“মুক্তি? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি,
মুক্তি কোথায় আছে?”
ঈশ্বর তো নিজেই ভক্তের ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। নেপালের তিন হাজার আটশ মিটার উচ্চতায় পৃথিবীর উচ্চতম বিষ্ণুমন্দিরে সোনার মুক্তিনাথ বিরাজমান। সঙ্গে তাঁর দুই শক্তি লক্ষ্মী এবং সরস্বতী।

জন্ম-মৃত্যুর অনাদি চক্র থেকে যিনি মোক্ষ প্রদান করেন, সে ঈশ্বর নিজেই তো ভক্তপ্রাণের প্রেমে বারবার বাঁধা পড়েছেন! এই ভক্তি আর ভালোবাসা সম্বল করে অজস্র ভক্ত পায়ে হেঁটে, ঘোড়ায় অথবা পাল্কিতে চড়ে মুক্তিনাথ মন্দিরের পাহাড়ি পথ অতিক্রম করছেন। দর্শনের আগে মন্দির পরিসরের কুন্ডের কনকনে শীতল জলে, পাহাড় থেকে নেমে আসা একশ আটটি জলধারায় স্নান করে তাঁরা পবিত্র হন।

একদল মহিলা সেদিন গান গাইতে গাইতে মুক্তিনাথের পথশ্রমের ক্লান্তি দূর করছিলেন। ভাষা অচেনা। তবে একটানা পাহাড়ি সুরে বড় মায়া! সেই পুণ্যার্থীদের পরনে লাল শাড়ি। নেপালের মহিলাদের লালরঙ বড় পছন্দের। তাদের জাতীয় ফুল লালিগুরাশ বা রডোড্রেনডনের লাল রঙ তাঁদের সিঁথির প্রশস্ত সিঁদুরে, ঠোঁটের লালিমায়, গলার ‘তিল্হারি পোটে’ মালায় এবং পোশাকে উজ্জ্বল ।
মুক্তিনাথ আনতনেত্র অবলোকিতেশ্বরেরও এক পবিত্র আবাস। উঁচু পাহাড়ে পাঁচরঙা লুংতা বা তিব্বতী প্রেয়ার ফ্ল্যাগ পতপত করে উড়ছে। দুই ধর্মের এখানে কোনো বিরোধ নেই। কাঠের প্যাগোডা মন্দিরে সোনার বিষ্ণু, খোলা আকাশের নিচে ধ্যানমগ্ন বুদ্ধদেব দু-জনেই স্মিতহাস্যে ভক্তদের আশীর্বাদ দিচ্ছেন।

মুক্তিনাথ থেকে লোয়ার মুস্তাংয়ের মারফা গ্রাম, আমার এ যাত্রার অন্যতম আকর্ষণ। শুষ্ক-রুক্ষ পাহাড়, কালিগন্ডকির গভীর গিরিখাত, বিস্তৃত উপত্যকা, বিরল জনবসতির নির্জন পথ পেরিয়ে এ এক অনন্য লোকালয়। আপেল আর অ্যাপ্রিকটের বাগান ঘেরা এ গ্রামে পাহাড়ী, কর্কশ হাওয়া গমের খেতে এসে কোমল হয়ে তাকে দুলিয়ে দিয়ে যায়। চারপাশের কঠিন রুক্ষতার মাঝে মারবা গ্রামের সবুজ গমের খেত, ফুলে ভরা আপেল বাগান এক সবুজ সজীব স্পর্শ।
এখানকার পাথুরে ঘরে বাস করে থাকালি উপজাতির মানুষ। তাদের সাদা রঙ করা পাথরের ঘরে কাঠের অলঙ্কৃত দরজা, জানলা। ছাদের উপর জড়ো করে রাখা কাঠ তুষারপাতের বিরুদ্ধে এক সহজ প্রতিরক্ষা। গ্রামের পথটিও যত্নে গড়া।শান বাঁধানো, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। গোটা গ্রামের আকাশে ওড়া রঙিন লুংতার সাজে উৎসবের আবহ। ঘরের সামনে বর্ণময় সম্ভার নিয়ে কেউ কেউ দোকান সাজিয়েছে। তাতে আছে রঙিন পশমের জামাকাপড়, ফেং সুইয়ের শুভ উপকরণ, আপেল-অ্যাপ্রিকটের মোরব্বা, আপেল ওয়াইন, আপেল পাই। দোকানে ভাড়া পাওয়া যায় তিব্বতী পোশাক। এই পোশাকে সেজে অলি গলি ঘুরে হাসিমুখে রীল বানাচ্ছে সব বয়সের পর্যটক। গলির নাম টিকটক, জেরী (টম এন্ড জেরিকে মনে রেখে)। এই জেরি গলি সামান্য নয়, এই গলিই পথ দেখায় ধৌলাগিরি ট্রেকিংয়ের।

