ডালহৌসি ধরমশালা যখন যাওয়া হয়েছিল তখন এটা একেবারেই মাথায় ছিল না যে সামনেই সংক্রান্তি এবং নতুন বছর আসছে। জানা ছিল না এটাও যে আমাদের নববর্ষের মত হিমাচলীরা একই দিনে নববর্ষ পালন করেন। আর শিমলা বা ডালহৌসিতে যত হিমাচলীরা আছেন তত পাঞ্জাবীরাও আছেন। এটা এমনিতে যত না বোঝা যায়, কোনও মন্দিরে গেলে তখন বোঝা যায়। এগুলো লেখার কারণ আর কিছুই না, এটা বোঝানো যে মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে না পড়লে সেই স্থান সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতে পারেন না। এখন উইকিপিডিয়া হয়েছে, গুগল রয়েছে, তবু আসল জিনিস চাক্ষুষ না করলে কিছুই জানা সম্ভব নয়। এটা যাঁরা পায়ের তলায় সর্ষে নিয়ে ঘোরেন, তাঁরা অবশ্যই একমত হবেন।
ডালহৌসি খাজিয়ারের সৌন্দর্য একধরনের আবার ধরমশালা একটু অন্য রকম। সেখানে আপার ধরমশালায় দলাই লামা অধিকাংশ সময় বাস করেন। ফলে ওখানে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব অনেকটা। আবার আপার ধরমশালার আরো উপরে উঠলে আছে একটি নীরব নিস্তব্ধ চার্চ, একা। সেটা পাশে রেখে আরো পাক খেয়ে উপরে উঠলে ভাগসুনাগ আপনাকে স্বাগত জানাবে। ভাগসুনাগে আবার রয়েছে গভীর হা হা করা খাদের ধারে হিন্দু মন্দির। কি অদ্ভুত তাই না? আসলে ঈশ্বরে ঈশ্বরে তো কোনও ঝগড়া নেই, যত অশান্তি মানুষের মনে।
চৈত্র সংক্রান্তিতে যখন আমরা ডালহৌসি থেকে পাক খেতে খেতে ধরমশালা আসছিলাম, তখন রাস্তায় মাঝেমাঝেই আমাদের গাড়ি দাঁড়িয়ে পড়ছিল, কারণ শিঙা ও তাসা জাতীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে ছোট বড় শোভাযাত্রা পাহাড়ি রাস্তা কিছুক্ষণের জন্য আটকে দিচ্ছিল। শোভাযাত্রার সামনে হলুদ বস্ত্র পরিহিত দুজন ব্যক্তি, যাঁদের দেখে পুরোহিত মনে হয়েছে। মাঝে চতুর্দোলায় স্বর্ণালঙ্কারে শোভিতা দেবীমাতা বা আমাদের সারথি মদন ভাইয়ার ভাষায় ‘মাতারাণী’। আর পিছনে গ্রামবাসী। গাড়ি থেকে নেমে মাতারাণীকে প্রণাম জানিয়ে আবার পথ চলা শুরু।
এরকম শোভাযাত্রা কেন বা কি কারণে জানতে গিয়ে জানলাম যে এখানে কোনও কোনও মন্দিরে মাতারাণীকে সংক্রান্তিতে অন্য মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার কোনও কোনও মাতা শোভাযাত্রা সহকারে পথে সাধারণ মানুষের সঙ্গে আলাপ সেরে আবার নিজের মন্দিরে ফিরে এসে গুছিয়ে বসেন। বুঝলাম মায়েরও ঘোরার সাধ হয়।
পরদিন অর্থাৎ পয়লা বৈশাখে আমার গন্তব্য জ্বালামুখী বা জাওয়ালমুখী মন্দির। হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলার এটি একটি বিখ্যাত মন্দির শহর। শহরের নামকরণ হয়েছে এই মন্দির থেকেই। হরিদ্বারের মত এখানেও হিন্দু বংশতালিকা সংরক্ষণ করা হয়। ফিরোজ শাহ তুঘলক নাগরকোট অভিযানের সময় এই মন্দিরটি ধ্বংস করেন এবং অপবিত্র করেন। তিনি এই মন্দির থেকে ১৩০০টি সংস্কৃত পান্ডুলিপি চুরি করে নিয়ে যান যা পরবর্তীতে ফার্সি ভাষায় অনুবাদ করা হয়।
জ্বালামুখীর দেবীকে আদি পরাশক্তির অবতার হিসাবে মানা হয়। যাঁকে দুর্গা বা কালী নামেও আরাধনা করা হয়। এই মন্দির ৫১টি সতীপীঠের মধ্যে অন্যতম পীঠ। ইতিহাস অনুযায়ী কাংড়ার কাটোচ রাজা ভূমি চাঁদ, যিনি দেবী দুর্গার একজন মহান ভক্ত ছিলেন, তিনি এই স্থানটিকে স্বপ্নাদেশে পেয়েছিলেন। রাজা তখন এই স্থানের খোঁজে লোক পাঠান। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী ঠিক ওই স্থান খুঁজে পাবার পরেই রাজা সেই স্থানে মন্দির নির্মাণ করেন।

জ্বালামুখী মন্দির ঘিরে রয়েছে অপূর্ব ধৌলাধার পর্বতশৃঙ্গ। যার মাথায় বরফের মুকুট। আর মন্দিরের মাথায় জ্বলজ্বলে সোনার কলস। মূল দরজা রৌপ্যনির্মিত। জ্বালামুখী বা জাওয়ালমুখীতে গর্ভগৃহে পাথরের ফাটল থেকে নির্গত নয়টি শিখাকে নবদুর্গার প্রতীক হিসাবে পূজা করা হয়। কবে, কখন, কিভাবে এই শিখা নির্গত হয়েছিল তা অজানা। তবে বিজ্ঞানীদের মতে মন্দিরের নীচে ভূগর্ভস্থ আগ্নেয়গিরির অবস্থানের জন্য সেই আগ্নেয়গিরির প্রাকৃতিক গ্যাস পাথরের ফাটলের মধ্যে দিয়ে শিখারূপে বেরিয়ে আসে। তবে ভক্তদের কথা আলাদা।
কথিত আছে যে মুঘল সম্রাট আকবর এই আগুন নেভানোর অনেক চেষ্টা করেছিলেন। তিনি ভয় পেয়েছিলেন এই ভেবে যে এই অগ্নিশিখা পুরো নগর ভস্মীভূত করে দিতে পারে। কিন্তু এই শিখা তিনি কোনোভাবেই নেভাতে পারেন নি। তখন দেবীমাহাত্ম্য মেনে আকবর এই মন্দিরে একটি সোনার ছাতা (ছত্রি) উপহার হিসেবে দেন। কিন্তু ছাতাটি পড়ে যায়। কথিত আছে সোনার ছাতা অন্য ধাতুতে পরিণত হয়। এই ঘটনায় দেবীর প্রতি সম্রাটের বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। প্রতি বছর হাজার হাজার তীর্থযাত্রীরা তাদের মনস্কামনা পূরণের জন্য, আধ্যাত্মিক অগ্রগতির জন্য এই মন্দির দর্শন করেন।
মন্দিরের সামনে একটি ছোট মঞ্চ এবং একটি বড় মন্ডপ আছে। যেখানে নেপালের রাজা কর্তৃক প্রদত্ত একটি বিশাল ঘন্টা ঝোলানো আছে। দেবীমাতাকে দুধ ও জল নিবেদন করা হয় এবং অভিষেকে গর্তে পবিত্র অগ্নিশিখায় নিবেদন করা হয়। প্রসাদ এখানে ঘন দুধ বা রাবড়ি, মিছরি, কিছু শুকনো ফল এবং দুধ দিয়ে তৈরি যে কোনো ভোগ।
পবিত্র শিখার সামনে একটি শ্রীযন্ত্র থাকে। যেটি শাল এবং স্বর্ণালঙ্কারে ঢাকা। দেবীর পূজার্চনা সারা দিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে হয়। দিনে পাঁচবার আরতি হয়। আরতির জন্য মন্দির সকালে ১১.০০টা থেকে ১২.০০টা এবং সন্ধ্যা ৬.০০টা থেকে ৭.০০টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দে মহারাজ রঞ্জিত সিং এই মন্দিরের গম্বুজ সোনা দিয়ে মুড়ে দেন। এই মন্দির দেবী দুর্গার বিখ্যাত মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম একটি মন্দির। এই মন্দিরের কয়েক ফুট উপরে একটি ছয় ফুট গর্তে সদা সর্বদা গরম জল ঝরছে। এই মন্দির শক্তিপীঠ হিসাবেও বিবেচিত। জ্বালামুখী অর্থাৎ মায়ের বা সতীর জিহ্বা এখানে পড়েছিল এমনটাই মানা হয়। এই মন্দিরের কাছে শিবের অবতার ভৈরব মন্দিরও বর্তমান।
এ তো গেল মন্দিরের বর্ণনা। কারণ বর্ণনা না দিলে সম্যক ধারণা জন্মায় না। আমরা এই জ্বালামুখী দর্শন করতে গিয়েছিলাম পয়লা বৈশাখে। এর আগে ধারণা ছিল না পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বৈশাখী কিভাবে পালিত হয় বা আদৌ পালিত হয় কি না। ওখানের অভিজ্ঞতা শিখতে বাধ্য করেছে যে পয়লা বৈশাখে শুধু কালীঘাট আর দক্ষিণেশ্বরে ভীড় হয় না। হিমাচল প্রদেশের এবং পাঞ্জাবের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎসব এই বৈশাখী।
পাঞ্জাবি হিন্দু ছাড়াও শিখদের কাছে নববর্ষের গুরুত্ব অপরিসীম। এই সময় শিখরা কীর্তন করেন। স্থানীয় গুরুদ্বারে যান। নগর সংকীর্তনে বের হন। নিশান সাহেব পতাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া উৎসবে ভান্ডারার মাধ্যমে সর্ব সম্প্রদায়ের মানুষকে খাবার বন্টন করা হয়। বৈশাখী সংক্রান্তি নামে এই দিন ছুটির দিন হিসাবে সরকারি ভাবে ঘোষিত। এত তথ্য কিছুই জানা হত না যদি না এই দিন জ্বালামুখী দর্শনে যেতাম।
ভোরবেলা স্নান সেরে মদন ভাইয়া যখন গাড়ি স্টার্ট করল তখন শুধু বলেছিল যে ‘মন্দির যাচ্ছেন যখন দর্শন না করে ফিরবেন না।’ কথাটা কেন বলেছিল সেই মুহূর্তে বুঝিনি। বরং কথাটা শুনে মনে মনে হেসেছি যে মন্দিরে গিয়ে আবার কেউ দর্শন না করে ফেরে! জ্বালামুখী দর্শনের আগে গেলাম আর একটি সতীপীঠে। ব্রজেশ্বরী মন্দির। এটিও কাংড়াভ্যালিতে। কথিত আছে এখানে সতী মায়ের বাম স্তন পড়েছিল। বিশাল মন্দির চত্বর। তাই ভীড় হলেও দর্শনে কোনও অসুবিধা হয় নি। ব্রজেশ্বরী মন্দির দর্শন করে এলাম জ্বালামুখী।
গাড়ি পাক খেয়ে উঠতে উঠতে এক জায়গায় থেমে গেল। এখান থেকে হেঁটে উঠতে হবে বেশ উঁচুতে মায়ের মন্দিরে। দুপাশে সারি সারি দোকান। পূজার ডালি কিনে একটু বাঁক ঘুরতেই দেখলাম লাইন শুরু হয়েছে। সেই লাইন বহু বাঁক ঘুরে উঠে গেছে মূল মন্দিরে। এবার বুঝতে পারলাম কেন ড্রাইভার বলেছে — দর্শন না করে ফিরবেন না। লাইন যেভাবে এগোচ্ছে, বুঝতে পারলাম, আজ সন্ধ্যায় দর্শন হবে বা তারও পরে। সকলের মুখে জোরে জোরে মায়ের নাম উচ্চারণ হচ্ছে।
লাইন ছেড়ে পাশ দিয়ে উঠতে শুরু করলাম। মনে আশা বাইরে থেকে দর্শন করে চলে আসার। তখনও জানি না যে গর্ভগৃহে প্রবেশ না করলে কোনরূপ দর্শন হয় না। এ মা ভবতারিণী নন যে বাইরে থেকে টুক করে দর্শন মিলবে। মন্দির চত্বরে প্রবেশ করে দেখলাম ভীড় কাকে বলে। তারসঙ্গেই চলছে মাতৃনাম সংকীর্তন। মূল মন্দিরের চারটি দ্বারে প্রহরা দিচ্ছেন দ্বাররক্ষক। প্রত্যেকেই বললেন লাইন না দিলে দর্শন হবে না। লাইন দিয়েও আজ দর্শন নাও মিলতে পারে। তাহলে কালকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

মন্দির প্রদক্ষিণ করতে করতে মাকে আর্জি জানিয়ে চলেছি যে মা এতদূর থেকে এত কষ্ট করে এসেছি, তুমি দর্শন দেবে না? ফিরিয়ে দেবে? নরম বাঙালির দেহ, এত কষ্ট কি সহ্য হয় মা? এইসব বোধহয় মা শুনে ফেলেছিলেন। বোধহয় কেন, নিশ্চিত শুনেছিলেন। তাই ঘুরতে ঘুরতে যেই প্রধান দ্বারের কাছে গেছি, অমনি সামনে থাকা তিন চারজন লম্বা চওড়া ধবধবে পাঞ্জাবী মহিলা আমাদের ধরে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলেন। আমি ওনাদের বললাম যে আমরা লাইন দিইনি। ওনারা ওদের লম্বা চওড়া দেহের মতই চওড়া মন নিয়ে হেসে বললেন, ‘তাতে কী? দর্শন তোমাকে মা দেবেন বলেই আমরা তোমাদের টেনে নিলাম।’ সত্যিই তো। এতক্ষণ দ্বারে দ্বারে ঘুরে আর্জি জানিয়ে লাভ হল না। কিন্তু এক মুহূর্তে একদম সামনের দ্বার দিয়ে প্রবেশ করলাম কার জন্য, কিভাবে?
প্রবেশের অধিকার পেয়ে এতই বিস্মিত ছিলাম যে মায়ের রূপ দেখে আর বিস্মিত হইনি। শুধু অকারণে চোখে জল এসেছিল। অহেতুকী কৃপা পেলে যেটি হয়। তার সঙ্গে পাঞ্জাবীদের প্রতি একটা নরম দিক মনের মধ্যে তৈরি হয়ে গেল নিজে থেকেই।
হিমাচলী এবং পাঞ্জাবী মিলেমিশে আছেন গোটা কাংড়া ভ্যালিতে। কাংড়া ভ্যালিতে চৈত্র মাসে একটি উৎসব হয় যেটি চৈত বা ঢোলরু নামে পরিচিত। বিশেষ করে কাংড়াভ্যালিতে এটি পালিত হয় সমস্ত খারাপ জিনিস দূর করে সুখ সমৃদ্ধির সূচনার জন্য। এই ঢোলরু উপলক্ষে একটি বিশেষ ধারার গান গাওয়া হয়। আর কাংড়ায় বসন্ত উৎসবের শেষে বৈশাখী উৎসব পালন করা হয়। সাধারণত এটি ১৩ই এপ্রিল পড়ে। উৎসবের প্রস্তুতি নেওয়া হয় একমাস ধরে। গোটা বাড়ি ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করা হয়। যেখানে সম্ভব নতুন রঙে রঙিন করে তোলা হয় ঘর। ধার্মিকরা বনগঙ্গায় স্নান করে পবিত্র হন। এই বৈশাখী উপলক্ষে গোটা কাংড়া জুড়ে বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে। সেই মেলাও দেখার মত।
ঘুরতে যাওয়া মানে শুধুই চোখের দেখা তো নয়, মনেরও দর্শন। সেখানের জলহাওয়া, মাটি, উৎসব, মেলা, স্থানীয় বাজার হাট সব কিছুর মধ্যে পাওয়া যায় জীবনের খোঁজ। আর এই খোঁজের জন্য নিরন্তর চলার নামই জীবন।
পেজফোরনিউজ-এর নববর্ষ বিশেষ সংখ্যা ২০২৪-এ প্রকাশিত।