শুক্রবার | ৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২২শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ | সকাল ৬:৫৯
Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সিন্ধুসভ্যতা বিশেষজ্ঞ র‍্যান্ডাল ল’-র সুতকাগেনদোর-সফরের নির্যাস : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘পঞ্চাশ নম্বরে নাম’ ক্ষয়িষ্ণু পুরুষ লেখক সসীম কুমার বাড়ৈ আলোচক সুতপা দত্ত দাশগুপ্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতার হকার, উচ্ছেদ অভিযান, ইতিহাসের প্যারাডক্স : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিনোদিনী দিন ফিরিবার নয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আইসক্রিমের দারুন স্বাদে গরম হোক উধাও : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ মৌসুমী মিত্র ভট্টাচার্য্য-এর ছোটগল্প ‘পদ্মপাতার জল’ নজরুলের চোখে ক্ষুদিরাম : শৌনক ঠাকুর ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ ইতিহাসসাধক স্বদেশরঞ্জন মণ্ডল : দিলীপ মজুমদার এবারে দশহরাতে আরামবাগের মনসাডাঙ্গার মনসা মাতার পূজায় ছাগবলি বন্ধের সিদ্ধান্ত : মোহন গঙ্গোপাধ্যায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বরেন্দ্র ও গৌড়ীয় ব্রাহ্মণ সমাজের ইতিহাস, কুলপঞ্জি ও অভিলিখনের সমন্বয়ে একটি পুনঃপাঠ : অত্রি ভট্টাচার্য ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অয়ন মুখোপাধ্যায়-এর ছোটগল্প ‘ছেঁড়া জামার ঈশ্বর’ ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (১১২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অশুভ শক্তির বিনাশ ও ভক্তের সুরক্ষায় নৃসিংহ চতুর্দশী : রিঙ্কি সামন্ত বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বারাটাং এ একটা দিন : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী / ৪০১ জন পড়েছেন
আপডেট মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬

সকলের সঙ্গে সবকিছুর মেলবন্ধন সবসময় পারফেক্ট হয় না। ছোটবেলা থেকেই হাঁ করে আকাশে প্লেন উড়ে গেলে দেখা বা উঠোনে দাঁড়িয়ে অথবা ছাদে দাঁড়িয়ে প্লেনকে টা টা করা একরকম। কটকট শব্দ করে প্রায় মাথার উপর দিয়ে আজও যদি হেলিকপ্টার উড়ে যায় এখনও ছুটে ছাদে গিয়ে দেখতে ভালো লাগে। তবে আগের দেখা ছিল মনের আনন্দে আর এখন দেখা আনন্দের সঙ্গে সংশয়ে। কি জানি বাবা ভেঙে পড়বে না তো? চারদিকে যাসব ঘটছে সেসব দেখে সংশয় না হবার কিছু নেই। শৈশবে যে উড়োজাহাজ ভীষণ প্রিয় ছিল, পরে উঠে দেখেছি এতে অবাক হওয়ার বা ভালো লাগার মত তেমন কিছু নেই। বরং হাত পা বেঁধে একজায়গায় বন্দী করে উড়ান দেওয়ার মধ্যে আর যাই থাক বেশিক্ষণ নীল আকাশ দেখে মুগ্ধ হওয়ার মত কিছু থাকে না। উড়োজাহাজ ওড়ার পর কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখা আর নামা অর্থাৎ ল্যান্ড করার সময় নীচের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হওয়ার কিছু উপকরণ থাকে অবশ্য। আর যদি বরফাচ্ছন্ন পাহাড়ের চূড়ার ওপর দিয়ে যায় তখন কিছুক্ষণ মুগ্ধ হয়ে মোবাইলে ক্লিকের আওয়াজ একটু ঘনঘন ওঠে। তারপর হাই ওঠে অনেকের, নাক ডাকে বেশির ভাগের। শুধু কিছু অভাগা থাকেন আমার মত, যারা বসে বসে উড়ন্ত বা ছুটন্ত যানে কিছুতেই চোখের পাতা এক করতে পারে না। সোজা হয়ে বসে থাকে আর কখন যানটি থামবে তার প্রতীক্ষায় ক্ষণ গোনে। যাইহোক এবারের উড়ন্ত যান একবারও টার্বুলেন্সে না পড়েই দিব্যি ঝকঝকে আকাশে উড়ে নামার সময় নীল সমুদ্রের মাঝে পাহাড়-টাহাড় দেখিয়ে এক চরম মুগ্ধতার ঠুলি চোখে পড়িয়ে নামিয়ে দিল।

নামিয়ে তো দিল। এয়ারপোর্ট যে এত সুন্দর হয় সেটাও না দেখলে বিশ্বাস হয় না। এয়ারপোর্টটি খুব বড় না হলেও খুব ছোটও নয়। অসম্ভব সুন্দর সাজানো এবং পরিষ্কার। হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ব্যাগেজ রিক্লেম এরিয়ায় পৌঁছে বেল্টে ঘুরতে থাকা ট্রলিব্যাগগুলোর মধ্যে খুঁজে খুঁজে নিজের ব্যাগ তুলে নিয়ে শ্রীবিজয়পুরম এয়ারপোর্টের বাইরে এলাম। চারদিকে সবুজ পাহাড়, অসংখ্য ফুলগাছে সাজানো রাস্তা ধরে অপেক্ষমান গাড়ির দিকে এগোলাম। এয়ারপোর্টের নাম বীর সাভারকার ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। আর স্থান পোর্ট ব্লেয়ার, যার কিছুদিন আগে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়েছে শ্রীবিজয়পুরম, চোল সাম্রাজ্যের ঐতিহ্যকে মান্যতা দিয়ে। সামনেই বীর সাভারকারের মূর্তি। যদিও  কালাপানি পেরিয়ে এই দ্বীপপুঞ্জে যাঁদের দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়েছিল সেইসব বীর বাঙালির কথা বীর সাভারকারের মূর্তি দেখার সঙ্গে সঙ্গেই মনে আসবে। তবে বেড়াতে এসেই কেউ বিতর্কের মধ্যে যেতে চান না। মানুষ দেখতে আসেন, মুগ্ধ হতে আসেন, ভাবতে নয়।

এখনও আন্দামানে হিন্দু এবং বাঙালির সংখ্যা যথেষ্ট বেশি। দক্ষিণ ভারতীয়রাও রয়েছেন। মুসলিম ও খ্রিস্টান এখানে সংখ্যালঘু। তবে বাঙালিরা, যাঁরা আজন্ম এখানে আছেন, তাঁরা কিন্তু বাঙালি পর্যটক বুঝেও প্রথমে হিন্দিতেই কথা শুরু করে পরে ধীরে ধীরে বাংলাতে আসেন। এমনকি নিজেদের মধ্যেও হিন্দিতেই কথা বলতে শোনা যাবে দুজন দ্বীপান্তরের বাঙালির মধ্যে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্যই না কি মানুষ যখন থেকে নিজের দেশ নিজের মাটি ছেড়ে অন্যত্র বাসা বাঁধে, তখন নিজের ভাষা বলে আর কিছু থাকে না। ভাষা নিয়ে এত কথা বলার একটাই কারণ, আন্দামানের সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছেন বাঙালি, যাদের পূর্বপুরুষ এসেছিলেন সেই ব্রিটিশ সরকারের আমলে। এখন তাঁদের নাতি পুতি এই আন্দামানের লাইমস্টোন কেভের ধারে ‘নয়াডেরা’কে স্থায়ী বাসস্থান করে নিয়ে রয়ে গেছেন। তাঁদের কেউ নীল সমুদ্রের বুকে নৌকা ভাসিয়ে পর্যটকদের লাইমস্টোন কেভ, মাড ভলক্যানো দেখিয়ে আবার ওপারে পৌঁছে দিয়ে আসেন, কেউ বা গাইডের ভূমিকায় আবার কেউ বা – বিশেষ করে বাড়ির মহিলারা হেঁটে গরমে একসা হয়ে যাওয়া পর্যটকদের লেবুর সরবত খাইয়ে অথবা ঘর সাজানোর জিনিস বিক্রি করে সংসার নির্বাহ করছেন। ম্যানগ্রোভ এরিয়ায় জঙ্গলের মধ্যে হাঁটা ছাড়া তো গতি নেই। আর এই সময় পর্যটকদের পাশে থাকেন এই অভিবাসী বাঙালিরাই।

