Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সংগ্রাম, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদার জীবনকাব্য — সত্যজিৎ নাথের উপন্যাস “শেষের বেলা” : যশোবন্ত রায় যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের,… কিছুটা আরশোলারও… : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উম্মে মুসলিমা-র ছোটগল্প বারবনিতা সাহিত্যিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গসাহিত্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস

অসিত দাস / ১২৫ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘শ্যামাপ্রসাদের ডায়েরী ও মৃত্যুপ্রসঙ্গ’ বইয়ে একজায়গায় লিখেছেন যে শ্যামাপ্রসাদ ছাত্রাবস্থাতেই শার্লক হোমসের স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়্যালকে চিঠি লিখতেন এবং বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়তে গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখাও করেছিলেন। কিন্তু কেন দেখা করেছিলেন, তা নিয়ে উমাপ্রসাদবাবু নীরব। অনেক তত্ত্বতালাশ কর দেখা যাচ্ছে, বিষয়টি ছিল তৎকালে জনপ্রিয় প্ল্যানচেট বা প্রেতচর্চা-সম্পর্কিত। থিওসফিক্যাল সোসাইটি এইসব বিষয় নিয়ে প্রচুর কাজ করত সেযুগে।

বাংলা সাহিত্য ও জনপরিসরে বহুদিন ধরেই একটি আকর্ষণীয় কাহিনি প্রচলিত রয়েছে যে, ব্যারিস্টারি পড়ার সূত্রে লন্ডনে অবস্থানকালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে বিখ্যাত সাহিত্যিক স্যার আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎ হয়েছিল ১৯২৬-২৭ সালে। এবং সেই সাক্ষাতে প্ল্যানচেট বা আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।কাহিনীটি রহস্যময় হওয়ায় পাঠকের আগ্রহ জাগায়। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে এই ঘটনাটি কতখানি সত্য, তা নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে। নির্ভরযোগ্য দলিল, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, ডায়েরি বা সমসাময়িক সংবাদপত্রে এই সাক্ষাতের স্পষ্ট প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে হলে ইতিহাস ও লোকপ্রচলিত বর্ণনাকে পৃথকভাবে বিচার করা জরুরি। শোনা যায়, স্যার আর্থার কোনান ডয়্যাল শ্যামাপ্রসাদকে অশুভ আত্মা বা ইভিল সোল নিয়ে সাবধান করে দিয়েছিলেন। প্ল্যানচেটে এদের আবির্ভাব বার বার হলে, প্ল্যানচেটের অভ্যাস ত্যাগ করাই শ্রেয় বলে তিনি রায় দিয়েছিলেন।

স্যার আর্থার কোনান ডয়্যাল (১৮৫৯-১৯৩০) বিশ্বসাহিত্যে সর্বাধিক পরিচিত শার্লক হোমসের স্রষ্টা হিসেবে। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আত্মাবাদ বা স্পিরিচুয়ালিজমের প্রতি গভীর বিশ্বাস। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বিভিন্ন দেশে বক্তৃতা দিয়ে দাবি করেছিলেন যে মানুষের মৃত্যুর পরও চেতনার অস্তিত্ব থাকে এবং নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মৃত আত্মার সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিপুল প্রাণহানি এবং ব্যক্তিগত জীবনে একাধিক শোকের অভিজ্ঞতা তাঁর এই বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করেছিল। তিনি প্ল্যানচেট, মিডিয়াম, সিয়াঁস এবং অতিপ্রাকৃত যোগাযোগের পক্ষে প্রকাশ্যে মত প্রকাশ করেন এবং এ বিষয়ে একাধিক গ্রন্থও রচনা করেন।

অন্যদিকে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (১৯০১–১৯৫৩) ছিলেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, আইনজ্ঞ ও রাজনীতিক। অল্প বয়সেই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন এবং পরবর্তীকালে ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। উচ্চশিক্ষার সূত্রে তিনি ব্রিটেনে গিয়েছিলেন এবং সে সময় বহু খ্যাতিমান ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর পরিচয় হওয়া অস্বাভাবিক ছিল না। কিন্তু কোনান ডয়্যালের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটেছিল — এমন তথ্য প্রামাণ্য জীবনী বা নথিতে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ নেই।