এ গ্রামে চুরি-ডাকাতির ভয় নেই। স্থানীয়দের সহজ আশ্বাস, “তপাঈকো সামান ছুট্যো কি?” তোমার কিছু কি হারিয়ে গেছে? নিশ্চিন্ত থাকো, ফিরে পাবে। অলস দুপুরে এ গ্রামের গলিতে রাখা চেয়ারে বসে মেয়েরা উলের টুপি বানায়, রোদ পোহায়। রাতের নীল আলোয় মারফার বৌদ্ধ মঠ, অলিগলির ছবি বদলে যায়। পাবের টিউলিপ গ্লাসে ছলকে ওঠে ওয়াইন। সাজানো গোছানো ক্যাফে থেকে কফি আর কেকের সুঘ্রাণ ভেসে বেড়ায় অলিগলিতে।
এই গ্রামের সমৃদ্ধ উপজাতি থাকালিরা একসময় পশম আর নুনের ব্যবসা করত নেপাল আর তিব্বতের মাঝে। থাকালিদের নামেই তাদের সিগনেচার ডিশ গোটা নেপাল জুড়ে এখন জনপ্রিয়। কাঁসারের থালায় পরিবেশিত থাকালি ডিশ বা থাকালি থালিতে থাকে ভাত, কালি ডাল, সরষে শাক, তিমুরের (পাহাড়ি ফল) চাটনি, সবজি, পাঁপড়, ঢিডো (নানা রকম শস্য দিয়ে তৈরি একরকম মন্ড), মাছ বা মাংস। মোমো, থুকপার সঙ্গে এই সহজপাচ্য, পরিপূর্ণ থালিই আমাদের যাত্রাপথে তৃপ্তির স্বাদ এনে দিত।

তিব্বতী ছেলে নোরবুর ব্রো বেকারীতে ছিল হরেক কিসিমের কেক, আপেল পাই, মালপা, ডোনাট আরো কত কি! হাসিখুশি ছেলেটির মুখে কোথাও যেন এক বেদনার ছায়া। গল্প করতে করতে সে বলেই ফেলে তার দুঃখের কথা। মারফা গ্রামের থাকালি সুন্দরী জুনুকে সে ভালোবাসে। তাকে বিয়ে করতে চায়। জুনুর পরিবার নোরবুর গায়ে এখনো শরণার্থীর তকমা লাগিয়ে তাকে নাকচ করেছে। নোরবুর জন্মের কতকাল আগে তার ঠাকুর্দা বা তারও বাবা খামফা গোরিলা হয়ে নেপালে প্রবেশ করেছিল। নেপালের রাজা বীরেন্দ্রর অনুরোধে অস্ত্র সমর্পণ করে তারা একসময় নেপালের নাগরিকত্ব পায়। রাজা বীরেন্দ্র লোকপ্রিয় হয়ে ওঠেন। নোরবু আর জুনুর পরিবারের ধর্ম, সংস্কৃতি, খাদ্যাভাস সবই প্রায় পাশাপাশি হাঁটে তবু কোথাও যেন এখনো বেসুর।

প্রতিদিন সকালে দোকান খোলার আগে নোরবু মণিচক্র ঘুরিয়ে পদ্মসম্ভব অমিতাভর কাছে প্রার্থনা করে। সে জানে, —
ভালোবাসার রাস্তা যে বড় দুর্গম
পাহাড়ি পথের মতো।
কখনো খাড়া উঠে আবার হারিয়ে যায়
কুয়াশার ভেতর।
পথে পথে বাঁক,
প্রতি মোড়ে অনিশ্চয়তা,
তবু চলতে চলতে নিঃশ্বাস ভারি হলে
জুনুই যে তার একমাত্র আশ্রয়,
পাথরের ওপর বসে নেওয়া বিশ্রাম!