আন্দামানে যাওয়ার অর্থ তো শুধু সমুদ্রকে আস্বাদন করা নয়, আরও একটি বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে মানুষ এখানে আসেন। সেটি হল এখানকার আদি নিবাসীদের দর্শন করা। এখানে চার ধরনের ট্রাইবস বা আদিবাসী মূলত রয়েছে। জারোয়া, গ্রেট আন্দামানি, ওঙ্গি (প্রধানত লিটল আন্দামানের বাসিন্দা) ও সেন্টিনেলিজ (প্রধানত নর্থ সেন্টিন্যাল দ্বীপের বাসিন্দা)। তবে সাধারণ পর্যটক জারোয়া দেখতেই বেশি যান। পূর্বে কিন্তু জারোয়া বলতে ট্রাইবসদের বোঝানো হত না। জারোয়া শব্দের অর্থ ‘বি’। আন্দামানি ভাষায় ‘বি’ মানে ‘আগন্তুক’। এদের প্রাণ ধারণের জন্য এরা মূলত শিকার করে, মাছ ধরে আর ফলমূল, কন্দ সংগ্রহ করে। বাইরের জগতের সঙ্গে এরা সমস্ত রকমের যোগাযোগ এড়িয়ে চলে। জারোয়ারা নিজেদের ‘আওং’ বলে ডাকে। এই ‘আওং’ মানে ‘জনতা’। এদের নিজেদের মধ্যে যে ভাষা ব্যবহার করে তার নাম ‘ওঙ্গান’। শিকারের জন্য জারোয়ারা যে ধনুক ব্যবহার করে সেটা এই দ্বীপপুঞ্জের অন্যান্য আদিবাসীদের থেকে স্বতন্ত্র। ‘জারোয়া’ সম্পর্কে মানুষের অতিরিক্ত কৌতুহল ও আগ্রহের কারণ, এদের সম্পর্কে অনেক গল্প বা খানিক গুজব। যেহেতু এরা নিজেদের আলাদা রাখতে পছন্দ করে সেহেতু মানুষ এদের সম্পর্কে কৌতুহলী। স্বাধীনতার আগে ব্রিটিশ সরকারের ইন্ধনে বারবার এই জারোয়াদের এলাকায় প্রবেশ করার ফলে জারোয়ারা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার জন্য বা নিজেদের জীবন জীবিকা বাঁচিয়ে রাখার জন্যই অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। মূলত দক্ষিণ আন্দামানের জঙ্গলেই জারোয়ারা থাকত। পরে ধীরে ধীরে আরও কিছু জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। ওরা জামা কাপড় পরে কি পরে না, ওরা সভ্য মানুষ দেখলেই আক্রমণ করে কি করে না এই দ্বিধা দ্বন্দ্বের মধ্যেই ‘জারোয়া’ সম্পর্কে নানান কথা, গল্প ঘুরে বেড়ায়। আর তাতেই মানুষ আকর্ষিত হয়। একটা কৌম যদি নিজেদের আড়ালে রাখতে পছন্দ করে তাহলে তাদের সেই চাওয়াটাকেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত। জামা কাপড় পরলেই সভ্য আর না পরিধান করলেই সে অসভ্য এটাই বা কে ঠিক করে দেবে?

যা কিছু অন্যরকম সভ্য জগতের মতে তা দর্শন করতে একটু অন্যরকম প্রস্তুতিও লাগে। বর্তমানে যেহেতু জারোয়াদের সংখ্যা ক্রমশই কমে আসছে তাই সরকার ওদের রক্ষা করার জন্য যথেষ্ট সাবধানী। আজ মাত্র ২০০ থেকে ২৫০ জন জারোয়া উপজাতির মানুষ আন্দামানে রয়েছে। জারোয়াদের জাঙ্গিল উপজাতির বংশধর মনে করা হয়। অনুমান করা হয় তারা দু-হাজারের বেশি সময় ধরে এই দ্বীপপুঞ্জে বসবাস করে আসছে। জারোয়ারা সাংস্কৃতিক এবং ভাষাগত দিক থেকে স্বতন্ত্র। জারোয়াদের আফ্রিকার গোষ্ঠী থেকে বেরিয়ে আসা প্রথম সফল উপজাতি বলে মনে করা হয়। জারোয়ারা নিজেদের গোষ্ঠীর মধ্যেই থাকতে পছন্দ করে। এই ব্যাপারে তারা আপোসহীন রক্ষক। বাইরের সংক্রামক রোগের জন্য এদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার ফলে এই আদিবাসীদের স্থান আরও সংকুচিত হয়। তারা আরও ভিতর দিকে নিজের আবাসভূমি স্থাপন করে। যেহেতু জারোয়া অধ্যুষিত সংরক্ষিত অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে আন্দামান ট্রাঙ্ক রোড বরাবর গিয়েছে এবং জলপথ রয়েছে তাই জারোয়াদের সঙ্গে সভ্য মানুষের যোগাযোগ বেড়েছে। ভাষার আদান প্রদানের মাধ্যমে তারা নিজেদের অবস্থান ও অবস্থা বোঝাতে পেরেছে। তাদের নিজস্ব মর্যাদা সম্পর্কে সভ্য জগতকে অবহিত করেছে। চিকিৎসার প্রয়োজনে তারা সাহায্য নিতে পারে। শিশুদের শিক্ষার জন্য অনুরোধ করে। আবার তাদের ছবি তুললে অর্থও চাইতে শিখেছে। তবে জারোয়া সংরক্ষিত অঞ্চলে প্রবেশের আগেই কড়া নির্দেশ দেওয়া হয় যে ওই অঞ্চলে প্রবেশের পরে কেউ জারোয়াদের কোনোরকম ছবি তুলবে না, খাদ্যদ্রব্য দেবে না। ওদেরকে ওদের মতই থাকতে দিতে হবে। জারোয়ারা সরকার থেকে মাসিক ভাতা, লেবু জাতীয় বাগান পরিচর্যার জন্য মজুরি এবং চিকিৎসার সুযোগ পায়। জারোয়াদের ধনুকের নাম ‘আও’, তীর হল ‘পাথো’। তীরের ফলাটি তৈরি হয় সুপারি কাঠ দিয়ে। লোহার ফলাযুক্ত তীরকে ওরা বলে ‘আয়েতাহো’। শিকারে বেরোনোর সময় জারোয়ারা ‘কেকাদ’  নামে একটি বক্ষ আবরণী পরিধান করে। এদের খাবার মূলত ফল, কন্দ ও শিকার করা ঝলসানো মাছ ও মাংস।

রাত দুটোর সময় ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে গাড়িতে চেপে অভিযান শুরু। প্রায় এক ঘন্টার একটু পরেই গাড়ি থামল এক জায়গায়। জায়গার নাম জিরকাটাং। তখন রাত তিনটের একটু বেশি। সামনে বিশাল কনভয় এঁকে বেঁকে এগিয়ে গেছে ঘন জঙ্গলের অন্ধকারের মধ্যে। আপাততঃ চুপচাপ ঠান্ডার মধ্যে গাড়িতে বসে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই। তবে যাঁরা চুপচাপ বসতে পারেন না তাঁরা ঠিক বেরিয়ে হাঁটতে শুরু করেছেন। আকাশ ভর্তি তারাদের আলো আর একটি মাত্র খোলা চায়ের দোকানের টিমটিমে আলোয় এ এক অন্য পৃথিবী। এখানে অন্তত তিন সাড়ে তিন ঘণ্টা ‘ন যযৌ ন তস্থৌ’। তারপর আকাশে আলোর ছোঁয়া লাগলেই গোটা কনভয় একসাথে চলতে শুরু করবে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে। সারাদিনে চারবার এই কনভয় যাওয়ার অনুমতি রয়েছে সরকার থেকে। এতটা কড়াকড়ি একটা কারণেই, যাতে জারোয়াদের সঙ্গে কোনোভাবেই পর্যটকদের যোগাযোগ না হয়। জারোয়াদের যাতে ভিক্ষাজীবীতে পরিণত না করা হয় সেদিকেও সরকারের কড়া নির্দেশ রয়েছে।

এক সময় আকাশের গায়ে অন্ধকারের পরত সামান্য হালকা হতেই চায়ের দোকানের ভিড় পাতলা হতে শুরু। সকলের ভিতরে অদ্ভুত এক উত্তেজনার পারদ চড়ছে। এক সময় পুরো কনভয় গড়াতে শুরু করল। সমস্ত গাড়ির কাচ বন্ধ করে দিতে নির্দেশ দেওয়া হল। বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হল কেউ যেন মোবাইল বা ক্যামেরা বের না করে। এতক্ষণ বসে থাকতে থাকতে যাদের একটু হলেও ঝিমুনি আসছিল, গাড়ি চলতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে দেহ একেবারে সোজা রেখে সকলেই উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করছেন কখন কিভাবে কোথায় তার দর্শন মিলবে। হু হু করে বাস ছুটে চলেছে বারাটাং এর ঘন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে কিন্তু কারোর দেখা নেই। রাস্তায় একটা বিশাল সাপের দর্শন মিলল বটে, আর ড্রাইভার খুব তৎপরতায় সাপটাকে বাঁচিয়েও দিল। অনেক সহযাত্রী বললেন যাত্রায় সর্প দর্শন নাকি শুভ ফলদায়ক। অবশ্য শুভ ফল যদি শুধু এই জার্নিটাকেই ধরা হয় তবে একথা মানতেই হবে এমন জার্নি সত্যিই অপরূপ। ঘন জঙ্গলের মাঝে নিঃস্তব্ধ প্রকৃতির মাঝখানে একটা রাত থেকে দিনের আলো ফোটা দেখতে দেখতে যাওয়া কি কম প্রাপ্তি! মাঝে ড্রাইভার পাহাড়ের উঁচুতে দুটো ছোট্ট মাটির ভাঙা ঘরের মত দেখিয়ে বলল ওগুলো জারোয়াদের ঘর। এত দ্রুত চলনের মধ্যে কি সেই ঘর তার আগা মুড়ো কিছুই বোঝার উপায় নেই। তবু প্রশান্তি, জারোয়াদের ঘর দেখা হল, তাদের নাই বা দেখা গেল। হতাশ হতে হতেও হতাশ যেন কিছুতেই হতে দেয় না এই প্রকৃতি।

তারপর আচমকাই তাকে দেখা গেল। একা। নিঃসঙ্গ। কালো চিতার মত হাতে ধনুক নিয়ে সে এন্ট্রি নিয়েছে। সুন্দর একটা ছন্দে হাঁটছে সে। ঝকঝকে এক জোড়া চোখ আমাদের দিকে। কিন্তু হাঁটা থামাচ্ছে না। চলতে চলতেই যেন মেপে নিচ্ছে সভ্যতাকে। আমরা স্তব্ধ হয়ে এত জোড়া চোখ সন্নিবদ্ধ রেখেছি শুধু তার দিকে। খালি গা। পরনে ছোট্ট একখানি বস্ত্র জড়ানো। সে বেশ বুঝতে পারছে তার গুরুত্বখানা। উপভোগ করছে নিশ্চয়ই। তারপর? সে চলে গেল। আমার গল্প ফুরোলো। নটে গাছটি মুড়োলো? না। জারোয়া দর্শনের প্রথম ধাক্কা সামলে নিয়ে, লাইমস্টোন কেভের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে, মাড ভলক্যানোর কোথায় কাদা ছিটকে উঠছে খুঁজে খুঁজে হয়রান হয়ে তারপর খুঁজে পেয়ে, নয়াডেরার অজস্র বাঙালি অভিবাসীর হিন্দি ইংরেজি শোনার পরে বাংলা শুনে নিয়ে ফেরত আসার পথে আরও চমক ছিল। যেমন সব গল্পেই থাকে। রোদ বেরোলে বেলা বাড়লেই জারোয়ারা খাদ্যের সন্ধানে বের হয়। তাদের শিশুরা সমুদ্রের ধারে খেলা করে, নাচে, গায়, পর্যটকদের দেখে হাততালি দেয়, ডাকে। ফেরার পথে খোলা লরিতে একঝাঁক জারোয়া মেয়ে পুরুষের দেখা মিলল। মিলল সানগ্লাস পরা হাস্যমুখের এক জারোয়া যুবকের। তবে প্রথম  জনকে দেখে যে চমক লেগেছিল, এদের দেখার মধ্যে আর সেই চমকটা ছিল না। এজন্যই ওরা আড়ালে থাকে। যাতে চমকটুকু থাকে।


আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বারাটাং এ একটা দিন : মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী”

  1. Debapriya Pramanik says:

    সুন্দর ।শুধু একটা জিনিস লিখে দাও জারোয়াদের ছবি সংগৃহীত

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন