৫৬. বুড়িমার জীবন সংগ্রাম ও চকোলেট বোম
আমি শব্দবাজির বিপক্ষে। চকোলেট বোমের মাহাত্ম্য কীর্তনের জন্যও এ লেখা নয়। এ আসলে এক নারীর জীবন সংগ্রাম ও অদম্য জেদের কাহিনি। নাম তাঁর অন্নপূর্ণা দাস ( ১৯৩৫-১৯৯৫)। ‘বুড়িমা’ নামে তিনি পরিচিত। কিন্তু তার আগে আতশবাজির কাহিনিটা একটু জেনে নেওয়া যাক।
চিনের লিউয়াং এলাকায় শুরু হয়েছিল আতশবাজি। ৬০০-৯০০ খ্রিস্টাব্দের কোনও এক সময়ে এক চিনা অ্যালকেমিস্ট পটাশিয়াম নাইট্রেট, সালফার আর কাঠকয়লা মিশিয়ে এক ধরনের কালো পাউডারজাতীয় গুঁড়ো তৈরি করেন। ফাঁপা বাঁশের লাঠি বা শক্ত কাগজের টিউবের মধ্যে সেই গুঁড়ো ঢেলে তৈরি হয় পৃথিবীর প্রথম আতশবাজি। হয়তো মার্কো পোলো প্রাচ্য থেকে আতশবাজি নিয়ে যান ইউরোপে। চতুর্দশ শতকে ইউরোপে যে আতশবাজির চর্চা ব্যাপকভাবে ছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। ভারতে আতশবাজির রমরমা শুরু হয় ইসলাম-বিজয়ের পরে। উনিশ শতকে ভারতের কলকাতায় প্রথম আতশবাজির কারখানা গড়ে ওঠে। ১৯২৫ সালে পি আইয়া নাদার ও শানমুগা নাদার তৈরি করেন আতশবাজির কারখানা।
বাংলাদেশের ফরিদপুরে অন্নপূর্ণা দাসের জন্ম। গরিব ঘরের মেয়ে। কম বয়েসে তাঁর বিয়ে হয় সুরেন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গে। এই সময়ে দেশভাগ হল। আর স্বামীও মারা গেলেন প্রায় বিনা চিকিৎসায়। ততদিনে দুই সন্তানের মা তিনি। এখন কি করবেন তিনি? নিজে বাঁচবেন কিভাবে, সন্তানদেরও বাঁচাবেন কিভাবে? কি ভেবে চলে এলেন পশ্চিমবঙ্গে। পশ্চিম দিনাজপুর জেলার ধলদিঘির সরকারি ক্যাম্পে আশ্রয় নিলেন। পেট চালাতে ধলদিঘির বাজারে সবজি বেচতে শুরু করলেন। তারপরে চলে এলেন গঙ্গারামপুরে। বিড়ি বাঁধার কাজ শিখে নিয়েছিলেন। শুরু করলেন বিড়ির ব্যবসা। এবার জমে উঠল ব্যবসা। তৈরি হল তাঁর বিড়ির কারখানা।
এখন আর তেমন অর্থকষ্ট নেই। কিন্তু চিন্তা আছে। মেয়েটা বড় হয়েছে। বিয়ে দিতে হবে তার। একটা যোগাযোগ ঘটে গেল। হাওড়ার বেলুড়ে মেয়ের বিয়ে দিলেন অন্নপূর্ণা। কি মনে হল গঙ্গারামপুরের পাততাড়ি গুটিয়ে চলে এলেন বেলুড়ে। প্যারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে একটি দোকানসহ বাড়ি কিনে ফেললেন।
বসে থাকলে তো চলবে না। ব্যবসা করতে হবে। কি ব্যবসা করবেন? সরস্বতীপুজোর আগে তাঁর মাথায় এল একটা ভাবনা। প্রতিমা বিক্রির ব্যবসা করলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ। পিলখানার যোগেন্দ্র পালের কারখানা থেকে ঠেলাভর্তি করে প্রতিমা নিয়ে এলেন। ছোট বড় সব রকমের। সরস্বতীপুজো প্রায় ঘরে ঘরে। তখন বেলুড়ে সরস্বতীপ্রতিমা তৈরি হত না। কিনতে হত দূর থেকে। এখন বেলুড়বাসী ঘরের কাছে পেয়ে গেল প্রতিমা।
কালীপুজোর সময়ে তাঁর মনে হল বাজির ব্যবসা করলে কেমন হয়! তিনি বাজি কিনে এনে বিক্রি করতে লাগলেন। ধার করা দশটা একশো টাকার নোট দিয়ে। এই ব্যবসাও জমে উঠল। কিন্তু তিন দিনের মাথায় পুলিশ এসে হাজির তাঁর দোকানে। পুলিশ বলল, বাজি বিক্রি করছ, লাইসেন্স আছে?
অন্নপূর্ণা অবাক। বাজি বিক্রি করতে লাইসেন্স লাগে বুঝি!
পুলিশকে বোঝালেন তিনি। না, লাইসেন্সের কথা জানতেন না। এবার যেন তাঁকে রেহাই দেওয়া হয়। লাইসেন্স তিনি করাবেন।
একদিন তিনি দুপুরে বাড়ি এসে ছেলেকে একটা কাগজ দেখিয়ে বললেন, এই দেখ, বাজি বিক্রির লাইসেন্স, আর এই দেখ বাজি তৈরির অনুমতিপত্র।
ছেলে অবাক। বলে, তুমি বাজি তৈরি করবে? কিছু তো জানো না।
অন্নপূর্ণা হেসে বলেন, বাঁকড়ায় একজনের সঙ্গে দেখা হল। নাম তার আকবর আলি। সে বাজি তৈরির কৌশল জানে। সে শেখাবে আমাকে।
সাংবাদিক অময় দেব রায় লিখেছেন :
“ বাজির ব্যবসা শুরুর পিছনেও রয়েছে লড়াইএর কাহিনি। এক সময় তিনি লক্ষ করলেন বাজি কিনে বিক্রি করার থেকে অনেক বেশি লাভ তৈরি করতে পারলে। যেমন ভাবনা তেমনি কাজ। শুরু করেন বাজি তৈরি। কারখানাও বানান। তবে তার জন্য আইনি ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে তাঁকে। সে সব সামলে এক সময়ে লাইসেন্সও পেয়ে যান। শোনা যায় তিনি বাজি তৈরি শিখেছিলেন আকবর আলি নামে বাঁকড়ার এক ব্যবসায়ীর থেকে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নিজেই খোঁজ করে নিয়ে আসেন কারিগরদের। নিজের নতুন নামেই তৈরি করলেন ব্র্যাণ্ড। ‘বুড়িমা’ ব্র্যাণ্ড হয়ে ওঠে বাজির বাজারে। সবচেয়ে বেশি নাম করে ‘বুড়িমার চকলেট বোম। ”
১৯৯৫ সালে শব্দ বাজি নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই মারা যান বুড়িমা। ১৬/১ প্যারীমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের বাড়িতে বহু মানুষ এসেছেন শ্রদ্ধা জানাতে। এমন সময়ে বাইরে শোনা গেল চকোলেট বোম ফাটানোর শব্দ। বুড়িমার আত্মীয়রা বাইরে এসে দেখেন একদল যুবক চকোলেট বোম ফাটাচ্ছে। তাঁরা যুবকদের বললেন, এমন শোকের সময় একি চ্যাংড়ামো!
যুবকরা বলল, না চ্যাংড়ামো নয়। এটা জয়ধ্বনি। যে চকোলেট বোম বানিয়ে গোটা বাজির বাজার জিতে নিয়েছেন, সেটা ফাটিয়ে বুড়িমাকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছি আমরা।