প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, লন্ডনে কোনো এক সামাজিক বা বৌদ্ধিক আসরে দুই ব্যক্তিত্বের পরিচয় হয়। সেখানে কোনান ডয়্যাল আত্মাবাদ ও প্ল্যানচেট সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা বলেন। শ্যামাপ্রসাদ নাকি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে সেই আলোচনা শোনেন এবং ভারতীয় দর্শনে আত্মা, পুনর্জন্ম ও পরলোকচিন্তার প্রসঙ্গ তোলেন। কথিত আছে, পাশ্চাত্য স্পিরিচুয়ালিজম এবং ভারতীয় দার্শনিক চিন্তার মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু এই বিবরণের সমর্থনে কোনো প্রত্যক্ষ নথি পাওয়া যায় না। ফলে এটিকে ইতিহাসের প্রতিষ্ঠিত ঘটনা নয়, বরং একটি জনপ্রিয় বর্ণনা হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।

প্ল্যানচেট বলতে সাধারণত এমন একটি প্রক্রিয়াকে বোঝায় যেখানে কয়েকজন ব্যক্তি একটি বোর্ড বা কাগজের ওপর হাত রেখে মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। অনেক সময় একটি ছোট কাঠের বা চাকার ওপর বসানো নির্দেশক বিভিন্ন অক্ষর বা শব্দের দিকে সরে যায় এবং উপস্থিত ব্যক্তিরা সেটিকে আত্মার বার্তা বলে ব্যাখ্যা করেন। উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের প্রথমভাগে ইউরোপ ও আমেরিকায় এই ধরনের সিয়াঁস অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বিজ্ঞান ও ধর্মের সংঘাতের যুগে অনেক শিক্ষিত মানুষও এ বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা তো বাংলাসাহিত্যে বেশ চর্চিত বিষয়। প্ল্যানচেট নিয়ে কবিগুরুর আগ্রহ ছিল প্রবল।

অমিতাভ চৌধুরীর ‘রবীন্দ্রনাথের পরলোকচর্চা’ গ্রন্থ স্মরণীয়। জানা যায়, কবিবন্ধু মোহিতচন্দ্র সেনের কন্যা উমা একসময়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্ল্যানচেটের মিডিয়াম। উল্লেখ্য, মিডিয়ামের মাধ্যমেই আত্মাকে ডেকে আনা হত। উমাকে বুলা নামে ডাকতেন কবিগুরু। ১৯২৯ সালে রানী মহলানবীশকে গুরুদেব জানান, বুলা তাঁকে জানিয়েছে তার ওপরে প্রেতাত্মা ভর করে। সে বছর শান্তিনিকেতনের উদয়ন আর জোড়াসাঁকোয় টানা দুমাস রবিঠাকুর বন্ধু ও আত্মীয় পরিজনকে ডেকে আনেন বলে কথিত। এসময় তাঁর সাথে অবন ঠাকুর, প্রশান্ত মহলানবীশ বা অজিত কুমার চক্রবর্তী থাকতেন। অজিত কুমার চক্রবর্তীর কথা বিশেষ উল্লেখযোগ্য এজন্যই যে মৃত্যুর পূর্বে আত্মা তাঁর আগাম মৃত্যুর কথা ঘোষণা করেছিল অবন ঠাকুরের জামাই মনিলাল গঙ্গোপাধ্যায়ের আসরে। প্রমথনাথ বিশীকে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, প্রেতচক্রের আসরে তাঁর সাথে মাইকেল মধুসূদনের আলাপ হয়েছিল। প্রেতচক্রের আসরে নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবীর ছাড়াও এসেছিলেন সুকুমার রায়। সুকুমার রায়ের প্রেআত্মার অনুরোধে রবীন্দ্রনাথ ‘তরী আমার হঠাৎ ডুবে যায় ‘গান গেয়েছিলেন বলে জানা যায়।

আর্থার কোনান ডয়্যাল

বলাবাহুল্য,একাধিকবার প্রেতচক্রের বা প্ল্যানচেটে আয়োজন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেই প্ল্যানচেটে নিকটবর্তী অনেক মৃত আত্মীয় নাকি সাড়া দিয়েছিল। আত্মাদের সঙ্গে কবির কথোপকথনকেও কাগজ বন্দী করেছিলেন রবীন্দ্রনাথের সচিব কবি অমিয় চক্রবর্তী এবং অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৌহিত্র মোহনলাল গঙ্গোপাধ্যায়। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সদনে এখনো পর্যন্ত আটটি খাতা সংরক্ষণ করে রাখা আছে। যেখানে সেই মৃত মানুষদের আলাপ সংরক্ষিত আছে।ওই সংরক্ষণ গুলিতে দাবি করা হয়েছে, সেই প্রেতচক্রে সাড়া দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের প্রিয়জনেরা, স্ত্রী মৃণালিনী দেবী, নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী, বড় মেয়ে মাধুরীলতা, দুই দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ও জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, প্রিয় ভ্রাতুষ্পুত্র বলেন্দ্রনাথ ও তাঁর স্ত্রী সাহানা প্রমুখ, সেই সময়ে যাঁরা সকলেই মৃত ছিলেন, যা শুনলে শিহরণ জাগে বৈকি! কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের জীবনে একের পর এক নিকটজনের মৃত্যুই কি তাঁর পরলোক চর্চার মূল কারণ? নাকি তৎকালীন কলকাতার প্ল্যানচেট হুজুগও তার জন্যে দায়ী!

আর্থার কোনান ডয়্যাল এই আন্দোলনের অন্যতম বিশিষ্ট সমর্থক ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে সব ধরনের প্ল্যানচেট প্রতারণা নয়; কিছু অভিজ্ঞতা সত্যিই মানুষের চেতনার সীমা অতিক্রম করে। তিনি বিভিন্ন মিডিয়ামের প্রদর্শনীতে অংশ নিতেন এবং প্রকাশ্যে তাদের সমর্থন করতেন। তবে তাঁর এই অবস্থান সমসাময়িক বহু বিজ্ঞানী ও যুক্তিবাদীর সমালোচনার মুখে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে যেসব মিডিয়াম অলৌকিক ক্ষমতার দাবি করেছিলেন, পরে তাঁদের প্রতারণা প্রমাণিত হয়। তবুও কোনান ডয়্যাল শেষ পর্যন্ত তাঁর বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি।

ভারতীয় সমাজেও প্ল্যানচেট ও আত্মা-সংক্রান্ত নানা কৌতূহল দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান। উনিশ শতকের বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি স্পিরিচুয়ালিজমের প্রভাবও কিছু শিক্ষিত মহলে পৌঁছায়। একই সময়ে উপনিষদ, গীতা এবং বেদান্তে আত্মার অমরত্ব নিয়ে যে আলোচনা রয়েছে, তার সঙ্গে পাশ্চাত্য আত্মাবাদের তুলনা করার প্রবণতাও দেখা যায়। তবে এই দুই ধারার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। ভারতীয় দর্শনে আত্মা সম্পর্কে আলোচনা প্রধানত আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক; অন্যদিকে পাশ্চাত্য স্পিরিচুয়ালিজমে মৃত ব্যক্তির আত্মার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগের দাবি বিশেষ গুরুত্ব পায়।

যদি ধরা হয় যে কোনান ডয়্যাল ও শ্যামাপ্রসাদের মধ্যে এমন কোনো আলোচনা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি সম্ভবত এই দার্শনিক পার্থক্য ও মিলকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতে পারত। শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন যুক্তিবাদী শিক্ষাবিদ। তিনি কোনো দাবিকে সহজে গ্রহণ না করে যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার করার পক্ষপাতী ছিলেন বলে তাঁর লেখনী ও জনজীবন থেকে ধারণা করা যায়। তাই প্ল্যানচেট সম্পর্কে তিনি কৌতূহলী হলেও অন্ধবিশ্বাসী ছিলেন — এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর কোনো ভিত্তি নেই।

ঐতিহাসিক গবেষণায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো — অসাধারণ দাবির জন্য শক্তিশালী প্রমাণ প্রয়োজন। যদি সত্যিই দুই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তির মধ্যে এমন একটি তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা হয়ে থাকে, তাহলে তার কোনো না কোনো সমসাময়িক উল্লেখ থাকার সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই ধরনের নির্ভরযোগ্য দলিল সামনে আসেনি। ফলে গবেষকেরা সাধারণত এই ঘটনাকে নিশ্চিত ইতিহাস হিসেবে গ্রহণ করেন না।

