। বার্নিয়েকে উল্লেখ করে তিনি বলছেন বাংলার সমৃদ্ধির প্রমাণ উত্তর ভারত, পারস্য উপসাগর ও মালাবার উপকূলে বিস্তৃত বাণিজ্য। কিন্তু ১৭৬৫-র পর পরিস্থিতি পালটে যায় — কোম্পানি বাণিজ্য বাংলায় আর সমতুল্য অর্থ আমদানি করে না [যে উদ্বৃত্ত নিয়ে যায় ইংলন্ডে], অন্য বিদেশি কোম্পানি খুব কম নগদ অর্থ আমদানি করে, এবং হিন্দুস্তানের অন্য অংশ থেকেও বাংলায় নগদ মুদ্রা আসে না – কারন কোম্পানি বাংলা বাণিজ্য থেকে অন্যদের হঠিয়ে দিয়েছে। শোর মুদ্রা সংকটের  চিত্র তুলে ধরে বলছেন গত পঁচিশ বছরে — বিশেষ করে শেষ দশকে — বাংলা থেকে বিপুল নগদ বাইরে চলে গেছে। শুধু হুণ্ডিতেই নয়, সরাসরি নগদও পাঠানো হয়েছে চীন, বোম্বাই, মাদ্রাজ, ইংল্যান্ডে। স্বর্ণমুদ্রার বাট্টা (discount) অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে — শোর বলছেন মূল কারণ রূপোর ঘাটতি — বাংলায় রূপোর পরিমাণ কমেছে। তিনি সতর্ক করে বলছেন কোম্পানি যখন তার ঋণপত্র পরিশোধ করবে, মুদ্রার লেনদেন ব্যবস্থা আরও দুর্বল হবে, যা দীর্ঘমেয়াদে বাংলায় ব্রিটিশ স্বার্থেরও ক্ষতি হবে। শেষে রাজস্ব কাঠামোর জটিলতা আলোচনা করেছেন তিন মৌলিক তথ্যের অভাব সূত্রে — কৃষকদের প্রকৃত খাজনার হার, জমিদারদের প্রকৃত আদায়, এবং হস্তান্তরিত জমির বিবরণ। বাংলার কৃষকদের ওপর ধার্য কর ফসলের অর্ধেক — এমনকি এক-তৃতীয়াংশও হলে সেই আদায় সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে। জমিদাররা অতিরিক্ত লাভ করছেন না; তারা ঋণগ্রস্ত ও অভাবী, এবং তাদের হাতে থাকা অর্থ মোট আদায়ের এক-দশমাংশের বেশি নয়। রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক কারসাজি ও অনিয়ম চলে, যা দূর করলে খাজনার ক্ষেত্রে সাম্য আনা সম্ভব, কিন্তু রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে না। শেষে বলেছেন যে হস্তান্তরিত জমি পুনরুদ্ধার করলে রাজস্ব বৃদ্ধি সম্ভব, তবে এমন জমি এড়িয়ে চলতে হবে যার আয় বর্তমানে অন্যান্য জমির সরকারি খাজনা পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে। শোরের বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে ব্রিটিশ রাজস্ব নীতি কৃষক-জমিদার উভয়ের জন্য বিপর্যয়কর ছিল, এবং এই পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে বাংলায় ব্রিটিশ স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর হয়েছে। তাঁর এই ব্যাখ্যা গ্র্যান্টের রাজস্ব-বৃদ্ধির সুযোগ তত্ত্বের সরাসরি খণ্ডন — শোর প্রমাণ করেছেন যে বর্তমান রাজস্ব ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছেছে এবং তা কৃষক-জমিদার উভয়ের জন্যই অসহনীয়। — অনুবাদক]

১২৫. এমন কথাও বলা হয়েছে যে, ১৭৭০ সালে আদায়করা রাজস্বের পরিমাণ প্রমাণ করে যে সেই দুর্যোগের প্রভাব সাধারণ ধারণার চেয়ে কম মারাত্মক ছিল। যারা প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল, তাদের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝা চাপানো হয়েছিল; তবে শস্য আর জীবনধারণের অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির ফলে তারা সেই বোঝা বহন করতে সক্ষম হয়েছিল।

১২৬. সাধারণ পর্যবেক্ষণে এ বিষয় বেবাক স্পষ্ট যে বাংলায় জনসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে; কিন্তু এ বিষয়ে আমরা যে ধারণাই পোষণ করি না কেন, যুক্তিসঙ্গতভাবেই এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, ১৭৭০ সালের দুর্যোগের আগের তুলনায় বর্তমানে দেশের উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি কম।

১২৭. মিস্টার গ্রান্ট এই বক্তব্যের ঠিক বিপরীত মত পোষণ করেন এবং লবণের বর্ধিত ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে জনসংখ্যা বৃদ্ধির যুক্তি তুলে ধরেন।

১২৮. এই বক্তব্য এতটাই বেশি অনুমাননির্ভর পরিস্থিতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে যে, আমার মতে এর ভিত্তিতে কোনো সন্তোষজনক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ১৭৬৫ সালে লবণ উৎপাদন ও ব্যবহারের পরিমাণ নির্ভুলভাবে নির্ণয় করা অসম্ভব বলে আমি মনে করি। জনসংখ্যা বিষয়ক হিসাব-নিকাশ এবং পরবর্তী দুর্যোগগুলোর কারণে জনসংখ্যার যে হ্রাস ঘটেছিল তা বিবেচনায় নিলে, মোট জনসংখ্যার এক-পঞ্চমাংশ পুনরুদ্ধার হতে আঠারো বছরের সময়কালকে আমি অপর্যাপ্ত বলে মনে করি; অবশ্য এ বিষয়ে আমার গভীর জ্ঞান আছে বলে আমি দাবি করছি না।

১২৯. দ্বিতীয়ত, এটি একটা নিশ্চিত সত্য যে জমিদাররা প্রায় সর্বক্ষেত্রেই দরিদ্র। এই বক্তব্য নিয়ে যদি কোনো সন্দেহ থাকে, তবে রাজশাহী, বীরভূম, যশোর, নদীয়া, দিনাজপুর ও সালসিক্যার (Salsyka) জমিদারদের আর্থিক অবস্থার বিষয়ে অনুসন্ধান করা যেতে পারে — যদিও আমার বক্তব্য কেবল এই ক’জন জমিদারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিপরীতমুখী ইঙ্গিত এবং রাজস্ব বোর্ডের একজন সদস্যের সুনির্দিষ্ট দাবির — যেখানে বলা হয়েছে জমিদাররা অঢেল সম্পদ ও বিলাসিতায় মজে আছেন — প্রতিক্রিয়া হিসেবে ন্যায়বিচার ও মানবিকতার খাতিরেই এই কথা বলা প্রয়োজন।

১৩০. তবে আমি এই পরিস্থিতির জন্য আমাদের সরকারের অতিরিক্ত কর আদায় বা লুঠকে দায়ী করছি না; বরং অন্য কারণগুলোকে দায়ী করছি যা আমি পরবর্তী স্তবকগুলোতে তুলে ধরব এবং যা এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে প্রতীয়মান হবে। আমাদের কর আদায়ের মাত্রা যদি আরও সহনীয় হতো, তবে পরিস্থিতি এর বিপরীত হতো — এ বিষয়ে আমি মোটেও নিশ্চিত নই। [১৮২]

১৩১. তৃতীয়ত, কোম্পানি একই সাথে দেশের বণিক এবং শাসক — উভয় ভূমিকাই পালন করে। বণিক হিসেবে তারা দেশের বাণিজ্য একচেটিয়াভাবে নিয়ন্ত্রণ করে; অন্যদিকে শাসক হিসেবে তারা রাজস্বের ওপরও একইরকম কর্তৃত্ব আর মালিকানা ভোগ করে। রাজস্বের অর্থ ইওরোপে পাঠানোর ক্ষেত্রে তারা দেশের পণ্যই ব্যবহার করে, যা তারা নিজেরাই ক্রয় করে থাকে।

১৩২. রাষ্ট্রের উৎপাদিত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে (যদি ধরে নেওয়া হয় যে চাহিদা সত্যিই বেড়েছে) প্রজাদের কর্মতৎপরতা বা উৎপাদনশীলতা যেটুকু বৃদ্ধি পেয়ে থাকতে পারে, তার জন্য আমরা যতই ছাড় দিই না কেন — এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, দূরবর্তী কোনো বিদেশি শক্তির শাসনের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত কুফলগুলোর কাছে সেই সুফল ম্লান হয়ে যায়।

১৩৩. মি. গ্র্যান্টের ‘এনালাইসিস’ থেকে দেখা যায়, যে সব বিলের মাধ্যমে অর্থ পাঠানো হয়েছিল — যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ সম্ভবত নগদ মুদ্রায় (স্পেসি) পাঠানো হয়েছিল — সেগুলো বাদ দিলেও, সুজা খানের (শুজা-উদ-দৌলা) সুবাদারিত্বের সাড়ে দশ বছরের মধ্যে আট কোটি বারো লক্ষ টাকা নগদে দিল্লিতে পাঠানো হয়। আমি হয়তো অনুমান করতে পারি যে, উল্লিখিত সময়কালে বাংলা আর বিহার থেকে দিল্লিতে বার্ষিক নগদ স্থানান্তরের পরিমাণ ছিল প্রায় এক কোটি টাকা; এবং ব্রিটিশ মুদ্রায় এর মোট পরিমাণ দাঁড়ায় সোয়া দশ মিলিয়ন পাউন্ড (অর্থাৎ ১,০৫,০০,০০০ পাউন্ড)। ।

১৩৪. সেই সময়ে দেশে সম্পদের প্রাচুর্য যতই থাকুক না কেন, এটা স্পষ্ট যে — যেহেতু অর্থের প্রচলন বা প্রবাহে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার লক্ষণ দেখা যায়নি, তাই বিপুল পরিমাণ অর্থের এই বহির্গমন নিশ্চয়ই বিশাল আকারের আয় বা অর্থের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে পূরণ করা হয়েছিল; আর এই বিষয়টিই প্রমাণ করে যে, এই অর্থ বা পণ্য ফিরিয়ে আনার মাধ্যম হিসেবে তখন ব্যাপক বাণিজ্য প্রচলিত ছিল।

১৩৫. বার্নিয়ারের সময়কাল থেকে শুরু করে দেওয়ানি লাভের সময় পর্যন্ত পাওয়া যাবতীয় তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য — বিশেষ করে বাংলা ও হিন্দুস্তানের উত্তরাঞ্চল, মোরো উপসাগর (Gulf of Moro — ফিলিপাইনের সর্ববৃহৎ উপসাগর। মিন্দানাও দ্বীপের উপকূলে সেলেবেস সাগরের (Celebes Sea) অংশ), পারস্য উপসাগর এবং মালাবার উপকূলের মধ্যে — অত্যন্ত ব্যাপক ছিল। এই সব পথের মাধ্যমেই নগদ অর্থ ও পণ্যের আদান-প্রদান চলত; এছাড়া বিদেশি ইওরোপিয় কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে এবং পূর্বাঞ্চল থেকে আফিমের বিনিময়ে স্বর্ণরেণু বা স্বর্ণচূর্ণের মাধ্যমেও এই বিনিময় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতো।

১৩৬. কিন্তু ১৭৬৫ সাল থেকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত হয়ে গেছে। কোম্পানির বাণিজ্যের বিপরীতে সমতুল্য কোনো আয় বা পণ্য আর ফিরে আসে না। বিদেশি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নগদ অর্থ আমদানিও এখন কদাচিৎ ঘটে থাকে; কিংবা হিন্দুস্তানের অন্যান্য অঞ্চল থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলায় নিয়ে আসা হয়েছে।

১৩৭. গত পঁচিশ বছর ধরে — এবং বিশেষ করে এই সময়ের শেষ দশ বছরে — দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে নগদ অর্থ (মুদ্রা বা ধাতু-মুদ্রা) বাইরে চলে গেছে। যদিও সরকার ‘বিল’-এর (বিনিময়-পত্র) মাধ্যমে চীনে অর্থ প্রেরণের ব্যবস্থা করে থাকে, তবুও এটা সর্বজনবিদিত যে, সেই দায় মেটানোর জন্য বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থও বাইরে পাঠানো হয়েছে; একইভাবে, ‘শরাফ’ বা মুদ্রা-ব্যবসায়ীদের বিলের মাধ্যমে বোম্বাই ও মাদ্রাজে পাঠানো অর্থের একটা বড় অংশ বস্তাবন্দী অবস্থায় উপদ্বীপের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে পরিবাহিত হয়। ব্যক্তিপর্যায়েও ইওরোপে রৌপ্য-পিণ্ড (সিলভার বুলিয়ন) পাঠানো হয়ে থাকে; এর সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা সম্ভব নয়, তবে কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর থেকে এই পরিমাণ নিশ্চয়ই অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ছিল।

১৩৮. গত দুই বছরে স্বর্ণমুদ্রা বা ‘গোল্ড মোহর’ বিনিময়ের ক্ষেত্রে শরাফরা উল্লেখযোগ্য হারে ‘বাট্টা’ কেটে নিচ্ছে। এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য সরকারি ও বেসরকারি — উভয়ভাবেই নানা প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে, কিন্তু কোনোটিই সফল হয়নি। বিষয়টি মূলত কলকাতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যেখানে স্বর্ণমুদ্রার ব্যাপক প্রচলন রয়েছে; কিন্তু এর প্রভাব সারা দেশের বাণিজ্যিক লেনদেনে অনুভূত হচ্ছে।

১৩৯. এমন কোনো আকস্মিক কারণের কথা ভাবার মতো কোনো ভিত্তি আমাদের নেই যা এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে; বরং আমাদের ধারণা, শরাফ ও মুদ্রা-বিনিময়কারীদের কারসাজির কারণেই এই সমস্যাটি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই অনিয়মগুলো রোধে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর সাময়িক প্রভাব আমাদের এই ধারণাকেই সমর্থন করে; তবে অনেকের মতামতের সাথে একমত হয়ে আমিও মনে করি যে, এই বাট্টা বা মূল্যহ্রাসের মূল কারণ ছিল রৌপ্যমুদ্রার বা রূপো ঘাটতি; কারণ রূপোর ঘাটতি না থাকলে এমন চর্চা বা এর মাত্রা এতটা অস্বাভাবিক পর্যায়ে বৃদ্ধি পাওয়া কখনোই সম্ভব হতো না। সমগ্র বাংলায় রৌপ্যমুদ্রার মান কমে যাওয়া বা অবমূল্যায়ন আমার কাছে রৌপ্যমুদ্রার পরিমাণ হ্রাসেরই একটা প্রমাণ — যদিও এটি সরাসরি বা অপরিহার্য কোনো ফলাফল নয়।

১৪০. সব মিলিয়ে আমি নিঃসঙ্কোচে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি যে, কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পর থেকে দেশের প্রচলিত নগদ অর্থের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে; এবং অর্থ বেরিয়ে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট ঘাটতি পূরণের জন্য অতীতে আমদানির যে সব পথ বা উৎস চালু ছিল, সেগুলো এখন অনেকাংশেই বন্ধ হয়ে গেছে। এবং চীন, মাদ্রাজ ও বোম্বাইয়ে অর্থ সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা, সেইসাথে ইওরোপিয়দের দ্বারা ইংল্যান্ডে অর্থ পাচারের বিষয়টি — এসবই দেশটিকে রৌপ্যশূন্য করে ফেলার প্রক্রিয়াকে আরও ত্বরান্বিত করবে।

১৪১. যদি ধরেও নেওয়া হয় যে হিন্দুস্তানের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য নতুন করে সচল হয়েছে, তবুও ‘কোম্পানি’ কর্তৃক এদেশের পণ্য বিদেশে রপ্তানির ফলে সেই বিপুল অর্থের আগমন আর ঘটবে না, যা একসময় বাণিজ্যের মাধ্যমে দেশে আসত। এটি ইওরোপিয় শাসনব্যবস্থার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত একটা সমস্যা।

১৪২. যে কারোরই চোখে পড়বে যে দেশের নগদ অর্থের (মুদ্রার) পরিমাণ অনেক কমে গেছে; এবং আমি এটিকে একটা মৌলিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করি — যা কোনো অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন ছাড়া ক্রমশ এমন প্রভাব ফেলবে যা বাংলায় ব্রিটিশ স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। অর্থ আদান-প্রদানের বা লেনদেনের দ্রুততার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে, দেশের মুদ্রা চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের প্রকৃত পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে; কিন্তু সেই পরিমাণ অর্থের বার্ষিক ঘাটতি — তা যে পরিমাণই হোক না কেন — অবশ্যই ধীরে ধীরে মুদ্রা চলাচলকে প্রভাবিত করবে। আমার মনে হয় না যে আগেকার মতো এখন বিপুল পরিমাণ অর্থ বা সম্পদ গোপনে জমা করে রাখা হচ্ছে। কাগজের মুদ্রা বা সরকারি ঋণপত্র (paper) কেনার মাধ্যমে যে সুবিধা পাওয়া যায়, তা কলকাতার স্থানীয় বাসিন্দাদের — যাদের হাতেই মূলত দেশের অধিকাংশ সম্পদ কুক্ষিগত — তাদের এই সম্পদ বাজারে নিয়ে আসতে প্রলুব্ধ করে; আর যদি এই পর্যবেক্ষণটি সঠিক বলে গণ্য করা হয়, তবে কোম্পানি যখন তাদের এই ঋণপত্র বা কাগজের ঋণ পরিশোধ করবে, তখন মুদ্রা চলাচল ব্যবস্থা ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রভাবিত হতে পারে।

১৪৩. সামগ্রিকভাবে দেশের ওপর ধার্য কর বা রাজস্বের ভার সম্পর্কে সঠিক ধারণা পেতে হলে আমাদের কাছে নিম্নলিখিত তথ্যগুলো থাকা প্রয়োজন :

প্রথমত। কৃষকদের (রায়তদের) শ্রমলব্ধ ফসলের তুলনায় তারা প্রকৃতপক্ষে যে খাজনা প্রদান করে, সে সম্পর্কে জ্ঞান। [১৮৩]

দ্বিতীয়ত। জমিদার ও ইজারাদাররা যা আদায় করেন এবং সরকারের কাছে যা জমা দেন, তার সঠিক হিসাব।

তৃতীয়ত। হস্তান্তরিত বা বিশেষ সুবিধাপাওয়া জমির (alienated lands) বিস্তারিত হিসাব — যার মধ্যে জমির পরিমাণ, কে বা কারা তা প্রদান করেছিলেন, প্রদানের তারিখ এবং বর্তমানে কারা তা ভোগদখল করছেন — তা উল্লেখ থাকবে; যাতে করে এই জমিগুলো নতুন করে সরকারের নিয়ন্ত্রণে বা বাজেয়াপ্তকরণের (resumption) বিষয়টি কতদূর করা উচিত, তা নির্ধারণ করা যায়।

১৪৪. এই তথ্যাবলির মূল অংশগুলোরই অভাব রয়েছে; এবং তা সংগ্রহ করতে প্রচুর সময় ও অক্লান্ত গবেষণার প্রয়োজন হবে। তবে এর সাথে সম্পর্কিত কিছু বিষয় নিশ্চিতভাবে জানা গেছে; এবং এগুলো আমাদের কোনো একটা সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সহায়তা করতে পারে — যদিও সেই সিদ্ধান্তটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ভিত্তিতে পাওয়া সিদ্ধান্তের মতো অতটা নিশ্চিত নাও হতে পারে।

১৪৫. আমার বিশ্বাস, বাংলার কৃষকদের ওপর সাধারণত তাদের শ্রমলব্ধ ফসলের অর্ধেক পরিমাণ কর ধার্য করা হয়; সুতরাং আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, তাদের ওপর ধার্য করের পরিমাণ সর্বোচ্চ সীমার পর্যায়েই রয়েছে — এমনকি যদি ধরেও নেওয়া হয় যে করের হার ফসলের এক-তৃতীয়াংশ, তবুও তা যথেষ্ট বেশি। নির্ধারিত অনুপাতটি ন্যায্য কি না তা নির্বিশেষে, সাধারণ ধারণা এটাই যে করের হার অত্যধিক। এছাড়া পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা থেকে আমরা এটাও জানি যে, জমিদারদের জীবনযাপন পদ্ধতি খুব একটা জাঁকজমকপূর্ণ বা ব্যয়বহুল নয়; এবং আদায়করা অর্থের যে অংশ তাদের হাতে থাকে, তা মোট আদায়ের এক-দশমাংশের বেশি নয়। এবং যেহেতু আমাদের কাছে অত্যন্ত স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে তারা সাধারণত অভাবী এবং ঋণগ্রস্ত, তাই আমরা নিঃসন্দেহে বলতে পারি যে তাদের মুনাফা অত্যধিক নয়।

১৪৬. এই সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে একটা হলো যে, খাজনা ও রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপক কারসাজি বা আঁতাত বিদ্যমান; এবং রায়ত, জমিদার ও মধ্যস্বত্বভোগী — সব পক্ষই, বিশেষ করে প্রধান রায়ত বা মণ্ডলরা — এই কাজে লিপ্ত থাকে। তবে এ বিষয়ে আমার নিজস্ব অনুসন্ধান এবং কালেক্টরদের প্রতিবেদন থেকে আমি যা বুঝেছি, তা হলো — এই অনিয়মগুলো ধরা পড়লে খাজনার দাবির ক্ষেত্রে সমতা আনার সুবিধা হতে পারে; কিন্তু এর ফলে রাজস্বের উল্লেখযোগ্য কোনো বৃদ্ধি ঘটার সম্ভাবনা কম, আর সেই বৃদ্ধির বাস্তব সম্ভাবনা বা পরিমাণ কত হতে পারে, তা অনুমান করাও কঠিন।

১৪৭. হস্তান্তরিত বা বিচ্ছিন্ন জমি (alienated lands) নতুন করে সরকারের অধীনে নিয়ে আসা (resumption) রাজস্ব বৃদ্ধির একটা স্বতন্ত্র উপায় হতে পারে, যা রায়ত বা জমিদারদের ওপর নতুন কোনো বোঝা চাপাবে না — তবে শর্ত হলো, এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সময় এমন সব ক্ষেত্র বিবেচনায় রাখতে হবে যেখানে এই গোপন বা অননুমোদিত জমির আয় বর্তমানে অন্য জমির সরকারি খাজনা পরিশোধে ব্যবহৃত হচ্ছে।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন

Currently Maintained by the2.dev