এই পাহাড়ি পথে ভিউ পয়েন্ট বলে কিছু নেই। পাহাড় নিজেই এক অন্তহীন দৃশ্যপট। প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি ভাঁজে অলক্ষ্যে ফোটে নতুন কোনো বিস্ময়। আমরা শুধু পথিক হয়ে চোখ মেলে দেখি।
লোয়ার মুস্তাং জেলার মারফা গ্রাম থেকে আমরা পাখি ডাকা ভোরে বেরিয়ে পড়েছি হোটেলের খিড়কি দরজা দিয়ে। গোটা গ্রাম তখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। আমাদের গন্তব্য অবশ্যই একটা আছে। মধ্য নেপালের মানাং। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে উত্তর থেকে আমরা নেপালের হৃদয় ছুঁয়ে আসব। মাঝে আমাদের থামতে হবে। যদিও কোনো হোটেলের প্রি বুকিং নেই। মানাংয়ের পথে চালক ঈশ্বরের থেকে বান্ধবী সান্ত্বনা অনেক বেশি ভরসার।সে এই জায়গা নিয়ে পড়াশোনা করে এসেছে। মানাংয়ে ঈশ্বরের কখনো পা পড়েনি। দুর্গম এই পথে জিপিএস-ও প্রায়শই দিশা হারায়।

সেদিনের সকাল আমাদের জন্য এক অন্যরকম উপহার নিয়ে এল। সূর্য তখন অন্নপূর্ণাকে সাজিয়ে দিচ্ছে — সোনার সাজে। মুগ্ধ, হতবাক আমরা গাড়ি থামিয়ে দেখলাম সেই অপার্থিব দৃশ্য। অন্নপূর্ণার এক চূড়া থেকে অন্য চূড়া, ধীরে ধীরে জেগে উঠছে সোনার মুকুট পরে। আলোর স্পর্শে পর্বত যেন নিজেই দেবতা হয়ে উঠছে। কুমার সম্ভবের কবি কালিদাস বলছেন, —
“অস্ত্যুত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা হিমালয়ো নাম নগাধিরাজঃ।
পূর্বাপরৌ তোয়নিধীবগাহ্য স্থিতঃ পৃথিব্যা ইব মানদণ্ডঃ।”

উত্তর দিগন্তে বিরাজমান নগাধিরাজ হিমালয় স্বয়ং দেবতার আত্মা স্বরূপ। পূর্ব ও পশ্চিমের সমুদ্র ছুঁয়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন পৃথিবীর মানদণ্ডের মতো অটল ও মহিমান্বিত হয়ে। অনাদিকাল থেকে তিনি জীব এবং জড়ের রক্ষাকর্তা।
সেই দেবতার কোলে গড়ে উঠেছে কর্মমুখর গ্রাম। সেজেছে রঙিন বনভূমি। নদীর তরঙ্গে বেজেছে আনন্দসুর। মানুষ খুঁজেছে দুর্লভ জড়িবুটি। পশুরা পেয়েছ তাদের বিস্তৃত চারণভূমি। শিহরণ জাগানো কঠিন পথে অথবা ভ্যালির পাশ দিয়ে যেতে যেতে আমাদের চোখের সামনে কোলাজের মত সেইসব দৃশ্যের পর দৃশ্য প্রতি মুহূর্তে বদলে যায়।

নেপালে এখন বিয়ের লগ্ন। আমরা হঠাৎই ঢুকে পড়ি এক বিয়েবাড়ির আনন্দে। বর-কনেকে শুভেচ্ছা জানাই। আমাদের গলায় খাদা পরিয়ে, শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করা হয়।
পথে ভেড়ার পাল আমাদের পথ রোধ করে। দুষ্টু রাখাল বলে, “যেতে নাহি দিব!”
অগত্যা আমাদের থামতেই হয়।
তারপর সাজানো-গোছানো আপেল ফার্মে আপেলের জুস খেয়ে আবার যাত্রা শুরু অমসৃণ, সর্পিল পাহাড়ি পথে। সেই পথে অবিরাম চঞ্চল ঝর্ণারা, আবার কোথাও শান্ত লেক বা তালের জল। আমাদের সঙ্গী হয়ে চলে মার্সিয়াংদি নদী। চলতে চলতে সে যেন আমাদের থামিয়ে দেয় লামজুং গ্রামে।
“এতো তাড়া কিসের তোমাদের! খানিক বসো। আমায় দেখো। একটু না হয় গল্প করো আমার সঙ্গে। তারপর যেও আমার উৎসের সন্ধানে।”

বহমান নদীর পাশে ছোট্ট গ্রাম লামজুং। বিকেলে ঘরের সামনে বসে সবাই বন থেকে তুলে আনা ঢেঁকি শাক বাছছে। সেখানে ‘হোমস্টে ব্লু স্কাই’ চালান সদ্য বিবাহিতা তুলকাশির শাশুড়ি। গুরুং পরিবারের এই নতুন, লাজুক বৌ বা বুখারিটি আমাদের মালপত্র তিনতলায় তুলে দেয়।শ্বশুরকে সে ডাকে ‘মামা’, শাশুড়িকে ‘ফুফু’।
আমি কৌতুহলে জিজ্ঞেস করি, “মামার ছেলের সঙ্গে তোমার বিয়ে হয়েছে?”
সে হেসে বলে, “হ্যাঁ, আমাদের সমাজে এমন চল আছে।”
যদিও তুলকাশির বরকে দেখার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি। সংসারের ঊনকোটি কাজ আর হোমস্টের অতিথিদের দেখাশোনা — শাশুড়ি আর বৌ মিলে সব সামলায়। শ্বশুর বসে বসে রাক্সি পানীয় পান করে আর লোকজন জুটিয়ে আড্ডা মারে। আমরা সে রাতে মার্সিয়াংদির গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ি।

পরদিন পাইন বনের ছায়ায় ছায়ায় আবার পথচলা শুরু। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথের ঘুরপাকে হঠাৎই সামনে এসে ধরা দিল মানাংয়ের সেই পান্না-সবুজ গ্রীন লেক, এক নিমেষে আমাদের স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো সৌন্দর্য নিয়ে। নির্জন, নীরব সেই লেক যেন যুগ যুগ ধরে অপেক্ষায় ছিল, শুধু আমাদের জন্যই।
লেকের ধারে দাঁড়িয়ে চোখ তুলে তাকাতেই দেখা যায় বরফের শাড়ি পরা অনিন্দ্যসুন্দর অন্নপূর্ণা, তাঁর মহিমা ও মাধুর্য নিয়ে পূর্ণ প্রকাশিত।
সবুজের অধ্যায় শেষ করে এবার নীলের খোঁজে পথ চলা। চারপাশে বরফশীতল হাওয়া বইছে, তবু নীল লেকের জলে এক বিন্দুও অস্থিরতা নেই। স্থির, গভীর, ধ্যানমগ্ন সেই জলরাশি যেন নিজের মধ্যেই ডুবে আছে।

আর ঠিক সেই কারণেই, তার এই শান্ত সৌন্দর্য আমাদের ভেতরের চঞ্চলতাকে আরও উসকে দেয়। মনে হয়, এত নীরবতার মাঝেও কোথাও যেন এক অদৃশ্য টান আছে যা আমাদের টেনে নিয়ে যায় তার গভীরে, তার অনন্ত নীলের ভেতরে।
সবুজ আর নীল জলের আচ্ছন্নতা কাটিয়ে সামনে ডাক দেয় মানাং গ্রাম — একটি ছোট্ট, পাহাড়ি জনপদ। এখানে জীবন যেন অন্য ছন্দে বাঁধা। গুম্ফার নীরব প্রার্থনা, চৌর্তের ধ্যানমগ্ন উপস্থিতি, আর ঘূর্ণায়মান মণিচক্রের পবিত্র স্পর্শে প্রতিদিনের জীবন এখানে ধীরে ধীরে আবর্তিত হয়।বজ্রযান বৌদ্ধধর্মের আধ্যাত্মিক বন্ধনে আবদ্ধ এই গ্রামের মানুষ কঠোর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেই নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। শীতল হাওয়া, অনুর্বর মাটি, দীর্ঘ শীত সব প্রতিকূলতার মাঝেও তাদের জীবনযাপন এক আশ্চর্য স্থিতধী শক্তির পরিচয় দেয়।

মানাংয়ে মার্সিয়াংদি নদীর উৎসভূমি, গঙ্গাপূর্ণা পাহাড় আর হ্রদের সামনে আমরা আনত হই। নিজেকে কত ক্ষুদ্র, কত তুচ্ছ মনে হয়।তবু সেই তুচ্ছতার মধ্যেই যেন এক মুক্তির স্বাদ লুকিয়ে থাকে। আমাদের সমস্ত ব্যস্ততা, হিসেব-নিকেশ,
শহুরে ক্লান্তি আর সীমাবদ্ধতা
সবকিছু ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে।
রয়ে যায় শুধু এক অদ্ভুত টান,
অপরূপের প্রতি, অনন্তের প্রতি।
তখনই যেন বুকের গভীর থেকে ভেসে ওঠে,
“পথের হাওয়ায় কী সুর বাজে,
বাজে আমার বুকের মাঝে, বেদনায়
আমার ঘরে থাকাই দায়…”
পথ তখন আর শুধু পথ থাকে না,
সে হয়ে ওঠে এক আহ্বান!
শেষ।