এই কাহিনির জনপ্রিয়তার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শার্লক হোমসের স্রষ্টা হিসেবে কোনান ডয়্যালের নাম রহস্য ও অনুসন্ধানের সঙ্গে জড়িত। দ্বিতীয়ত, তাঁর আত্মাবাদে বিশ্বাস মানুষের কৌতূহল বাড়ায়। তৃতীয়ত, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো একজন বিশিষ্ট ভারতীয় ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সম্ভাব্য সাক্ষাৎ গল্পটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। এই তিনটি উপাদান মিলেই ঘটনাটি লোকমুখে প্রচারিত হয়েছে বলে মনে করা যায়।

আধুনিক মনোবিজ্ঞান প্ল্যানচেটের ক্ষেত্রে “আইডিওমোটর ইফেক্ট” নামে পরিচিত একটি ব্যাখ্যা দেয়। এর মতে, অংশগ্রহণকারীরা নিজেরাও টের না পেয়ে অতি সূক্ষ্ম পেশী-সঞ্চালনের মাধ্যমে নির্দেশকটিকে সরিয়ে ফেলেন। ফলে মনে হয় যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি সেটিকে পরিচালনা করছে। এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক গবেষণা হয়েছে। যদিও যাঁরা আত্মাবাদে বিশ্বাস করেন, তাঁরা এই ব্যাখ্যাকে সম্পূর্ণ গ্রহণ করেন। শ্যামাপ্রসাদের পরবর্তী জীবনে স্পিরিচুয়ালিটি বা আধ্যাত্মিকতা তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি। তিনি পণ্ডিচেরীর শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছিলেন। পণ্ডিচেরীর শ্রীঅরবিন্দ আশ্রমের শ্রীমা একবার বলেছিলেন ঋষি অরবিন্দর বৈদান্তিক দর্শনকে যদি কেউ একচতুর্থাংশও বুঝে থাকেন, তবে তিনি হলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।

১৯৫১ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে পন্ডিচেরির শ্রী অরবিন্দ আশ্রম-এর পক্ষ থেকে অনুষ্ঠিত Sri Aurobindo Memorial Convention-এ সভাপতিত্ব করা ও বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এই সম্মেলন ২৪-২৫ এপ্রিল ১৯৫১ সালে অনুষ্ঠিত হয় এবং এর উদ্দেশ্য ছিল শ্রী অরবিন্দের স্মৃতিতে একটি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া। আশ্রমের প্রধান ব্যক্তিত্ব দ্য মাদার (শ্রীমা) (মিরা আলফাসা) শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে সম্মেলনের সভাপতি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তিনি উদ্বোধনী ও সভাপতির ভাষণ দেন এবং সম্মেলনের কার্যবিবরণীতেও তাঁর স্বাক্ষর রয়েছে।

সবশেষে বলা যায়, লন্ডনে আর্থার কোনান ডয়্যাল ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সাক্ষাৎ এবং প্ল্যানচেট নিয়ে তাঁদের আলোচনার কাহিনীটি বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের তুলনায় লোকপ্রচলিত বর্ণনা হিসেবেই বেশি পরিচিত। নির্ভরযোগ্য প্রমাণের অভাবে এটিকে নিশ্চিত ঐতিহাসিক ঘটনা বলা যায় না। তবে এই কাহিনী আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে — বিশ শতকের প্রথমভাগে বিজ্ঞান, দর্শন, ধর্ম ও অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে যে বৌদ্ধিক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, তারই একটি প্রতীক হিসেবে এই কাহিনীকে দেখা যেতে পারে।

তাঁর ছোটভাই উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তো বটেই, কারও লেখাতেই শ্যামাপ্রসাদের প্ল্যানচেটচর্চার কথা পাইনি। জানি না তথাগত রায় লিখিত শ্যামাপ্রসাদজীবনীতে এটির উল্লেখ আছ কিনা। শ্যামাপ্রসাদ তাঁর ডায়েরিতে এই প্ল্যানচেটের বিষয়ে কিছু লিখেছেন কিনা তাও জানি না।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন