Logo
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ সংগ্রাম, মানবিকতা ও আত্মমর্যাদার জীবনকাব্য — সত্যজিৎ নাথের উপন্যাস “শেষের বেলা” : যশোবন্ত রায় যে জীবন ফড়িঙের, দোয়েলের,… কিছুটা আরশোলারও… : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কৃষক আন্দোলনের ঐতিহ্য ও সাম্প্রতিক কৃষক আন্দোলন : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ উম্মে মুসলিমা-র ছোটগল্প বারবনিতা সাহিত্যিক উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও বঙ্গসাহিত্য : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (১৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ
Notice :

পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন,  ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গা / ৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

৯০. ব্যয় বা খরচ বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মাবলী অনুসরণ করে ১১৯৩ সালের জন্য বাংলা ও উড়িষ্যার নিট রাজস্ব নির্ধারণের হিসাব নিচে দেওয়াগেল —

৯১. মিস্টার গ্রান্টের মতে, ১৭৬৩ সালে (মীর জাফরকে সরিয়ে মীর কাসিমকে নবাব বসানোর বিনিময়ে বর্ধমান, মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম — এই তিন  —  অনুবাদক) হস্তান্তরিত বা সমর্পিত ভূখণ্ডর (শুধু কলকাতা শহরের ‘সায়ের’ বা বিবিধ কর এবং শুল্ক ছাড়া) নিট বন্দোবস্তের পরিমাণ ছিল — দেওয়ানি এলাকার জন্য এবং এর সাথে যুক্ত হবে মেদিনীপুর (যা এই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং যার মূল্য তিনি নির্ধারণ করেছিলেন) ২,৫৬,২৪,২২৩ মোট সিক্কা রুপি ২,৬৭,২৪,২২৩

৯২. ভগ্নাংশ বা খুচরা হিসাব বাদ দিলে, এই দুই মোট অঙ্কের মধ্যে পার্থক্য দাঁড়ায় ৩৩,৭০,৮৪০; তবে যদি আমরা লবণের ব্যবসা থেকে প্রাপ্ত মুনাফাকেও হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করি — যা ১১৯৩ সালের মোট নিট কর-নির্ধারণের (net assessment) মধ্যে ধরা হয়নি এবং যার পরিমাণ সম্পর্কে মিস্টার গ্রান্ট ও উৎপাদন বিভাগের নিয়ন্ত্রকের (comptroller) বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় তা এখনও সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়নি — তাহলে পার্থক্যের পরিমাণ কম হবে।

৯৩. এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে এমন বলা যেতে পারে যে, রাজস্ব আদায়ের ওই বিশেষ খাতের ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের ফলে লবণের ব্যবসা থেকে যে মুনাফা অর্জিত হয়েছে, তা হিসাবের মধ্যে আনা উচিত নয়। এই মন্তব্য আদৌ যথার্থ কি না তা বিচার না করে আমি কেবল তথ্য তুলে ধরব এবং এ বিষয়ে পাঠককে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার দেব; তবে শুধু এটুকু উল্লেখ করব যে, যেহেতু বাংলায় লবণ সেখানকার অধিবাসীদের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য দ্রব্য, তাই ১৭৬৫ সালের তুলনায় এর মূল্য একশ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় — কৃষকদের (রায়তদের) ওপর ধার্য করা খাজনার ওপর এই বৃদ্ধির প্রভাব বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।

৯৪. দেওয়ানি লাভের পর থেকে কর-নির্ধারণের ক্রমবিকাশ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এর পরিমাণ সাধারণত কেবল অনুমান-নির্ভর হিসাবের মাধ্যমেই নির্ধারণ করা হয়েছে; আর এ কারণেই অনেক সময় করের বোঝা এতটাই ভারী হয়ে পড়েছে যে তা পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে, আবার কর বৃদ্ধির দাবি জানানোর মতোই সহজে অনেক ক্ষেত্রে তা মওকুফও করা হয়েছে। জমিদার ও ইজারাদারদের (ফার্মারদের) আয় বা উপার্জনের বিষয়ে কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়েই অনেক সময় করের পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। আবার প্রকৃত অথবা ভুয়া ক্ষতির কথা তুলে ধরে করের বোঝা কমানোর ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

৯৫. ১৭৭২ সালে গঠিত ‘কমিটি অফ সার্কিট’-এর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য জমি ইজারা বা বন্দোবস্ত প্রদানের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত মূল্য বা রাজস্ব-ক্ষমতা নিরূপণ করা। ধারণা করা গিয়েছিল যে, শাসকের তুলনায় স্থানীয় অধিবাসীরা জমির প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে অধিকতর অবগত এবং তারা এমন কোনো অর্থের বিনিময়ে চুক্তিবদ্ধ হবে না যা পরিশোধ করার সামর্থ্য তাদের নেই। কিন্তু বাস্তবের ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি; ইজারার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এই বন্দোবস্ত ব্যবস্থাটি সম্ভবত আর কোথাও তার মূল শর্তানুযায়ী কার্যকর থাকেনি।

৯৬. সরকারি নীতি অনুসরণ করে ইজারাদাররা (ফার্মাররা) যে লাভের হিসাব করেছিলেন তা ভুল প্রমাণিত হয়; কারণ সেই লাভের অস্তিত্বই ছিল না, অথবা — তাদের কাছে যা একই কথা — সেই অর্থ আদায় করা সম্ভব ছিল না। দেশের সব প্রান্ত থেকেই বন্দোবস্তের শর্ত অনুযায়ী অর্থ পরিশোধে অক্ষমতার অভিযোগ আসতে থাকে এবং আমার মতে সরকার সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত বিকল্প গ্রহণ করে — অর্থাৎ রাজস্বের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। এমন পরিস্থিতিতে যারা রাজস্ব প্রদানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তাদের ওপর চুক্তির শর্ত কঠোরভাবে চাপিয়ে দিলে সর্বত্র নিপীড়ন ও অত্যাচারের সৃষ্টি হতো; কারণ দেশের প্রকৃত সম্পদ বা উৎপাদন-ক্ষমতা সম্পর্কে তাদের অধিকাংশেরই কোনো ধারণা ছিল না এবং তা নিরূপণের মতাও তাদের ছিল না। ফলে, আদৌ যদি সেই অর্থের সংস্থান থাকার সম্ভাবনাও থাকত, তবে নিজেদের দায়বদ্ধতা মেটানোর জন্য একমাত্র জোরকরে অর্থ আদায় বা শোষণের পথই তাদের সামনে খোলা থাকত।

৯৭. ১৭৮১ সালে ‘কমিটি অফ রেভিনিউ’ যে বন্দোবস্ত করেছিল, তা-ও অনুরূপ নীতির ওপর ভিত্তি করেই করা হয়েছিল। এ কথা সত্য যে, তখন আর সর্বোচ্চ দরদাতাদের কাছে জমি ইজারা দেওয়া হয়নি এবং সাধারণত জমিদারদেরই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছিল; কিন্তু দেশের ওপর যে বাড়তি রাজস্বের বোঝা চাপানো হয়েছিল, তা দেশের প্রকৃত সম্পদের উপযুক্ত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়নি। জেলার অবস্থা সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যাবলির সাথে ‘খালসা’ (সরকারি রাজস্ব) হিসাবের তুলনা করেই রাজস্বের পরিমাণ নির্ধারণের ভিত্তি প্রস্তুত করা হয়েছিল।

৯৮. সরকারের লক্ষ্য ছিল যে, প্রজাদের দুর্দশা বা কষ্টের কারণ না ঘটিয়ে যথাসম্ভব অধিক রাজস্ব আদায়। অন্যদিকে প্রজারাও নিজেদের স্বার্থের বিষয়ে সমানভাবে সচেতন ছিলেন; তাই তারা প্রদেয় রাজস্বের পরিমাণ কমানোর জন্য নানা কৌশল ও বুদ্ধিমত্তার আশ্রয় নিয়েছেন। এহেন পরিস্থিতিতেই রাজস্ব বন্দোবস্ত চূড়ান্ত করার সময় সরকারি কর্মকর্তা এবং কোনও এক জমিদার বা ইজারাদারের মধ্যে আলোচনা বা সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। প্রথমোক্ত ব্যক্তি (সরকারি প্রতিনিধি) বিগত বছরগুলোর সর্বোচ্চ বন্দোবস্ত ও আদায়ের পরিমাণের দিকে দৃষ্টি রাখেন এবং তাঁর এলাকার মানুষের জন্য ন্যায্য পাওনা আদায়ের চেষ্টা করেন; অন্যদিকে দ্বিতীয় ব্যক্তি (জমিদার বা ইজারাদার) তার অক্ষমতার কথা জানান এবং দাবিকরা অর্থের পরিমাণ কমানোর সপক্ষে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। এমনটা হতে পারে যে, সরকারের দাবিও ঠিক এবং আপত্তিতে উত্থাপিত তথ্যগুলোও যথার্থ; অর্থাৎ, এমন সম্পদ বা আয়ের উৎস হয়তো বিদ্যমান যা কথিত ক্ষতি যথেষ্ট পরিমাণে পুষিয়ে দিতে সক্ষম, অথচ জমিদার বা ইজারাদাররা তা প্রকাশ করছেন না; আবার এর বিপরীত পরিস্থিতিও সত্য হতে পারে। প্রথম ক্ষেত্রে, সরকার নিজের শর্তে অটল থেকে কেবল ন্যায্য পাওনাটুকুই আদায় করে; কিন্তু জেলার প্রকৃত অবস্থা এবং দাবি পূরণের উৎস সম্পর্কে উপযুক্ত তথ্যের অভাবে ভবিষ্যতে এমন সব দাবির মুখে পড়তে হতে পারে যা খণ্ডন করা কঠিন। দ্বিতীয় ক্ষেত্রে, জমিদারকে হয়তো জমি থেকে উচ্ছেদ হতে হবে অথবা চরম আর্থিক সংকটে পড়তে হবে, যা কাটিয়ে ওঠার জন্য ভবিষ্যতে হয়তো আবার জোর করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের পথ বেছে নিতে হবে।

স্তবক আর সারণীর টিকা

৯০ নম্বর স্তবকটি ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের রাজস্বের সারসংক্ষেপ অংশ। বাংলার বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া মোট রাজস্বের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এই স্তবক জন শোরের (স্যার জন শোর) যুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে তিনি জেমস গ্র্যান্টের ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ তত্ত্বের বিপরীতে বাংলার রাজস্বের প্রকৃত চিত্র উপস্থাপন করেছেন।

ব্যাখ্যা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

ফিফথ রিপোর্টের দ্বিতীয় খণ্ডের এই সারণী বাংলার বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া রাজস্বের সারসংক্ষেপ।

১. দেওয়ানি জমি (১,৪৫,৩৬,৩৩৮ টাকা): এই খাতে কোম্পানির প্রত্যক্ষ রাজস্ব-শাসনের অধীন জমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব। দেওয়ানি জমি মূলত ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আদায়ের অধিকারভুক্ত অঞ্চল।

২. সমর্পিত জেলা (২০,৭৫,৯৪,০২৭ টাকা): বর্ধমান, ২৪ পরগনা, কলকাতা, পঞ্চান্নগঞ্জ, চট্টগ্রাম, মেদিনীপুর, জেলাসোর, তহনা বিহার — এই অঞ্চলগুলো ১৭৬০-এর দশকে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে কোম্পানির হাতে আসে। এই তালিকা থেকে বোঝা যায় যে ব্রিটিশ রাজস্ব ব্যবস্থা কীভাবে ক্রমশ সম্প্রসারিত হয়েছিল।

৩. শুল্ক ও কর (২,৫১,১৪,০০৫ টাকা): বন্দর, বাজার ও বাণিজ্য থেকে প্রাপ্ত শুল্ক ও অন্যান্য কর। এটি কোম্পানির রাজস্বের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাণিজ্যিক লাভের পাশাপাশি প্রশাসনিক খরচ মেটাত।

৪. মেদিনীপুরে বিলুপ্ত জমি পুনরুদ্ধার (৮২,৫৭৯ টাকা): এই খাতে পূর্বে অব্যবহৃত বা হস্তান্তরিত জমি থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব দেখানো হয়েছে। কোম্পানির জমি পুনরুদ্ধার ও রাজস্ব বৃদ্ধির কৌশলের অংশ। মোট রাজস্ব (সিক্কা রুপি): ২,৩৩,৫৩,৩৮২ টাকা

কেন এই সারণী গুরুত্বপূর্ণ — প্রথমত এই সারণী বাংলার রাজস্বের তিনটি প্রধান উৎস চিহ্নিত করে :

১। দেওয়ানি জমি – ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব আদায়ের অধিকারভুক্ত জমি (১,৪৫,৩৬,৩৩৮ টাকা)।

২। সমর্পিত জেলা – ১৭৬০-এর দশকে নবাবদের কাছ থেকে চুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অঞ্চল (২০,৭৫,৯৪,০২৭ টাকা)।

৩। শুল্ক ও কর – বন্দর, বাজার ও বাণিজ্য থেকে পাওয়া রাজস্ব (২,৫১,১৪,০০৫ টাকা)। দ্বিতীয়ত শোর এই সারনীসূত্রে গ্র্যান্টের ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ তত্ত্ব খণ্ডন করলেন। জেমস গ্র্যান্টের বক্তব্য ছিল বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব (আন্ডার-অ্যাসেসড)।

কিন্তু এই সারণী সূত্রে শর দেখালেন

১। ১৭৮৬-৮৭ সালে দেওয়ানি জমি থেকে রাজস্ব ছিল ১,৪৫,৩৬,৩৩৮ টাকা।

২। অথচ ১৭৬৫-৬৬ সালে (মুহম্মদ রেজা খানের আমলে) দেওয়ানি জমি থেকে রাজস্ব ছিল ১,৫০,৪৮,৩৩৩ টাকা (পূর্ববর্তী সারণী অনুযায়ী)।

৩। অর্থাৎ, ২০ বছরে দেওয়ানি জমি থেকে রাজস্ব ৫,১১,৯৯৫ টাকা কমেছে। অর্থাৎ এই সারণী প্রমাণ করে যে রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ নেই, বরং তা কমেছে।

তৃতীয়ত শোর এই সারণীটি ব্যবহার করে দেখাতে চেয়েছেন

১। রাজস্ব কমেছে কারণ কৃষকরা তা দিতে পারছিল না।

২। সমর্পিত জেলা ও শুল্কের রাজস্ব যুক্ত করলেও মোট রাজস্ব বাড়েনি — বরং কৃষি-ভিত্তিক রাজস্ব কমেছে।

৩। গ্র্যান্টের ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ তত্ত্ব ভুল – কারণ প্রকৃত তথ্য রাজস্ব হ্রাসের দিকেই ইঙ্গিত করে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট — শোর এই সারণীটি ১৭৭০-এর মন্বন্তর ও কৃষক-বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করেছেন: ১৭৭০-এর মন্বন্তরের পর বাংলার জনসংখ্যা ও উৎপাদন ব্যাপক হ্রাস পায়। কৃষকরা রাজস্বের বোঝা আর বহন করতে পারছিল না — যা রংপুরের কৃষক বিদ্রোহ (১৭৮৩)-এ প্রতিফলিত হয়। শোর দেখাতে চেয়েছেন যে রাজস্ব কমানো মানে ‘জনস্বার্থ’ রক্ষা করা, আর গ্র্যান্টের প্রস্তাবিত রাজস্ব বৃদ্ধি মানে কৃষক-শোষণ বাড়ানো।

৯৩ স্তবকের টিকা

জন শোর ব্রিটিশ রাজস্ব নীতিতে লবণের মূল্য বৃদ্ধি ও কৃষকদের ওপর তার প্রভাব দেখতে চেয়েছেন। শোর বলছেন, কেউ হয়তো আপত্তি তুলতে পারেন যে লবণ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা (যা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের ফলে বেড়েছে) রাজস্ব হিসাবে ধরা উচিত নয়। কিন্তু শোর এই আপত্তির বৈধতা নিয়ে তর্ক না করে বাস্তব তথ্য উপস্থাপন করছেন – “Against this conclusion it may be urged, that the profits of the salt, arising from an alteration in the mode of managing that branch of the revenue, ought not to be brought into the calculation. Without considering the validity of this observation, I shall content myself with stating the fact…” অর্থাৎ, তিনি লবণ ব্যবস্থাপনার পরিবর্তনের ফলে কোম্পানির মুনাফা বাড়লেও, সেই মুনাফাকে রাজস্ব হিসাবে ধরা উচিত কি না — সে নিয়ে তিনি সরাসরি মন্তব্য না করে শুধু তথ্যটি তুলে ধরছেন। (বাস্তবিক ভূমি রাজস্বের আদায়ের পরেই লবণ বাণিজ্য থেকে আয় ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ – অনুবাদক)

১৭৬৫ থেকে ১৭৮৬-৮৭ লবণের মূল্য বৃদ্ধির পরিমান। তিনি বলছেন “…salt in Bengal is universally an essential to the existence of the inhabitants, the effect of the enhanced price of this article, upon the rents levied from the ryots, exceeding a hundred per cent. what it was in 1765…” অর্থাৎ, বাংলায় লবণ মানুষের অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য, এবং ১৭৬৫ সালের তুলনায় লবণের দাম শতকরা ১০০%-এর বেশি বেড়ে গিয়েছিল।

বাস্তব কি বলে? ১৭৬৫ সালে কোম্পানি লবণের ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার লাভ করে। ১৭৬৫ সালে প্রতি ১০০ মণ লবণের দাম ছিল ১২৫ টাকা। ১৭৬৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২৩১ টাকা — অর্থাৎ মাত্র দুই বছরে প্রায় দ্বিগুণ; তার ভাষায় ১০০%। এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের ওপর চরম প্রভাব ফেলেছিল, কারণ লবণ ছিল প্রতিটি পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

শোর এখানে লবণের মূল্যবৃদ্ধি ও কৃষকদের ওপর ধার্য খাজনার মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করেছেন: “…the effect of the enhanced price of this article, upon the rents levied from the ryots…” অর্থাৎ, লবণের দাম বাড়ার ফলে কৃষকদের জীবনযাত্রার খরচ বেড়ে যায় — যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ে খাজনা দেওয়ার ক্ষমতার ওপর। কৃষকরা যখন লবণের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেশি দিয়ে কিনতে বাধ্য হন, তখন তাদের হাতে খাজনা দেওয়ার মতো অর্থ থাকে না। ফলে তারা ঋণগ্রস্ত হয়, জমি হারায়, এবং শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহের পথ বেছে নেয়। শোরের মতে, রাজস্ব মূল্যায়নের সময় এই বিষয়টি বিবেচনা করা আবশ্যক — কারণ লবণের মূল্যবৃদ্ধি পরোক্ষভাবে কৃষকদের ওপর চাপ বাড়ায় এবং রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে।

কেন আমাদের আলোচনায় ৯৩ স্তবক গুরুত্বপূর্ণ? শোর শুধু কোম্পানির মুনাফার কথা বলেননি, বরং কৃষকদের জীবনযাত্রার খরচ ও তার প্রভাবও বিবেচনা করেছেন। গ্র্যান্টের তত্ত্বের খণ্ডন করেছেন। জেমস গ্র্যান্টের বক্তব্য বাংলার রাজস্ব আরও বাড়ানো সম্ভব (আন্ডার-অ্যাসেসড)। শোর এখানে প্রমাণ করছেন যে লবণের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের ওপর চাপ বাড়িয়েছে, তাই রাজস্ব বাড়ানোর সুযোগ নেই — বরং তা কৃষক-শোষণ বাড়াবে। অথচ শোর দেখাচ্ছেন, কোম্পানি লবণের ব্যবসায় একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করে দাম বাড়িয়েছিল, যা কৃষকদের ওপর পরোক্ষ করের মতো কাজ করেছিল। শোর এই বিষয়টি তুলে ধরেছেন, যা ব্রিটিশ রাজস্ব নীতির শোষণমূলক চরিত্রকে উন্মোচন করে।

আদতে ৯৩ নম্বর স্তবকে শোর প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে লবণের মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের ওপর চরম প্রভাব ফেলেছিল, এবং রাজস্ব মূল্যায়নের সময় এই বিষয়টি বিবেচনা করা আবশ্যক। তিনি গ্র্যান্টের ‘আন্ডার-অ্যাসেসমেন্ট’ তত্ত্বের বিপরীতে দেখাতে চেয়েছেন যে কৃষকরা ইতিমধ্যেই অতিরিক্ত করের বোঝায় নিপীড়িত, এবং লবণের দাম বাড়লে তাদের ওপর চাপ আরও বাড়ে — যা রাজস্ব বৃদ্ধির সুযোগকে অস্বীকার করে। এই স্তবকটি শোরের কৃষক-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তববাদী বিশ্লেষণ-এর একটি উদাহরণ।

চলবে

ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট ফ্রম দ্য সিলেক্ট কমিটি অন দি অ্যাফেয়ার্স অফ দি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভলিউম-২, ইন্ট্রোডাকশন অ্যান্ড বেঙ্গল এপেন্ডিক্স।

বিশ্বেন্দু নন্দ


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন