টেবিলের ওপর নীল মলাটের খাতাটা পাঁচ দিন ধরে একইভাবে পড়ে আছে। ধুলো জমতে শুরু করেছে, কিন্তু অমিতাভ সেন একবারও সেটি ছুঁয়ে দেখেনি। প্রতিদিন সকালে চায়ের কাপ হাতে সে খাতার দিকে তাকায়, আবার মুখ ফিরিয়ে নেয়। মনে হয়, শব্দগুলো যেন তাকে ডাকে; অথচ সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার ইচ্ছেটুকুও আর অবশিষ্ট নেই।
একসময় কবিতা ছিল তার শ্বাস নেওয়ার মত সহজ। একটি শব্দের জন্য রাত জেগে থাকা, একটি চিত্রকল্পের জন্য নদীর ধারে হাঁটা — এসবই ছিল তার জীবনের অংশ। কিন্তু এখন চারদিকে শব্দের এমন অপচয় যে, কবিতা যেন নিজের মুখটাই হারিয়ে ফেলছে।
মোবাইলের পর্দায় একের পর এক নতুন কবিতা ভেসে ওঠে। ছিন্নভিন্ন বাক্য, অসংলগ্ন শব্দ, অর্থহীন বিস্ময়চিহ্ন — এসবই নাকি আধুনিকতার নতুন ভাষা। হাজার হাজার লাইক, অজস্র প্রশংসা। অমিতাভ বিস্মিত হয়ে ভাবে, শব্দ কি তবে কেবল প্রদর্শনীর বস্তু? অনুভূতির কোন মূল্যই কি আর নেই?
এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ল তার বন্ধু অরুণ।
‘কী রে, আজকাল কিছু লিখছিস না?’
অমিতাভ মৃদু হেসে বলল,’ লিখে কী হবে? এখন তো কবিতার চেয়ে শব্দের কসরত বেশি বিক্রি হয়।’
অরুণ চেয়ার টেনে বসল।
‘সবাইকে এক চোখে দেখিস না। সময় বদলায়, ভাষাও বদলায়।’
‘ভাষা বদলাক, আপত্তি নেই। কিন্তু কবিতার আত্মা যদি হারিয়ে যায়? কেবল দুর্বোধ্য শব্দ সাজালেই কি কবিতা হয়? শিল্প কি শুধু চমকে দেওয়ার নাম?’
অরুণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল, ‘তোর রাগটা আসলে কবিতার ওপর নয়, সময়ের ওপর।’
অমিতাভ জানলার বাইরে তাকাল। বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ম্লান হচ্ছে।
‘আমি কবিতার ওপর কখনও রাগ করতে পারি না। অভিমান করি। কারণ কবিতা আমাকে মানুষ করেছে। আজ সেই কবিতাকেই বাজারের পণ্যের মতো ব্যবহার হতে দেখি। তাতেই কষ্ট হয়।’
অরুণ খাতাটা হাতে তুলে নিয়ে বলল,’এটা খুলে দেখ। পাঁচ দিন ধরে তোকে অপেক্ষা করছে।’
অমিতাভ মাথা নাড়ল।
‘ না, এখনও না। আমি এমন কোনো কবিতা লিখতে চাই না, যেটা পড়ে পাঁচ মিনিট পরে কেউ ভুলে যাবে। আমি চাই শব্দ মানুষের ভেতরে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকুক।’
ঘরে নীরবতা নেমে এল। বাইরে সন্ধ্যার প্রথম তারা জ্বলেছে। টেবিলের ওপর পড়ে থাকা খাতাটা যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিল — কবিতা কখনও কবিকে ছেড়ে যায় না; কখনও কখনও সে শুধু অপেক্ষা করে, কবি আবার সত্যিকারের শব্দের কাছে ফিরে আসবে বলে।
দুই
জেলা গ্রন্থাগারের সভাকক্ষে সেদিন মাসিক কবিসভার আয়োজন। নতুন-পুরোনো মিলিয়ে অনেক কবির ভিড়। মঞ্চে আধুনিক কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা চলছে। কেউ বলছে, কবিতাকে ভেঙে ফেলাই নতুন সৃষ্টি; কেউ বলছে, অর্থহীনতাই নাকি নতুন অর্থের জন্ম দেয়।
অমিতাভ সেন শেষ সারিতে বসে সব শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, শব্দের শরীরকে যেন ইচ্ছে করেই ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে। কবিতা আর অনুভূতির আশ্রয় নয়, যেন শব্দ নিয়ে এক ধরনের প্রদর্শনী।
এক তরুণ কবি উঠে বলল,’ আজও যারা ছন্দ, চিত্রকল্প আর অর্থের কথা বলেন, তারা সময়ের অনেক পিছিয়ে। জীবনানন্দ দাশের পর আর নতুন কিছু নেই। তাঁর ভাবনার অনুরণনই আমাদের কবিতার শেষ আশ্রয়।’
কথাটা শেষ হতেই হাততালিতে ভরে উঠল হলঘর।
অমিতাভ আর চুপ থাকতে পারল না। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
‘জীবনানন্দ দাশকে ভালোবাসা আর তাঁকে অনুকরণ করা এক জিনিস নয়। তাঁর কবিতার অন্ধকার ছিল নিজের সময়ের, নিজের একাকিত্বের। সেই অন্ধকারকে ধার করে নিজের কবিতা লেখা যায় না।’
একজন তরুণ হেসে বলল, ‘আপনি কি বলতে চাইছেন আমরা ভুল লিখছি?’
অমিতাভ শান্ত গলায় উত্তর দিল, ‘ভুল নয়। কিন্তু শব্দকে আহত করে কবিতা তৈরি হয় না। কবিতার শরীর আছে, তার শ্বাস আছে। তাকে ছিন্নভিন্ন করলে কেবল ভাঙা বাক্য থাকে, কবিতা থাকে না।’
আরেকজন প্রতিবাদ করল, ‘কবিতার কোনো নিয়ম নেই। পাঠক বুঝুক বা না বুঝুক, সেটাই শিল্প।’
অমিতাভ মৃদু হেসে বলল, ‘কবিতা ধাঁধা নয়। কবিতা পাঠকের হৃদয়ে পৌঁছানোর একটি সেতু। সেই সেতুই যদি ভেঙে দিই, তবে কবি একা দাঁড়িয়ে থাকবে নিজের শব্দের ধ্বংসস্তূপে।’
ঘরে মুহূর্তের জন্য নীরবতা নেমে এল। কয়েকজন প্রবীণ কবি সম্মতির দৃষ্টিতে তাকালেন, আবার অনেকে বিরক্ত মুখে অন্যদিকে চোখ ফেরালেন।
সভা শেষে অরুণ পাশে এসে বলল, ‘আজ তুই অনেকের অপছন্দের মানুষ হয়ে গেলি।’
অমিতাভ মৃদু হেসে উত্তর দিল, ‘যদি শব্দকে বাঁচাতে গিয়ে অপছন্দের মানুষ হতে হয়, তাতেই আমার আপত্তি নেই। কবিতা কোনো ফ্যাশন নয়; এটি মানুষের ভেতরের সবচেয়ে নির্মল উচ্চারণ। আগামী প্রজন্মের হাতে আমি ক্ষতবিক্ষত ভাষা নয়, জীবন্ত শব্দ তুলে দিতে চাই।’
হলঘর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে গেল। বাইরে রাত নেমেছে। বাতাসে শুকনো পাতার শব্দ। অমিতাভ মনে মনে অনুভব করল, তার লড়াই কোন কবির বিরুদ্ধে নয়; তার লড়াই কবিতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য। এই লড়াই হয়ত দীর্ঘ, হয়ত একাকী। তবু সে জানে, সত্যিকারের কবিতা কখনও শব্দের কোলাহলে জন্মায় না — জন্মায় নীরবতার গভীরে, মানুষের অনিবার্য সত্য থেকে।
তিন
কবিসভার সেই বিতর্কের পর অমিতাভ সেন যেন আরও একা হয়ে গেল। সামাজিক মাধ্যমে তার বক্তব্য নিয়ে বিদ্রূপ চলল, কয়েকটি ছোট পত্রিকার সম্পাদক তার লেখা ফিরিয়ে দিলেন। কেউ লিখল — “অমিতাভ সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি”, কেউ বলল — “পুরোনো নন্দনতত্ত্ব আঁকড়ে ধরে থাকা এক হতাশ কবি।”
অমিতাভ প্রতিবাদ করল না। কারণ সে জানত, শব্দের আসল লড়াই কাগজে নয়, মানুষের ভেতরে।
এরপর সে শুরু করল এক অন্যরকম উদ্যোগ। প্রতি মাসে শহরের কোন না কোন উন্মুক্ত প্রান্তে তরুণদের নিয়ে কবিতা পাঠের আসর বসাতে লাগল। সেখানে কোন প্রতিযোগিতা নেই, করতালির মোহ নেই, নামী সম্পাদকদের উপস্থিতিও নেই। শুধু কবিতা, পাঠক আর মানুষের অভিজ্ঞতার বিনিময়। সে বলত, “শব্দকে জটিল করলেই কবিতা বড় হয় না। মানুষের হৃদয়ে পৌঁছাতে পারলেই কবিতা দীর্ঘজীবী হয়।”
কিছু তরুণ তার পাশে এসে দাঁড়াল, অনেকেই দূরে সরে গেল। কিন্তু অমিতাভ বুঝল, পরিবর্তন কখনও সংখ্যার জোরে আসে না; আসে বিশ্বাসের শক্তিতে।
তবু রাতের নির্জনতায় একটি প্রশ্ন তাকে তাড়া করত — তবে কি সে ভুল পথে হাঁটছে? তবে কি জীবনানন্দ দাশের মত সেও একদিন নিজের সময়ের কাছে অচেনা হয়ে যাবে? “বনলতা সেন” কি কেবল একটি কবিতা, নাকি পথহারা মানুষের অন্তহীন আশ্রয়ের নাম?
একদিন গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেল তার। জানলার বাইরে পূর্ণিমার আলো নেমে এসেছে। অদ্ভুত এক টান অনুভব করল সে। কোন পরিকল্পনা ছাড়াই খাতা আর কলম ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়ল।
ভাগীরথীর পাড় তখন নিস্তব্ধ। নদীর বুক জুড়ে চাঁদের আলো ভাঙা রুপোর পাতার মতো ছড়িয়ে আছে। বাতাসে কাশফুল দুলছে, দূরে কোথাও মাঝির ক্ষীণ সুর ভেসে আসছে। অমিতাভ ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল।
তার মনে হচ্ছিল, এই নদী বহু কবির পদচিহ্ন বহন করে চলেছে। কত স্বপ্ন, কত ব্যর্থতা, কত অব্যক্ত কবিতা — সবই যেন জলের সঙ্গে মিশে গেছে।
হাঁটতে হাঁটতে সে থামল এক পুরোনো বটগাছের নীচে। নদীর দিকে তাকিয়ে মনে হল, অন্ধকার কখনও শত্রু নয়; অন্ধকারই হয়ত নতুন আলোর জন্ম দেয়। জীবনানন্দ যে বনলতা সেনকে খুঁজেছিলেন, তিনি হয়ত কোন নির্দিষ্ট নারী ছিলেন না। তিনি ছিলেন মানুষের ক্লান্ত আত্মার বিশ্রাম, দীর্ঘ পথচলার পর এক মুহূর্তের আলো।
অমিতাভ নিজের মনেই বলল, “আমার বনলতা সেন কে? কোনো মানুষ, কোনো মুখ, নাকি এমন একটি কবিতা, যা এখনও লেখা হয়নি?”
ঠিক তখনই নদীর বাতাসে খাতার পাতা উল্টে গেল। সাদা পাতার দিকে তাকিয়ে তার মনে হল, এতদিন সে অন্যদের বোঝাতে ব্যস্ত ছিল, অথচ নিজের ভেতরের নীরবতাকে শোনেনি।
সে চাঁদের আলোয় লিখতে শুরু করল —
“যে শব্দ মানুষের চোখের জল স্পর্শ করে না, সে শব্দ কবিতা নয়। যে কবিতা মানুষের একাকিত্বের পাশে বসে থাকতে জানে না, সে কেবল বাক্যের অলংকার।”
কলম থামল না। বহুদিনের জমে থাকা অভিমান ধীরে ধীরে ভাষা হয়ে বেরিয়ে এল। সে অনুভব করল, কবিতা কাউকে হারায় না; হারিয়ে যায় কেবল কবির বিশ্বাস। আর বিশ্বাস ফিরে এলে শব্দও ফিরে আসে।
ভোরের প্রথম আলো ফুটতে শুরু করেছে। নদীর ওপারে আকাশে লালচে রেখা। অমিতাভের মনে হল, সে যেন কোন অচেনা দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। সেখানে জীবনানন্দের ছায়া আছে, আবার তার নিজেরও এক নতুন পথ আছে। অনুকরণ নয়, উত্তরাধিকার নয় — নিজস্ব কণ্ঠস্বরই একজন কবির প্রকৃত পরিচয়।
সে ধীরে ধীরে খাতা বন্ধ করল। আজ আর কোন সম্পাদককে কিছু প্রমাণ করার তাড়া নেই। বর্তমান প্রজন্ম তাকে গ্রহণ করবে কি করবে না, সেই উৎকণ্ঠাও নেই। কারণ সে বুঝেছে, কবিতার ভবিষ্যৎ কোন প্রতিষ্ঠানের হাতে নয়; তা বেঁচে থাকে সেই মানুষগুলোর মধ্যে, যারা এখনও একটি সত্য শব্দের জন্য অপেক্ষা করতে জানে।
ফিরতি পথে ভাগীরথীর জলে শেষবারের মতো চোখ রাখল অমিতাভ। চাঁদের আলো ফিকে হয়ে এসেছে, কিন্তু অন্ধকার আর তাকে ভয় দেখায় না। সেই অন্ধকারের গভীরেই সে খুঁজে পেয়েছে নিজের নতুন যাত্রার শুরু — এক বিকল্প বনলতা সেনকে, যে কোন মুখ নয়, কোন নাম নয়; সে এক অনন্ত সৃজনশক্তি, এক অবিনশ্বর কবিতার আলো।
অমিতাভ হাঁটতে লাগল। সামনে দীর্ঘ পথ। সেই পথের শেষ কোথায়, সে জানে না। তবে এবার তার হাতে একটি খাতা আছে, আর হৃদয়ে জেগে উঠেছে এমন এক কবিতা, যার জন্য কোন করতালির প্রয়োজন নেই। কারণ সত্যিকারের কবিতা শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছে নয়, মানুষের আত্মার কাছেই ফিরে যায়।